করোনা পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতি হুমকির মুখে, বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বোরো মৌসুমে ২ কোটি ৪ লাখ ৩০ হাজার টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বোরো চাষে কৃষি উপকরণ বা পরিচর্যা বিষয়ে কোনো ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণে সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ চালু রাখতে জ্বালানি তেলসহ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্প্রবাহ, সেচযন্ত্রসহ কর্তনযন্ত্রের মেরামতকাজ নির্বিঘ্ন রাখতে খুচরা যন্ত্রাংশের দোকান খোলা রাখতে হবে। এজন্য স্থানীয় প্রশাসনকে এরই মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় জোরালো নির্দেশনা দিয়েছে। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শ্রমিক সংকট মোকাবেলা করা। এজন্য শ্রমিক উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে ঘাটতি এলাকায় শ্রমিকদের প্রবেশের সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। বিগত বছরগুলোতে ধান কাটা মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের সংকট পরিলক্ষিত হয়েছে। চলতি মৌসুমে করোনার প্রাদুর্ভাবের দরুন গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তাদের চলাচল বিঘ্নিত হবে, এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিক সংকট তীব্র হওয়ার আগেই তাদের স্বচ্ছন্দে চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া কৃষি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সঠিক নির্দেশনা থাকতে হবে। পাশাপাশি বোরোতে ক্ষতি হলে সেটা আউশে কীভাবে মেটানো যায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এখনই।
অকৃষি শ্রমিক (রিকশা/ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র দোকানি, নির্মাণ ও অন্যান্য শ্রমিক) করোনার সংকট কাটাতে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর অঞ্চল থেকে নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ সাপেক্ষে আপত্কালে তাদের উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে ধান কর্তন কাজে নিয়োজিত করে আয়ের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক কৃষি শ্রমিক সংকট নিরসন করা যাবে। এছাড়াও এলাকা উপযোগী বরাদ্দকৃত কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার সময়মতো কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁঁছতে হবে। সম্ভব হলে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পরিবহনের মাধ্যমে ধান কর্তন কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন করতে হবে।
তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে আউশের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ রয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ, আমনের ২ শতাংশ এবং বোরোতে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ। মোট চালের উৎপাদন ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার টন থেকে বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ রয়েছে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ১৯ হাজার টন। ফলে চালের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ রয়েছে প্রায় ৩ শতাংশ বা ১০ লাখ ৫৯ হাজার টন। এর মধ্যে বোরোতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ২ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার টন থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টন বৃদ্ধি হতে পারে বলে প্রক্ষেপণ রয়েছে। এছাড়া আউশের ৩০ লাখ থেকে ৩৭ লাখ ২৬ হাজার টন, আমনের ১ কোটি ৫৩ লাখ টন থেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ টন প্রক্ষেপণ রয়েছে।
এ বছর আউশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আউশের আবাদ গত বছরের চেয়ে ২ লাখ হেক্টর বৃদ্ধি করা হয়েছে। আউশের বীজতলা তৈরি করার জন্য আউশ চাষীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। কৃষি উপকরণ ক্রয় ও বিক্রয়ের দোকান খোলা রাখা এবং পরিবহন চলাচল বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আউশ মৌসুমের বীজতলা তৈরি এবং কৃষি উপকরণ ক্রয় করতে সুবিধা হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে লকডাউনের সময় বর্ধিত হতে পারে। এতে বোরো ধান কর্তন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে, শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে এবং কর্তনকালীন ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ারও সম্ভাবনা আছে।
হাওড় অঞ্চলের সাত জেলায় বোরো ধান কাটার উপযোগী অবস্থায় রয়েছে এবং বৈশাখের প্রথমার্ধে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। এ অঞ্চলের সাত জেলায় চলতি মৌসুমে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১০১ হেক্টর জমির ধান কর্তন সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সরকার এরই মধ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় জরুরি ভিত্তিতে ধানের কর্তন যন্ত্র বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব জেলার জন্য নতুন ১৮০টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার দ্রুত সরবরাহের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। পুরনো ২২০টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ৪৮৭টি রিপার অতিদ্রুত মেরামতের উদ্যোগ গ্রহণ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
হাওড় অঞ্চলের জন্য সরকারিভাবে কর্তন যন্ত্র সরবরাহের ঘোষণা আসায় ওই এলাকার কৃষকরা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছেন। নভেল করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে গণপরিবহন বন্ধ এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনায় আগাম কর্তনকৃত ধান বাজারজাত বিষয়ে কৃষকরা বিপাকে পড়তে পারেন। তবে যেসব অঞ্চলে বোরো ধানের কর্তন মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে জুন পর্যন্ত চলবে এবং আশা করা যায় করোনা পরিস্থিতি ততদিনে শিথিল হয়ে যাবে ও মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসতে পারবে। করোনার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে দেশের প্রধান খাদ্যশস্যের সরবরাহ এবং চাহিদা নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারলে খাদ্য ঘাটতির মতো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যাবে।
চলতি বোরো মৌসুমে জমি আবাদ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় এক লাখ হেক্টর কম অর্জিত হয়েছে। তবে গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৩ টন (গত বছর ৪ দশমিক ২ টন/হে.) হলে
১ লাখ ১৪ হাজার টন উৎপাদন বাড়বে। এতে মোট উৎপাদন দাঁড়াবে ২ কোটি ৪ লাখ ৯৩ হাজার টন। আউশ মৌসুমে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ও ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদন বেড়ে ৩৭ লাখ ২৬ হাজার টন হবে। যদি প্রলম্বিত খরা এবং করোনার আতঙ্কে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা না যায়, তাহলে আউশ মৌসুমে মোট ধানি জমির ৫ শতাংশ কমতে পারে। জুনের পর নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাব কমলে এবং আমন উৎপাদনের আগাম ও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে ফলন বাড়ানো সম্ভব হবে। নতুন ধান উৎপাদনের প্রযুক্তি ও কৃষি উপকরণের সরবরাহ ঠিক থাকলে আমনের উৎপাদন বাড়তে পারে দুই থেকে আড়াই লাখ টন। এতে মোট উৎপাদন হবে ১ কোটি ৫৫ লাখ টন। সেক্ষেত্রে দেশের মোট চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ৩ কোটি ৯৬ লাখ ৪৭ হাজার টন।
গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে আউশের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ রয়েছে ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ, আমনের ২ শতাংশ ও বোরোতে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ। মোট চালের উৎপাদন ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার টন থেকে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ১৯ হাজার টন বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ রয়েছে। চালের উৎপাদন বৃদ্ধি হতে পারে ৩ শতাংশ বা ১০ লাখ ৫৯ হাজার টন। এমতাবস্থায় দেশের মোট ১৬ কোটি ৫৬ লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য মাথাপিছু গড় বার্ষিক ১৩৪ কেজি চাল হারে এবং মুড়ি, চিঁড়া, খই, পিঠা ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ মোট চালের প্রয়োজন হবে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টন। মানব খাদ্যের পাশাপাশি আরো বহুবিধভাবে ব্যবহার বীজ, গবাদিপশুর খাদ্য এবং শিল্প-কারখানায় উপাদান হিসেবে ২৬ শতাংশ। ফলে উদ্বৃত্ত থাকতে পারে ৪৩ লাখ ৯২ হাজার টন।
সৃষ্ট পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক ক্ষতির পরিমাণ বলা দুরূহ হলেও হাওড় অঞ্চলে আগাম বোরো কর্তনের চাপ, কৃষিশ্রমিক সংকট এবং কর্তনযন্ত্রের ব্যবহার সমস্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ (কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টি) বিবেচনায় নিয়ে আপত্কালে কর্তন দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির ঝুঁকি যথাক্রমে হাওড় অঞ্চলে ৫ শতাংশ এবং বাকি অঞ্চলে ২ শতাংশ হারে হিসাব করা যেতে পারে। করোনার আতঙ্ক এবং দীর্ঘায়িত খরা বিবেচনায় আসন্ন আউশ মৌসুমের মোট জমির লক্ষ্যমাত্রা ৫-১৫ শতাংশ কমার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু গড় ফলন ঠিক থাকলে উৎপাদন কমার সম্ভাবনা নেই। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উভয় মৌসুমের মোট ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ১৪ লাখ ৭৫ হাজার টন। সেক্ষেত্রে দেশের মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৮ লাখ ১২ হাজার টন আর উদ্বৃত্ত হবে ২৮ লাখ ২৩ হাজার টন।
সুপারিশগুলো: হাওড় অধ্যুষিত মৌলভীবাজার ও সিলেট অঞ্চলের চা বাগানের শ্রমিকদের সাময়িকভাবে নিকটবর্তী এলাকায় বোরো ধান কর্তনে নিয়োজিত করে সেসব এলাকায় কৃষিশ্রমিক সংকট মোকাবেলা করা যেতে পারে। বোরো ধানের ন্যূনতম বাজার মূল্য কেজিপ্রতি ২৬ টাকা নিশ্চিত করতে হবে। বোরো ধানের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা হলে আসন্ন আউশ ও আমন মৌসুমে ধান রোপণে কৃষকরা উৎসাহিত হবেন। এছাড়া আউশে দীর্ঘায়িত খরার কারণে বীজতলা তৈরি বিলম্বিত হতে পারে, যা ওই মৌসুমের রোপণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেক্ষেত্রে আউশ ও আমন মৌসুমে ধানচাষীদের বিনা মূল্যে সেচ নিশ্চিত করতে হবে এবং হাওড় অঞ্চলে যেসব ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবায় নিয়োজিত নন, তাদের বোরো ধান কর্তনকালীন কৃষিশ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য নিয়োজিত করা যেতে পারে।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: মহাপরিচালক; বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)





