মধ্য এপ্রিলে যখন সাত বছর বয়সী জ্যাক মাহলারের মাঝে কভিড-১৯-এর লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে, তখন তার মা কিন্ডে মাহলার শান্ত ছিলেন। তখন তিনি ধাঁধাগুলো মেলানোর চেষ্টা করেন এবং সমস্যাকে শান্তভাবে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, বাচ্চাদের অবস্থা ভালো দেখাচ্ছিল। তাই আমার ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না।

জ্যাকের লক্ষণগুলো মে মাসের শুরুতে তীব্র হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সে মাসের মাঝামাঝি চারদিন জ্বর ছাড়া কাটায়, তখন মাহলার মনে করেন এটা মনে হয় শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এরপর তার জ্বর আবার ফিরে এল। এমনকি অসুস্থ হওয়ার সাড়ে চার মাস পরও জ্যাকের কভিড-১৯-এর উপসর্গগুলো দেখা যাচ্ছিল: অবসন্নতা, হালকা জ্বর, গলা ব্যথা, কাশি, নিদ্রাহীনতাসহ আরো অনেক কিছু আসা-যাওয়ার মাঝে ছিল।

মাহলার বলেন, আমি ভাবতেই পারছি না যে আমাদের শরীর চার মাস পরও সেরে ওঠার জন্য চেষ্টা করছে। একইভাবে মাহলারের কভিড-১৯-এর উপসর্গ দেখা যেতে শুরু করে ছেলের পাঁচদিন আগে থেকে এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সে সময় এ রকম কোনো গল্প শুনিনি। সেটা ছিল এপ্রিল মাস। ব্যাপারটা ছিল আপনি দুই সপ্তাহ আক্রান্ত থাকবেন এবং তারপর ভালো বোধ করতে শুরু করবেন।

মাহলার বলেন, তার নিজের টেস্টও নেগেটিভ এসেছিল। কিন্তু তার ডাক্তার বলেছিলেন, এটা সম্ভবত ফলস নেগেটিভ হতে পারে। শিশু বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করেন যে জ্যাকের এমন কোনো ভাইরাল রোগ হয়েছে, যা কিনা কভিড-১৯ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। প্রতি দুতিনদিন পর ডাক্তার খোঁজ নিতে থাকেন।

কিন্তু সেরে ওঠা পিছিয়ে যেতে থাকে এবং লক্ষণগুলো অব্যাহত থাকে। তিনি বলেন, তাপমাত্রা নেয়া বন্ধ করে দিলাম। বললাম, জ্যাক তোমার সঙ্গে কিছুই হয়নি, তোমার মায়ের কিছুই হয়নি।

এমন নয় যে সন্দেহভাজন বা নিশ্চিত কভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার পর মাহলার একমাত্র মা, যিনি দীর্ঘমেয়াদি উপসর্গের কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে নিউজ মিডিয়া এবং গবেষকরা কভিড-১৯-এর স্ব-বর্ণিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষণগুলোর ওপর মনোযোগ দিয়েছেন, যেখানে অনেকের সংক্রমিত হওয়ার কয়েক মাস পরও উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অনেক সময় নিজের ডাক্তার দ্বারা খারিজ হয়ে বা সন্দেহের মুখে পড়ে লোকেরা অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি উপসর্গধারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সে সঙ্গে তারা কিছু গবেষণার বিষয়বস্তুতেও পরিণত হয়েছে, যেখানে নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালও এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।

দীর্ঘমেয়াদি ভুক্তভোগী হিসেবে বেশি মনোযোগ পাচ্ছেন বয়স্করা, যাদের কভিড-১৯-এর অভিজ্ঞতা শিশুদের চেয়ে অধিকতর খারাপ। কিন্তু সমর্থন দানকারী গ্রুপগুলো এখন সেই বাবা-মায়েদের ওপরও দৃষ্টি দিচ্ছেন যারা বলছেন তাদের বাচ্চারাও ভালো হচ্ছে না। জুলাই থেকে আনডার্ক ২৮টি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, যারা বলছে তাদের বাচ্চারা মারাত্মকভাবে অসুস্থ নয় কিন্তু তারা এক ধরনের অনিশ্চিত অবস্থার মাঝে আছে। এই শিশুগুলোর বয়স নয় মাস থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত।

অনেক বাবা-মা বলছেন যে তাদের ডাক্তাররা সময়ের সঙ্গে কভিড-১৯-এর লক্ষণগুলো নিয়ে সন্দেহবাতিক হয়ে উঠেছেন।

কিন্তু কিছু গবেষক ও ডাক্তার, বৈজ্ঞানিক অনিশ্চয়তাকে মেনে নিয়েও কভিড-১৯-এর আশপাশে ছিলেন এবং উদ্বিগ্ন ছিলেন। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সিয়েন ও’লেরি সেরে ওঠেনি এমন বাচ্চাদের কথা শুনেছেন। তিনি বলেন, এটি বাচ্চাদের মধ্যে ঘটতে পারে এমন বাস্তব ঘটনা বলে মনে হয়।

কিছু কিছু গবেষণা চলছে মারাত্মক প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বাচ্চাদের নিয়ে। ও’লেরি বলেছেন, তিনি জানেন না কেউ দীর্ঘমেয়াদে বাসায় থেকে কম মারাত্মক উপসর্গ নিয়ে ভুগছে এমন বাচ্চাদের নিয়ে কেউ গবেষণা করছে কিনা। যদি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এদিকটাকে নজর দেয়া হয়, তবে সেটা দারুণ একটা ব্যাপার হবে।

শিশুরা সাধারণত কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে মৃদু উপসর্গের অভিজ্ঞতা লাভ করে। তাদের জটিলতা, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যু বয়স্কদের তুলনায় একেবারেই দুর্লভ। এ মৃদু উপসর্গকে বিবেচনায় নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প শিশুদের নিয়ে ঝুঁকি নিয়েছেন এবং স্কুল খুলে দেয়ার মতো বিতর্ককেও সামনে এনেছেন।

এখনো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন প্রমাণ আছে যে শিশুরা যাদের বয়স ১০ বা তার চেয়ে বেশি তারা সার্স-কোভ-২-এর সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম এবং সংক্রমণ ছড়ানোর হারও বয়স্কদের মতোই। এছাড়া সম্প্রতি অন্য গবেষণা বলছে, শিশুরা তাদের নাকে ও গলায় উচ্চমাত্রায় ভাইরাস বহন করতে পারে। কোনো কোনো বিশেষ দুর্লভ ক্ষেত্রে শিশুরা কাওয়াসাকি রোগের মতো অভিজ্ঞতাও লাভ করে, এ রোগ যাতে রক্তনালিতে প্রদাহের সৃষ্টি করে। যাকে সিডিসির মতো প্রতিষ্ঠান কভিড-১৯-এর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। আর ডাটা অনুসারে এ গ্রীষ্মে বাচ্চাদের সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যুর হার পূর্ণবয়স্ক মানুষের তুলনায় বেশ দ্রুতগতিতে বেড়েছে।

মেডিকেল নৃবিজ্ঞানী জানেল্লে মেনার্ড বলেন, কভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষণগুলো নিয়ে গবেষণা প্রাথমিক অবস্থায় আছে, যা মূলত বয়স্কদের ওপরই অধিক মনোযোগ দিচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের মাঝে সংক্রমণের হার ট্র্যাক করা নিয়ে একটি উদ্যোগে সহায়তা করছেন।

তিনি বলেন, যখন কভিড-১৯ শুরু হয় তখন বিষয়টি নিয়ে আমার মাথায় ঘুরছিল যে আমরা এখনো জানি না যে বাচ্চাদের ওপর এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবটা আসলে কেমন হবে, যাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এখনো বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। মেনার্ড যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন যে ভাইরাস শিশুদের জন্য ততটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়, এ ধারণাটি সঠিক নয়। তিনি আরো বলেন, শিশুদের কভিড-১৯-এর গতিপ্রকৃতি নিয়ে আমরা আসলে কিছুই জানি না। আমাদের আরো ভালো ডাটার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কারণ এটা অনেকটা কোনো ধরনের সরঞ্জাম ছাড়াই রাতের বেলায় বিমান ওড়ানোর মতো ব্যাপার। যদি আপনার কাছে পর্যবেক্ষণপ্রসূত প্রকৃত ডাটা না থাকে তাহলে আপনি কীভাবে সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন?

এর মাঝে সিডিসি বলেছে যে ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মাঝে ২০ শতাংশ লোকের কভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষণ রয়েছে। কিন্তু বাচ্চাদের নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ডাটা পাওয়া যায়নি। তাই শিশুদের কম ঝুঁকিপূর্ণ ধরে না নিয়ে তাদের ওপর কভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। কেউ কেউ অবশ্য একে ভাইরাসের চেয়ে ইমিউন প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে বেশি যুক্ত করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। যদিও এ বিষয়ে গবেষক ডেনিসে কাপলান বলেন, কী করতে হবে কেউ হয়তো এখনো তা জানে না।

স্মিথসোনিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত