চীনে নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি নিয়ে চলতি বছরের শুরুতে বিবৃতি দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সে সময় ভারতের অল্প কয়েকটি রাজ্যই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণের রাজ্য কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা তাত্ক্ষণিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখতে শুরু করেন।
শৈলজা জানতেন কেরালার অনেক শিক্ষার্থী উহান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন। কেউ কেউ আগের বছর তার কাছে ইন্টার্নশিপের জন্য আবেদনও করেছিলেন। তিনি প্রথম থেকেই জানতেন যে মহামারীটি একটি বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। ২০১৮ সালে তার মন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদে তিনি নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা জানতাম যেকোনো সময় যেকোনো কিছু হতে পারে।
সে সময় শৈলজা তার র্যাপিড রেসপন্স টিমের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। তিনি একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেন এবং পর্যবেক্ষণ দলকে একত্র করেন। ২৭ জানুয়ারি প্রথম একটি দল উহান থেকে ফিরে আসে। তিনদিন পর তাদের একজন কভিড-১৯-এ পজিটিভ হন, যা ছিল ভারতের প্রথম নিশ্চিত কেস।
শহুরে নাগরিকদের নিয়ে কেরালা ভাইরাসের বিস্তৃতির জন্য উপযুক্ত অঞ্চল ছিল। যেখানকার অনেক অধিবাসী বাইরে বসবাস করতেন এবং আসা-যাওয়ার ওপর থাকতেন। পাশাপাশি অন্যান্য রাজ্য থেকেও প্রচুর শ্রমিক আসা-যাওয়া করত। কিন্তু তার পরও টার্গেটেড টেস্টিং, কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং আইসোলেশনের মাধ্যমে সরকার দৈনিক নতুন সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছিল। এমনকি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়েও সংক্রমণের হারকে বেশ নিচে নামিয়ে এনেছিল তারা। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে লকডাউন শিথিল করার পর সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করে। তবে সেই পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিল কেরালা। কেরালার নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার মাত্র ০.৩৬ শতাংশ, যা কিনা বিশ্বের সবচেয়ে কম। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো কেরালাও তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্যের কারণে সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু তার পরও অঞ্চলটির স্বাস্থ্যসেবার উন্নত মান এবং উন্নত হাসপাতাল ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ভাইরোলজিস্ট শহিদ জামাল বলেন, অনেক উপায়েই কেরালা সঠিক পথে ছিল। সম্ভবত তারা ভারতের যেকোনো রাজ্যের চেয়ে কাজটি সবচেয়ে সঠিকভাবে করতে পেরেছে।
কেরালার এমন সাফল্যের নেপথ্য নায়ক হচ্ছেন তাদের শান্ত ও প্রফুল্ল স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যাকে প্রায়ই ‘শৈলজা টিচার’
নামে ডাকা হয়। কারণ এর আগে তিনি স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করতেন। পাশাপাশি দেশের শিক্ষার হারে সবচেয়ে এগিয়ে থাকার সুফলও পেয়েছে কেরালা। এছাড়া ভারতের অন্যতম সেরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈলজার নেতৃত্ব করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কে. শ্রীনাথ রেড্ডি বলেন, তিনি মানুষের কথা শুনেছেন। ব্যক্তিগতভাবে হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন এবং ডাক্তারদের সঙ্গে নিজে কথা বলেছেন।
শৈলজা বিজ্ঞানী নন। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি তার আগে থেকে ভালোবাসা ছিল, যখন তিনি ১৯৭০-এর দশকে স্কুলে পদার্থ ও জীববিজ্ঞান পড়াতেন, ক্লাসে তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে আঞ্চলিক পত্রিকার বিজ্ঞান পাতা পড়তেন। তিনি বলেন, আমরা মহাকাশ, চন্দ্র অভিযান ও পাঠ্যসূচির বাইরে অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা করতাম।
যদিও শেষ পর্যন্ত রাজনীতি তার পথ নির্মাণ করে দিয়েছে। ১৯৫০ দশক থেকে তার পরিবার সাম্যবাদী রাজনীতি এবং জাতপাতবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সে সময় তার দাদির সঙ্গে শৈলজাও সেসব আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করেন। মূলত দাদির অনুপ্রেরণায়ই এতদূর এগিয়ে এসেছেন তিনি। যেখানে ২০১৬ সালে কেরালায় বামপন্থী জোট ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। এরপর ২০১৮ সালে সফলতার সঙ্গে নিপাহ ভাইরাস মোকাবেলার পর, এবার করোনা মোকাবেলায়ও দারুণ সাফল্য পেয়েছেন তিনি। যা তাকে অন্যদের জন্যও অনুসরণীয় করে তুলেছে।
সায়েন্সম্যাগ





