কভিড-১৯-এর বিস্তৃতির সঙ্গেই এ-সম্পর্কিত কিছু মিথ ছড়িয়ে পড়েছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেসব মিথের ওপর বিশ্বাসও রেখেছে সাধারণ মানুষ। তেমন কিছু মিথ ও এখনো সেগুলোর ওপর বিশ্বাসের কারণগুলো এখানে খতিয়ে দেখা হলো।
উহানে ল্যাবে ভাইরাসের উত্পত্তি
চীনের উহানে ভাইরাসের উত্থান ঘটার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অন্য রাজনীতিবিদরা কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই ঘোষণা দেন যে এটি ল্যাব থেকে শুরু হয়েছে। ইউএসের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্পষ্টভাবে এ সম্ভাবনা খারিজ করে দেয়। তারা বলে, গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রদায় বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক মতের সঙ্গে একমত যে কভিড-১৯ মানুষের তৈরি বা জিনগতভাবে মডিফায়েড নয়।
কেন মানুষ এটা বিশ্বাস করেছে: মানুষ কভিড-১৯-এর কারণে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে বাঁচতে কোনো একটি বলির পাঁঠা সন্ধানে ছিল। পাশাপাশি বিদেশী দেশ হিসেবে চীন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই লক্ষ্যটা বেশ সহজ ছিল। দুর্ঘটনাবশত ল্যাব থেকে ভাইরাসের বেরিয়ে যাওয়া কখনো কখনো ঘটে। যদিও অনেক বিজ্ঞানী বলেছেন, এ সম্ভাবনাটি একরকম অসম্ভব। সব মিলিয়ে অনেকেই এ আখ্যানে বিশ্বাস করেছিল যে চীন ল্যাবে এটি তৈরি করে ছেড়ে দিয়েছে।
কভিড-১৯ ফ্লুর চেয়ে খারাপ নয়
মহামারীর শুরুতে ট্রাম্প রোগের তীব্রতা নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এটা মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়ে বিপজ্জনক না। কিন্তু পরে এক সাক্ষাত্কারে ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, তিনি জানতেন যে ভাইরাসটি ফ্লুর চেয়ে অনেক বেশি মরণঘাতী।
সিডিসির হিসাব অনুযায়ী, ফ্লুতে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ১২ থেকে ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে কভিড-১৯-এ মধ্য সেপ্টেম্বরেই মারা গেছে দুই লাখের বেশি মানুষ। সব মিলিয়ে কোনো অর্থেই করোনাভাইরাস সাধারণ ফ্লু নয়।
কেন মানুষ বিশ্বাস করে: মানুষ এটা বিশ্বাস করে কারণ তাদের নেতারা সারাক্ষণ এটা বলতে থাকে। কেবল তা-ই নয়, ট্রাম্প এটাও বলেছেন যে কভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যা অতিরঞ্জিত। অথচ উল্টোটাই সত্য।
মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই
মাস্ক সংক্রমণকে সীমায়িত করে, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মাঝে এমন শক্তিশালী ধারণা থাকার পরও অনেক মানুষ (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও) মাস্ক পরতে অস্বীকৃতি জানান। এ ইস্যুতে ইউরোপের একাধিক দেশে বেশ প্রতিবাদ প্রতিরোধও দেখা গেছে।
কিন্তু মাস্ককে অনেক দিন ধরেই এপিডেমিওলজিস্টরা উৎস নিয়ন্ত্রণের (যেখানে অসুস্থ রোগীকে আটকানো হয় অন্যদের মাঝে রোগ ছড়ানো থেকে) জন্য কার্যকর বলে বিবেচনা করে আসছেন। ১৭০টি দেশ নিয়ে ল্যানসেটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফেস মাস্ক সংক্রমণ রোধ করতে পারে।
মানুষ কেন বিশ্বাস করে: শুরুর দিকে মাস্ক পরা নিয়ে নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে সিডিসি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উভয়ই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। তারা বলেছিল, সংক্রমণের উপসর্গ না থাকলে সাধারণ মানুষের মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই। মূলত উচ্চমানসম্পন্ন মাস্কের স্বল্পতার কারণেই এ রকম নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু এখন এসে মাস্ক পরা অনেক জায়গায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবার নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের দোহাই দিয়ে মাস্ক পরতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে।
ধনীরা ভাইরাসকে ব্যবহার করছে ভ্যাকসিন থেকে মুনাফার জন্য
