আমি একজন ফিজিশিয়ান সায়েন্টিস্ট। পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে ক্লিনিক্যাল, বৈজ্ঞানিক ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো নিতে আমি অভ্যস্ত। প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনের গঠন নিয়ে পরামর্শ দেয়া আমার কাজের অংশ। নভেল করোনাভাইরাসের এ মহামারীর সময় বাকি সবার মতো আমাকেও অনিশ্চয়তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে। অনেক অনিশ্চয়তা জমা হয়ে আছে কভিড-১৯-এর একটি কার্যকর ভ্যাকসিনের সামনে আসা নিয়েও।
একটি ভ্যাকসিনকে তখনই লাইসেন্স দেয়া হবে, যখন সেটি সাধারণ জনগণের মাঝে সুরক্ষা ও কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে অনেক প্রশ্ন: একটি ভ্যাকসিন অন্যটির চেয়ে অধিক কার্যকর কিনা, যাদের মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করবে (যেসব মানুষকে ট্রায়ালে হয় বাদ দেয়া হয় কিংবা দূরে রাখা হয়), ভ্যাকসিন
সংক্রমণ কিংবা মারাত্মক রোগ দূর করতে পারবে কিনা, ইমিউনিটি কত সময় পর্যন্ত থাকবে এবং আদর্শ, অবিশ্বাস ও গুজবের কারণে কোন দলটি ভ্যাকসিন প্রতিহত করবে কিংবা খারিজ করবে।
এসব অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন ভ্যাকসিনটি সরবরাহ করতে হবে, কাকে দিতে হবে ও কতবার দিতে হবে সে বিষয়ে। ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভ্যাকসিন দেয়া হবে কিনা। পাশাপাশি তাদের বুঝতে হবে যে একটি কার্যকর ভ্যাকসিন হয়তো প্রতি জন ইমিউনাইজ ব্যক্তিকে অসুস্থ হওয়া থেকে কিংবা অন্যদের সংক্রমিত করা থেকে রক্ষা করতে পারবে না। কর্তৃপক্ষ যে কাজটি ভালোভাবে করতে পারে তা হলো কোন বিষয়গুলো জানা এবং কোন বিষয়গুলো অজানা তা পরিষ্কার হওয়া, আলোচনায় সাধারণ মানুষকে যুক্ত করা, তাদের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে আস্থা তৈরি করা।
সাফল্যের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় আমাদের জানা আছে। ভ্যাকসিনেটেড হওয়ার জন্য মানুষকে অবশ্যই আগ্রহী হতে হবে: হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হলে ৬০ শতাংশের বেশি লোকের ভ্যাকসিন গ্রহণ করার প্রয়োজন হবে, সম্ভবত সেটি ৭০ শতাংশের বেশিও হতে পারে। সামাজিক বাস্তবতাগুলোকেও অবশ্যই এ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ মহামারী হতবাক করার মতো অসমতা ও অতীতের অন্যায়কে সামনে এনেছে। যার অর্থ হচ্ছে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী তাদের সরকার ও কর্তৃপক্ষের ওপর কোনোভাবেই আর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য প্লাটফর্মকে কেন্দ্র করে তাদের উদ্বেগের ভিত্তিতে বার্তা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ভ্যাকসিন সম্পর্কিত বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার সময়, অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোর ওপর জোর কমানো যাবে না। যেমন মাস্ক পরা, হাত ধোয়া ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। জ্ঞানের মূল্যায়নের সঙ্গে প্রতিটি কৌশল নির্ভর করছে জনগণের আস্থা বজায় রাখার ওপর।
হাম, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, পোলিও, পেরটিউসসিসসহ বেশির ভাগ ভ্যাকসিন তৈরি করা হয় মূলত বাচ্চাদের জন্য, প্রায়ই একটি কিংবা দুটি বোস্টার দেয়া হয়। এমনকি বার্ষিক ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনও দেয়া হয় একটি অংশের মানুষকে। বিপরীতে, কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এরই মধ্যে অনেকগুলো ভ্যাকসিন প্রার্থী ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নজিরবিহীন প্রচেষ্টা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখিয়েছে। এখানে সেগুলোও রয়েছে যেগুলোর ভিত্তি নিউক্লিক এসিড, ভাইরাস ভেক্টরস, নিষ্ক্রিয় ভাইরাস ও প্রোটিন সাবইউনিট। যেখানে কোনো কোনোটা সুরক্ষিত ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হবে। পাশাপাশি একটি কার্যকর ভ্যাকসিনের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে সাত বিলিয়ন মানুষের জন্য এটি উপলব্ধ আছে।
বেশির ভাগ দেশেরই ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর প্রস্তুতির পরিকল্পনা করা আছে, যা কিনা গণভ্যাকসিন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কর্মকর্তাদের উচিত ২০০৯ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর অভিজ্ঞতাকে পর্যালোচনা করা এবং ভ্যাকসিন ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি বিবরণকে বিবেচনায় নেয়া। এমনকি ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার আগেই সেটা নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন ভ্যাকসিনের ডোজ, সূচি, সংরক্ষণাগারের অবস্থা ও সাপ্লাই চেইনের পার্থক্য জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য রসদ লজিস্টিককে জটিল করে তুলবে।
এখানে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার আছে। প্রত্যেক ভ্যাকসিন লাইসেন্স পাবে প্ল্যাসেবোর সঙ্গে তুলনার ভিত্তিতে, অন্য ভ্যাকসিনের সঙ্গে তুলনায় নয়। শুরুতে আমাদের হাতে এটা তুলনা করার মতো তথ্য ছিল না যে ভ্যাকসিন কতটা ভালোভাবে রোগকে প্রতিরোধ ও ইমিউনিটি জাগিয়ে তুলতে পারে। স্বাস্থ্যসেবার কর্মীরা এক্ষেত্রে বিস্তৃতভাবে বিবেচিত হবেন উচ্চতর-অগ্রাধিকার প্রাপ্তির জন্য, তারাই প্রথম ক্যাটাগরিতে থাকবেন। কারণ তাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং সবকিছু সূচারুরূপে পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্যসেবায় তাদের প্রয়োজনীয়তাও অনেক। দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে থাকবে যাদের বয়স বেশি ও শারীরিক অন্যান্য সমস্যা রয়েছে তারা। কারণ, এসব জটিলতায় তাদের মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার কিংবা মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক ভ্যাকসিন ট্রায়াল দেখায় না যে এ মানুষগুলোর ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন কতটা ভালোভাবে কাজ করবে। আমরা জানি ভ্যাকসিন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তরুণদের ওপর ভালো কাজ করে। যে কারণে বিভিন্ন রোগের ভ্যাকসিন যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ও শিংজাল বৃদ্ধদের জন্য বৃদ্ধি করা হয়। যা করা হয় উচ্চতর ডোজ কিংবা ইমিউনিটি বুস্ট করার জন্য সংযোজনের মাধ্যমে। এটা স্পষ্ট না যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল কতটা ভালোভাবে সংখ্যালঘু ও জাতিগত সম্প্রদায়ের ওপর কাজ করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, ট্রায়ালগুলো ভ্যাকসিন সংক্রমণ হ্রাস করতে পারে কিনা তা মূল্যায়ন করতে পারে না। তাই এটা বলা কঠিন যে ভ্যাকসিনেটেড তরুণ, স্বাস্থ্যবান মানুষ কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই নিরাপদে কাজে ফিরতে পারবে কিনা।
সাধারণ মানুষকে অবশ্যই যুক্ত হতে হবে ভ্যাকসিনের ঝুঁকি ও সুবিধা সম্পর্কিত আলোচনায়, যেখানে কে আগে ভ্যাকসিন পাবে এবং কেন পাবে সেটিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অনেক বিশেষজ্ঞ দল এ বিষয়ে লেখালেখি করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের নিজেদের যুক্তি মূল্যায়নের সুযোগ থাকতে হবে। ‘সিটিজেন জুরি’র মাধ্যমে এটা করার সুযোগ রয়েছে, এটি একটি প্রতিনিধি দল যারা বিষয়গুলো বিবেচনা করবে এবং নিজেদের মতামত প্রদান করবে। সার্স ও এইচ৫এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জার সময় ঠিক এ কাজই করেছিল অস্ট্রেলিয়া।
সুসংবাদের কারণে আবেগে ভেসে না যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ভ্যাকসিন প্রার্থী রেকর্ড সময়ের মধ্যে ট্রায়ালে এসেছে এবং ডাটাগুলোও প্রতিশ্রুতিশীল। আমরা ধারাবাহিকভাবে জানব ভ্যাকসিন কতটা ভালোভাবে কাজ করে এবং তাদের কীভাবে সেরা উপায়ে ব্যবহার করা যাবে।
নেচার জার্নাল থেকে অনূদিত





