নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দুনিয়ায় নানামুখী দুর্যোগের সূচনা হয়েছে। বিশেষ করে সাপ্লাই চেইনের নড়বড়ে অবস্থার কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা এখন হুমকির মুখে। এখন ভেঙে পড়া চেইন মেরামত অথবা নতুন করে তৈরি করাই হবে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও রাজনৈতিক সংকল্পের নতুন চ্যালেঞ্জ।
ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমার মনে হয়, কিছু দেশ বুঝতে পেরেছে ভাইরাস ও বাফার ইকোনমিক শকের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে এমনভাবে যাতে খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখা যায়। খাবার ছাড়া স্বাস্থ্য ভালো রাখার কোনো উপায় নেই। এ অবস্থান থেকে পরিত্রাণের নীতি খুব সরল কিন্তু আইসোলেশন এর কোনো অংশ হতে পারে না। দেশগুলোকে অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কোনো বাণিজ্য দেয়াল তৈরি এবং প্রয়োজনীয় কর্মীদের সীমান্ত অতিক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি করা যাবে না।
বিশ্ব খাদ্যের সাপ্লাই চেইন এরই মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভারতে কৃষকরা গরুকে স্ট্রবেরি খাওয়াচ্ছে, কারণ তারা শহরে ফল পাঠাতে পারছে না। পেরুতে টন টন সাদা কোকো ফেলে দিতে হচ্ছে, কারণ যে রেস্টুরেন্ট ও হোটেল এগুলো কিনত সেগুলো এখন বন্ধ। একই কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ফেলে দিতে হয়েছে দুধ। লস অ্যাঞ্জেলেসে পূর্ব ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার অভিবাসী শ্রমিকদের দল ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিতে ফসল কাটার পরিবর্তে আটকে পড়েছে সীমান্তে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় মৌসুমি শ্রমিকদের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা আছে। অথচ এ শ্রমিকরা ভাইরাসের কারণে আরোপ হওয়া ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় আটকে গেছে। কোনো কোনো এম্বাসি তাদের রুটিন ভিসা পরিষেবা প্রদানের প্রক্রিয়াও বন্ধ করে রেখেছে। পাশাপাশি বিদেশী কর্মীরা ভাইরাস নিয়ে আসতে পারে, এমন আশঙ্কাও আছে। যার ফলে জমিতে এখন ফসল পচে যাচ্ছে।
সৌভাগ্যবশত খাদ্যশস্য উৎপাদন এ বছর ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বিশ্বে ভুট্টার মজুদ ২০০৭ ও ২০০৮ সালের দ্বিগুণ, যখন মারাত্মক খরার ফলে গুরুত্বপূর্ণ রফতানিকারক দেশগুলো খাদ্য মজুদ করেছিল এবং বৈশ্বিক খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছিল।
তবে এ ফলন কোনো সাহায্য করবে না, যদি দেশগুলো উৎপাদিত খাদ্য যেখানে উত্পন্ন হচ্ছে সেখান থেকে যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেখানে সরবরাহ না করে। এদিকে খাদ্যশস্য, তাজা ফল ও সবজি বন্দরে পৌঁছাচ্ছে দেরিতে এবং সেগুলো খালাসও করতে পারছে না শ্রমিকরা। যা এক কথায় ধ্বংসাত্মক। কারণ এসব খাবার পাইকারি বাজারে সময়মতো পৌঁছতে না পেরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে গত মার্চের তুলনায় গমের দাম ৮ শতাংশ এবং চালের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ। এর মাঝে আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটার ফলেও প্রচুর খাবার নষ্ট হচ্ছে এবং খাবারের গুণগত মানও থাকছে না। অবশ্য কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের আগেও বিশ্বব্যাপী খাদ্যের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া চ্যালেঞ্জিং ছিল। যেখানে অনেক দেশ ও অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপায়ে মহমারীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
চেইন রি-অ্যাকশন
