কভিড-১৯ বিশ্বের প্রায় সব দেশকেই আক্রান্ত করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে, ২১৬টি দেশ ও অঞ্চলে আঘাত হেনেছে করোনা। জাতিসংঘের স্বীকৃত ২৫১ দেশের মাঝে যা কিনা ৮৫ শতাংশের বেশি। যদিও নভেল করোনাভাইরাস সামলানোর ক্ষেত্রে একেক দেশের সরকার একেকভাবে মোকাবেলা করেছে। এমনকি রোগের ডাটা প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রত্যেক দেশের কৌশল ছিল আলাদা আলাদা।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশের দিক থেকে সরকারগুলোর বিশেষ অবস্থান নেয়ার পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে ‘বায়ো-পাওয়ার’
কৌশল।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো আবিষ্কার করেছেন বায়ো-পাওয়ারের ধারণা। ১৯৭৭-৭৮ সালে এক লেকচারের মাধ্যমে তিনি তার এ ধারণাটি উত্থাপন করেন। তার মতে, বায়ো-পাওয়ার হচ্ছে এমন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মানবপ্রজাতির মৌলিক জৈবিক বৈশিষ্ট্য পরিণত হয় রাজনৈতিক কৌশলের উদ্দেশ্য ও ক্ষমতার সাধারণ কৌশলে।
ফুকো বায়ো-পাওয়ারের উদাহরণ হিসেবে সামনে আনে আঠোরো শতকের শেষ দিকে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের যে ঘটনা তাকে। সম্ভাব্যতার নিরিখে জনস্বাস্থ্যের ব্যানারের নিচে জনসংখ্যাকে পরিচালনার সেটিই ছিল প্রথম দিকের একটি প্রচেষ্টা। এদিকে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন এখনো তৈরি হয়নি। এক্ষেত্রে বায়ো-পাওয়ারের ধারণা আমাদের বুঝতে সহায়তা করতে পারে যে কীভাবে সরকারগুলো চলমান মহামারী মোকাবেলা করছে।
ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা এবং এর থেকে সেরে ওঠার যে সুযোগ, তা আমাদের সরকারগুলো কর্তৃক প্রকাশিত প্রাসঙ্গিক সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিসংখ্যানগুলোর দ্বারা আকারপ্রাপ্ত হয়। এই পরিসংখ্যানগুলো কভিড-১৯ নিয়ে আমাদের যে প্রতিক্রিয়া তাতে রসদ জোগায়। যেখানে যুক্ত থাকে ভয় ও অবহেলার বিষয়ও।
এখন কভিড-১৯ মোকাবেলা এবং মহামারী থেকে বাঁচতে প্রকৃত ব্যবস্থা গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে সরকারের দেয়া তথ্যকে অবশ্যই সম্পূর্ণ, বৈধ ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই তা ঘটেনি।
যখন কিছু কিছু দেশের মহামারী মোকাবেলার প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে দেখার ক্ষেত্রে বায়ো-পলিটিক্যাল ফ্যাক্টরকে অবশ্যই বিবেচনায় নেয়া উচিত। এখানে সরকারগুলো করোনাভাইরাস নিয়ে কীভাবে ডাটা সংগ্রহ করছে এবং তা প্রকাশ করছে তাও অন্তর্ভুক্ত আছে। বিশেষ তিনটি কীভাবে এটি করেছে তাতে নজর দেয়া যাক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-১৯ সংক্রান্ত তথ্য প্রচারিত হয়েছে সরকারি এজেন্সি, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে। প্রকাশিত পরিসংখ্যানগুলোর চূড়ান্ত উৎস ছিল সরকারের বিভিন্ন স্তর। কিন্তু সেগুলো কতটা সঠিক?
