আট মিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক প্রতি বছর সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়। প্রতি মিনিটে আমরা এক ট্রাক প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে নিক্ষেপ করি। বছরের এই পুরো প্লাস্টিকের ওজন ৯০টি বিমানবাহী রণতরীর সমতুল্য। একটি হিসাব বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ওজনের নিরিখে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিক বেশি হবে।

এটি একটি বড় ধরনের দুঃস্বপ্নের বিষয় হতে যাচ্ছে। তিমি, মাছ, সি-বার্ডস, কচ্ছপ এবং অন্য অনেক প্রাণী প্লাস্টিক খেয়ে থাকে এবং সেসব খাওয়ার ফলে একপর্যায়ে তারা মারাও যাচ্ছে। অনেকগুলো গবেষণা চলমান আছে মানব স্বাস্থ্য সমস্যা এবং  মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণকারী মাছ খাওয়ার মাঝে সম্পর্ক অনুসন্ধানের কাজে। বিশ্বব্যাপী সাগরের যে বাস্তুসংস্থান তা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হচ্ছে। অবশ্য এগুলো সব কভিড-১৯-পূর্ব সময়ের কথা।

শুরুতে অবশ্য মনে হচ্ছিল বৈশ্বিক মহামারী পরিবেশগত দিক থেকে সুখবর বয়ে আনবে। সামাজিক দূরত্বের মাধ্যমে মানুষকে রাস্তা এবং আকাশপথ থেকে দূরে রাখা বিশ্বব্যাপী পরিবেশের ব্যাপক উন্নতি নিয়ে এসেছে। ধারণা করা হয়, ২০২০ সালে ২০১৯ সালের তুলনায় কার্বন নিঃসরণও ৪ শতাংশ কমে যাবে। চীনে সাময়িকভাবে ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ হওয়ার ফলে দেশটিতে কুখ্যাত হয়ে ওঠা ধোঁয়াশা পরিবেশও স্বাভাবিক করেছে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে দূষণের হার কমিয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনা মানুষকে একধরনের স্বস্তিও ফিরিয়ে দিয়েছিল।

অবশ্য করোনাভাইরাসের স্থায়ী ফল হতে পারে সম্ভবত এশিয়ায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রচেষ্টা। এজন্য ধন্যবাদ জানানো যেতে পারে পশুর বাজারগুলোতে বর্ধিত নজরদারি (যেখান থেকে ভাইরাস মানুষের শরীরে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়)।

অবশ্য একই কথা সমুদ্রের ক্ষেত্রে বলা যায় না, যা কিনা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কভিড-১৯-এর কারণে প্রতি মাসে ১২৯ বিলিয়ন ফেস মাস্ক এবং ৬৫ বিলিয়ন গ্লাভস ব্যবহূত হচ্ছে। যদি এরই মধ্যে প্রস্তুত হওয়া মাস্কগুলোকে একসঙ্গে সেলাই করা হয় তবে তা সুইজারল্যান্ডের গোটা ভূখণ্ডকে ঢেকে ফেলতে সক্ষম হবে।

গ্লাভস ও মাস্কের যেটি সমস্যা তা হলো এগুলোর স্থান হয় আমাদের নদী ও সমুদ্রে। ফলে খুব সহজেই ভুলবশত জেলিফিশ বলে মনে হতে পারে। এই জেলিফিশ সামুদ্রিক কচ্ছপের পছন্দের খাবার। মাস্কে থাকা ইলাস্টিকের কারণে তাতে জড়িয়ে মাছ, প্রাণী ও পাখিরা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এদিকে তেলের বাজার ধসে পড়েছে, প্লাস্টিক তৈরির খরচও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সস্তা হয়েছে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস হচ্ছে প্লাস্টিক তৈরির মূল কাঁচামাল। সর্বকালে সবচেয়ে কম দাম বিকল্প উপাদান ও ভার্জিন প্লাস্টিকের মাঝে বৈষম্য বৃদ্ধি করেছে, যা সব সময় সবচেয়ে দামি উপায় ছিল পণ্য প্যাকেজিং করার জন্য।

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভোক্তারা দামের প্রতি আরো সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। মুদি বাজার সাধারণত প্লাস্টিকের ব্যাগে পরিবহন করা হয়, আর প্লাস্টিকের দাম কমে যাওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতারা সেগুলো আরো বেশি করে ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া রেস্টুরেন্টগুলো টেকআউট পদ্ধতির বৃদ্ধির কারণেও একক ব্যবহারে প্লাস্টিকের কদর বাড়ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের প্লাস্টিকগুলো রিসাইকেল করা যায় না। ফলে দুনিয়ায় ২০২০ সালে ২০১৯-এর চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি বর্জ্য তৈরি হতে যাচ্ছে।

এদিকে কভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বব্যাপী রিসাইক্লিং সিস্টেম ভেঙে পড়েছে। তাহলে বাড়তি যে প্লাস্টিক তা কোথায় যাবে?

পাশ্চাত্য সমাজে এগুলো ঠাঁই হয় ভাগাড়গুলোতে কিংবা পুড়িয়ে ফেলা হয়। খুব অল্প একটা অংশ গড়ে ১০ শতাংশের মতো রিসাইকেল করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ৯ হাজারের মতো রিসাইক্লিং সুবিধা রয়েছে, যা কিনা মিউনিসিপ্যালটি দ্বারা পরিচালিত হয়। তবে কভিড-১৯-এর স্বাস্থ্য ও বেকারত্বের কারণে অনেক মিউনিসিপ্যালটি তাদের রিসাইক্লিং সার্ভিস স্থগিত করেছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্লাস্টিকগুলো খোলা জায়গায় ছুড়ে ফেলা হয়। শেষ পর্যন্ত যা চালিত হয় নদী এবং তারপর সমুদ্রের দিকে। উন্নয়নশীল বিশ্বে ১৫ মিলিয়ন বর্জ্য সংগ্রহকারী রাস্তা থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শ্রেণীকে একই পারিশ্রামিকে দ্বিগুণ প্লাস্টিক সংগ্রহ করতে বলা হয়। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ কাজ করার ব্যাপারে তারা ব্যাপকভাবে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছে।

এখন পাশ্চাত্যে রিসাইক্লিং অবকাঠামোর ভেঙে পড়া এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে কভিড-১৯ সংক্রান্ত একক ব্যবহারের প্লাস্টিক বিস্ফোরণের কারণে আমাদের সমুদ্রে প্লাস্টিকের সুনামি ক্রমাগত শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত