বিভিন্ন উপায়ে করোনাভাইরাস পপুলিস্টদের জন্য বিপজ্জনক ব্যাপার হয়ে সামনে এসেছে। এটি জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে জার্মানির অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, নিউজিল্যান্ডের জেসিন্ডা আরডার্ন এবং ইতালির গুসিপ্পে কন্তের মতো নেতাদের। সামনে এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্থনি ফাউসি এবং ব্রিটেনের ক্রিস উইটির মতো জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।

একই সময়ে পপুলিস্ট নেতাদের দ্বারা চালিত দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ভারত মহামারীর দ্বারা সবচেয়ে বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিশ্চিতভাবে তাদের অব্যবস্থাপনা পপুলিস্ট প্রতিশ্রুতিগুলোকে মিথ্যাচার হিসেবে তর্কের বিষয়ে পরিণত করেছে।

বাস্তবতা অত সহজ নয়। এই সংকট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় এটি ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি খারাপ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সংস্থাগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অনেক বিশ্বনেতা কিছুদিন আগেও যে জনপ্রিয়তাকে উপভোগ করতেন, এখন তা হ্রাস পেতে শুরু করেছে।

পপুলিজম এই সংকটে মারা যায় না। উল্টো, সংকটে এটি আরো বেশি শক্তিশালী হতে পারে। পপুলিজম নিয়ে বিতর্কে যা হারিয়ে যায় তা হলো আধুনিক গণতন্ত্রে এটি কতটা গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে সেটি। যদিও শব্দটি সমস্যাজনক এবং অপ্রত্যাশিত সবকিছুর জন্য পপুলার ক্যাচালে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ২০১৬ সালে জোড়া ধাক্কা আসে ব্রেক্সিট ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। রাজনীতির এমন একটি স্টাইল হিসেবে এটিকে বোঝা হয় যা দুর্নীতিগ্রস্ত এলিটদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের গণ ইচ্ছাকে দাঁড় করিয়ে দেয়। সরল বৌদ্ধিক আদর্শ হিসেবে এটি নিজেকে নানাভাবে প্রকাশ করে, যেমন গ্রিসের সিরিজা পার্টি ও স্পেনের পোডেমোসের বামপন্থী পপুলিজম এবং এদের ডানপন্থী সংস্করণ হিসেবে ইতালির লিগ এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি। সবাই না হলেও এদের অনেকেই জাতীয়তাবাদী। যেখানে কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রান্তে রয়েছেন, সেখানে অন্যরা জাতীয় বিরোধীদের দিকে এগিয়ে গেছেন। অনেকে সরকারের পদে আরোহণ করেছেন।

যারা ক্ষমতায় আছেন, বিশেষ করে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পপুলিজমের দীর্ঘায়ু নিয়ে যে সন্দেহ তাকে সবচেয়ে বেশি উসকে দিয়েছেন এবং এটা কেন হয়েছে তাও বলা সহজ। ইউএস ও ব্রাজিল যথাক্রমে সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থান দখল করে আছেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে। এসব দেশের নেতারা ভাইরাসের তীব্রতার ব্যাপারে শুরু থেকে সন্দেহ পোষণ করেছেন, প্রশ্নবিদ্ধ চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দিয়েছেন এবং সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির পরও তারা তাদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুলে দিয়েছেন। এছাড়া ট্রাম্প ও বোলসোনারো তাদের সত্যিকারের পপুলিস্ট ফ্যাশন অনুসারে তাদের জাতীয় সংকটকে নিজেদের তৈরি নয় বলে চিত্রিত করেছেন। তারা দোষ ঠেলে দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং তাদের প্রতিপক্ষ, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তার দিকে। যেমন শুরুতেই ট্রাম্প দোষ দিয়েছিলেন চীনকে।

কিন্তু বিশৃঙ্খলভাবে এ সংকট মোকাবেলার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পপুলিজমের জন্য খারাপ ব্যাপার হবে। একটি বিষয় হচ্ছে, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পপুলিজম যে স্থায়ী ব্যাপার এই ফ্যাক্টটি উপেক্ষা করা হচ্ছে, বিশেষ করে কয়েক দশক ধরে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায়। এমনকি ট্রাম্প ও বোলসোনারো যদি ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন সেটি তাদের রাজনীতি থেকে বিদায় ঘোষণা করে না বা তাদের রাজনীতিকে থামিয়ে দেয় না। ব্রিটেন, জার্মানি ও ইতালি পপুলিস্ট ফিগাররা যেমনটা দেখিয়েছে, তারা সাইডলাইনে থেকেও বিতর্ক উসকে দিয়ে নিজেদের কার্যকর প্রমাণ করতে পরে। হয়তো তারা অফিস ছেড়ে গেছে কিন্তু তাদের চিন্তা ও উসকানির বেশ দীর্ঘ জীবন রয়েছে।

পপুলিজম বিপদে পড়ার যে ধারণা তা সবগুলো উপায়কে অগ্রাহ্য করে, যার মাধ্যমে মহামারীটি এ ধরনের রাজনীতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে চালিত করেছে সীমান্ত বন্ধ করার দিকে, উৎসাহিত করেছে ডানপন্থী নেতাদের যারা কিনা মহাদেশের মাঝে চলাচলের যে স্বাধীনতা তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে এবং এটি জাতীয়-সরকারকে অধিক প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিকতার যে চরিত্র তার ওপর। বুদাপেস্টের সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট মাইকেল ইগনাটিয়েফ বলেন, এই ইউরোপ, যা আমি ৩০ বছর ধরে অপরিবর্তনীয় বলে মনে করছি, তা বদলে যেতে সময় লেগেছে কেবল একটি বিকাল। যখন নাগরিকরা কঠিন কোনো বিপদে পড়ে যায়, তারা তখন এমন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ফিরে যায় যারা তাদের পাসপোর্ট দেয় এবং তাদের সুরক্ষা দিতে পারবে বলে মনে হয় এবং এটি হচ্ছে জাতিরাষ্ট্র। সবাই তেমনটাই করেছে: উদারপন্থী রাষ্ট্র, স্বৈরাচারী রাষ্ট্র, রক্ষণশীল সরকার, প্রগতিশীল সরকার—সবাই নিজ নিজ জাতিরাষ্ট্রের দিকে ফিরে গেছে।

যদিও মহামারী বিশেষজ্ঞদের যিকঞ্চিত পরিমাণে সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছে, যাদের পপুলিস্টরা এলিটদের পাশাপাশি উপহাস করে এসেছে, তবে এটা তাদের লক্ষ্যেও পরিণত করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ট্রাম্পের কথা। তিনি ফাউসিকে নিচে নামানোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এমনকি তিনি ডাক্তারের অনুমানকে ভুল প্রমাণ করার জন্য জনসম্মুখে হাজির হয়েছেন। সরাসরি ফাউসি ভুল বলছেন বলেও মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে বোলসোনারো মহামারী শুরু হওয়ার পর এরই মধ্যে তিনজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দেখে ফেলেছেন। প্রথমজনকে বহিষ্কার করা হয় ব্রাজিলিয়ান প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করায়। যেখানে প্রেসিডেন্ট করোনাভাইরাস সামান্য ফ্লু বলে মন্তব্য করেছিলেন। এরপর দ্বিতীয় জন নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এ উপায়ে মহামারীটি পপুলিস্টরা সবচেয়ে ভালো যা করতে পারে তা করতে দিয়েছে: যারা তাদের সঙ্গে একমত না তাদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করেছে, ঘটনাকে নিজেদের মনমতো বিশ্লেষণ করেছে এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবনাকে এগিয়ে দিয়েছে।

দ্য আটলান্টিক