এসবের ফলে একটি বিশৃঙ্খল সমধর্মী প্রতিক্রিয়ার ধারা (চেইন রি-অ্যাকশন) সৃষ্টি হয়েছে। এ মাসের শুরুতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গম রফতানিকারক দেশ রাশিয়া তিন মাসের জন্য গম রফতানি সীমিত করেছে। মূলত স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদ রাখার জন্য তাদের এ পদক্ষেপ। যদিও এর দ্বারা সীমিত ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এ পদক্ষেপ অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা। এটা ছিল এমন সিদ্ধান্ত যা অনেকগুলো ঘটনার সংঘর্ষের ফলাফল। যার মাঝে তেলের দামের
হ্রাসসহ এটি ডলারের বিপরীতে রুবলের দামকে দুর্বল করেছে। ফলে গমের স্থানীয় দামও বেড়ে যায়। এর আগে মার্চ মাসে একই পথে হেঁটেছিল ভিয়েতনাম। যে কারণে চালের দামও বেড়ে গিয়েছিল।
এই মহামারী বিভাজনের কিছু যুক্তিকে উৎসাহিত করেছে, যেমন উন্মুক্ত সীমানা ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে, শরণার্থী, অভিবাসীদের দূরে রাখতে হবে এবং আউটসোর্সিংয়ের ইতি টানতে হবে। তবে এ রাজনৈতিক অবস্থান ভুলিয়ে দিচ্ছে যে একটি দেশ অন্য দেশের ওপর খাদ্যশস্য, কীটনাশক, সার, পশু খাদ্য, কর্মী ও দক্ষতার ওপর কতটা নির্ভরশীল।
এর পরিবর্তে তাদের উচিত মুদ্রা অবমূল্যায়নের কারণে স্থানীয় মূল্যবৃদ্ধির ক্ষতিপূরণে শুল্ক ও কর বাতিলে একমত হওয়া। পাশাপাশি তাদের উচিত বন্দর ও খামারের শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মী হিসেবে মনোনীত করা। সে সঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাতায়াতের ব্যবস্থা করা এবং কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা।
সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব। এই মাসে ২৫টি লাতিন আমেরিকান এবং ক্যারিবিয়ান দেশ একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। যেখানে তারা এ অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত রাখার ব্যাপারে একমত হয়েছে। এ ধরনের রাজনৈতিক ঘোষণা অগ্রগতির পথকে উন্মোচিত করবে।
ধাক্কা সামলানো
এফএওতে আমরা মনোযোগ দিচ্ছি প্রাপ্ত প্রমাণ ও অতীতের সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে যেসব খাদ্যদ্রব্য মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে তার ওপর ভাইরাসের প্রভাব হ্রাস করা। যেখানে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও অস্থিরতা সম্পর্কে তথ্য দেয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইবোলার প্রাদুর্ভাবের সময় কীভাবে খাদ্য ও পুষ্টিপ্রাপ্তি প্রভাবিত হয়েছিল তাও। উপাত্ত ব্যবহার করে আমরা বাণিজ্য নিরীক্ষা করি এবং লজিস্টিক্যাল ইস্যুসম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করি। সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করা হয়েছে তা নির্ধারণ করি এবং অনিশ্চয়তা কমাতে বাজারকে সংকেত দিয়ে থাকি।
উদাহরণস্বরূপ আমরা জানি শিপিংয়ে প্রধানত দেরি হয় কার্গো খালাসের সময়। যা কিনা শ্রমিকদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে একদিনের পরিবর্তে তিনদিন সময় নিয়ে থাকে। এই দেরি রফতানিকারকদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল। কিন্তু বিনিময় মূূল্য বাড়িয়ে তারা এটা পুষিয়ে নেয়। পাশাপাশি
মহামারী কীভাবে খাদ্য ও কৃষিকে প্রভাবিত করেছে সে সম্পর্কে আমরা একাধিক ভাষায় সংবাদ ট্র্যাক করে থাকি। এটা দেশগুলোকে নীতিমালা তৈরিতে সাহায্য করে। আমরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে তাদের এগ্রো-ইকোলজিক্যাল অবস্থা বিশ্লেষণ করে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানোর ব্যাপারে কাজ করি। পাশাপাশি কখন ও কোথায় চারা রোপণ করতে হবে এবং শস্য কাটার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে থাকি। মহামারী থেকে যে বিষয়টি আমাদের শিখতে হবে তা হলো পৃথিবীকে অবশ্যই ভূমি ও পানির ব্যবহার সঠিকভাবে করতে হবে। যেন প্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর খাদ্য আরো স্থিতিশীলভাবে উৎপাদন করা যায়।
নেচার ম্যাগাজিন





