১৯৯৩ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আমি বাংলাদেশ ব্যাংকে কাজ করেছি। যখন ফরেন ট্রেনিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছি তখন সিলেকশন কমিটির প্রধান ছিলেন কাজেমী স্যার। প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের গভীরতার কারণে অনেকেই স্যারের মুখোমুখি হতে সাহস করতেন না। কিন্তু আমি কমিটির সভায় দেখেছি এ সাদামাটা মানুষটা বাহুল্য কথা পছন্দ করতেন না। টু দ্য পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করতে পারলে সভা খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যেত এবং তিনি ত্বরিত সিদ্ধান্ত দিয়ে দিতেন। তার পেশাদারী সিদ্ধান্তের ওপর কমিটির অন্য কেউ দ্বিমত পোষণ করতেন না।

একবার তার রুমে একটা কাজে গিয়েছি। গিয়ে দেখি রুমে তার ব্যক্তিগত সহকারী শ্রুতলিপি লিখছেন। আর তিনি রুমে পায়চারি করে যাচ্ছেন। লেখাটি ছিল মনিটারি পলিসির ওপর। জ্ঞানের কত গভীরতা থাকলে এভাবে সৃজনশীলভাবে সূক্ষ্ম জিনিসের ওপর লেখা যায়।

স্যার অকারণে কারো ওপর কখনো রাগ করতেন না। অপ্রয়োজনে কাউকে রুমে ডাকতেন না। পুরো ফাইল দেখে যুক্তিযুক্ত মনে হলে অনেক কঠিন বিষয়ের নীতিগত অনুমোদন দিয়ে দিতেন।

কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টে যোগদানের পর বার্ষিক নোট ছাপানোর হিসাবায়নের একটি নীতিমালা চোখে পড়ে। নীতিমালাটি কাজেমী স্যারের অনুমোদিত। কিন্তু আমার মনে হয়, নীতিমালাটি পরিমার্জনের প্রয়োজন। কেউ সাহস করছে না। আমি জিএম স্যারের সম্মতি নিয়ে আমার যুক্তি দিয়ে নীতিমালা সংশোধন ও পরিমার্জনকল্পে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করি। আর দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করি, কখন স্যার ডাকবেন। আমাকে ব্যাখ্যা করতে হবে। কিন্তু অবাক ব্যাপার, স্যার ডাকলেন না। কিন্তু প্রস্তাব ঠিকই অনুমোদিত হয়ে গিয়েছে। তার ঔদার্য এতটাই ছিল যে নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে আরেকজনকে তার মতপ্রকাশের সুযোগ দিতেন।

২০০৪ সালে আমাকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সুপারভিশনের ওপর প্রশিক্ষণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। আমি তখন সেক্রেটারিজ ডিপার্টমেন্টে কর্মরত। স্যার ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগে বদলি নিশ্চিত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠান। স্যারের চিন্তা ছিল কর্মস্থলের কারণে যেন আমার প্রশিক্ষণের প্রস্তাব নাকচ না হয়। এতটাই ছিল স্যারের মহানুভবতা।

 

মিঞা কামরুল হাসান চৌধুরী: উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড