প্রত্যেকটি সঙ্কট আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে বদলে দেয়। করোনাভাইরাস অনুরুপ তাই করবে। তবে এই পরিবর্তনের মাত্রা কেমন হবে এখনও বলার মত সময় আসেনি। তবে আমার ঘরবন্দী জীবনে কিছু বিষয়ের অভিজ্ঞতা এলোমেলো ভাবে তুলে ধরলাম-

১. রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক গুরত্বপূর্ণ সময়। এ সময়টাতে মানুষ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় সারাদিন রোজা রেখে মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ে। মাস জুড়ে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বিশেষ রহমত ও ফজিলত আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্তির সুযোগ থাকে। কিন্তু করোনার আমাদের ধর্মীয় রীতি নীতি বদলে দিচ্ছে। এই যে একাকিত্ব আমাদের একার নয়। পৃথিবীর সমস্ত সম্প্রদায়ের কাছে এটা এখন বাস্তব অভিজ্ঞতা। 

২. আমাদেরকে যারা প্রতিনিয়ত করোনা সর্ম্পকিত তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করে গৃহে সুরক্ষিত থাকতে সাহায্য করছেন সে সব সাংবাদিক ভাই ও বোনদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞ। আমরা যখন গৃহে নিজেদেরকে নিরাপদ রাখছি তেমনি তাঁরা নিজেদের পরিবারকে রেখে তথ্য সংগ্রহের জন্য আক্রান্ত এলাকায় যাচ্ছেন, সঠিক তথ্য তুলে এনে আমাদেরকে অবহিত করছেন। তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা বাড়ল। 

৩. বাংলাদেশে চিকিৎসকদের প্রতি সেবা সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের অভিযোগের অন্ত ছিলনা [ এখনও কিছু আছে]। চিকিৎসার খরচ আর সেবা নিতে গিয়ে লম্বা লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হলে আমরা সমালোচনা মূখর থাকতাম । গরীবের ডাক্তার ভাই মঈনুদ্দিন জীবন দিয়ে দেখিয়ে দিল এই সঙ্কটময় সময়ে সম্মুখবর্তী সেনা হিসাবে তারা এগিয়ে এসেছে। আজ ডাক্তার, নার্সরা আমাদের প্রিয়জন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা যেন তাঁদের ভূলে না যাই। 

৪. পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী এই সঙ্কটকালীন সময়ে যেভাবে সাধারন মানুষের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে, রোগীদের হাসপাতালে পৌছে দিচ্ছে, অভূক্ত মনুষদের ত্রাণ দিচ্ছে, আইন শৃঙ্খলা ঠিক রাখছে এবং অনেকে নিজেরা আক্রান্ত হয়েও দায়িত্বে অবহেলা করছেন না, তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। প্রকৃত বন্ধুর দেখা মিলে বিপদে। আমরা এই প্রকৃত বন্ধুদেরকে যেন সর্বদা স্মরণ করি। 

৫. দেশের প্রধানমন্ত্রী যাকে মায়ের সংঙ্গে তুলনা করা যায়। সর্বদা নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন দেশের মানুষকে এই দুঃসময়ের হাত থেকে রক্ষা করতে। আমরা জানি আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় সম্পদ সীমিত। এই স্বল্প সম্পদ নিয়ে মানুষের পাাশে থেকে অভয় দিচ্ছেন ‘সাথে আছি সাথে থাকব’। অনেক জনপ্রতিনিধি স্বাভাবিক সময়ে যত গর্জে উঠেছিলেন আজ তাদের দেখা পাওয়া বড় দুস্কর। শত সালাম তোমায় জননী পাশে থাকার জন্য। 

৬. এই সময়ে পারিবারিক (স্বচ্ছল পরিবারদের জন্য) বন্ধন দৃঢ় হবে বলে আমি বিশ্বাস  করি। বাবা-মা একসময় অফিস বা ব্যবসায়ের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। সন্তানদেরকে সময় দেবার মত ফুসরত ছিল না। তারা এখন এক সঙ্গে খাবার খাচ্ছে, গল্প করে সময় কাটাচ্ছে, যার অর্থ নিজেরা পরস্পরকে সময় দিচ্ছে এবং নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরী হচ্ছে। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে পরবর্তীতে পারিবারিক কাঠামো অটুট থাকবে বলে আশা করি। 

৭. দিন মজুর যারা পারিশ্রমিকের উপর জীবনযাপন করে, তাদের অপরিহার্যতা আমাদের বুঝিয়ে দিল। সম্প্রতি অনেককে মাথা ন্যাড়া হতে দেখছি অর্থাৎ তাদের কোন উপায় না থাকায় [সেলুনের কাজ বন্ধ থাকায়] এই কাজ করতে হয়েছে। বাড়ীতে অনেকে অসুস্থ্য থাকায় কাজের লোকের দরকার কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে এই অসুস্থ্য লোকদের কষ্টের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে এই শ্রমিকরা আমাদের সম্পদ। আমরা যেন তাদের দুঃসময়ে পাশে থাকি। 

৮. এই লকডাউন আমাদের বোঝাতে পেরেছে কাদেরকে কিভাবে সাহায্য দেয়া উচিত। পাশের বাড়ীর রান্না করা খাবার বস্তিতে বিতরণ, বাসার নিচে ছোট মুদির দোকান থেকে জিনিস কেনা, যাতে সেই দোকানদারটিও তার ব্যবসা এই দুর্দিনেও চালিয়ে যেতে পারে, তার খেয়াল রাখা। 

৯. আমাদের জনস্বাস্থ্য খাতের দূর্বলতা এবং কিভাবে সামলান যাবে তার স্পষ্ট রুপরেখা ফুটে উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেজ্ঞদের অধিক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সঠিক সময়ে সম্বনয়ের মাধ্যমে যথোপযুক্ত কাজে তাদের মনোনিবেশ করতে হবে। আমরা সাধারন আম জনতা তাদের দিকে তাকিয়ে আছি।