২০০৮ সালে ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ভিশনে অনুপ্রাণিত হয়ে হাজার হাজার তরুণ উদ্যোক্তা তাদের স্বল্প মূলধন, পিতামাতার অবসরকালীন ভাতা, শেষ সঞ্চয় এবং কিছু এঞ্জেল বিনিয়োগকারী ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টের অর্থ পুঁজি করে তাদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে ব্যবসায় রূপ দেয়ার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ হওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। গত ১২ বছরে এ উদ্যোক্তাদের রক্ত, ঘাম ও ত্যাগের ফলে এবং সরকারের নীতিমালার সহায়তায় আমাদের দেশে অনেকগুলো উদ্ভাবনী স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্টার্টআপের সফলতার কারণে দেশে একাধিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী তৈরি হয়েছে, যারা ওইসব ক্রমবর্ধনশীল স্টার্টআপকে সহায়তা করছে। বছরের পর বছর ধরে আমরা যে স্টার্টআপ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছি তা চলমান কভিড-১৯ মহামারীতে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। স্টার্টআপগুলো উদ্ভাবনী চিন্তা ও বৈপ্লবিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটানোর জন্য বৈশ্বিকভাবে সুপরিচিত। যদি বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়, তাহলে দেশে উদ্ভাবনের যাত্রা থমকে যাবে, যা আমাদের অগ্রযাত্রাকে কমপক্ষে এক যুগ পিছিয়ে দেবে।

স্মার্টআপগুলো আমাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। গত শতকে যেসব বিষয় আমাদের কাছে অসম্ভব ছিল, স্টার্টআপগুলো গত এক দশকে সেগুলোকে বাস্তবে পরিণত করেছে। পাঠাও, সহজ, জোবাইক ও হাংরিনাকির মতো রাইডশেয়ারিং এবং ফুড ডেলিভারি কোম্পানি আমাদের যাতায়াত ও খাওয়া-দাওয়ার ধরনকে পাল্টে দিয়েছে; চালডাল, আজকেরডিল, বাগডুম, প্রিয়শপ ও সিন্দাবাদের মতো ই-কমার্স কোম্পানি আমাদের কেনাকাটার ধরন বদলে দিয়েছে; সেবা, হ্যান্ডিমামা ও যান্ত্রিকের মতো হ্যান্ডিম্যান এবং লজিস্টিক কোম্পানিগুলো নানা ধরনের সেবা আমাদের দোরগোড়ায় এনে দিয়েছে; গেজ এবং সিগমাইন্ডের মতো কোম্পানিগুলো তাদের এআইভিত্তিক ভোক্তা ও ব্যবসা বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজতর এবং ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এসব পরিবর্তন শুধু ভোক্তাসাধারণের জীবনকেই প্রভাবিত করেনি, পাশাপাশি গতানুগতিক ব্যবসাগুলোকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী পন্থার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব পণ্য ও সেবাকে তুলে ধরতেও উদ্বুদ্ধ করেছে।

স্টার্টআপগুলো বয়সে নবীন এবং তারা দ্রুতবর্ধনশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে প্রযুক্তি, বাজার উন্নয়ন ও মানবসম্পদে আগ্রাসী বিনিয়োগ করে থাকে, যার ফলে তাদের নগদপ্রবাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঋণাত্মক হয়। কিছু স্টার্টআপ এ ঘাটতি পূরণে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে থাকে। তবে কমপক্ষে আগামী এক বছর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় তহবিল সংগ্রহ প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের অনেক স্টার্টআপ প্লাটফর্মভিত্তিক হওয়ায় এবং লকডাউনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে গত কয়েক সপ্তাহে তাদের আয় অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। উদাহরণস্বরূপ ফুড ডেলিভারি সেবায় গ্রাহকদের অর্ডারের পরিমাণ ৭০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যদিও কেউ কেউ সীমিতভাবে ডেলিভারি সেবা চালু রেখেছে, যা ব্যবসা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। বর্তমানে রাইডশেয়ারিং সেবা স্থগিত রয়েছে। চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ছাড়া অন্যান্য ই-সার্ভিস এবং ই-কমার্স সেবার ডেলিভারিও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ এসব স্টার্টআপ এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। যদি স্থানীয় স্টার্টআপগুলো অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কভিড-১৯ মহামারী শেষে এ খাত সম্পূর্ণরূপে অধিক বিনিয়োগ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদেশী কোম্পানিগুলোর দখলে চলে যাবে।

বছরের পর বছর ধরে স্টার্টআপগুলো প্রায় দেড় লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, যাদের চাকরি এখন হুমকির সম্মুখীন। এছাড়া এসব স্টার্টআপের সঙ্গে জড়িত প্রায় সাত লাখ সেবাদাতার সেবাদান কার্যক্রম এখন বন্ধ রয়েছে, ফলে তারাও রোজগার করতে পারছে না। সরাসরি ও বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরিতে স্টার্টআপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এ ধরনের সংকটকালে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়ে তাদের টিকিয়ে রাখা ও সহায়তা করা আবশ্যক। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও স্থানীয় ব্যবসাগুলো আমদানির বিকল্প নিশ্চিত করে। তারা ক্রমবর্ধমানভাবে স্থানীয় পরিসরে লেনদেন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অবদান রাখে। এর ফলে বাইরের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তারা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে ভূমিকা রাখে। এমতাবস্থায় এসব স্টার্টআপ যদি বিরূপভাবে আক্রান্ত হয়, তাহলে উদ্ভাবনী সক্ষমতাসহ একটি টেকসই অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।

এ অনিশ্চিত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট অর্থনীতিতে কভিড-১৯-এর প্রভাব সামাল দিতে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ৫৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষুদ্র ব্যবসার ঋণ হিসেবে এবং আরো ১৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের বেতন প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠানপ্রতি অনূর্ধ্ব ৬০ হাজার ডলার হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসাকে সহায়তার জন্য জার্মানি ৫৫ বিলিয়ন ডলার ঘোষণা করেছে এবং স্বনির্ভর ব্যক্তিদের দেউলিয়া হওয়া ঠেকাতে ১৬ হাজার ২২৫ ডলার করে নগদ সহায়তা এবং এ বছরের শেষ নাগাদ জরিমানা ছাড়াই ট্যাক্স পরিশোধের সুযোগ করে দিয়েছে। ইতালি ২৮ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বার্ষিক ২২ হাজার ডলারের ট্যাক্স ক্রেডিট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফ্রান্স দেশটির স্টার্টআপের জন্য ৫ বিলিয়ন ডলারের তারল্য সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জাপান মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে প্রাধান্য দিয়ে ১৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ অর্থায়নও গ্যারান্টি বরাদ্দ করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য আয়কর বিলম্বকরণসহ ৬৯৩ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ ঋণ সুবিধা বরাদ্দ করেছে মালয়েশিয়া।

বাংলাদেশ সরকারও এরই মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের জন্য ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যদিও এ প্যাকেজের আওতায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ভর্তুকির মাধ্যমে বিশেষ সুদ হারে ঋণ গ্রহণ করা যাবে, যা ওই ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী বিতরণ করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পত্তি আমানত এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য যথেষ্ট নগদপ্রবাহ নেই, তাদের জন্য এ নীতিমালাগুলো সহায়ক নয়। ফলে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে দেশের অধিকাংশ স্টার্টআপ কোনো সহায়তা লাভ করতে পারবে না।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড প্রাইভেট ইকুইটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ভিসিপিয়াব) থেকে আমরা সরকারের কাছে স্টার্টআপকে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষ সহায়তা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—১. অনুদান তহবিল থেকে ছয় মাসের জন্য কর্মীদের বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রদান, ২. অনুদান তহবিল থেকে ছয় মাসের জন্য স্টার্টআপের অফিস ভাড়া পরিশোধ করা, ৩. এ মহামারী চলাকালীন দূরশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদন খাতের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে স্থানীয় স্টার্টআপকে কাজ দেয়া, ৪. সরকারি কাজে ও টেন্ডারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্টার্টআপকে প্রাধান্য দেয়া, ৫. স্টার্টআপকে সর্বনিম্ন সুদহারে (২%) জামানতবিহীন চলতি মূলধন ঋণ দেয়া এবং ৬. বিকল্প বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোকে স্টার্টআপ বাংলাদেশের আইডিয়া প্রকল্প থেকে তহবিল প্রদান। অনুদান ও সহজ শর্তের ঋণের পাশাপাশি স্টার্টআপের আয় চলমান রাখতে সরকার তার নিজস্ব পণ্য ও সেবা ক্রয় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে, যা সিঙ্গাপুর করেছে। সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে স্মার্টআপের কাছ থেকে পণ্য বা সেবা নিয়েছে, সেগুলোর প্রাপ্য অর্থ প্রয়োজন হলে চুক্তি সংশোধনের মাধ্যমে দ্রুত পরিশোধ করা উচিত, যাতে স্টার্টআপগুলো তার কর্মীদের বেতন দিতে সমর্থ হয় এবং কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। লকডাউনের সময় রিমোট কাজের টুল ব্যবহার করে স্টার্টআপগুলোকেও সক্রিয় থাকতে হবে, যাতে আয়ের প্রবাহ যতটা সম্ভব ধরে রাখা যায়।

আমরা আমাদের স্থানীয়ভাবে বেড়ে ওঠা স্টার্টআপকে হারিয়ে যেতে দেব নাকি আগামীতে আমাদের অর্থনীতিকে জোরদার করতে এবং সামনের দশকগুলোতে আন্তর্জাতিক উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে দেখতে চাইব, সেটি নির্ধারণ করার এখনই সময়। বর্তমানে বাংলাদেশে এক বিলিয়ন ডলারের একটিমাত্র কোম্পানি বা ইউনিকর্ন আছে এবং ২০২৫ সাল নাগাদ কমপক্ষে পাঁচটি বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের কোম্পানি তৈরির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারলে প্রত্যক্ষভাবে ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষভাবে ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। অনতিবিলম্বে সরকারের প্রণোদনা ও সহায়তা ছাড়া গত ১২ বছরে আমাদের উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সরকার কর্তৃক স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে যে বিপুল পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তার সবই বিফলে যাবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী জাতি হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

শামীম আহসান: পেগাসাস টেক ভেঞ্চারসের জেনারেল পার্টনার, ইজেনারেশনের চেয়ারম্যান, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড প্রাইভেট ইকুইটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ভিসিপিয়াব) সভাপতি এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি।