কোনো সরকারি নেতাই সত্যিকার অর্থে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংক্রান্ত মহামারীর জন্য প্রস্তুত ছিল না। যুগপত্ভাবে সুপার পাওয়ারদের মধ্যকার উত্তেজনা এবং অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়েছে। যা মূলত বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের কারণে সৃষ্ট। তাই কেউ সহজেই বুঝতে পারবে কঠিন পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে কেন সরকার উদ্বিগ্নতা ও উত্কণ্ঠা বোধ করছে। তবে উত্তরসূরিরা তাদের এ নিষ্ক্রিয়তার জন্য ক্ষমা করবে না। বিশেষত এখানে তাদের জনগণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অনেক কিছু রয়েছে। সার্বভৌম সরকারের দায়িত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে কারণ বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং সাহায্যের মাত্রা স্মরণকালের সবচেয়ে নিচের স্তরে এসে থেমেছে। তাই এখন অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনে প্রতিটি রাষ্ট্রের সমালোচনামূলক, পরিষ্কার ও কঠোর এজেন্ডা থাকা উচিত এবং সেটি কাজে লাগানো উচিত।

বর্তমান সংকটের সময়টা চ্যালেঞ্জিং, কারণ এটি ভিন্ন তিনটি বিভাগের মাঝে সমন্বয়ের চেষ্টা করছে, যা সাধারণত একে অন্যকে সহযোগিতা করতে অভ্যস্ত নয়। এই তিনটি বিভাগ হলো স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও বৈদেশিক নীতি বিশেষজ্ঞ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের লক্ষ্য থাকবে যত বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়। অর্থনীবিদ দেখবেন খরচের পরিমাণ এবং সুযোগ-সুবিধাগুলো। অন্যদিকে বিদেশ নীতি বিশেষজ্ঞের কাজ হচ্ছে বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণে দেশে প্রবেশের জন্য পথ তৈরি করা। এই বিশেষজ্ঞরা জানেন না কীভাবে নিজেদের সঙ্গে কথা বলতে হয় এবং জরুরি সমস্যা সমাধানে কীভাবে একসঙ্গে সুসংগত নীতি দ্রুততার সঙ্গে বিন্যস্ত করা যায়।

যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে তা হলো আমরা লকডাউনে থাকি বা না থাকি, ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত অর্থনীতি চালু করা সম্ভব না। লকডাউনের পর শৃঙ্খলা ও পদ্ধতিগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশেষ করে যতক্ষণ পর্যন্ত না সাশ্রয়ী টেস্ট পাওয়া যাবে অথবা সব জায়গায় কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল উপলব্ধ হবে।

দুই মাস স্ব-উদ্যোগে কোমায় থাকার পর কোনো অর্থনীতিকে পুনরায় চালু করা নজিরবিহীন। আমরা যে দেশেই থাকি না ভোক্তাদের অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার কমে যাবে। গত দুই মাসে ভারতে কদাচিৎই কার বিক্রি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে কাপড়ের বিক্রি ৮০ শতাংশ কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বেকারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া যেটি বেশি দুশ্চিন্তার বিষয় তা হলো বিশ্বের কর্মশক্তির প্রায় অর্ধেক কিংবা ১.৬ বিলিয়ন শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোতে কাজ করে, যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত এ খাতকে উদ্ধারে কোনো প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়নি। আমদানি ও রফতানি দুটোই ২০২০ সালে ১৩ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এছাড়া বিমান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও মার্কেটগুলো বন্ধ হয়ে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে অর্থনীতিকে ফেরানো যায়?

প্রতিক্রিয়ার সঠিক ব্যবস্থা জানতে হলে আমাদের ইতিহাসের কাছে ফিরে যেতে হবে। যেভাবে চাকরি হারাচ্ছে লোকেরা এবং মূলধনের ব্যয়ও স্থবির হয়ে আছে। বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছে। গত ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কেনেসিয়ান অর্থনীতির (মন্দা বা সংকটকালের অর্থনীতি) যে ধারা চলে আসছে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ে সংকটের প্রতিক্রিয়ায় এটি হয়তো সঠিক পন্থা নয়। গত দুই দশকের আর্থিক সংকটের কারণে মনিটারি পলিসি সরঞ্জাম পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। তারল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, সুদের হার কমে গেছে, করপোরেটগুলোর ঋণের পরিমাণ ১২ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে এবং তার পরও এখনো কোনো মুদ্রাস্ফীতি নেই।

এখন একজন কীভাবে তার চাকরি হারানো এবং মূলধন ব্যয় ফ্রিজ হওয়া থামাতে পরে? বর্তমান সংকটে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন হচ্ছে সামগ্রিক চাহিদাকে ত্বরান্বিত করা। যদি ঠিকভাবে সামলানো যায়, তবে মুদ্রাস্ফীতির হুমকি আরো দূরে থাকবে।

কেনেসিয়ান বিশ্বে এই সময়টি সামগ্রিক চাহিদার ওপর চাপ দেয়ার জন্য উপযুক্ত। আবার ঋণের বাজার এখানে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই সময়ে ভবিষ্যতের কথা ভেবে টাকার মুদ্রণে যাওয়া দরকার। পাশাপাশি এর খরচের ব্যাপারেও সতর্ক হতে হবে। প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য মূলত দুটি দিগন্ত এখানে উন্মোচিত আছে। একটি হচ্ছে যুদ্ধে তাত্ক্ষণিকভাবে যেকোনো উপায়ে টিকে থাকা এবং দ্বিতীয়ত হচ্ছে শান্তি অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, যা ভাইরাস চলে যাওয়ার পর প্রয়োজন হবে।

বর্তমানে অবশ্য তাত্ক্ষণিকভাবে পাঁচটি জায়গায় নজর দেয়া প্রয়োজন। প্রথমত অস্থায়ী কর্মীরা যারা হয় ছাঁটাই হয়েছেন বা কাজ ছাড়া আছেন তাদের দুর্দশা লাঘব করুন। দ্বিতীয়ত কাজে থাকা শ্রমিকদের বেতন পাওয়ার জন্য সহায়তা করুন। তিন থেকে ছয় মাসের জন্য চাকরির সহায়তা প্রদান খুবই জরুরি। তৃতীয়ত, নিউ ডিল, দ্য মার্শাল প্ল্যান বা করোনা ডিল নামের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবুন, যা প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর জন্য জরুরি। চতুর্থত অর্থনৈতিক খাতগুলোকে রক্ষা করুন এবং পঞ্চম ও শেষটি হচ্ছে বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত খাতকে সহায়তা দেয়া।

ওপেন ম্যাগাজিন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত