সাম্প্রতিক সময়ে একজন সিঙ্গাপুরিয়ান ছাত্র এবং একজন ভিয়েতনামের আর্ট কিউরেটর যুক্তরাজ্যে নভেল করোনাভাইরাস সংশ্লিষ্ট জেনোফোবিয়া (ভিন্ন দেশের মানুষের প্রতি ঘৃণা বা ভয়) এবং বর্ণবাদের অভিযোগ এনেছেন। মহামারীর প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী এমন ঘটনা বৃদ্ধির অনেক অভিযোগ সামনে এসেছে। অবশ্য যতই দিন যাচ্ছে এসব ঘটনা কেবল এক-দুটি উদাহরণে সীমাবদ্ধ নেই। এ ধরনের ঘটনা এখন প্রতিদিনই ঘটছে।
জোনাথন মক নামে ২৩ বছর বয়সী সিঙ্গাপুর থেকে আসা এক তরুণ সোস্যাল মিডিয়ায় জানান গত ফেব্রুয়ারিতে সেন্ট্রাল লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিট দিয়ে হাঁটার সময় কী ভয়াবহভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, চারজন ব্যক্তির একটি দল তাকে বলে, ‘আমরা আমাদের দেশে করোনাভাইরাস চাই না।’
এরপর তারা তাকে ঘুষি ও লাথি মেরে মারাত্মকভাবে আহত করে। এমনকি এ আক্রমণের ফলে তাকে ডান পাশের চোখের কাছাকাছি জায়গায় হাড় ভেঙে গিয়ে অপারেশন করানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।
মক তার ফেসবুক প্রোফাইলে নিজের চোট পাওয়া মুখের ছবিও পোস্ট করেছেন। যা কিনা বিশ্বের অনেক মানুষের নজরে এসেছিল এবং এ ঘটনায় প্রতিবাদও হয়েছে চারপাশ থেকে। তিনি লিখেন, বর্ণবাদ কোনো বোকামি না। বর্ণবাদ হচ্ছে ঘৃণা। বর্ণবাদীরা সারাক্ষণ নিজেদের ঘৃণার প্রকাশের জন্য অজুহাত খুঁজতে থাকে এবং বতর্মান সময়ে করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপটে তারা নিজেদের ঘৃণার প্রকাশের জন্য আরেকটি অজুহাত পেয়ে গেল।
গত ৬ মার্চ লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ ঘোষণা দেয় তারা ১৬ ও ১৫ বছর বয়সী দুজনকে আটক করেছে মকের বিরুদ্ধে সেই বর্ণবাদী আক্রমণাত্মক লাঞ্ছনার ঘটনায় যুক্ত থাকার কারণে। পুলিশ মক ও জনসাধারণের কাছে আবেদন জানায়, তারা যেন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অন্য দুজনকে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে।
ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সোসিওলজির প্রফেসর মিরি সং বলেন, যখনই বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক কোনো ধরনের বড় ঘটনা ঘটে, দ্রুত আপনি দেখবেন এর সঙ্গে ‘অপর’ সংশ্লিষ্ট বর্ণবাদ যুক্ত হয়ে গেছে। বিশেষ করে আধিপত্যবাদী সাদা এবং ইংল্যান্ড অথবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহুজাতিক সমাজে আপনি এটা বেশি দেখবেন বলে আমি মনে করি।
ছোট একটি অজুহাত দেখিয়ে তাদের চেহারার ওপর ভিত্তি করে বলির পাঁঠা বানানো মানুষের জন্য খুব সহজ। বিভিন্ন দলের লোককে বিভিন্ন প্রচলিত সাধারণ ধারণার ভিত্তিতে আক্রমণের লক্ষ্য বানানো হয়। মিরি সং এজন্য আঙুল তোলেন ৯/১১-পরবর্তী নানা হিসাবনিকাশের ওপর। যার ফলে প্রাচ্য, আরব, মুসলিম ও শিখ সম্প্রদায়ের ওপর তাদের জাতি ও বর্ণ পরিচয়ের কারণে আক্রমণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণা বলছে, যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট-সংক্রান্ত গণভোটের পর বর্ণ, জাতি ও ধর্ম সম্পর্কিত ঘৃণাবাদী অপরাধ তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়েছে।
চীনের উহানে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ প্রথম কভিড-১৯-এর দেখা মিলেছিল। এ প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সোস্যাল মিডিয়ায় অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে বর্ণবাদ ও জেনোফোবিয়ার অভিযোগ এসেছে। অনেক সরকার ও রাজনীতিবিদ মহামারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব ঘটনার নিন্দা করেছে। আবার অনেকে ভেবেছে চীনা সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আরো অনেক কিছু করা যেতে পারে। এর মধ্যে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান মিশেল ব্যাচলেট সদস্য দেশগুলোকে ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট বৈষম্য মোকাবেলায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
