গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর এখন পর্যন্ত ওই ভাইরাসের বিস্তার সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে, একথা সত্য। কিন্তু এর বিস্তার যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো মহামারী রূপ নেবে না, তা বলা যাচ্ছে না। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ৮০৩ এবং প্রাণহানি হয়েছে ৩৯ জনের (সূত্র: আইইডিসিআর)। কয়েক দিন ধরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। নভেল করোনাভাইরাসে বিশ্বে মোট আক্রান্ত হয়েছে ১৮ লাখ ৫১ হাজার ৫৩১ জন, সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৭৯৩ জন এবং ১ লাখ ১৪ হাজার ২৯০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বৈশ্বিক এ করোনা মহামারী বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠীকে মহাবিপদসংকেত দিয়ে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে প্রাণহানির সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, বিশ্বের কোথাও এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার হয়নি। সব আক্রান্ত দেশই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবস্থা নিয়ে সাধ্যমতো এগিয়ে যাচ্ছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, মরণঘাতী এ ভাইরাসে বৈশ্বিকভাবে আক্রান্ত ও প্রাণহানি উভয় সংখ্যাই দ্রুত বাড়ছে। অদৃশ্যমান এ ভাইরাসের সংক্রমণ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বিশেষ তহবিল গঠন করে তা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যবহার করায় মনোযোগী হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও একই পথে হাঁটছে। প্রথম পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা, যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী বিতরণসহ ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হলেও করোনায় ক্ষতির ব্যাপ্তি বিবেচনা করে পুনরায় সব সেক্টরের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মোট ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যার মধ্যে তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন।
প্রণোদনা প্যাকেজের মোট ব্যয় দেশের মোট জাতীয় আয়ের ২ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশ কর্তৃক গৃহীত অনুপাতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, স্বল্প সুদে (২-৭ শতাংশ হারে) সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের উপকারভোগীর কাছে ঋণ পৌঁছে দেয়া এবং তা পর্যবেক্ষণে কঠোর তদারকির নির্দেশনা দেয়া। ধরেই নেয়া হয়েছে যে ওই টাকা অনুদান হিসেবে দেয়া হলে বিস্তর দুর্নীতির সুযোগ থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তারল্য বৃদ্ধি, রফতানি শিল্পে উৎসাহ প্রদান, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও সেবায় সহায়তা প্রদানসহ আনুষঙ্গিক বহুক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত কার্যকরী পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে। সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে সরকার ঘোষিত প্যাকেজ সাদরে গৃহীত হয়েছে এবং আশা করি কৃষি উৎপাদন ও কৃষি ব্যবসায় (শস্য, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ) ওই প্রণোদনার সুবিধা যথাযথভাবে বণ্টিত হবে। কিছু প্রত্যাশা অপূর্ণ ছিল, যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় পূর্ণ করেছেন, তা হলো করোনায় সেবা প্রদানকারীদের (ডাক্তার, নার্স, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য) উৎসাহ প্রদান এবং প্রকৃত সেবা প্রদানকারীদের অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদানের জন্য বীমার সুযোগ সৃষ্টি করা, সামাজিক সুরক্ষা খাতের পরিধি বৃদ্ধি করা, কৃষি উৎপাদনে গুরুত্ব প্রদান করা এবং যারা নিম্ন বা মধ্যম আয়ের মানুষ কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে সাহায্য চাইতে পারে না, তাদেরকে কার্ড দিয়ে সাহায্য পৌঁছে দেয়ার নির্দেশনা।
সত্যিকার অর্থে এটা সাধারণ মানুষের একটি বড় অপ্রকাশিত চাওয়া ছিল। কৃষিকে খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান উৎস বলে বর্ণনা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তাদের খাদ্য চাহিদা মেটানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি বৈশ্বিক খাদ্যঝুঁকির ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা তাকে আরো বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে খ্যাতি এনে দিতে সহায়ক হবে। কৃষিজমি ও বসতবাড়িতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে কোনো জমি ফেলে না রেখে আবাদ করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন, যা আমাদের কৃষকসমাজ ও সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করবে।