আল্লাহ মালিক কাজেমী স্যার এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেখে গেছেন তার অপরিসীম অবদানের স্বাক্ষর। খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই একাধারে একাধিক বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারেন। এ রকম একজন সার্থক কর্মকর্তা ছিলেন তিনি।

কাজেমী স্যার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার মেধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি যেন প্রকৃতি থেকেই মেধা নিয়ে জন্মেছিলেন। এত বড় মেধাসম্পন্ন মানুষ হয়েও তিনি ছিলেন নিরহংকারী, কিন্তু দৃঢ়চেতা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজে কখনো কখনো অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু কোনো অবস্থায়ই কাজেমী স্যারকে উত্তেজিত কিংবা উদ্বিগ্ন হতে দেখিনি। সুস্থিরভাবে সব সমস্যার সমাধান করেছেন।

আমি যুগ্ম পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগে কর্মরত ছিলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কার্যাদি কাজেমী সাহেবের তত্ত্বাবধানে সম্পাদিত হতো। তিনি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে ওই বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ওই সময় প্রবাসী বাংলাদেশীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রাপ্রাপ্তির ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়। তখন যুক্তরাজ্য প্রবাসী এক বাংলাদেশী লন্ডনে একটি এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেন। উদ্দেশ্য, সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠানো। এ আবেদন নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয়টি স্থগিত হয়ে যায়। এর আগে কোনো নজির না থাকায় এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

পরবর্তী সময়ে বিষয়টি কাজেমী স্যারের গোচরে আনা হলে তিনি এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন এবং লাইসেন্স দেয়ার জন্য প্রস্তাব উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। দ্রুতগতিতে তা-ই হলো। বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলা ও পরিচালনা করার অনুমোদন দেয়া হলো। এ সংক্রান্ত নীতি-নিয়ামাবলি প্রণয়ন করা হলো।

কাজেমী স্যারের এ বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স দ্রুত ও স্বল্প খরচে দেশে প্রেরণ ও প্রাপ্তির নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো। ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে আনীত রেমিট্যান্স যোগ হওয়ায় সহজেই দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসা শুরু হলো, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভকে স্ফীত করে। কাজেমী স্যারের এরূপ বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের কারণে এটি সম্ভব হয়েছিল। তার এ অবদান অপরিসীম।

এ ধরনের আরো অসংখ্য অবদান তার চাকরিকালে এবং অবসর-উত্তরকালে বাংলাদেশ ব্যাংকে তিনি রেখে গেছেন। যেগুলোর সুফল বাংলাদেশের গোটা অর্থনীতিতে দৃশ্যমান। বাংলাদেশ ব্যাংকে এবং দেশের আর্থিক খাতে এ-যাবৎ সংঘটিত সংস্কারগুলোর প্রতিটিতে কাজেমী স্যারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মেধাভিত্তিক অংশগ্রহণ ও অবদান রয়েছে।

একটি ব্যক্তিগত বিষয়: ২০১০ সালে আমি অফিসে কর্মরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি হই। স্যার নিয়মিত আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন। একদিন কাজেমী স্যার আমাকে দেখতে এলেন শমরিতা হাসপাতালে। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম। কপালে হাতের স্পর্শ পেয়ে চোখ খুলে তাকে আমার মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অতিশয় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। তার এ আন্তরিকতা আমার মনের ওপর এক অপার ভালো লাগার পরশ সৃষ্টি করে। স্যার আনুমানিক মিনিট ২০ আমার কেবিনে ছিলেন। ভরসা দিয়েছেন, দোয়া করেছেন। সে ক্ষণটি আজও আমার কাছে অবিস্মরণীয়।

কাজেমী স্যারের এরূপ অগণিত অবদান এবং তার মেধার ব্যাপ্তি ও অন্যান্য গুণাবলির বর্ণনা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তার কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশ ব্যাংক ধারণ করবে এবং অমলিন থাকবে বহু কালব্যাপী। তার প্রতি থাকল অসীম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

 

ড. আবুল কালাম আজাদ: নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক