প্রাগ্রসর ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় গত ৩১ মার্চ ‘নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক
বণিক বার্তা
বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন শেষ হলো। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের গর্ব করার মতো যেমন নানা অর্জন রয়েছে, তেমনি এর বিপরীত চিত্রও দৃশ্যমান। এ সময়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও মাথাপিছু আয় বেড়েছে, ঠিক বিপরীতে বৈষম্য ও নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনাও বেড়েছে। গৃহ ও গৃহের বাইরে নারী নির্যাতন ও নিপীড়নের ব্যাপ্তি আরো বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কাজের সন্ধানে নারীদের বহির্গমন বেড়েছে। পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরত আসার ঘটনাও বেড়েছে। দেশের ভেতরে এবং বাইরে থেকে ফেরত আসা নির্যাতিত নারীদের আইনি সহায়তা ও আশ্রয় দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। সরকারি ও বেসরকারি কিছু আশ্রয় ও সহায়তা কেন্দ্র গড়ে উঠলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এমনকি তহবিলের সংকট ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে এর অধিকাংশই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আন্তর্জাতিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতাকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়েছে। কেননা নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু তাদের অধিকারকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং মানবতা, অর্থনীতি, সমাজসহ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে বাধাগ্রস্ত করে। নারী নির্যাতন শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই এর ব্যাপ্তি বেড়েছে। তবে অনুন্নত, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এর মাত্রা অনেক বেশি। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও নির্যাতনের শিকার নারীদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়া শুধু মেয়েদের কল্যাণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য জরুরি।
ফওজিয়া খোন্দকার
নির্বাহী পরিচালক
(অনারারি) প্রাগ্রসর
প্রাগ্রসরের পক্ষ থেকে সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। আজকের এই বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য আমরা প্রধান অতিথিসহ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রাগ্রসর একটি নারীবাদী, বৈষম্যবিরোধী, অলাভজনক সংস্থা। প্রাগ্রসর ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সম্প্রদায়কে তাদের দর্শন ও অনুশীলনে আরো লিঙ্গ সংবেদনশীল হতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেয়।
নারীর জন্য পুরো পৃথিবীই যুদ্ধক্ষেত্র। এটি শুধু স্লোগান নয়। প্রায় সব নারীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক কঠিন বাস্তবতা। কখনো ঘরে, কখনো কর্মক্ষেত্রে, কখনোবা পথে আমাদের নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ঘরই তার প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় বেশির ভাগ সময় পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়, নারীর নিজস্ব কোনো ঘর নেই। সম্পদ নেই। কোনো নারী যখন নির্যাতনের শিকার হন তখন তিনি একটা নিরাপদ আশ্রয় চান। কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই নারীর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। নির্যাতনের শিকার নারীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এটি একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে আমরা দেখতে পেয়েছি। তারা অনেকেই আশ্রয় চান। অথচ বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল, সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে হাতেগোনা কয়েকটি। সেগুলোয়ও অনেক ক্ষেত্রে সহজ প্রক্রিয়ায় যাওয়া যায় না। নানা আইনি জটিলতাও রয়েছে। আবার এগুলো পরিচালনার জন্য যথেষ্ট বাজেটও নেই। বেশকিছু বেসরকারিভাবে পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও আমরা মনে করি, কেবল আশ্রয়কেন্দ্রই তাদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারবে। অবশ্যই তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যেটি দরকার, অনেক সময় সেটিও তারা পান না। আমার মনে হয়, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আশ্রয়কেন্দ্র আছে কিন্তু সেই সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। বিশেষ করে আমাদের যারা করপোরেট সেক্টরে আছেন, উদ্যোক্তা আছেন, তারাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ জায়গাগুলোয় সাহায্য করতে পারেন। হাসপাতাল, পুলিশ, সমাজসেবা ও মহিলা অধিদপ্তর, মিডিয়া ও ডেভেলপমেন্ট সেক্টর ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে নারীর জন্য সার্বিকভাবে একটা নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হবে।
প্রাগ্রসর পরিবার পরবর্তী সময়ে জেন্ডার সহিংসতার শিকার নারীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল নিয়ে আরো অ্যাডভোকেসি ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ নেবে।
সিফাত ই নূর খানম
আইনজীবী, ব্লাস্ট
নির্যাতনের শিকার নারীর জন্য দেশে বর্তমানে ছয়টি সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এগুলো সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন। এছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম নামে একটি কর্মসূচি আছে। এ কর্মসূচির আওতায় ১২টি ওসিসি এবং বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে সাতটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে নির্যাতিত নারীকে সেবা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, যেমন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, আহসানিয়া মিশন, অপরাজেয় বাংলাদেশ, মুক্তি, তরঙ্গ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন, হোপ ফর ডেস্টিটিউট উইমেন অ্যান্ড সিলড্রেন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে আশ্রয়কেন্দ্র সেবা রয়েছে। এসব সেন্টারে নির্যাতিত নারীকে যেসব সেবা দেয়া হয়, তার মধ্যে রয়েছে সাময়িক আশ্রয়, চিকিৎসা, মনোসামাজিক কাউন্সিল, পুনর্বাসন, পুলিশি ও আইনগত সহায়তা, ফরেনসিক পরীক্ষার সুযোগ প্রদান, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা। তবে সেখানে সেবা গ্রহণে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। দেশে নির্যাতিত নারীদের প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা খুবই কম। বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর একটি বড় সমস্যা অর্থের জোগান। অর্থাভাবে অনেক বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হয়েছে। অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার নারী চাইলেই আশ্রয়কেন্দ্রের সেবা নিতে পারছেন না। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাময়িক আশ্রয়সেবা দেয়া হয়। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয় সীমিত পরিসরে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাটিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেই। জরুরি অবস্থায় সহজে সেবাপ্রাপ্তি নিয়েও আমাদের কিছু প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
শিপা হাফিজা
সাবেক নির্বাহী পরিচালক
আইন ও সালিশ কেন্দ্র
নির্যাতিত নারীর সহযোগিতার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা শুধু সীমিত নয়, আমি বলব অসম্ভব রকম কম। এর সংখ্যা বাড়াতেই হবে। কেননা অনেক বেশিসংখ্যক নারীরই এ ধরনের আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন জরিপের তথ্য বলছে, দিন দিন নারী নির্যাতন বাড়ছে। তাই আশ্রয়কেন্দ্র বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যেন যেকোনো নির্যাতিতা জিডি ছাড়া সরাসরি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেন, আশ্রয় নিতে পারেন। সরকারি পর্যায়ে আশ্রয় দেয়ার শূন্যতা আসলে অনেক দুঃখজনক। এ বিষয় নিয়ে অনেক বলেছি। একসময় শুধু ঢাকায় একটি আশ্রয়কেন্দ্র ছিল। এখন সাতটি হয়েছে। এটা তো নগণ্য সংখ্যা। সত্যিকার অর্থে মানুষকে সেবাদানের কোনো সুযোগই নেই। আমরা জানি, সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো শুধু বিভাগীয় শহরে আছে। আমাদের বেসরকারি সংস্থার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোও ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে। তাহলে সাধারণ নারীরা যাবেন কোথায়? গ্রাম থেকে একটা মেয়ে বা নারী না হয় উপজেলা সদর পর্যন্ত গেলেন। কিন্তু তিনি তো কখনো শহর পর্যন্ত আসতে পারবেন না তার বিপদ-আপদের সময়ে। কভিডের সময়ে অনেকে আমাকে ফোন করেছিলেন। ভেবেছিলেন, আমরা সাহায্য করতে পারব। আমি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। সে সময় প্রায় সব সংস্থা বন্ধ ছিল। এমনকি আমাদের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারও কার্যকরী ছিল না। আবার কোনো মেয়ে একবার থানায় গেলে দ্বিতীয়বার আর যাওয়ার মনমানসিকতা থাকে না। কারণ সেখানে এত নিয়ম-কানুন, কঠোরতা এবং আরো অন্য ব্যাপার তো আছেই। বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় পুনর্বাসনের কাজটি অনেক কম হয়। পুনর্বাসনের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।
প্রফেসর ইশরাত শামীম
প্রেসিডেন্ট
সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজ, সিডব্লিউসিএস
আমরা ২০১০ সালে একটা আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছি। সেটি মূলত পাচারের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য। এটা সাতক্ষীরায় অবস্থিত। এ আশ্রয়কেন্দ্র চালাতে গিয়ে অভিজ্ঞতা হলো, পাচারের শিকার নারীরা ফেরত আসার পর তাদের অনেক ধরনের সেবা প্রয়োজন হয়। তাদের মেডিকেল হিস্ট্রি জানা লাগে। তাদের মনোসামাজিক সেবা দিতে হয়। পরিবার তাদের গ্রহণ করতে চায় না। কাউন্সেলিং তাদেরও লাগে, পরিবারেরও লাগে। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাদের আমরা সাময়িক আশ্রয় দিই। এরপর আমরা তাদের আয়বর্ধক কাজে যুক্ত করি। পরে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করি। আরো কিছু সারভাইভার, যাদের ১৮ বছরের কাছাকাছি বয়স এবং অবিবাহিত, তাদের আমরা আশুলিয়ার পোশাক কারখানায় চাকরি দিয়েছি। পোশাক কারখানার সঙ্গে আমাদের এমওইউ আছে। আমরা এ রকম তিনশর বেশি মেয়েকে চাকরি দিয়েছি। নির্যাতিত নারীদের আমরা বিভিন্নভাবে সেবা দিয়ে আসছি। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি। সেলাইয়ের কাজ শেখানোর পাশাপাশি তাদের হাঁস পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা করেছি। শিক্ষিত নারীদের পোশাক কারখানায় চাকরি দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অর্থাভাবে আমাদের সেন্টারটি কিছুদিন আগে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। আমরা যদি ভিকটিমদের কিছু প্রশিক্ষণ দিয়ে জব প্লেসমেন্ট করতে পারি তাহলে সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র অনেক সফল হবে।
মাহমুদা শেলী
নির্বাহী পরিচালক
মানব প্রগতি সংঘ
সম্প্রতি একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়। পাঁচ মাস পরে সে যখন বাচ্চা প্রসব করে তখন ওসিসিতে ২০ দিন ছিল। এরপর তাকে সেখানে থাকতে দেয়া হয় না। যেহেতু তার বাচ্চা হয়ে গেছে। এই যে ২০ দিন পর সে শিশুটিকে নিয়ে চলে যাবে, কোথায় যাবে? এ জায়গা তার ছিল না। ফলে তার খালার বাড়িতে মেয়েটির আশ্রয় হয়। বাবার বাড়িতে তার ভাইয়েরা তাকে আশ্রয় দেয়নি। কেননা সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ভাইয়ের মানসম্মানের বিষয় আছে। কাজেই তারাও তার পাশে দাঁড়ায়নি। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, তার ডিএনএ প্রোফাইল করতে দেয়া হয়েছে, কিন্তু চার-পাঁচ মাসের মধ্যে এর রিপোর্ট দেয়া হয়নি। কেননা মহিলা অধিদপ্তরের ফরেনসিক পরীক্ষার মেশিনটি নষ্ট। আমরা খোঁজ নিয়ে জানলাম, সেখানে এক হাজারেরও বেশি মামলা জমা পড়ে আছে। মেয়েটি ছিল গ্রামের এবং একেবারে প্রত্যন্ত এলাকার। সে কিন্তু সাহস করে শহর পর্যন্ত এসেছে, আদালতে এসেছে মামলা করার জন্য। আদালতে মামলা করার ফলে সে বাড়িতে যেতে পারেনি। কেননা যে পুরুষটি তাকে ধর্ষণ করেছে, সে তার আপন মামাতো ভাই। মেয়েটির মা-বাবাও তাকে থাকতে দিতে পারছে না। এটি একটিমাত্র মামলার ঘটনা। এ রকম অসংখ্য মামলা আছে যে আমরা আসলে সারভাইভারদের কোথাও রাখতে পারি না। টাঙ্গাইলের বাইরে কিংবা গাজীপুরে একটা আশ্রয়কেন্দ্র আছে, সেখানে সময়স্বল্পতার কারণে আমরা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারিনি। কিন্তু তাত্ক্ষণিকভাবে মেয়েটির একটা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় প্রয়োজন ছিল। সমাজকল্যাণের অধীনে ভালুকায় একটি শিশুসদন আছে। সেটি কিছুটা বাড়ির কাছে। কখনো কখনো সেখানেও আশ্রয় দেয়া হয়। কিন্তু সেই শিশুসদনে যেসব শিশু থাকে, তাদের জন্য এ সারভাইভার/ভিকটিম মানসিকভাবে ক্ষতিকর বিষয় হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
অ্যাডভোকেট সালমা আলী
সভাপতি
বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি
কিশোরী ও নারী যখন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সবার আগে তার একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। ধর্ষণ থেকে শুরু করে পারিবারিক নির্যাতন প্রভৃতি ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে উত্তরণে ভুক্তভোগীর একটা সুরক্ষাবলয় দরকার পড়ে। সরকারি যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আছে সেগুলো ন্যূনতম মানও বজায় রেখে চলছে না; বরং ওইসব কেন্দ্রে গিয়ে নারী আরো অনিরাপদ, ভিকটিমাইজ হয়ে পড়েন। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ বিষয়ে আমাদের একটা বড় প্রজেক্ট ছিল। সেখানে কমিউনিটি আশ্রয়কেন্দ্রেরও একটা কনসেপ্ট তৈরি করেছিলাম। এর অর্থ হলো একেবারে কমিউনিটি লেভেলে কিংবা তৃণমূলে এমন এক সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে হবে, যাতে নারীরা আশ্রয় নিতে পারেন। প্রথমবার যখন রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে এসেছিল, তখন চাহিদার কারণে আমাদের আশ্রয়কেন্দ্র করতে হয়েছিল। এছাড়া আমাদের ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্র চট্টগ্রামে অনেক বছর ছিল, ঢাকায় আমাদের তিনটি ছিল। এখন আমাদের একটা ট্রানজিট হোম আছে, যেখানে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীদের আশ্রয় দেয়া হয়। আমরা আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য অ্যাডভোকেসি করছি। আমাদের অনেক দিনের অ্যাডভোকেসির পরে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার হয়েছে। ঢাকার ওসিসিতে ধারণক্ষমতা আটজনের। সেখানে বর্তমানে ১৪ জন আছে। সেগুলো আরো বাড়াতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নারীবান্ধব ও শিশুবান্ধব করা প্রয়োজন। তার সঙ্গে একটা কম্প্রিহেনসিভ প্যাকেজ দিতে হলে ফান্ড একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের প্রধান আশ্রয়কেন্দ্রটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ভালো আশ্রয়কেন্দ্র। এটি ১০ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা। কিন্তু অর্থের সংকটের কারণে সব সাপোর্ট আমরা দিতে পারছি না। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের কিছুটা সাহায্য করতে পারে। শুধু সরকারি বা বিদেশী টাকায় নয়, এ ধরনের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সাহায্য করার জন্য আমাদের দেশের বিত্তবান লোকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
রাশেদ খান মেনন
সভাপতি
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয়
স্থায়ী কমিটি
দেশ এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নারী নির্যাতনের চিত্র কমিয়ে আনাও জরুরি। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, কভিডকালে পারিবারিক সহিংসতা যেমন বেড়েছে, নারী পাচারও বেড়েছে। একইভাবে বিভিন্ন জায়গায় স্বামী পরিত্যক্তা নারীর সংখ্যাও বেড়েছে। এটা শুধু অতিমারীর কারণে হয়েছে তা নয়, আসলে এক ধরনের মানসিক জায়গাও তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রবাসী নারী কর্মীদের কথাও উল্লেখ করতে চাই। তারা যখন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন তখন তাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না, যার কারণে নারীর প্রতি দমন-পীড়ন বেড়ে চলেছে। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ও সেবার মান বাড়ানোর যে দাবি আজ উঠেছে, জনবল সংকট রয়েছে, যারা এ বিষয়ে কাজ করছে, তারা যেন ফান্ড পেতে পারে, সেটি নিয়ে আমি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তুলে ধরব। যারা দায়িত্বে আছেন, বিষয়গুলো তাদের নজরে আনতে চেষ্টা করব। একটি বিষয় উল্লেখ করি। আমাদের মোট বাজেটের ১৭ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ব্যয় করা হয় বলে দাবি করা হয়। কিন্তু আসলে এর বিরাট অংশ, প্রায় ৬৫-৭৫ শতাংশ চলে যায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনের জন্য। সুতরাং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য যে পরিমাণ টাকা থাকে, সেটি খুবই কম। যদিও এ সময়ে বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা বাড়ানো হয়েছে, দরিদ্র জেলা-উপজেলাগুলোয় শতভাগ বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে, স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের জন্য ভাতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সেটা এখনো অপ্রতুল। যেখানে যা প্রয়োজন তা নিশ্চিতে দরকার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আলোচনায় উঠে এসেছে সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যেসব সমস্যা-সংকট তৈরি হচ্ছে তা সমাধানে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। উন্নত দেশেও আমরা পরিণত হব। কিন্তু এ মৌলিক বিষয়গুলো সমাধান না করলে জনগণ প্রকৃত সুফল পাবে না।
শামীমা বেগম
অতিরিক্ত ডিআইজি
বাংলাদেশ পুলিশ
আমি ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে কাজ করেছি। পরবর্তী সময়ে ঢাকার বাইরে বিভাগীয় পর্যায়ে যে আরো সাতটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে, সেখানেও কাজ করেছি। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আমাদের অনেক উদ্যোগ আছে। অনেক প্রকল্প আছে। এগুলোর মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় দরকার। আমাদের গ্যাপ কোথায় কোথায় আছে সে বিষয়ে গবেষণা করা দরকার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এসব কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো, আমরা যদি ভাবি নারী-শিশু সবসময় নির্যাতিত হবে, তাদের পরিবার থেকে তারা বঞ্চিত হবে, নিগৃহীত হবে আর আমরা সরকারিভাবে তাদের আশ্রয় দেব, কর্মসংস্থানের চিন্তা করব, তাহলে সেটি হবে ভুল ধারণা। পাশাপাশি সহিংসতা প্রতিরোধে প্রোঅ্যাক্টিভ ভূমিকা পালনের বিষয় রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মুজিব বর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে ৬৫৪টি থানায় নারী, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী সেবার একটা ডেস্ক চালু করা হয়েছে। এখনো অনেক জায়গায় কিছু গ্যাপ আছে। প্রতিটি ডেস্কেই চেষ্টা করেছি নারী পুলিশ দ্বারা নির্যাতিত নারীরা যেন সেবাটা পান, তা নিশ্চিত করতে। ঢাকা মেট্রোপলিটন সিটির ৫০ থানাতেই উল্লিখিত ডেস্কে নারী পুলিশ দিতে পেরেছি। কিছু প্রত্যন্ত থানায় আমরা এখনো পৌঁছতে পারিনি বা ব্যবস্থা করতে পারিনি। আমাদের লক্ষ্য সব থানায় নারী পুলিশ থাকবে এবং নারীরা যেন প্রাইভেসি মেইনটেন করে এখানে এসে কথা বলতে পারেন। এখানে আরো কিছু বিষয় আছে। কেউ কেউ হয়তো পারিবারিক কলহের কারণে আসে। সবকিছু মামলায় রূপান্তর করা যায় না। হয়তো মধ্যস্থতা করে সমাধান করতে হয়। পাশাপাশি ৯৯৯ নম্বরে প্রচুর নারী-শিশু নির্যাতন, সহিংসতার ঘটনায় রেসপন্স করা হয়েছে এবং তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা হয়েছে।
ড. শেখ মুসলিমা মুন
অতিরিক্ত পরিচালক
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর
দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরে আমাদের সেবা দেয়া হচ্ছে। আমরা ১০৯ নম্বরে একটি হেল্প সার্ভিস চালু করেছি। আমরা এক বছর পর্যন্ত নির্যাতিত নারীকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার সুযোগ দিই। এটা কেবল পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে। এখানে কোনো জিডি কিংবা আদালতের নির্দেশেরও প্রয়োজন নেই। ১২ বছরের দুটো সন্তানসহ থাকতে পারবেন। একটি বাস্তব কথা হলো, ছয় মাস বা এক বছর পুনর্বাসন করা হলো। কিন্তু আমাদের কেন্দ্রে আসা কোনো নারী যদি কিছু সময় পর পরিবারে ফিরে যেতে চান, আমরা তাদের আইনি সহায়তা দিই। আমাদের আইনজীবী আছেন, সমাজসেবা কর্মকর্তা আছেন, চিকিৎসক আছেন, তাদের নিয়ে আমরা সেবা দিই। কিন্তু এখানেও আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হয়তো অনেক জায়গায় পোস্টিং নেই, জনবলের অভাব। দ্বিতীয়ত, একটি জেলা বা উপজেলায়, ইউনিয়ন বা গ্রাম যেকোনো জায়গায় হলে তখন কী করবে কিংবা রাতে নির্যাতনের শিকার হলে তখন কী করবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে হয় চারটা জায়গায় জোর দিতে হবে—হাসপাতাল, পুলিশ, সমাজসেবা ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর—এ চারটা বিষয়ের সমন্বয় দরকার। চারটা জায়গায় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রথমেই যদি হাসপাতালে যান তাহলে সেখানে শুধু চিকিৎসা নয়, তাত্ক্ষণিক সেখানেই যদি একটা আশ্রয়কেন্দ্র থাকে তাহলে সেটি নিরাপদ হতে পারে। সেটা কেন বিভাগীয় শহর বা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হতে হবে? ওসিসি সেন্টারগুলো মেডিকেল কলেজগুলোয় রয়েছে। প্রতিটি থানায় আশ্রয়কেন্দ্র করার প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু থানায় আবার নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। কারণ নারীর সম্মান, সম্ভ্রম, মর্যাদার ক্ষেত্রে থানা কতটুকু নিরাপদ হয়েছে, সেই সংবেদনশীলতার জায়গাটিও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশি পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। কোন নারী-শিশুকে আমরা সেবা দেব, কাদের সমাজ সেবা দেবে—এটা অনেকেই জানেন না। এখানেও গ্যাপ রয়েছে, যা কটিয়ে ওঠা প্রয়োজন
খুশী কবির
সমন্বয়কারী
নিজেরা করি
একজন নারী হিসেবে আমি অনেক দিন ধরে কাজ করছি। আমার কাছে গ্রামগঞ্জে, শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন অবস্থানের নারীরা আসেন। এর মধ্য দিয়ে একটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে যে নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন; নিজে যেখানে থাকুক না কেন, তিনি একজন পাচারের ভিকটিম হতে পারেন, একজন যৌনকর্মী হতে পারেন, বাইরের মানুষ দ্বারা ধর্ষণ ও সহিংসতার শিকার হতে পারেন, একজন পারিবারিক সহিংসতার শিকার হতে পারেন, নির্যাতিত প্রবাসী নারী শ্রমিক হতে পারেন। বিশেষ করে প্রবাসী নারী শ্রমিকরা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে ধরনের সাপোর্ট পাওয়ার কথা তার কিছুই পান না। দূতাবাস থেকে কোনো সহায়তা তারা পান না। তারা নির্যাতিত হয়ে ফিরে এলে সমাজ, পরিবার তাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে। আবার দেখা যায়, নির্যাতিত অনেক নারীই বেশ অবস্থাসম্পন্ন। কিন্তু পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজন সমর্থন না দেয়ার কারণে তারা সামাজিকভাবে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। নারীদের অনেকের অত্যাচারের শিকার হয়ে হয়তো একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো অনেক বেশি উন্মুক্ত হওয়া দরকার। সবার জন্যই যেন স্পেস থাকে, সে রকম হওয়া উচিত। সেখানে সব ধরনের নারীকে সহজে সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি। কোথাও কোথাও এমনটাও দেখা গেছে, কোনো নারী আশ্রয়কেন্দ্রে আসার পর স্বামী তাকে জোর করে নিয়ে গেছেন। তাই গোপনীয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের পুলিশ বাহিনীকেও সবসময় নারীবান্ধব বলা যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। কোনো নির্যাতিত নারীকে তারা আমাদের জিম্মায় রাখতে অনুরোধ করেন। সর্বোপরি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো একটা আনন্দঘন পরিবেশে পরিচালিত হওয়া উচিত। নয়তো নির্যাতিত নারী আশ্রয়কেন্দ্রে এসে মানসিকভাবে আরো দুর্বল হয়ে পড়বেন।
নাসরিন মনসুর
সদস্য
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা নারী নির্যাতনবিরোধী বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকি। তারই একটা অংশ হিসেবে আমরা রোকেয়া সদন নামে আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করছি। আমাদের এ আশ্রয়কেন্দ্র ৩৭ বছর অতিক্রান্ত করতে চলেছে। আমরা যখন যাত্রা করি তখন আমাদের আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না কিংবা তেমন কোনো আর্থিক সংগতিও ছিল না। দেশে এ রকম আশ্রয়কেন্দ্র খুবই কম ছিল। বলতে গেলে ছিলই না। যেভাবে নারীর ওপর সহিংসতা ও নির্যাতন ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং যখন তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন পড়ে তখন আমরা আশ্রয়কেন্দ্রটি চালু করি। আমরা মনে করি, নির্যাতনের শিকার একজন নারীর জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খুবই দরকার। কেননা একটি স্বস্তিদায়ক, যথাযথ গোপনীয়তা রক্ষাকারী নিরাপদ পরিবেশের প্রয়োজন হয়। যাতে নির্যাতিত নারীকে আবার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা যায়। আমাদের রোকেয়া সদনে বিভিন্ন জেলা, বিভিন্ন সংস্থা, সাপোর্ট সেন্টার এমনকি থানা থেকেও নিরাপত্তার জন্য সহিংসতার শিকার নারীদের পাঠিয়ে দেয়া হয়। একটা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। আমরা এটা সবসময় দেয়ার চেষ্টা করি। এটা প্রায় ৩৭-৩৮ বছর ধরে দেয়ার চেষ্টা করছি। কভিডকালে পারিবারিক নির্যাতন বেড়ে যায়। নানা দিক থেকে তারা একটা অসহায়ত্বের মুখে পড়ে। বর্তমানে আমাদের আশ্রকেন্দ্রে ১০ জন মেয়ে আছে। তবে ৫০০-এর বেশি মেয়েকে পুনবার্সন করতে পেরেছি। আমাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিজস্ব চিকিৎসক আছে, সাইকিয়াট্রিস্ট আছে, প্রথমে যখন মেয়েরা ট্রমাটাইজ হয়ে আসে, তাদের সাইকোথেরাপির ব্যবস্থা করে থাকি। শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। আমাদের টার্গেট আছে যে আমরা মেয়েদের সর্বোচ্চ গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি, যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে।
শাহনাজ সুমী
উপপরিচালক
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ
নির্যাতনের যেমন বিভিন্ন ধরন রয়েছে তেমনি ধরনভেদে আশ্রকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তাও আমরা বুঝতে পারি। কাজের অভিজ্ঞতা থেকেও বুঝতে পারি, প্রতিদিনই গড়ে তিন-চারজন নির্যাতিত নারী নিরাপদ আশ্রয় চান। যদিও বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পক্ষ থেকে আমাদের নিজস্ব কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। বিভিন্ন সংস্থা যাদের আশ্রয়কেন্দ্র আছে, আমরা তাদের সেখানে পাঠিয়ে দিই। প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম। এটা আমরা সবাই জানি। আমি কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে চাই। তার মধ্যে প্রচারণার একটি বিষয় আছে। হেল্পলাইনগুলো সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্র যেন একটা নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে গড়ে ওঠে, সে বিষয়টিও খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া জরুরি। আমাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে, মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদেরও এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
মাহবুবা আক্তার
উপপরিচালক
ব্লাস্ট
কভিডের সময়ে বিশেষ করে নির্যাতিত নারীদের আশ্রয় দিতে আমরা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছি। এখন আস্তে আস্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। আমরা জানতে পেরেছি বাংলাদেশ পুলিশের একটা নিবেদিত হেল্প ডেস্ক আছে। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। পাশাপাশি আমরা অনেক দিন ধরে অনুরোধ করে আসছি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার বিভিন্ন জায়গায় যেন আরো বাড়ানো যায়, যাতে সাময়িক আশ্রয়ের সুযোগ আরো বাড়ে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও বেবসরকারি সংস্থার যে আশ্রয়কেন্দ্র আছে, সেখানে যদি রেফারেল ম্যাকানিজম আরো শক্তিশালী করতে পারি তাহলে হয়তো আমরা এ জায়গায় আরেকটু অগ্রসর হতে পারব। আইনগত সহায়তার আওতায় যদি তাদের আনা যায়, তাহলে হয়তো এখান থেকে সেবাটা আমরা বৃদ্ধি করতে পারব। উচ্চ আদালতের কিছু নির্দেশনা আছে যে অনলাইনে যদি অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি চালু করা যায় তাহলে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যারা থানায় যেতে পারছেন না, তাদের আইনের আশ্রয়ে নিয়ে আসা যাবে।
জেনিফা জব্বার
পরিচালক
সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স অ্যান্ড সেফগার্ডিং, ব্র্যাক
ব্র্যাক থেকে সম্প্রতি আমরা ‘সংযোগ’ নামে একটা অ্যাপ চালু করেছি। রেফারেল ম্যাকানিজম হিসেবে পুলিশ স্টেশনগুলো কোথায়, শেল্টার হোমগুলো কোথায়, সারা বাংলাদেশে মেডিকেল সাপোর্টগুলো কোথায়, আইনগত সহায়তা কারা দিচ্ছেন—সবই এ অ্যাপে ম্যাপ করা হয়েছে। ওই ম্যাপে আমরা দেখলাম বাংলাদেশ পুলিশের আটটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার আছে, ১৩টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র আছে। প্রশ্ন হলো, এগুলো কি পর্যাপ্ত? মোটেই পর্যাপ্ত নয়। আবার আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে যদি সেবার মানের হিসাব করি, সেটিও তেমন একটা সন্তোষজনক নয়। ৩০টি এনজিও আমরা পেয়েছি, যারা ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত নির্যাতিত নারীদের আশ্রয় দেয়। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে অবশ্য সাতদিনের বেশি রাখা যায় না। আদালতে তোলা হয়। তারপর ছয় মাস বা এক বছরের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়। আশ্রয়কেন্দ্রের সুযোগ-সুবিধা উন্নত মানের করতে হবে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন। শুধু দরিদ্ররা যে শিকার হন তা নয়, উচ্চবিত্তের অনেকেও সহিংসতার শিকার হন। কাজেই তাদের যেনও সেবা দেয়া যায়, তা বিবেচনায় রাখতে হবে। আমরা দেখেছি যোগাযোগের অভাবে মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সে জায়গা থেকে আমরা সংযোগ অ্যাপটি চালু করি। এটা একটা ওপেন সোর্স। এটা ব্যবহার করে সবাই দেখতে পারবে কোথায় কী সেবা আছে। আশ্রয়কেন্দ্র সরকারি উদ্যোগে আরো বাড়াতে হবে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নারীর জন্য যদি পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র করতে না পারি তাহলে মানুষ নির্যাতনের শিকার অব্যাহতভাবে হবে। এখানে একটা সামগ্রিক অ্যাপ্রোচ প্রয়োজন। শুধু শেল্টার নয়, তাকে স্বাবলম্বী করেও তুলতে হবে।
সেলিনা আক্তার
সিনিয়র আইনজীবী মিডিয়েশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র
নির্যাতনের ধরন একটু ভাগ করি। একটা পারিবারিক নির্যাতন, আরেকটা যেকোনো জায়গায় নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তাদের জন্য বেশ সেবা আছে। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে সেবার মানটা আমরা আসলে বুঝতে পারি। আমাদের যা সেবা আছে তার মান ভালো না হলে সবাই হতাশার শিকার হবে। হচ্ছেও তাই। আর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ও নারী হয়তো এমন এক পরিবারের, তারা চাইলেও কোনো একটা জায়গায় চট করে যেতে পারেন না। কাজেই তাদের জন্য অনায়াসে আরামদায়ক পরিবেশ আছে, এমন এক আশ্রয়কেন্দ্র দরকার। বিশেষ করে সিঙ্গেল যারা অন্তঃসত্ত্বা নারী, তাদের জন্য আলাদাভাবে আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই। আমাদের কাছে যারা আসেন তাদের আমরা আরেকটা সংগঠনের সহযোগিতা নিয়ে আইনি সেবা দিচ্ছি এবং তার নিরাপদ ডেলিভারির ব্যবস্থাটা আরেকটা সংগঠনের/এনজিওর মাধ্যমে করছি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের যে একটা হাফওয়ে হোম আছে, সেখানে অনেকে আসেন। সেখান থেকে আমরা পরিবারের সঙ্গে পুনঃসম্পর্ক স্থাপন করে দিচ্ছি, আমরা তাদের সাময়িক নিরাপত্তা দিচ্ছি।
শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির