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বর্তমানে ২ দশমিক ২৩ লাখ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি পতিত রয়েছে (তথ্যসূত্র: কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ, ২০১৭)। বিশেষ কোনো কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না হলে আমরা আমাদের কৃষিকে নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে ভূমিকা রাখতে পারব। তবে এক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতাকে স্মরণে রেখে খাদ্য সরবরাহে নিজেদের প্রয়োজনকে সর্বাগ্রে রাখা দরকার, কারণ আমাদের দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদাও বৃহৎ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক কৃষি উপকরণ সরবরাহ অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন এবং তার মন্ত্রণালয়ের অধীন সব বিভাগ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন। মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনায় ডিএই, ডিওএফ, ডিএলএস, বিএআরসি, নার্সভুক্ত সব গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের স্ব-স্ব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে কৃষি উৎপাদন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়।
নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে কী পরিমাণ ক্ষতি হবে তা কেউ অনুমান করতে পারছে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) মনে করে, করোনায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ হবে প্রায় ৪ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে কী পরিমাণ ক্ষতি হবে তা এখনো কেউ প্রাক্কলন করেনি। যদিও এডিবির হিসাবে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। অর্থাৎ ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে বলে জানিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বহুল প্রচারিত লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট পূর্বাভাস দিয়েছে যে করোনা-উত্তর বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। মাননীয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অবশ্য এ অর্থবছরে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. আবুল বারকাত মনে করেন, করোনার কারণে শুধু ‘মানুষ বাঁচাও কর্মসূচি’ বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ৮১ হাজার কোটি টাকা।
আশার কথা হচ্ছে, এডিবি ও বিশ্বব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় করোনার স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কিছু সহযোগিতা কর্মসূচি নিয়ে আসছে বলে জানা যাচ্ছে; যা দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি পূরণে ভূমিকা রাখবে। সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সম্মানিত সদস্য (সিনিয়র সচিব) প্রফেসর ড. শামসুল আলম মনে করেন, সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে; যা ২০২০ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে। সরকার সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য ১০ টাকা দরে চাল বিক্রি এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় ত্রাণ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমাজের বিত্তবানরাও এগিয়ে এসেছেন তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এলাকার দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করার জন্য, যা সত্যিকার অর্থে প্রশংসাযোগ্য।
কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের সুবিধায় যেসব বিষয়ের প্রতি আরো গুরুত্ব দেয়া দরকার তা হলো, খোলাবাজারে সরকার নির্ধারিত হারে চাল ও আটা বিক্রি উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা; সামনে রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, ডাল, আলু খোলাবাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা, যাতে অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা কোনো প্রকার সিন্ডিকেট করতে না পারেন এবং অযথা দাম বাড়াতে না পারেন; আমাদের সবচেয়ে ভরসার ফসল বর্তমান বোরো ধানে যেন সেচের অভাব না হয়, সেদিকে নজর রাখা; হাওড় অঞ্চলের ফসল যেন ভারি বৃষ্টি বা আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার প্রতি দৃষ্টি রাখা; কৃষি উপকরণ যেমন সার, জ্বালানি তেল, কীটনাশক, সবজিবীজসহ অন্যান্য বীজের সরবারাহ বাড়ানো; পরবর্তী মৌসুমে যেসব ফসল চাষ করতে হবে, সে বিষয়ে চাষী ভাইদের আগাম নির্দেশনা দেয়া; সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতির মূল্য হ্রাস করা; ফসলের রোগ নিরাময় করা; কৃষকরা যেন তাদের উৎপাদিত ফসলের (শস্য, শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ) ন্যায্যমূল্য পান, তার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখা; কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানো, সর্বোপরি করোনায় আক্রান্ত কৃষক যেন কোনোভাবেই স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা।
ড. মো. সাইদুর রহমান: প্রফেসর, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
saidurbau@yahoo.com





