নভেল করোনাভাইরাসে সৃষ্ট কভিড-১৯ মহামারী পৃথিবীকে অনেক কিছু সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। ‘অর্থনীতি নাকি স্বাস্থ্য’—এ নিয়ে কিছুদিন আগেও বেশ একটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। সময়ের সাথে সাথে সেই বিতর্ক মিলিয়ে গেছে অনেকটাই। কারণ বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে উৎপাদন ও বণ্টনে মনোনিবেশ করতেই হবে। মহামারী পর্ব শেষ হতে এখনো অনেক বাকি, কিন্তু এরই মধ্যে মানুষ নতুন স্বাভাবিক অবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে সব রকমের প্রচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন এই স্বাভাবিক অবস্থায় খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীই তালিকায় সবার ওপরে। মহামারীর শুরুর দিকে খাদ্য সংকটের কথাই বিশ্বব্যাপী আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল। কারণ লকডাউন কারণে খাদ্যোৎপাদন ও সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি ব্যাহত হয়, যার কারণে খাদ্য সংকটে ভুগতে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে অনেক গুণ। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬৯ কোটি, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। কভিড-১৯ তাই খাদ্যোৎপাদনের প্রতি জোর আহ্বানকে আরো বেগবান করেছে সে কথা বলাই বাহুল্য।
প্রথাগত মানদণ্ডের আলোকে বলা যায় যে বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ক্রমেই কমে আসছে। যেমন ২০১৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ছিল মাত্র ৮ শতাংশ, অর্ধশতাব্দী আগেও যার অবদান ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে বর্তমান বিশ্বের শিল্প বিপ্লবের বুনিয়াদ তৈরি হয়েছিল মূলত কৃষি বিপ্লবের হাত ধরেই। শিল্প বিপ্লবের আগে যুক্তরাজ্য, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে কৃষির অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির সূচনা হয়। যেমন ১৮০০ সালের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট শ্রমশক্তির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কৃষিতে নিযুক্ত ছিল এবং মোট দেশজ উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি ছিল কৃষির অবদান। ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে জাপান যখন প্রযুক্তিতে বেশ এগিয়ে, তখনো দেশটির মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৬৫ শতাংশ কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্ত ছিল এবং জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৩৮ শতাংশ। গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি যেমন দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান সবুজ বিপ্লবের সাহায্যে শিল্পোন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে তাদের অর্থনীতিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। কৃষির সেই ধারা এখনো বজায় আছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে, যেখানে দেশ ও অঞ্চলভেদে অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ৩০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে কৃষি বাংলাদেশের একটি অত্যাবশ্যকীয় উৎপাদন খাত। দেশটির জন্মলগ্ন থেকে অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ছিল অপরিসীম। ১৯৭২ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল কৃষির অবদান, যা ক্রমান্বয়ে কমে ২০১৯ সালে ১২ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে আসে। কৃষির জায়গা দখল করে নেয় টারশিয়ারি সেক্টর বা পরিষেবা খাত। দেশটির অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান এখনো খুব কম। ২০১৯ সালে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্পের অবদান ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ, যেখানে সেবা খাতের অবদান ছিল অর্ধেকের সামান্য বেশি (৫২ শতাংশ)। ১৯৮০-৯০ দশকে কৃষির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা ১৯৯০-২০০০ দশকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ শতাংশে। পরবর্তী দশক (২০০০-১০) ছিল বাংলাদেশের কৃষির জন্যে এক যুগান্তকারী সময়। এ দশকে কৃষির গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২৭ শতাংশে, যা পরবর্তী দশকে কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কৃষির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির সমান এবং কখনো কখনো বেশি। ২০১০ সালের পর কৃষির গড় প্রবৃদ্ধির ধারা ছিল ক্রমহ্রাসমান, যেখানে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ক্রমবর্ধমান।
জিডিপিতে কৃষির অবদান ক্রমহ্রাসমান হলেও বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব এখনো কোনো অংশে কম নয়। কৃষির অবদানকে নয়া ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির উন্নয়ন মডেলে বিবেচনা করলে কৃষির প্রতি সুবিচার হবে না। এসব মডেল কৃষির অবদানকে যথোপযুক্তভাবে তুলে ধরতে বরাবরই ব্যর্থ। কৃষির সাফল্যকে দেখতে হবে বাজার অর্থনীতির মাপকাঠির বাইরে। দারিদ্র্য হ্রাস, লিঙ্গ সমতা ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মতো কারণগুলোকে সমসাময়িক উন্নয়ন মডেল খুব একটা আমলে নেয় না। অথচ জীবনযাত্রার উন্নয়নের এ নির্ণায়কগুলো প্রায়ই কৃষি বিকাশের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং কৃষির অবদানকে দেখতে হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের দিকে তাকাতে হবে।
বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ (৬৩ শতাংশ, ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী) এখনো গ্রামে বাস করে, যাদের সিংহভাগই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের কিছু বেশি (৫৯ শতাংশ) শ্রমবাজারে নিযুক্ত। তিন দশক আগেও (১৯৯০ সালের শুরুর দিকে) মোট শ্রমশক্তির ৭০ ভাগ নিয়োজিত ছিল কৃষিতে, যা কমে ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৩৮ শতাংশে। অর্থাৎ গত তিন দশকে কৃষিতে নিযুক্ত শ্রমশক্তি কমেছে ৪৬ শতাংশে, যেখানে একই সময়ে জিডিপিতে কৃষির অবদান কমেছে ৬০ শতাংশ। এ তথ্য-উপাত্ত এটাই প্রমাণ করে যে কৃষিতে নিয়োজিত মানবসম্পদের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু তাই বলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমানের অবনমন হয়েছে এ কথা বলা যাবে না। ২০০০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক (৪৯ শতাংশ) দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। দারিদ্রের হার শহরের (৩৫ শতাংশ) চেয়ে গ্রামে (৫২ শতাংশ) তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ছিল। গত তিন দশকে দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সামগ্রিকভাবে প্রায় অর্ধেকে (২৪ শতাংশ) নেমে এসেছে। ঠিক একই সময়ে গ্রামীণ দরিদ্র জনসংখ্যা কমে অর্ধেক (২৬ শতাংশ) হয়েছে। তবে শহরের দারিদ্র্য হ্রাসের হার ৪৬ শতাংশ, যা গ্রামের চেয়ে কিছুটা কম। মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ লোক গ্রামে বাস করে। এত বড় একটা জনগোষ্ঠীর দারিদ্রের হার তিন দশকে অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রধান ভূমিকা কৃষিরই।
যদিও এ কথা সত্য যে কয়েক দশক ধরে তৈরি পোশাক খাত নারীর কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নে অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছে। আসলে কৃষি খাতই ছিল নারীর কর্মসংস্থানের আদি ভরসাস্থল। শ্রমশক্তিতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের প্রায় ৬০ শতাংশ এখনো সনাতন কৃষিতেই নিযুক্ত। এতে পুরুষের পাশাপাশি নারী যেমন পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে, তেমনি সক্ষম হয়েছে নিজেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি সমাজে লিঙ্গবৈষম্য কমেছে। আর এসব নিয়ামক প্রথাগত উন্নয়ন মডেলে স্থান পায় না বলে কৃষির প্রকৃত অবদান অস্বীকৃত থেকেই যায়।
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে অবশ্য কৃষির ভূমিকাই প্রধান। গত পাঁচ দশকে দেশের মোট জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় গুণ। একই সময় কৃষিজমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। কিন্তু এ বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য জোগানে কৃষি কখনই তেমনভাবে ব্যর্থ হয়নি, যদি না প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন—বন্যা, খরা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি কৃষিক আঘাত হানে। যেমন গত পাঁচ দশকে শস্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩ গুণ। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদণের পরিমাণ ছিল এক কোটি টন, যা ২০১২-১৩ অর্থবছরে বেড়ে ৩ কোটি ৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ খাদ্যশস্য নিট আমদানিকারক দেশ। গত চার দশকে নিট খাদ্যশস্য আমদানির গড় পরিমাণ ছিল মোট পণ্যদ্রব্য আমদানির প্রায় ৯ শতাংশ।
গত পাঁচ দশকে দেশে চরম দরিদ্র লোকের সংখ্যা কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রতি ১০ জনে একজন চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করে। তবে মাঝারি থেকে চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে মোট জনসংখ্যার ৩১ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষের বাস। অপুষ্টির বিস্তার গত দুই দশকে ১৯ শতাংশ কমলেও অপুষ্টিতে ভোগে এমন মানুষের সংখ্যা এখনো প্রায় দুই কোটি।
কৃষি তথা সবুজ বিপ্লবে কৃষির আধুনিকায়ন ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যাবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৬৫-৬৬ থেকে ১৯৮৯-৯০ পর্যন্ত সময়ে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। পরবর্তী সময়ে বাজার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ায় সারের ব্যবহার বৃদ্ধির হার আরো দ্রুত হয়। ১৯৮৭-৯২ সময়ে রাসায়নিক সারের বেসরকারি খাতের শেয়ারের পরিমাণ ৫ থেকে বেড়ে ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়। এছাড়া সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি যেমন—কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানি শুল্ক হ্রাস, বাধ্যতামূলক কৃষিঋণ বিতরণ এবং উৎপাদনের স্থায়ী ব্যয় হ্রাস কৃষিতে যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে সাহায্য করেছে। বিশেষত গত ৫০ বছরে দুই চাকার পাওয়ার টিলারের ব্যবহার বেড়েছে শূন্য থেকে প্রায় পাঁচ লাখে। সেই সাথে গভীর ও অগভীর নলকূপের ব্যবহার বৃদ্ধিও ছিল উল্লেখযোগ্য।
গ্রামীণ অর্থনীতি রূপান্তরে কৃষির অপরিসীম ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও এ কথা বলা যাবে না যে গ্রামীণ অর্থনীতি রূপান্তরে কৃষিক্ষেত্রের সম্ভাবনার সবটুকু আমরা কাজে লাগাতে পেরেছি। বাংলাদেশের কৃষি এখনো অনেক সমস্যায় জর্জরিত। একটি উন্নত ও বৈচিত্র্যময় রূপান্তরে বাংলাদেশের জন্য আরো উৎপাদনশীল, জলবায়ু স্থিতিস্থাপক কৃষিখাত প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে কৃষি খাতে সম্ভাব্য বাধা দূর করতে হবে।
কৃষির উন্নয়নে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অবশ্যই প্রথমে আসবে জলবায়ুর পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলই হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনকে সময়ে সময়ে পর্যুদস্ত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সব দেশেরই কিছু না কিছু দায়িত্ব আছে। তবে ভুক্তভোগী হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সে দায়িত্বটা আরো বেশি। নিজেদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর নীতি গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সাথে যৌথভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পন গ্রহণ করতে হবে।
তবে কৃষি যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রভাবিত, কৃষিকাজের ফলে নিঃসরিত কার্বনও (বিশেষ করে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড) জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। যদিও গত পাঁচ দশকে কৃষিকাজ থেকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ তেমন বাড়েনি, কিন্তু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে যে পরিমাণ দূষণের মাত্রা কমার কথা ছিল, সেটা অর্জিত হয়নি। সুতরাং কৃষির উৎপাদনশীলতার স্বার্থে এবং কৃষিকাজ থেকে দূষণের মাত্রা কমানোর জন্য কৃষির আধুনিকায়ন খুবই জরুরি। সেই লক্ষ্যে উন্নত ও আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম আমদানি ও সরবরাহে সমস্ত বাধা দূর করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা থেকে তহবিল সংগ্রহ করে উন্নত প্রযুক্তি সংযোজনে কৃষিতে ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে একদিকে যেমন গ্রামীণ দারিদ্র্য কমবে, অন্যদিকে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের মাত্রা কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন সহজ হবে।
দুই. গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কৃষিকাজের সাথে সংশ্লিষ্টদের মজুরির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। যেমন ১৯৮৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত সময়ে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বেড়েছে গড়ে ১০৪ শতাংশ। একই সময়ে সিপিআই বেড়েছে ১৩৩ শতাংশ। যদি আমরা ধরে নিই যে ১৯৮৫ সালে শ্রমিকের আয়-ব্যয়ের সাম্যাবস্থা বজায় ছিল, নতুন শতাব্দীতে এসে কৃষিতে নিযুক্ত শ্রমিকরা তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছে এবং আয়-ব্যয়ের সমতা বজায় থাকেনি। গত দুই দশকে এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও শ্রমিকের মজুরি প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। একটি দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন হলো কৃষিনির্ভর কর্মকাণ্ড থেকে শিল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর। তবে কৃষিকে বাদ দিয়ে এ রূপান্তর বাংলাদেশের জন্যে অসম্ভব। কারণ জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি—যার অধিকাংশই অদক্ষ—কৃষির সাথে জড়িত। এ বিরাট জনসংখ্যার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো না গেলে শিল্পপণ্যের চাহিদা বাড়বে না আর শিল্পের প্রসারও ঘটবে না। তাই শ্রমিকের মজুরির দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অধিকন্তু এসব অদক্ষ শ্রমিক শ্রেণীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করা না গেলে শিল্পে তাদের সংস্থান করা অসম্ভব। যতদিন সেটা সম্ভব না হচ্ছে, ততদিন কৃষিই হবে অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র। তাই কৃষি খাতকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
তিন. কৃষির ইনপুট (সার, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি, উন্নত বীজ ইত্যাদি) এবং আউটপুট (কৃষি পণ্য) সংশ্লিষ্ট বাজারের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। বিশেষ করে বাজারের একচেটিয়া কাঠামো ভেঙে সুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কৃষিপণ্যের বিক্রয় ও সরবরাহে ফড়িয়া, দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর দৌরাত্ম্য এখনো বিরাজমান, যা কৃষিপণ্য বাজারজাতের প্রধান অন্তরায়। পণ্য পরিবহনে কৃষককে পদে পদে ঝামেলা পোহাতে হয়, যার জন্য কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিকীকরণে কৃষক উৎসাহিত হয় না। কৃষির বিকাশে এসব অন্তরায় অবশ্যই দূর করতে হবে।
চার. কৃষিঋণের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বলা বাহুল্য যে অতীতে সরকার অনেক কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। তবে তাদের সত্যিকার সুফল কৃষক পায়নি। যেমন সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে তাদের মোট ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ কৃষি খাতে বরাদ্দের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে শাখা স্থাপনে শহর ও গ্রামের মধ্যে সমতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ফলে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২০০০ সালের মাঝামাঝি থেকে তাদের গ্রামীণ উপস্থিতি বাড়িয়েছে। শুরুতে অবশ্য কৃষিঋণের সুদ অনেক বেশি ছিল। ২০১০ সাল পর্যন্ত ঋণের সুদের কোনো নির্দেশনা ছিল না। পরবর্তী সময়ে কয়েক ধাপে কৃষিঋণের সুদ কমিয়ে এক সংখ্যায় নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য সেই হার লাভজনক মনে হয়নি। তাই তাড়া কৃষিঋণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ২০০২ সালে কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণের ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে ৫ শতাংশের কমে নেমে আসে। কৃষিতে অবণ্টনকৃত ঋণ সরবরাহে নতুন এক পন্থার আবিষ্কার করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতিতে কৃষির জন্য বরাদ্দকৃত ঋণ সরকার বেঁধে দেয়া হারে এনজিওতে স্থানান্তর করে দেয়। আর এনজিওগুলো তাদের নির্ধারিত হারে গ্রাহককে ঋণ দেয়। ২০১৪ সালে এনজিওর মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা, যা বেড়ে ২০১৮ সালে দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এ কার্যকলাপের ফলে কৃষিবান্ধব ঋণ নীতির যে প্রকৃত উদ্দেশ্য সেটা অর্জিত হয়নি। এ প্রথা বন্ধ করে কৃষিঋণের যথাযথ বিতরণ একান্তই প্রয়োজন। অন্যথায় সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি রূপান্তরের প্রক্রিয়ায়টা অনেকটাই ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামো কৃষি বিকাশে সহায়ক। তদুপরি একটি কার্যকর গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যম হিসেবে ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষির অবদান অপরিসীম। তাই বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য কৃষিকে মুক্ত বাজারের হাতে অবহেলায় ছেড়ে দিলে চলবে না, বরং কৃষির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমেই কৃষিনির্ভর থেকে আধুনিক শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর সম্ভব।
ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: সহযোগী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি ও ফিন্যান্স বিভাগ
নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান





