নভেল করোনাভাইরাসের এই সময়কালে বিনম্র ফেস মাস্কটি যেন সর্বজনীন প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি সংক্রমণকে সীমায়িত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়ও। কিন্তু তারা কোথা থেকে আসে? কোথায় তারা বাধ্যতামূলক? তাদের জন্য কী মূল্য দিতে হয় এবং কোথায় গিয়ে তারা শেষ হয়?
মুখ ঢাকার পাল্টাপাল্টি অবস্থান
২০০২-০৩ সাল থেকে সার্স মহামারীর আবির্ভাবের পর পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে মাস্ক পরা একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে। যা এটিকে দৈনন্দিন, বিনোদনমূলক, ব্যক্তিগত উপকরণে পরিণত করে তুলেছে বলে মন্তব্য করেন মেডিকেল নৃবিজ্ঞানী ক্রিসটোস লিয়ানটেরিস।
জাপানে শীত ও বসন্তে সার্জিক্যাল মাস্ক পরা একটি নিয়মিত ঘটনা। উভয় ক্ষেত্রেই এটি পরা নিজেকে এবং অন্যদের সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে। নৃবিজ্ঞানী ফ্রেডরিক কেক বলেন, বিপরীতে ইউরোপে, যেমন ফ্রান্সে বিপ্লব-পরবর্তী আলোকায়ন মানে নাগরিককে নিজেদের চেহারাকে জনসাধারণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে।
এর সঙ্গে মানুষের যে পরিচিতি কম তা বুঝতে পারা যায় অনেকের মাস্ক পরার ধরনে। যারা কিনা চিবুকের নিচে অথবা নাক না ঢেকে পরে। আবার ইরাকে দেখা গেছে অনেক ক্রেতা তাদের মাস্ক অন্যদের দিয়ে যাচ্ছে যারা এরপর দোকানে প্রবেশ করবে।
নিয়ম ও সম্মতি
বিশ্বব্যাপী ৫০টি দেশে মাস্ক পরা বর্তমানে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যরাও প্রয়োজন অনুসারে কিছু জোনে পরার পরামর্শ দিয়েছে। কোথাও কোথাও শাস্তির
বিধানও রয়েছে। যেমন আরব আমিরাতে ইচ্ছা করে মাস্ক না পরলে ২০০ ডলার জরিমানা, আবার শাদে শাস্তি হিসেবে ১৫ দিনের বেশি জেল হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টিলওয়াটার এবং ওকলাহোমার মেয়র মাস্ক পরার আদেশ দিয়েও তা বাতিল করেছেন। কারণ কিছু বাসিন্দা এটাকে নাগরিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের হুমকিস্বরূপ দেখছিল। তারা এ নিয়ে দোকানের কর্মীদের হুমকিও প্রদান করে।
অস্ট্রিয়ানরা মাস্ক পরার যে প্রয়োজনীয়তা তা বুঝতে পেরে দোকানে ও গণপরিবহনে সেটি পরে চলেছে। ফ্রান্সেও এখন গণপরিবহনে মাস্ক পরার বিধান দেয়া হয়েছে। শুরুর দিকে অবশ্য ফরাসি সরকার মাস্ক জরুরি নয় বলে ঘোষণা দিয়েছিল।
উৎপাদনের ফারাক মনে রাখতে হবে
সাপ্লাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। বেশির ভাগই উৎপাদন হয় এশিয়ায়, যেখানে গ্লোবাল স্টকের প্রায় ৫০ ভাগ উৎপাদন হয় চীনে। কিন্তু মহামারী শুরুর পর চীন আগে নিজের দেশেই সবচেয়ে বেশি বিতরণ করেছে।
ডেল্টা প্লাসের গ্রুপের ফরাসি বিশেষজ্ঞ ডেডিভ গুইহো বলেন, চীনে মাস্কের প্রয়োজনীয়তা সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আমাদের সাবকন্ট্রাক্টর ফার্মগুলোর পক্ষে রফতানি করার কোনো অধিকার ছিল না। যখন চীন আবার রফতানি শুরু করে তখনো চাহিদা ছিল সীমাহীন। ইতালি ও স্পেন থেকে শুরু মিসর সব জায়গায় ঘাটতি ছিল।
বিশ্বায়নের সঙ্গে আমরা ভেবে নিয়েছিলাম দেশগুলোর মাঝে বাণিজ্যের প্রবহমানতা আছে। কিন্তু সংকট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই নিজের প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়েছে, বলছিলেন হেলথ অ্যাফায়ার ইকোনমিস্ট স্টিফানে বিলোন।
ব্যয়বহুল
চাহিদা অনুযায়ী দামও বেড়েছে অনেক। মেডিকেল পণ্য আমদানিকারক সমিতির মতে, লেবাননে মাস্কের দাম বেড়েছে প্রায় ২৫ গুণ।
দক্ষিণ আফ্রিকার দুটি ফার্ম সিকোরো সেফটি এবং হেনোক্স সাপ্লাইস প্রতিযোগী কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা করেছে যে কেন তারা ১ হাজার শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। ইরাকের ফার্মাসিস্ট সায়েদ আলী এএফপিকে বলেন, ৫০টি মাস্কের একটি প্যাকেটের দাম সাধারণ ইরাকি দিনারে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। যা কিনা এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার দিনারে।
এদিকে দাম বাড়ার এ সুবিধা নিয়ে নকল মাস্কও অনলাইনে চলে আসে। সেখানে আবার হাসপাতাল থেকে চুরি যাওয়া মাস্কগুলোও ছিল।
চীন তাদের উৎপাদন অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মার্চ ও এপ্রিলের মাঝে বিশ্বব্যাপী ২১ বিলিয়ন মাস্ক রফতানি করেছে। অনেক দেশ আবার নিজ উদ্যোগে মাস্ক তৈরি শুরু করেছে।
মরক্কোর প্রায় ২০টি ফার্ম নিজেদের দক্ষতায় প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন মাস্ক উৎপাদন করছে। এমনটা জানিয়েছেন দেশটির শিল্পমন্ত্রী হাফিদ ইলালামি। ফরাসি সরকারও স্থানীয় ফার্ম এবং বৃহৎ কোম্পানিগুলোকে হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্যারিস ইউনিট খরচ নির্ধারণ করেছে ৯৫ সেন্ট। ইতালি ঠিক করে দিয়েছে ৫০ সেন্ট।
মরক্কোর খুচরা বিক্রেতারা বিক্রি করছে মাত্র ৮ সেন্টে। এজন্য রাজার বিশেষ জরুরি ভর্তুকিকে অবশ্য ধন্যবাদ দিতে হয়।
এদিকে ইসরায়েলে এফএফ২ গ্রেডের মাস্ক যা কিনা উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা প্রদান করে তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২০ ডলারে। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সেটি পরে কমে এসেছে।
মূূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক মানুষ নিজেরাই ফ্যাব্রিক ব্যবহার করে মাস্ক বানানো শুরু করেছে। যদিও মিসরে তা সম্ভব নয়। কারণ সেখানে সরকারের তৈরি করা মাস্ক জনসমাগমের স্থানে পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সুপার মার্কেটের কর্মীদের জন্য এ ধরনের মাস্ক আশীর্বাদস্বরূপ।
ব্যবহার করুন এবং ফেলে দিন
অনেক দেশ মাস্ক ব্যবহার করে কীভাবে ফেলে দিতে হবে তার নির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন নেই। অনেক জায়গায় গৃহস্থালির আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেয়া হয়। ফরাসি রিসাইক্লিং ফার্ম সিটেও ফ্রান্স পরামর্শ দিয়ে বলেছে, রুমাল, মুখোশ ও গ্লাভস প্রতিরোধী প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে ভালোভাবে মুখ বন্ধ করে যেন ফেলে দেয়া হয়।
তবে এটি ঠিকমতো না ফেলা হলে পরিবেশগতভাবে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ অনেক সার্জিক্যাল মাস্কে পলিপ্রোপাইলিন থাকে, যা কিনা ব্যাপক সময় ধরে টিকে থাকতে পারে। আবার অনেক সময় সমুদ্রে গিয়ে জমা হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইকোলজিক্যাল ক্ষতি কমাতে বিজ্ঞানীরা সার্জিক্যাল মাস্ককে জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন।
এএফপি