অবশ্য এমন নয় যে মকের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কিছু। ৬ মার্চ নিউইয়র্ক সিটিতে ডানপন্থীদের দ্বারা বর্ণবাদের আরো একটি ঘটনা দেখা গেছে। ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী সাবওয়ে ট্রেনে এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য যাত্রী তর্ক করছে এবং যাত্রীটির গায়ে এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে দিচ্ছে। যিনি ছিলেন এশিয়ান-আমেরিকান। সম্ভাব্য ঘৃণাবাদী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে নিউইয়র্ক পুলিশ এ ঘটনা তদন্ত করছে। তবে এমন ঘটনা ইউরোপ ও আমেরিকায় অনেক বেড়েছে। এশিয়ানদের বাইরে আফ্রিকানদেরও অনেক ক্ষেত্রে এখন বর্ণবাদের শিকার হতে হচ্ছে।
গত ৫ মার্চ একই রকম আরো একটি কেস সামনে আসে। যেখানে যুক্তরাজ্যে একটি চিত্র প্রদর্শনীতে ভিয়েতনামের একজন আর্ট কিউরেটরকে আয়োজকের পক্ষ থেকে বাদ দেয়া হয় ভাইরাস বহন করতে পারে এ আশঙ্কায়। নগুয়েন নামে সে কিউরেটর সোস্যাল মিডিয়ায় একটি ই-মেইলের স্ক্রিনশট শেয়ার করেন। যা কিনা পাঠানো হয় আজরান নামে নিউইয়র্কের একজন শিল্প ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে। যে ব্যক্তি ভিয়েতনামি আর্টে বিশেষজ্ঞ একজন। যেখানে জানানো হয় লন্ডনের একটি আর্ট ফেয়ারে নগুয়েনকে বাদ দেয়া হয়েছে। সেই মেইলে আজরান লিখেন, করোনাভাইরাস চারপাশে অনেক উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। মোটামুটিভাবে এশিয়ানদেরই ভাইরাসের বাহক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আপনার উপস্থিতি দুর্ভাগ্যজনকভাবে আগত দর্শকদের মাঝে অস্বস্তি তৈরি করবে।
সোস্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলে আজরান তার ই-মেইল কাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। নগুয়েন বলেন, এমন নয় যে এটা কারো ব্যক্তিগত সমস্যা। এটা তেমন না। ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তিনি আরো বলেন, অনাক্রমণাত্মক বৈষম্যকে স্বাভাবিক করার যে দৃষ্টিভঙ্গি তা বদলাতে হবে।
মক ও
নগুয়েনের সঙ্গে ঘটা এই দুই ঘটনা বলছে, বৈষম্য কেবল চীনা নাগরিকদের সঙ্গে দেখানো হচ্ছে তেমনটা না। মূলত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোকজন এবং আরো বিস্তৃতভাবে বললে সেসব মানুষ যারা কিনা প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী নয় তাদেরও বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। সোসিওলজিস্ট মিরি সং বলেন, আমি মনে করি না যারা এ ধরনের ঘৃণা ছড়ায় তারা কেউ আপনার জাতি বা বর্ণসংক্রান্ত পরিচয় জানতে আগ্রহী। আপনার জাতিগত ফেনোটাইপের কারণে আপনাকে তারা ধরেই নেয় যে বিদেশী।
যখন উহান থেকে এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এরপর বৈশ্বিকভাবে এটি চীনকে পেছনে ফেলে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। দেশের পর দেশ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। যে কারণে কেবল জাতিগত পরিচয়ের কারণে কারো ওপর ভাইরাসের দায় চাপানো এক কথায় অসম্ভব। সং বলেন, বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের যে দ্রুততা, যেখানে মানুষ প্রতি মুহূর্তে ভ্রমণ করছে এবং এটা এত বেশিসংখ্যক যে একে ট্র্যাক করা অসম্ভব। ফলে কাউকে তার চেহারার ওপর ভিত্তি করে লক্ষ্যবস্তু বানানো খুবই ভুল একটা ব্যাপার।
টাইম ম্যাগাজিন





