২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ইরাক ডজি ডসিয়েরে (ইরাকের অস্ত্রশস্ত্রবিষয়ক নথিপত্রের অনানুষ্ঠনিক নাম, যা পরে তুলে নেয়া হয়) লেখেন, সাদ্দাম হোসেনের সামরিক পরিকল্পনায় মাত্র ৪৫ মিনিটের প্রস্তুতিতে তার বাহিনীকে ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এ খবর অবশ্য পরে যদিও মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তবে খবর ভুল হলেও এটি পার্টি সমাবেশ, সংসদ এবং যুদ্ধে যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত তাতে বেশ ভালোই রসদ জোগায়। ১৬ মার্চের লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ মডেলও এখন ইরাকের সেই ডজি ডসিয়েরের সমান কুখ্যাতি অর্জনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নায়াল ফার্গুসনের দাবি ছিল, যুক্তরাজ্যে ৫ লাখ ১০ হাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ মারা যাবে, যাকে কিনা ভবিষ্যতে টনি ব্লেয়ারের করা সেই দাবির (৪৫ মিনিটে সাদ্দামের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে দেয়া বক্তব্য) সমান্তরালে রেখে বিচার করা হবে। যেমনটা এখন পর্যন্ত আমরা কভিড-১৯-এর মৃত্যুর সংখ্যার দিকে তাকালে দেখতে পাই।

প্রথমত, একইভাবে নভেল করোনাভাইরাসের ভয়ঙ্কর হুমকিকে সামনে রেখে জনগণের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ এবং দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে জরুরিভাবে নেয়া পদক্ষেপগুলোয় সাধারণ মানুষের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওয়াল্টার শেইডেল আমাদের মনে করিয়ে দেন যে সার্স-কোভ-২ স্প্যানিশ ফ্লুর মতো অতটা ভয়ঙ্কর না। ১৯১৮-১৯ সালে স্প্যানিশ ফ্লু বয়স্ক লোকদের সঙ্গে সুস্থ ও তরুণদেরও হত্যা করেছে। এটি আক্রান্ত করেছে ৫০০ মিলিয়ন মানুষকে এবং হত্যা করেছে পছাচ কোটি মানুষকে। যা কিনা বর্তমান সময়ের ২২ থেকে ২৫ কোটি মানুষের সমতুল্য। তবে এর পরও ১৯১৮ সালে সে সময়ের কর্তৃপক্ষ সমাজ ও অর্থনীতি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। এছাড়া অন্য সব মহামারীতেও আমাদের বেশ ভুগতে হয়েছে, কিন্তু তা সহ্যসীমার ভেতরেই ছিল। এখন ইতিহাসের এই দ্বিধা এবং অভিজ্ঞতা কাটিয়ে উঠতে হবে, কারণ সার্স-কোভ-২-এর কাছ থেকে আসা হুমকি অতীতের সব বিপর্যয়কে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে দেশগুলোকে আতঙ্কিত হওয়ার মতো ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, প্রমাণের স্বল্পতা। ২০০২ সালের ২৩ জুলাইয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের হিসাব বলছে, প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যুদ্ধে এবং মিলিটারি অ্যাকশনে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। যা কিনা কোনোভাবেই পরিবর্তনীয় ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তারা বিশ্বাস করেননি যে এটা যৌক্তিকভাবে ন্যায়সংগত ছিল। তাই গোয়েন্দা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আগে থেকেই পলিসিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল। একইভাবে প্রমাণভিত্তিক পলিসির পরিবর্তে অনেক সরকারকে পলিসিভিত্তিক প্রমাণ এনে লকডাউনকে যৌক্তিক করতে হয়েছে।

তৃতীয়ত, প্রমাণ চাওয়ার কারণে সমালোচকদের অবজ্ঞা। যারা ইরাকে হামলার ব্যাপারে প্রমাণের স্বল্পতার অভিযোগ এনেছিলেন, তাদের বাগদাদের কসাইদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হিসেবে কলঙ্কিত করা হয়। একইভাবে যারা এখন পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ব্যাপারে প্রশ্ন করছেন, তাদের নিজেদের পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হচ্ছে।

চতুর্থত হচ্ছে, অন্যান্য সমান্তরাল ক্ষতির বিষয়। গত মাসে যেমনটা বলা হয়েছিল যে অতিরঞ্জিত, অনুমাণমূলক, প্রমাণবিহীন ইত্যাদি। যদিও বাড়তে থাকা প্রমাণগুলো করোনা নয়—এমন ছয়টি পথের কথা বলছে, যার মাধ্যমে লকডাউনের কারণে বাড়ছে ভুক্তভোগীর সংখ্যাও।

পঞ্চম বিষয়টি হচ্ছে, এর থেকে মুক্তির নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। ইরাক জয়ের পর স্থিতিশীল অঞ্চলে সুসংহত গণতান্ত্রিক সরকার দৃঢ় করা এবং সুশৃঙ্খলভাবে সেনা প্রত্যাহারের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র নিজেরাই বাজে অবস্থায় পড়ল। ফলে তাদের বাড়ি ফিরতে হলো ক্লান্তি ও বিপর্যয় নিয়ে। একইভাবে সব সরকার এখন নিজেদের জয়ী ঘোষণা করে লকডাউন তুলে দেয়ার ব্যাপারে ব্যাপক সংগ্রামের মাঝে পড়তে হচ্ছে। মডেলাররা এখন কোনোটাই চান না এবং আরো ধ্বংসাত্মক হওয়ার সতর্কবার্তাও ফিরে আসছে। যদিও অনেক দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা না বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের লকডাউনও শেষ হয়ে এসেছে।

আরেকটি সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মিশন ক্রিপ (সামরিক অভিযানে নেয়া ধীরগতির পদক্ষেপ, যা বেশির ভাগ সময় অপরিকল্পিত হয়)। মুক্তি লাভের স্বনির্মিত উপায়ের আরেকটি হচ্ছে কার্ভ সমতল করার মূল মিশন। ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভাইরাসের ধীরগতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু তাতে ভাইরাস মোকাবেলাকে আরো উচ্চাভিলাষী ও অসম্ভব করে তোলে। আর শেষ কথা হচ্ছে, ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার মিডিয়া সমালোচনামূলক জিজ্ঞাসাবাদের পরিবর্তে অনেক বেশি ব্যস্ত ছিল বিনোদন দেয়া নিয়ে এবং বর্তমান করোনাযুদ্ধের কালেও তেমনটাই ঘটছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া