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রেই কভিড-১৯-এ আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেখানে একে ব্যাখ্যা করা যায় মহামারীতে দেরিতে সাড়া দেয়া এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অভাব।
মহামারীর কারণে সৃষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট এ বছরের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে। তার প্রশাসনের ওপর থেকে মনোযোগ সরানোর কৌশল হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কভিড-১৯-এর জন্য সরাসরি দায় ছাপিয়েছেন চীনের ওপর। এদিকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে ক্রমবর্ধমান সংখ্যা, তা ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। যা বায়ো-পাওয়ারের দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রাম্পকে তার বার্তা বিক্রি করার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে।
রাশিয়া : কভিড-১৯ সংক্রান্ত তথ্যের একমাত্র উৎস হওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য ডাটার উৎপাদন ও প্রচারের ক্ষেত্রে একচেটিয়া ক্ষমতাকে ধরে রাখতে। যারা সরকারি লাইসেন্স ছাড়া কভিড-১৯-এর পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছিল, তাদের ফৌজদারি অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছিল।
ককেসাসের অতীতের বিদ্রোহী অঞ্চল চেচনিয়ার একদল ডাক্তার চেষ্টা করেছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে প্রস্তুতির অভাব থাকার অভিযোগ সামনে আনার। তাদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিকভাবে প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয় এবং বাধ্য করা হয় জনসমক্ষে ক্ষমা চাওয়ার জন্য।
সরকারি তথ্যমতে, কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থান অনেক নিচে। যেখানে মৃত্যুহার কিনা ১ শতাংশেরও কম। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যা কিনা ৬ শতাংশ এবং ইতালি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে যেটি ১৪-১৫ শতাংশ। হয় রাশিয়ানদের ইমিউনিটি সিস্টেম আশ্চর্যজনকভাবে শক্তিশালী অথবা সরকারের মৃতের সংখ্যা গণনায় কোথাও মারাত্মক ভুল রয়েছে।
কভিড-১৯-এ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করার আনুষ্ঠানিক সংখ্যায় যে গড়মিল, তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাশিয়াতেও মহামারী রাজনৈতিক এজেন্ডায় হস্তক্ষেপ করেছে। সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষমতাকাল বাড়ানোর যে আয়োজন তা নির্ধারিত ছিল ২২ এপ্রিল, যা কিনা পরে ১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।
পুতিন চেষ্টা করছেন পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর। তিনি কভিড-১৯-এ আক্রান্তের যে সংখ্যা তার সঠিক হিসাব দিচ্ছেন না এবং ধারাবাহিকভাবে সম্ভাব্য সবকিছু করার চেষ্টা করছেন প্রকৃত সংবাদ প্রকাশকে আটকাতে। যদি তিনি তাতে সফল হন, তবে পরে দাবি করতে পারেন যে মহামারী মোকাবেলায় তার সাফল্য অন্য বিশ্বনেতাদের চেয়ে বেশি।
কানাডা: কানাডার সংখ্যা প্রথম দেখায় বিতর্কিত মনে হবে না। দেশটির বিস্ময়করভাবে কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বেশি নয়, মৃত্যুও খুব বেশি নয়। যদিও তার মানে এ নয় যে তারা কোন কোন ক্ষেত্রে বায়ো-পাওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করেনি।
প্রদেশ ও অঞ্চলগুলোয় কভিড-১৯-এর পরিসংখ্যান তুলনা করার জন্য কানাডার সরকার জটিল উপায় বেছে নিয়েছে। ফেডারেল সরকারের ওয়েবসাইটে যা কিনা কভিড-১৯-এর বরাদ্দ, কেবল সামষ্টিক ডাটা প্রকাশ করছে। সেখানে মৃত্যুর কোনো পরিসংখ্যান দেয়া নেই। ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিটি প্রদেশের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন।
যেহেতু এই ১৩টি পৃথক প্রদেশের ফলাফল প্রকাশের ফরম্যাট ভিন্ন, তাই ওয়েবসাইটগুলোর মাঝে একটা নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
নয়তো এখানে তথ্য পাওয়ার যে অনুরোধ তা কোনো কাজে আসবে না, ফেডারেল ও প্রাদেশিক স্তরে তথ্য গ্রহণসংক্রান্ত আইন থাকা সত্ত্বেও। সাধারণ তথ্য গ্রহণের অনুরোধের পর তা পেতে এক মাস সময় লাগে। কিন্তু এখন তা সরকারের বিবেচনাধীন বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
স্ক্রলইন