বই ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের একটি সিনেমা ‘প্যানডেমিক’-এ জুটি মিকোভিটস ভিত্তিহীন একটি দাবি করেন। তিনি বলেন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ ডিরেক্টর অ্যান্থনি ফাউসি এবং মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস তাদের শক্তিকে ব্যবহার করছেন কভিড-১৯ ভ্যাকসিন দ্বারা লাভবান হওয়ার জন্য। এ সময় ভাইরাস ল্যাব থেকে এসেছে বলেও দাবি করেন।
কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ নেই যে ফাউসি কিংবা গেটস মহামারী থেকে সুবিধা পেয়েছেন এবং ভ্যাকসিন থেকে লাভবান হয়েছেন। এমনকি ফাউসি মহামারীর শুরু থেকে এর ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন, সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বিল গেটসও এ ধরনের প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকে কথা বলে আসছেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা থেকে ভূমিকা রেখে আসছেন।
মানুষ কেন বিশ্বাস করে: ধনী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি যেমন গেটস ও ফাউসিদের প্রায়ই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জন্য লক্ষ্যে রাখা হয়। ট্রাম্প নিজেও ফাউসিকে আক্রমণ করেছেন। ট্রাম্পের অনেক অনুসারীও ফাউসির বিরুদ্ধে অতিরঞ্জনের অভিযোগ আনেন। এসবই মানুষকে এসব ধারণার প্রতি বিশ্বাস করার দিকে ঠেলে দেয়।
হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন একটি কার্যকর চিকিৎসা
যখন ফ্রান্সের একটি ছোট গবেষণা পরামর্শ দেয় যে ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন রোগের চিকিৎসার জন্য কার্যকর, তখন ট্রাম্প এবং অন্যরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু সেই গবেষণা এখন এসে ব্যাপকভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে। এমনকি এটি কোনো সুবিধা দেয় না জেনেও অনেকে এ চিকিৎসার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একটি টুইটে ট্রাম্প বলেন, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধের ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসতে যাচ্ছে। তিনি বারবার এটির পক্ষে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেন।
কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটা কভিড-১৯ থেকে কাউকে সুরক্ষা দিতে পারে না। প্রথমে এফডিএ এর জরুরি ব্যবহার অনুমোদন করলেও পরে তা নিয়ে সতর্কবার্তাও জারি করে এবং শেষ পর্যন্ত এটি বাতিল করে।
মানুষ কেন এটি বিশ্বাস করেছে: শুরুর দিকের কিছু রিপোর্ট বলেছিল, এটি সম্ভবত প্রতিশ্রুতিশীল একটি ওষুধ। মানুষ সাধারণত কোনো বিষয়ে প্রথম জানার পর তা বিশ্বাস করে। তার ওপর ট্রাম্পের বারবার বলার বিষয়টিও এখানে ভূমিকা রেখেছে।
টেস্টের কারণে কেসের সংখ্যা বেড়েছে
যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, সংক্রমণ বাড়ছে অধিক মানুষকে টেস্ট করার কারণে।
যদি এটা সত্যি হতো তবে একজন আশা করতে পারত যে পজিটিভ কেসের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে কমে যেতে পারত। কিন্তু অনেকগুলো গবেষণা দেখিয়েছে উল্টোটাই সত্য। মূলত সঠিক ব্যবস্থা নেয়া হলেই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এসেছে, নয়তো এটি বেড়েছে। টেস্ট বাড়ার ফলে কেসের সংখ্যা বাড়ার ঘটনা দেশের প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে।
মানুষ কেন এটি বিশ্বাস করেছে: যুক্তরাষ্ট্রে শুরুর দিকে টেস্টের স্বল্পতা ছিল। যদিও পরে তা বেড়েছে। বিস্মিত হওয়া যৌক্তিক যে কেন অনেক বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাই এটি মানুষ বিশ্বাস করেছে।
এসবের বাইরে অনেকেই বিশ্বাস করে যে হার্ড ইমিউনিটি আমাদের রক্ষা করবে যদি আমরা নিজেদের সংক্রমিত হতে দিই। যদিও এটি সত্যি ছিল না। যুক্তরাজ্য ও সুইডেন এ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের দিকে হাঁটে। যদিও সরকারগুলো এটিকে অফিশিয়াল কৌশল বলে অস্বীকার করে। যুক্তরাজ্য পরে পূর্ণ লকডাউনও দেয়। কিন্তু অনেক মানুষ এ তথ্যে বিশ্বাস রেখেছিল। এছাড়া ভ্যাকসিন সুরক্ষা দেবে না, এমন তথ্যেও বিশ্বাস রেখেছিল প্রচুর মানুষ। এটি বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে প্ররোচিত করেছে অ্যান্টিভ্যাকসারদের প্রতিবাদ কর্মসূচিও।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত





