কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রতিযোগিতার উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে কিছু গবেষক মনোযোগ দিয়েছেন মানুষকে চিকিৎসা করার স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতির দিকে: মনোকোলোনাল অ্যান্টিবডি। ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে, যা কিনা শরীরকে চালিত করবে স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরির দিকে। এই বিজ্ঞানীরা সরাসরি সার্স-কোভ-২ করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে এই অণুর ডিজাইনার ভার্সন সরাসরি শরীরে প্রবেশ করান। তবে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত অ্যান্টিবডি নিয়মিত ব্যবহার করা হয় ক্যানসারের মতো রোগের চিকিৎসার জন্য, যা প্রস্তুত করা কঠিন এবং এর মূল্যও অনেক। ফলে এগুলো গরিবদের নাগালের বাইরে থেকে যায়।

এই সতর্কবার্তা ১০ আগস্ট দুটি নেতৃস্থানীয় জনস্বাস্থ্য চ্যারিটি থেকে এসেছে: নিউইয়র্কের অলাভজনক গবেষণা সংস্থা দ্য ইন্টারন্যাশনাল এইডস ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভ (আইএভিআই) এবং লন্ডনের রিসার্চ ফান্ডার ওয়েলকাম। তারা কভিড-১৯ ও অন্যান্য রোগের বিরুদ্ধে থেরাপিউটিক অ্যান্টিবডিগুলোর প্রাপ্যতা বৃদ্ধির আহ্বান করেছে। এটি করা হয়েছে ব্যবসায়িক মডেল এবং প্রযুক্তি দ্বারা দামি ওষুধের দাম কমানোর জন্য।

এই শৃঙ্খলা বেশ দীর্ঘ, জানিয়েছেন আইএভিআইয়ের প্রেসিডেন্ট মার্ক ফেইনবার্গ। তিনি বলেন, কভিড-১৯ সত্যিকার অর্থেই এই ইস্যুর ওপর জোর দিয়েছে। মহামারী এই আলাপকে সামনে আনার দাবি করছে এবং পরিবর্তনের জন্য সমাধানগুলো তৈরি করতে বলেছে।

বাধ্যতামূলক বিজ্ঞান

কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে একটি ভ্যাকসিন সম্ভবত কয়েক মাসের মধ্যে আসতে যাচ্ছে। কিন্তু এর পরও অনেক মাস পর্যন্ত অনেক মানুষ এটা গ্রহণ করতে পারবে না। এমনকি তার পরও বৃদ্ধরাসহ অনেক মানুষ ইমিউনাইজেশনের জন্য ঠিকঠাকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারবে না এবং অনেকে এটাকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারে।

এই ফ্যাক্টরগুলো কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে থেরাপিগুলোর বিকাশকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ডাক্তারদের হাতে এ রোগের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পথ হাতে নেই। রেমডেসিভির নামক অ্যান্টিবডি কিছু রোগীর হাসপাতালে থাকার সময়কালকে সংক্ষিপ্ত করেছে, কিন্তু এটা দামি এবং এর স্বল্পতাও রয়েছে। এছাড়া ডেক্সামেথাসোন নামক স্টেরয়েড, যা দামে সাশ্রয়ী এবং বিস্তৃতভাবে উপলব্ধ। এটি কেবল মারাত্মকভাবে অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা দেখিয়েছে।

ইনফেকশাস ডিজিজ ফিজিশিয়ান জেনস লুন্ডগার্ন বলেন, বিজ্ঞানীরা মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির ওপর মনোযোগ বৃদ্ধি করেছেন, তারা এটি এ আশায় করেছেন যে তারা ভাইরাল আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়াটিকে কাজে লাগাবেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার রীতিমতো বিস্ফোরণ হচ্ছে। এটা বেশ দারুণ আশাবাদের ব্যাপার।

এই প্রক্রিয়ায় গবেষকরা সেরে ওঠা রোগীদের অ্যান্টিবডি গ্রহণ করে এবং সেখান থেকে সেরাগুলো চিহ্নিত করে, যা ভাইরাসকে নিউট্রালাইজ করে একে আবদ্ধ করার মাধ্যমে এর প্রতিলিপি হওয়া থামিয়ে দেয়। তারপর তারা এই অ্যান্টিবডিগুলো ল্যাবে বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করে। যদি চিকিৎসা কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে বায়োরিএক্টর ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো উৎপাদন বাড়িয়ে দেবে।

এটা কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা চিকিৎসা থেকে আলাদা, যেটি অ্যান্টিবডি ও অণুর জটিল মিশ্রণ দিয়ে গঠিত, যা কভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা মানুষের রক্ত থেকে সরাসরি নেয়া হয় এবং অন্য রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহূত হয়। এই দুটি প্রক্রিয়ার প্রভাব স্বল্পস্থায়ী। এর কোনোটিই দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না।

অ্যাক্সেস গ্যাপ

আইএভিআইয়ের হিসাবমতে ৭০টির বেশি অ্যান্টিবডি থেরাপি বিকাশমান আছে কভিড-১৯-এর চিকিৎসা ও প্রতিরোধ করার জন্য এবং অনেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও চলমান আছে।

কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যদি এ ধরনের চিকিৎসা গড়ে ওঠে তবে তারা সম্ভবত বিশ্বের বেশির ভাগ জায়গায় খুব বেশি পথ খুঁজে পাবে না। মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপিজ সাধারণত ছোট মলিকিউল ওষুধের চেয়ে বেশ খরুচে হয়। এগুলো মুখে নেয়ার পরিবর্তে নিতে হয় ইনজেকশনের মাধ্যমে এবং জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুতকারকদের জন্য এগুলোর প্রতিলিপি তৈরি করা কঠিন। থেরাপিউটিক অ্যান্টিবডির ৮০ শতাংশ বৈশ্বিক বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও কানাডা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যান্টিবডি থেরাপি জন্য গড় মূল্য প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার ইউএস ডলার থেকে ২ লাখ ইউএস ডলার পর্যন্ত।

ফেইনবার্গ বলেছেন, মহামারী প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরির সহজ ও সাশ্রয়ী উপায় খুঁজতে পারে। পাশাপাশি এটি থেরাপিউটিক অ্যান্টিবডি প্রস্তুতকারক কোম্পানি এবং অন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তিকে উৎসাহিত করতে পারে। এছাড়া নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অ্যান্টিবডি থেরাপিকে পরিচিত করার ব্যাপারে রেগুলেটরদের ওপর জোর প্রয়োগ এবং তাদের ব্যবহারে অনুমোদন লাভ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

ফেইনবার্গ বলেন, আমি জানি না তাদের কেউ সমাধান দেবে কিনা। কিন্তু যদি আপনি তাদের একীভূত করতে পারেন তাহলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় হবে।

স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য

কেউ এখন পর্যন্ত কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি থেরাপির বৃহৎ এবং বিস্তৃত গবেষণা সম্পন্ন করেনি। কিন্তু সামনের মাসগুলোতে ট্রায়ালগুলোর ফলাফল প্রত্যশা করা যায়। ৪ আগস্ট লুন্ডগ্রেনের ট্রায়াল কভিড-১৯ আক্রান্ত ১ হাজার মানুষের যুক্ত করার কথা বলেছে। আরো একটি বড় ট্রায়াল, যা স্পন্সর করছে এনআইএইচ এবং গেগেনেরনন। সেটি শুরু হয়েছে ৬ জুলাই এবং এটি সার্স-কোভ-২-এর বিরুদ্ধে দুটি অ্যান্টিবডির মিশ্রণ টেস্ট করবে। যার ফল আশা করা যাচ্ছে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পাওয়া যাবে।

যদিও এই অ্যান্টিবডিগুলো একই ভাইরাসকে লক্ষ্য করে চালিত হয়, তবুও প্রতিটি সার্স-কোভ-২-এর সংস্পর্শে আসে ভিন্নভাবে। কিছু ভাইরাসের সঙ্গে অন্যগুলোর চেয়ে আরো শক্তভাবে আবদ্ধ হয় কিংবা এর সারফেসের এমন সাইটগুলোকে লক্ষ্য করবে যা ভাইরাসকে আরো কার্যকরভাবে থামিয়ে দেয়। যদিও অ্যান্টিবডির প্রকৃতি হচ্ছে সুরক্ষা দেয়া, তার পরও নিরাপত্তা নিয়ে কিছু ভাবনা আছে। গবেষকরা অ্যান্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে, এটি একটি ঝামেলাপূর্ণ অবস্থা। যেখানে কিছু অ্যান্টিবডি ভাইরাসকে মানব কোষে প্রবেশে সাহায্য করতে পারে, সংক্রমণ প্রতিরোধ করার পরিবর্তে। কিন্তু এ সমস্যা দূর করা গেলে অ্যান্টিবডিগুলো কার্যকর হবে।

নেচার