কভিড-১৯ এ বছর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও সম্ভাব্য মহামারী হিসেবে করোনাভাইরাস বিজ্ঞানীদের রাডারে অনেকদিন ধরেই ছিল। তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন ২০০২-২০০৩ সালের দিকে সার্স ভাইরাস আট হাজার মানুষকে সংক্রমিত করে দুই ডজনের বেশি দেশে এবং এর ফলে মারা গিয়েছিল ৮০০ মানুষ। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা অনেকগুলো নির্দিষ্ট বিষয় যাচাই করে নিয়েছিলেন, যেখানে ভাইরাসটি উদ্বেগ তৈরি করেছিল। যদিও এটিই ভাইরাসের একমাত্র গ্রুপ নয়, যা নিয়ে গবেষকরা চিন্তিত ছিলেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং আরো কিছু কিছু ভাইরাস যাদের কিনা অনেক দিন ধরেই মহামারীর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

একটি দিক যা ভাইরাসের মহামারীর আশঙ্কাকে উসকে দেয় তা হলো জিনোমে ডিএনএর বদলে আরএনএর উপস্থিতি। এর কারণ আরএনএর প্রতিলিপি করার প্রক্রিয়াটিতে সাধারণত ডিএনএর মতো প্রুফ রিডার অন্তর্ভুক্ত থাকে না। আর সেখানে আরএনএ ভাইরাসের মিউটেশনের হার ডিএনএর চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের হয়। এপিডেমিওলজিস্ট স্টিভ লুভি বলেন, এর অর্থ তারা বদলাতে পারে এবং মানব সংক্রমণ ও বিস্তৃতির জন্য আরো অনেক বেশি যোগ্য হয়ে ওঠে।

যখন একটি ভাইরাস প্রাণী থেকে মানুষে স্থানান্তারিত হয়, এরপর এটি মহামারীতে পরিণত হয় যখন তা মানুষ থেকে অন্য মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সার্স-কোভ-২ মূল এবং মরণঘাতী সার্স করোনাভাইরাস, মার্স এবং কিছু বার্ড ফ্লুর স্ট্রেইনকে ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এই স্বল্প স্থানান্তরিত ভাইরাসগুলো নতুনভাবে মিউটেশনের মাধ্যমে তাদের আরওকে বাড়িয়ে নেয়। ফলে মানব সম্প্রদায়ের ভেতরে তারা দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। এমন ভাইরাসের মাঝে করোনা ছাড়াও ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিপাহ ভাইরাস উল্লেখযোগ্য।

অন্যান্য সম্ভাব্য হুমকি

কিছু ভাইরাস তালিকার ওপরে না থাকলেও তাদের ওপর নজর দেয়া জরুরি, যেমন ইবোলা ও মারবার্গ ভাইরাস। যা কিনা হেমোরেজিক জ্বরের কারণ এবং মানুষের পাশাপাশি উল্লুক, বানর ও বাদুড়কেও সংক্রমিত করতে পারে। লুবি বলেন, ইবোলার সংক্রমণের জন্য রক্ত কিংবা শরীরের তরল প্রয়োজন হয়। এর অর্থ এটির স্থানান্তর কঠিন, ফলে এটি বৈশ্বিক হুমকি হওয়ার সম্ভাবনা কম। একই অবস্থা নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমণের ক্ষেত্রেও হয়। মানুষ দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাদের দ্রুত আলাদা করে ফেলা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফিলোভাইরাসকে মহামারী হওয়ার জন্য এটিকে শ্বাস-প্রশ্বাসের ফর্মে স্থানান্তরিত হতে হবে কিংবা সহজেই ডায়রিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে হবে এবং এটা কত সহজে ঘটতে পারে তা এখনো পরিষ্কার নয়। ভাইরোলজিস্ট রালফ বারিক বলেন, বড় প্রশ্ন হচ্ছে ইবোলা ভাইরাসের প্রকৃতির মাঝে বৈচিত্র্য কেমন তা।

অন্যান্য যেসব ভাইরাসের ওপর বিজ্ঞানীরা নজর রেখেছেন, সেখানে বুনভাভাইরাস ও অ্যারেনাভাইরাস পরিবার অন্তর্ভুক্ত। যা প্রাথমিকভাবে ইঁদুর ও মশার মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে; যেমন ডেঙ্গু, জিকা ভাইরাস, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস। বারিকের মতে, ভেক্টরবাহিত জীবাণুগুলোর দুই বিলিয়ন মানুষকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যদি আপনি উত্তর অক্ষাংশে থাকেন তবে এটি আপনার জন্য কম ক্ষতির কারণ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মশার ভৌগোলিক পরিসীমা যেমন উচ্চতর অক্ষাংশে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনিভাবে তারা যে জীবাণু বহন করে তাও ছড়িয়ে পড়ে।

এখানে ‘ডিজিজ-এক্স’ও আছে। এই টার্মটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ব্যবহার করেছে মারাত্মক কোনো মহামারী যা কিনা জীবাণু দ্বারা হতে সংগঠিত হতে পারে, যা মানুষের রোগের কারণ কিন্তু বর্তমানে অজানা সেটি বোঝাতে। মলিকিউলার বায়োলজিস্ট রেবেকা ডাচ বলেন, ২০০২ সালে সার্স ভাইরাস সামনে আসার আগ পর্যন্ত করোনাভাইরাসের গবেষণার জন্য ফান্ড পাওয়া বেশ যন্ত্রণার বিষয় ছিল। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না এমন বিষয়গুলো সেখানে থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ ভাইরাস ছড়ানোর এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে মূলত প্রাকৃতিক আবাস নষ্ট করে এবং বিভিন্ন  বন্যপ্রাণীকে বাজারে এনে বিক্রি করার মাধ্যমে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ প্লোরাইট বলেন, আমরা নতুন ভাইরাসের উত্থানের জন্য নিখুঁত ঝড় তৈরি করছি। এছাড়া বিজ্ঞানী সম্প্রদায় বিস্তৃতভাবে ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারছেন না। তিনি আরো বলেন, কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করে বলতে পারেনি যে ফ্লু মহামারী (২০০৯) মেক্সিকোতে শূকরের মাধ্যমে ছড়াবে। আমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে কোন প্রাদুর্ভাবটি এগিয়ে আসছে তা বোঝার জন্য।

গবেষকরা অবশ্য আশাবাদী যে কভিড-১৯ আমাদের মহামারীর প্রস্তুতিকে আরো ভালো করে তুলবে। লুবি যেমনটা বললেন, আমি ধারণা করি এই হুমকি সম্পর্কে আরো মনোযোগ দেয়া হবে।

দ্য সায়েন্টিস্ট