ইয়েল ইউনিভার্সিটির মেডিসিন অব হিস্ট্রির প্রফেসর ফ্রাঙ্ক স্নোডেন। তার বিখ্যাত একটি বই ‘এপিডেমিকস অ্যান্ড সোসাইটি: ফ্রম ব্ল্যাক ডেথ টু দ্য প্রেজেন্ট’। ৫০ বছর আগে তিনি রোমে গবেষণা করছিলেন যখন সেখানে কলেরা হানা দিয়েছিল। আর এবার ফের ইতালির রাজধানীতে তিনি যখন গবেষণার কাজে ব্যস্ত তখন হানা দিল কভিড-১৯। সম্প্রতি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অবস্থায় কথা বলেছেন ডার স্পিগেলের সঙ্গে। এর মাঝেও মহামারী নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছেন তিনি। তার সেই সাক্ষাত্কারের চুম্বকাংশ এখানে ভাষান্তরিত হলো:

ডার স্পিগেল: কয়েক বছর আগে আপনি সতর্ক করে বলেছিলেন সার্স, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সোয়াইন ফ্লু বড় কিছুর ড্রেস রিহার্সাল মাত্র। এর চেয়ে ভয়ংকর মহামারী আসছে। আপনি কভিড-১৯-এর মতো কিছুর কথা চিন্তা করছিলেন?

স্নোডেন: হ্যাঁ, অবশ্যই। আর এটা কেবল আমি একমাত্র নয়, যে এমন ভাইরাসজনিত মহামারীর আশঙ্কা করছিলাম। ভাইরোলজিস্ট ও এপিডেমিওলজিস্টরা বারবার বিশ্বকে এ নিয়ে সতর্ক করেছিল। আমি নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলাম, এমন অন্ধ হয়ে কীভাবে থাকা যায়? এখন যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প জিজ্ঞেস করছেন, ‘কে আর জানত’। আমার উত্তর: সবাই।

ডার স্পিগেল: এই বার্তা কেন শোনা হয়নি?

স্নোডেন: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজের পরিচালক অ্যান্থনি ফউসি ২০০৬ সালে পরিস্থিতি গ্রাফিকের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন: আপনি যদি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বসবাস করেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলবে আবশ্যিকভাবেই হারিকেন আসতে যাচ্ছে। তারা আপনাকে সময় বলবে না এবং তারা বলবে না এটা কতটা শক্তিশালী। কিন্তু এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে প্রস্তুতি নেয়া। মহামারীও এ রকম। কিন্তু আমরা কী করেছি? সার্স ও ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ চলে যাওয়ার পর আমরা মহামারী নিয়ে সব হুমকির কথা ভুলে গেছি। সুতরাং এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ মহামারীর নীতি নেই এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পর্যাপ্ত অর্থ নেই।

ডার স্পিগেল: বর্তমান মহামারীটি এক ধরনের নৈতিক সংকট তৈরি করেছে। যেমন এটাকে মোকাবেলায় যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা কি মানুষের জীবনকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করেছে কিনা। এটাকে মূলত জীবন ও অর্থনীতি বাঁচানোর সংঘাত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

স্নোডেন : এটা খুব পরিচিত শোনাচ্ছে। ১৮৫১ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত নিয়মিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছে কলেরার বিস্তার কীভাবে আটকানো যায় তা নিয়ে। যেমন শিপ কোয়ারেন্টিন অথবা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে। এ পদক্ষেপের ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়েও বিশদভাবে আলোচনা হতো।

ডার স্পিগেল: এটা অনেকটা এখনকার দিনের তর্কের মতো শোনাচ্ছে।

স্নোডেন: হ্যাঁ। আরো উদাহরণ দেয়া যায় ১৭২০ সালে একটি শিপ মূল্যবান ফ্যাব্রিকস নিয়ে আসছিল দক্ষিণ ফ্রান্সের মার্শেই বন্দরে। যখন এটা সমুদ্রে ছিল আটজন নাবিক, একজন যাত্রী এবং জাহাজের ডাক্তার সেখানেই প্লেগে মারা গেছে। সাধারণত এ ক্ষেত্রে ৪০ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়। কিন্তু এ ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চাপে এটাকে ১০ দিনে নামিয়ে আনতে হয়। মূল্যবান বলে ফ্যাব্রিকস পুড়িয়ে ফেলা হয়নি। যার ফলে মার্শেইয়ে অর্ধেকের বেশি মানুষ প্লেগে মারা গেল। ‘স্মল কোয়ারেন্টিনের’ এ ধারণা, এটা আমাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। যিনি কিনা শুরুতে এটা সাধারণ সর্দি জ্বর ও ফ্লু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

ডার স্পিগেল: এই মহামারী থেকে ইতিবাচক কিছু কি বের হতে পারে?

স্নোডেন: হ্যাঁ। আমরা এখন ক্রসরোডে আছি। যদি আমরা জাতীয়তাবাদে পড়ে থাকি, যেমনটা এখন চলছে তবে আমরা পরিবর্তনের সুযোগ হারাব। এভিয়েন ফ্লু থেকে সার্স ও ইবোলা থেকে করোনাভাইরাস পর্যন্ত এসব রোগ এসেছে জোনোটিক স্পিলওভার  (মেরুদণ্ডী প্রাণী থেকে মানুষে যেসব রোগ স্থানান্তরিত হয়) থেকে। প্রাণীদের সঙ্গে আমাদের সংস্পর্শ যেভাবে বেড়েছে তা মানব ইতিহাসে এর আগে কখনো দেখা যায়নি। আমাদের হাতে কি যথেষ্ট উদাহরণ নেই? আর কতবার এ যন্ত্রণা ভোগ করলে আমরা বলব, ওহ, এখানে কি একটা প্যাটার্ন আছে? সেটা কি আমাদের আবাস সম্প্রসারণ বন্ধ করা?

ডার স্পিগেল: কিন্তু বিজ্ঞানের কী অবস্থা? বিজ্ঞান কি আমাদের মহামারী থেকে বাঁচাতে পারবে?

স্নোডেন: কোনো সন্দেহ নেই বিজ্ঞান অনেক উন্নতি সাধন করেছে। করোনাভাইরাসের এই মহামারীকালেও আমরা তা প্রতিদিন দেখছি। প্লেগের সময় মানুষ ভাবত এটা সৃষ্টিকর্তার শাস্তি, এটাই ভয়াবহ ব্যাপার ছিল। ১৯৭৩ সালে কলেরার সময় আমি রোমে ছিলাম। ইতালির স্বাস্থ্যমন্ত্রী খুবই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। তিনি নিজেই সুস্বাস্থ্য নীতিতে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু সে সময় অনেক আগে চলে গেছে। এমনকি ১৭ বছর আগের সার্সের সঙ্গে তুলনা করলেও বিজ্ঞান অনেক উন্নতি দেখিয়েছে।