বিশ্ব ধরিত্রী দিবস উপলক্ষে ২৩ এপ্রিল ২০২১ তারিখে ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং, নিজেরা করি, সাংগাত ও বণিক বার্তার উদ্যোগে ‘ধরিত্রী ও নারী’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র।
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক
বণিক বার্তা
আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উদযাপন করছি। দেশ স্বাধীনের পর আমাদের বনসম্পদ, পানিসম্পদ কিংবা নদী ও বাতাসকে কীভাবে পেয়েছিলাম এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে সেগুলোর কি অবস্থা, তা পর্যালোচনা করা জরুরি। এই ৫০ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক মহলে অনেক প্রশংসা আমরা শুনি। কিন্তু কখনই আমরা বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করি না যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি করতে গিয়ে আমরা আমাদের পরিবেশ বা প্রাকৃতিক সম্পদকে কতটুকু ভালোভাবে ব্যবহার করেছি এবং কতটা ক্ষতি করেছি। বৈশ্বিক যে মানদণ্ডগুলো রয়েছে, সেখানে বিশেষ করে বায়ুদূষণে আমরা সবচেয়ে এগিয়ে। তাছাড়া বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুহারও আমাদের এখানে বেশি। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি সংস্থা বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক বলেছে পরিবেশগত কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার বেশি। তাদের তথ্যানুসারে বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের কারণে যেখানে ১৬ শতাংশ মানুষের প্রাণহানি হয়, বাংলাদেশে তা প্রায় ২৮ শতাংশের মতো। পরিবেশগত যে বিপর্যয়ের দিকে আমরা ক্রমাগত অগ্রসর হচ্ছি সেখানে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের কয়েকটা এলাকা পর্যালোচনা করে এর একটা চিত্রও আমরা পাই। বিশেষ করে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই লেক, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা ও টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের এলাকা বা শালবন এলাকার পরিবেশ বিপর্যয় আমাদের নারীদের ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। আমরা সবসময় হিসাব করি, আমাদের জিডিপি কতটা বড় হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখি না পরিবেশগত যে ক্ষতিগুলো আমরা করছি, সেটার আর্থিক ও সামাজিক মূল্য কত। আমাদের অনেক ভালো দিকও আছে। কিন্তু গত পাঁচ দশকে আমাদের পরিবেশের যে ক্ষতিগুলো হয়েছে, তার মূল্যায়ন এখন খুবই জরুরি। গত কয়েক বছরে উন্নয়ন নীতির কারণে পরিবেশগত যে আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে, তা পরিমাপ করার চেষ্টা বা আগামী ৫০ বছরে আমরা বাংলাদেশকে প্রকৃতিগতভাবে বা পরিবেশের ভারসাম্যের জায়গা থেকে কীভাবে দেখতে চাই, তা নিয়ে আলোচনার জন্য এখনই সবচেয়ে ভালো সময়।
খুশী কবির
চেয়ারপারসন, এএলআরডি
সমন্বয়কারী, নিজেরা করি
আমাদের ধরিত্রী কী অবস্থায় আছে এবং উন্নয়নের নামে আমরা কী করতে যাচ্ছি, এটা বিবেচনা করা জরুরি। এখানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা হয়তো বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের জন্য দায়ী না কিন্তু আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে কীভাবে ধ্বংস করছি, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। প্রকৃতি আমাদের জীবন দান করে, খাদ্য দেয়, তাকে ধ্বংস করার প্রতিক্রিয়া নারীর ওপর কী হচ্ছে এবং নারীর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের বিষয়টা তুলে ধরা জরুরি। প্রকৃতিকে ধ্বংসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী। নয়া উদারপন্থী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মূলত পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এখানে চিন্তা করা হয় কীভাবে বেশি অর্থ আয় করা যায়। জনগণের শ্রম শোষণ করে যেমন অর্থ বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়, তেমনি প্রকৃতিকে যত বেশি শোষণ করা যায়, সে চিন্তা করা হয়। কিন্তু প্রক্রিয়াটা ক্ষতিকর। তাই আমরা মনে করি বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরা দরকার। আমাদের সবার সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। তাছাড়া কী ধরনের উন্নয়ন আমাদের দরকার এবং উন্নয়নের কী প্রভাব পড়ছে—আশা করি বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসবে।
সত্তরের দশকে তরুণদের মধ্যে এক ধরনের সক্রিয়তা ছিল। ১৯৭১ সালে আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। সে সময়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাতিন আমেরিকা কিংবা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানবতার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে পৃথিবীর সব তরুণ জেগে উঠছিল। তারা সবাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা ভাবল, কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল কীভাবে উন্নয়নের নামে মানুষ ও পৃথিবীকে ধ্বংস করা হচ্ছে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টিকে যদি এখন আমরা গুরুত্ব না দিই তাহলে ধরিত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে আমরা মানুষেরাও আর থাকতে পারব না। তাই আমাদের নিজেদের জায়গা থেকে ধরিত্রী রক্ষার্থে কাজ করতে হবে। আমি দেখেছি কীভাবে ধানি জমি নষ্ট করে রফতানিমুখী চিংড়ি চাষে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পানিতে লবণাক্ততা বাড়ানো হয়েছে। সাংবাদিক মানিক সাহা তার বইতেই লিখে গেছেন যে চিংড়িবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে প্রায় ১০০ জনের উপর মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। চিড়িং চাষের মাধ্যমে ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেমনি নারীর দুর্ভোগ বেড়েছে। তারা সহজে সুপেয় পানি পাচ্ছেন না, সবজি উৎপাদন থেকে শুরু করে অন্য কাজগুলোয় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন। কিছু কৃষক আবার আগের জায়গায় ফিরতে চাইছেন। তাদের জমির উর্বরা শক্তিকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে আট থেকে নয় বছর সময় লেগেছে। তামাক চাষ করা হচ্ছে, আলু চাষ করা হচ্ছে। আলু থাইল্যান্ডে রফতানি হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে আমাদের আলুই আমাদের কাছে চিপস হিসেবে রফতানি করা হচ্ছে। মুনাফা আর পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এ বিষয়গুলো নিয়ে জোর আওয়াজ তুলতে হবে। কিছু ব্যক্তির লাভের জন্য আমরা তথাকথিত উন্নয়ন করে টাকা বানিয়ে হয়তো জিডিপি বাড়াচ্ছি কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। তারা ক্রমে পুঁজিবাদের দাসে পরিণত হচ্ছে। পুঁজিবাদ নতুন নতুন কৌশলে অগ্রসর হচ্ছে, তাকে মোকাবেলার জন্য আমাদের যূথবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। ব্যক্তি বনাম সমষ্টি; আমরা শুধু ব্যক্তিস্বার্থ দেখব নাকি সমষ্টির কল্যাণের কথা ভাবব, তা ঠিক করতে হবে। আর গোটা বিষয়টিতে নারী বাদ যেতে পারেন না। নারীর দৃষ্টিভঙ্গিকে এখানে না নিয়ে এসে আমরা যদি মনে করি সার্বিক আলোচনার মধ্যেই নারীর বিষয়গুলো চলে আসবে, তাহলে ভুল করব। নারীকে আমি যদি আলাদাভাবে কেন্দ্রে না নিয়ে আসি, তার জন্য চিন্তা না করি তাহলে বিদ্যমান অসম অবস্থার মধ্যে আরেক দল আরো অসম হয়ে থাকবে। আমাদের এ লড়াইটা তাই বাংলাদেশের পাশাপাশি গোটা ধরিত্রীর সঙ্গে যুক্ত।
মাহমুদা বেগম
ভূমিহীন নেতা, পীরগঞ্জ
আমি আমার বাপ-দাদার আমলে যেভাবে ফসল উৎপাদন করতাম, দেশী বীজ রোপণ, নিজস্ব পদ্ধতিতে লাঙল দিয়ে চাষাবাদ করতাম—এভাবে আমরা অনেক ভালো থাকতাম। আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন লাঙল দিয়ে চাষাবাদ করতেন তখন আমাদের জমিতে উর্বরা শক্তি ছিল। কেঁচো, ব্যাঙ ছিল। এখন কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে এগুলো নেই বললেই চলে। আগে ঘরোয়া পদ্ধতিতে তৈরি পোকানাশক ব্যবহার করা হতো বলে মাটিটাও সুরক্ষিত ছিল। ওই মাটিতে উৎপাদিত ফসল খেয়ে আমরা ভালো থেকেছি। সুন্দর একটা পরিবেশ ছিল, মানুষের কঠিন কোনো রোগবালাই ছিল না। মানুষ বাঁচে মাটি-পানি আর অক্সিজেনে। আমরা যদি আমাদের মাটিকে ভালো রাখতে না পারি তাহলে আমরা মানুষেরাও ভালো থাকতে পারব না। হাইব্রিড জাত চাষাবাদ করে আমরা তা নষ্ট করেছি। আগে আমরা মাটির পাতিলে বীজ সংরক্ষণ করেছি। এভাবে কৃষকরা ধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন শাকসবজির বীজ সংরক্ষণ করেছেন। সেসব খাবারের পুষ্টিগুণ অটুট ছিল। তা খেয়ে কারো কোনো রোগবালাই হয়নি। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নতুন নতুন যে জিনিসগুলো এখন কৃষকের হাতে তুলে দিচ্ছে, তা আমাদের ক্ষতি বয়ে আনছে। মাটিটা আগের মতো নরম থাকছে না, মাটি পাথরের মতো শক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাটির আগের মতো আর উর্বরা শক্তিও নেই। কৃষিজমি ধ্বংস হওয়ার একমাত্র কারণ বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। তারা এসে যেমন কৃষককে বলে, তোমরা ভুট্টা চাষ করো আমরা ৫০০ টাকা দরে ভুট্টা কিনব। এভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা আমাদের, আমরা যারা কৃষক, তাদের। আগে যেমন নারীরা বীজ সংরক্ষণ করতেন। এখন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা সে জায়গার দখল নিয়ে নিয়েছে। এখন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অনেক সময় ৫০০ টাকা দরেও এক কেজি বীজ কিনতে হয়। বাজার ছাড়া সে বীজ পাওয়া যায় না। বাণিজ্যিক ব্যবস্থা কৃষককে বাজারমুখী হতে বাধ্য করেছে। ফসল আবাদ করার সময় কৃষককে তাদের কাছ থেকে বীজ নিতে হবে, তারপর জমিতে তা বপন করতে হবে। কিন্তু একসময় যদি বীজ না থাকে তখন কৃষক কী করবেন? কৃষক তখন বাঁচবেন কীভাবে? শুধু এই নয়, একপর্যায়ে কোম্পানি বেশি বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে বলছে। জমিতে এভাবে বিষ দেয়া হচ্ছে। কোম্পানি তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে নতুন নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের জমির ক্ষতি করছে, যা আমরা আমাদের নিজ চোখ দিয়ে দেখছি। তাই এখন আমরা দেশী বীজ সংরক্ষণ করছি। আমাদের যে বীজ ভাণ্ডার আছে, সেখানে ২২ পদের বীজ সংরক্ষণ করেছি। এ বীজ দিয়েই আমরা উৎপাদন করি এবং আমাদের যারা সদস্য রয়েছেন, তাদের আমরা দেশী বীজ ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করি। তাছাড়া আগে যেমন নদী থেকে পানি তুলে আমরা ফসলের মাঠে দিয়েছি। আজ ১০০ ফুট গভীর নলকূপ দিয়েও পানি তোলা যাচ্ছে না। বন-জঙ্গলের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। বন কেটে পুঁজিপতিরা মিল-কলকারখানা নির্মাণ করছে। এতে পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়ছে। পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। তাই পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য আমাদের সবাইকে একত্র হয়ে দেশী জাতের বীজ যেমন উৎপাদন করতে হবে, তেমনি আমাদের নদী-পানি-বন-মাটি রক্ষা করতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা কিছু কাজও করছি। আমরা বাজার থেকে ক্ষতিকর কীটনাশক না কিনে বাড়িতেই তা তৈরি করছি। নিমপাতা, মেহগনি ফল ইত্যাদি দিয়ে আমরা ঘরে কীটনাশক তৈরি করে তা ব্যবহার করি। এটাতে কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি হয় না। আগে যেমন মৌমাছি ছিল অনেক। কিন্তু গত পাঁচ বছর থেকে মৌমাছি দেখাই যায় না বলা চলে। বিষ খেয়ে খেয়ে মৌমাছিগুলো মারা গেছে। তাই পরিবেশ ও এর ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে আমাদের ক্ষতিকারক কীটনাশক বিষমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং এর সঙ্গে হাইব্রিড ফসল উৎপাদন থেকে সরে আসতে হবে।
সুজাতা চাকমা
কৃষক, রাঙ্গামাটি
ফসল রোপণ থেকে উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি পর্যায় কৃত্রিম সার ও কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ফল পাকার জন্য সবকিছুতে ওষুধ দিচ্ছে। যার কারণে আমরা বিষমুক্ত কোনো খাবার গ্রহণ করতে পারছি না। আমরা যারা পাহাড়ে থাকি, তাদের মধ্যে অসুখ হওয়ার প্রবণতা বেশি এখন। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা আগে কিন্তু এমন ছিল না। এ অবস্থায় শুধু আমি একা বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিলে হবে না। সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। আমি ও আমার পরিবারের লোকেরা যেমন ধান, পেঁপে, সবজি, কলা ইত্যাদি চাষ করে। এখানে আমরা কোনো কৃত্রিম সার কীটনাশক ব্যবহার করি না। ধান চাষ করতে গেলে এখন আমরা অনেক অসুবিধার মধ্যে পড়ছি। পানির সংকট প্রবল। ধানের বীজ বাজার থেকে কিনতে হয়। ওই বীজ চাষ করলে আবার নানা ধরনের কীটনাশক দিতে হয়। আবার ওই ধান থেকে যে চাল হয়, তা বেশিদিন ভালো থাকে না। পোকা ধরে। শুধু তাই না, খরার প্রবণতা বাড়ছে। আগে যেমন সময়মতো বৃষ্টি হতো, এখন তেমন হয় না। বন উজাড় হচ্ছে। গাছ কাটা হচ্ছে। সব শূন্য হয়ে গেছে। এসব কারণেও পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করার জন্য শুধু আমি একা কাজ করলে হবে না। সবার উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁত শিল্পের ওপরও প্রচণ্ডভাবে প্রভাব পড়েছে। আগে যেমন আমরা তুলা থেকে সুতা উৎপাদন করতাম, নিজেদের গাছের ফল দিয়ে সুতা রঙ করা থেকে শুরু করে অন্য কাজগুলো আমরা নিজেরাই করতাম। এখন সবকিছুর জন্যই বাজারমুখী হতে হচ্ছে। সুতা থেকে তুলা কিনতে হলেও বাজারমুখী হতে হচ্ছে। আগের মতো এ ধরনের কাজের কোনো কিছুর নিয়ন্ত্রণই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের হাতে বা এ সম্প্রদায়ের হাতে নেই।
লিপি রহমান
নির্বাহী পরিচালক
বাদাবন সংঘ
রামপালের আগের পরিবেশ এবং বর্তমানের পরিবেশ একদম ভিন্ন। এখন হয়তো বড় বড় রাস্তা হয়েছে, বড় বড় যানবাহন চলছে, কিন্তু অগের মতো সবুজ নেই। আগে মাটির রাস্তা থাকলেও এর দুই পাশে ধানক্ষেত ছিল, অনেক গাছপালা ছিল। মানুষ সহজ-সরল জীবনযাপন করত। আমরা যেটাকে মোংলা বন্দর বলি, একসময় মোংলা বন্দর দিয়েই মানুষ যাতায়াত করত। এখন নদীর নাব্যতা কমে গেছে এবং খাল-বিলগুলো শুকিয়ে গেছে। আশার কথা, এ এলাকার ৮৩টা খাল ও নদী পুনরায় খননের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার কারণে নদীগুলো লবণাক্ত হয়ে পড়ায় এখানে ধান চাষ নেই বললেই চলে। এ এলাকা দিয়ে গেলে দুই পাশে পানি আর পানি চোখে পড়বে। যা দেখতে সুন্দর কিন্তু লবণাক্ত পানি হওয়ায় এখানে আর ধান চাষ করা যাচ্ছে না। মানুষ এখানে মাছ চাষ করছে শুধু। সাতমারী বিল এলাকা আগে ধান উৎপাদনের জন্য জনপ্রিয় ছিল। এখানের জমিতে চাষাবাদ করলে মণ মণ ধান পাওয়া যেত। প্রথমত, লবণাক্ততার কারণে ধান উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। বলা বাহুল্য, এতে ভয়াবহ রকমের পরিবেশ দূষণ হবে। বিশেষ করে বারবার বিভিন্ন দুর্যোগ থেকে যে সুন্দরবন আমাদের বাঁচাচ্ছে, তাকে ভীষণ রকম ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কেননা বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে হাজার হাজার কলকারখানা গড়ে উঠছে। যেমন সিমেন্ট, পেট্রোলিয়াম গ্যাস। একের পর এক জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। অনেকে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে আমরা দেখছি কৃষির সঙ্গে জড়িত এ এলাকার নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে যে নারীদের জীবনযাত্রা কৃষির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়টা যেমন আছে, তেমনি এখানে আমি বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করব, যাদের সঙ্গে আমি কাজ করছি। আমরা যখন মত্স্যজীবী শব্দটা ব্যবহার করি তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের চোখে পুুরুষদের কথা ভেসে ওঠে। কিন্তু এখানে আমি নারী মত্স্যজীবীদের কথা বলব। তারা যেমন জাল ফেলে মাছ ধরছেন, তেমনি নৌকা নিয়ে গভীর সাগরে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে তাদের বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নারীপ্রধান পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার বা যে নারী বিধবা তাদের ওপর। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশাসনের উদাসীনতার বিষয়টিও উল্লেখ্য। প্রশাসন পুরুষ মত্স্যজীবীদের যেভাবে পেশাগত স্বীকৃতি দিচ্ছে, নারী মত্স্যজীবীদের সেভাবে দিচ্ছে না। এতে কার্ড না থাকায় নারী মত্স্যজীবীরা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা নিজেদের জন্য কোনো সংগঠন করতে পারছেন না। আম্পানের সময় আমরা দেখেছি বাঁধের ওপর ২১০টি ঘর ভেঙে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী মত্স্যজীবীরাই। অথচ তারা তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি।
মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী
নির্বাহী সদস্য
স্পার্ক ও সদস্য, সাংগাত
শুধু আদিবাসী নারী না, আদিবাসী পুরো জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রকৃতির চরমভাবে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা যেমন বলে থাকি যে ধরিত্রী আমার না, আমিই ধরিত্রীর। কিন্তু বাজারমুখী ও পুঁজিবাদী যে চিন্তাভাবনাগুলো আছে, সেখানে ধরিত্রীকে ভোগ করার, পৃথিবী মাকে ভোগ করার প্রবণতা রয়েছে। যেটা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মধ্যে কখনই ছিল না। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে নানা ধরনের মিথ প্রচলিত রয়েছে যে তারা জংলি, তারা শিকার করে, তারা জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে ফেলছে, তারা জুম চাষ করে পাহাড় ধ্বংস করছে, পাহাড়ের গাছপালা ধ্বংস করছে—এ সবগুলোই কিন্তু মিথ। আর মিথগুলো এসেছে পুঁজিবাদী চিন্তাভাবনা থেকে। শোষকগোষ্ঠীর প্রপাগান্ডা ও ‘আদারিং’ করার প্রবণতা থেকে। বছরের পর বছর ধরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ ওখানে জুম চাষ করে এসেছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এসেছে। এ সম্প্রদায়ের যারা ‘হান্টার’ ও ‘গ্যাদারার’ হিসেবে আছেন, তারা যখন শিকার করতে যান, তারা কিন্তু কিছু নিয়ম অনুসরণ করেন। যেমন যে পাখির বাসায় ডিম রয়েছে, সেটা তারা নেবেন না, কমপক্ষে তিনটা পাখির বাসা ফেলে গিয়ে তারপর তারা তা নেবেন। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য তারা এ ধরনের কিছু নিয়ম-নীতি অনুসরণ করেন। কিন্তু ষাটের দশকের কাপ্তাই ড্যাম হওয়ার পরে আমরা বিশাল জমি হারালাম, প্রকৃতি ও পাহাড়কে হারালাম। এরপর পুঁজিবাদী ও শোষকগোষ্ঠীর যে প্রভাব দেখা গেল, তার ফলেই কিন্তু পাহাড় ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে। আমরা যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব কতগুলো ইটভাটা সেখানে আছে! পাহাড়ের আদি গাছ কেটে ফেলে ও বন ধ্বংস করে সেগুন বাগান করা হচ্ছে। পাহাড়ের মানুষ কি সেগুন বাগানের কাঠ দিয়ে তৈরি আসবাব ব্যবহার করছে? তাহলে এগুলো কারা ব্যবহার করছে। পাহাড়ের সমস্যাগুলো উপলব্ধি করার জন্য এ বিষয়গুলো বোঝা জরুরি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে যে আইনগুলো করা হয়, আমরা দেখেছি ওই আইনগুলো চশমা লাগানো জায়গা থেকে আসে, যেখানে সবসময়ই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগোষ্ঠীকে প্রকৃতির শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ জায়গাটা থেকে যখন চিন্তা করা হয়, তখন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণের জন্য আমাদের যে সহমর্মিতা, সহানুভূতি থাকা দরকার তা আর থাকে না। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের পোশাক, সংস্কৃতি, খাবার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা লাউ শুকিয়ে তার মধ্যে লবণ রাখি। যখন কোনো ফসল বেশি উৎপাদিত হয়, যেমন কাঁঠাল, মুলা বা বিভিন্ন ধরনের মাছ আমরা শুকিয়ে রাখি। যাতে বছরে চাষাবাদের সময় ছাড়াও তা সংরক্ষণ করা যায়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা ধরিত্রীর সঙ্গে প্রচণ্ডভাবে সম্পর্কিত। আমি তাই বারবার একটি বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে এক ধরনের মিথ চলে যে তারা প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে। আমার মনে হয়, বিষয়টি সম্পর্কে সবার ওয়াকিফহাল হওয়া দরকার।
ফৌজিয়া খন্দকার
নির্বাহী পরিচালক (স্বেচ্ছাব্রতী), প্রাগ্রসর
সদস্য, সাংগাত
আলোচনার শুরুতেই আমি বলতে চাই, আমি নারী, সারা পৃথিবী আমার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র। আমরা আজ যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে কথা বলছি, নারী হিসেবে সেটার জন্য আমিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। আমি যে শ্রেণী-পেশার নারী হই না কেন, এর প্রভাব দ্বারা আমি প্রভাবিত। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী, প্রতিবন্ধী নারী ও প্রান্তিক নারীরা তো বটেই। নারীর শরীর একজন শিশুর বা মানুষের প্রথম খাদ্য বিতরণ করে। ধরিত্রীকে আমরা বলি ধরিত্রী মাতা। কেন আমরা ধরিত্রীকে মাতা বলি, কারণ নারী যেমন সৃজনশীল, জন্ম দেয়, ধরিত্রীও সৃজনশীল ও জন্ম দেয় এবং ধরিত্রীই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রকৃতির মধ্যে শুধু মানুষ নয়, আরো অনেক কিছু রয়েছে। তাই প্রকৃতিকে যে আমরা নির্মমভাবে নিঃশেষ করছি, তাই সবকিছুর কাছেই আমরা দায়বদ্ধ। প্রকৃতির যে অন্যান্য জীবজন্তু, জীববৈচিত্র্য রয়েছে, সবকিছুর কাছেই আমরা ঋণী এবং জবাবদিহি করতে বাধ্য। নারীর শরীর যেমন প্রথম খাদ্য সরবরাহ করে, তেমনি আমরা জানি নারীই প্রথম কৃষিকাজের আবিষ্কারক। প্রকৃতির সঙ্গেও নারীর শরীর সম্পর্কযুক্ত। পূর্ণিমা অমাবস্যার সময় কিন্তু নারীর শরীরের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তাই আমার মনে হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টা সব নারীর জন্যই বেশি, তবে যারা দরিদ্র নারী, সবচেয়ে বেশি শোষিত নারী, তাদের কথাটা সবার আগে বলা খুবই প্রয়োজন। এখন আমরা বোতলে পানি নিয়ে ঘুরি, কিছুদিন পরে হয়তো আমাদের বোতলে অক্সিজেন নিয়ে ঘুরতে হবে। করোনার কারণে আমরা অনেক বিষয় জানছি। তাই মনে রাখতে হবে আমরা নিজেরাও কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করছি, যদি আমার বাড়িতে চার থেকে পাঁচটি এসি চলে, গাড়ি চালাই, প্লাস্টিক ব্যবহার করি প্রতিদিন, প্লাস্টিক উৎপাদন করি, তাহলে আমি নিজেই কিন্তু একজন আসামি। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি নিজে না পরিবর্তিত হই, অন্যকে কীভাবে বলব। তাই প্রথম কাজ হচ্ছে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করা। প্রকৃতি আমাদের এত দেয় কিন্তু প্রকৃতিকে আমরা সেটা ফিরিয়ে দিই না। সবসময়ই আমরা প্রকৃতির প্রতি অবিচার করি। আমি মনে করি, নারী আন্দোলন থেকে পরিবেশ আন্দোলনকে বিচ্যুত করা যাবে না। এ দুটোকে আলাদা করা উচিত নয়। এগুলোকে আমাদের সমন্বিত বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কারণ পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু নারী। তাই আমরা যারা বিভিন্ন সংগঠনের হয়ে কাজ করছি, তাদের খেয়াল রাখতে হবে পুঁজিবাদের করাল গ্রাস থেকে কীভাবে আমরা নিজেদের বের করে নিয়ে আসতে পারি এবং সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারি এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারি, সেই জায়গাটা নিয়ে আসলে আমাদের কাজ করতে হবে। প্রশিক্ষণ ও আলোচনার মাধ্যমে আমাদের যার যার নিজেদের জায়গা থেকে পরিবর্তন করতে হবে।
লাকী আকতার
নির্বাহী সদস্য
বাংলাদেশ কৃষক সমিতি
বর্তমানে করোনা মহামারী চলছে। গত বছর প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণাকালে বলা হয়েছিল এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। কিন্তু আমরা যদি বাস্তবতার দিকে তাকাই তবে দেখি যে কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসলের লাভজনক দাম না পেয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। প্রতি বছর আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে আমি হাওরে গিয়েছিলাম, পত্রপত্রিকা মারফত আমরা জেনেছিলাম যে এটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে যত গভীরে অনুসন্ধান করতে থাকি, জানতে পারি যে কীভাবে মানবসৃষ্ট দুর্যোগে বিপর্যস্ত হচ্ছে হাওরাঞ্চল। মানবসৃষ্ট দুর্যোগ কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হচ্ছে। সেসময়ে যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের অনেকেই কৃষি কাজ কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এভাবে প্রচুর জমি অনাবাদি রয়ে যাচ্ছে। এদিকে যারা উৎপাদন করছেন, তারা ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। এভাবে কৃষক ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। কৃষিজমি চলে যাচ্ছে করপোরেটদের হাতে। সত্যিকার অর্থে কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। কিছু জায়গায় প্রকৃতি এমনভাবে রুষ্ট হয়েছে, জমির উর্বরা শক্তি নেই, নদীর নাব্যতা নেই, নাব্যতা ফেরাতে পর্যাপ্ত ড্রেজিং নেই। ফসল উৎপাদনের মানচিত্রই বদলে গেছে। আগে যেখানে ধান চাষ হতো, সেখানে তরমুজ, বাঙ্গি বা বাদাম চাষ হচ্ছে। ফসল চাষাবাদের ধরন পাল্টে গেছে। আবার যে ফসল উৎপাদন করে কৃষক তুলনামূলক কিছুটা বেশি দাম পাচ্ছেন, তখন তিনি ওই ফসল উৎপাদনে ঝুঁকছেন। আমি যখন কৃষক সমিতির কাজে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গায় গিয়েছি, তখন দেখেছি প্রচুর কৃষক তামাক চাষ করছেন। অনেকের হাতে ফোস্কা পড়ছে, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা হচ্ছে। প্রচুর শারীরিক সমস্যা হওয়া সত্ত্বেও তারা বলছেন, তামাক উৎপাদনের জন্য তাদের বীজ ও অন্যান্য সুবিধা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা যখন ধান চাষ করতে যাচ্ছেন তখন তারা বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ পাচ্ছেন না। তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হচ্ছে না। ফলে তারা তামাক চাষে বাধ্য হচ্ছেন বা তাদের বাধ্য করা হচ্ছে। কৃষক হিসেবে নারীদের স্বীকৃতি নেই। অথচ কৃষির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রায় ২০ ধরনের কাজের সঙ্গে নারীরা যুক্ত। নারীরা কৃষক হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছেন না, অথচ নারীরা একাধারে খাদ্য উৎপাদক, বীজ ও লোকায়ত জ্ঞানের সংরক্ষক। তাছাড়া নারীরা ক্ষেতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, খাদ্য প্রস্তুত করছেন, প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ করছেন। অথচ বেশির ভাগ জমি পুরুষের হাতে, নারীর মালিকানায় জমি অনেক কম। তাই এক্ষেত্রে নারীদের অবস্থাটা অনেক বেশি করুণ। নারীরা কৃষিসেবা থেকেও বঞ্চিত। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণসহায়তা নেই। বাজার ব্যবস্থার অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের প্রবেশাধিকার নেই। নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তো অনেক দূরের ব্যাপার। অনেক ক্ষেত্রেই এ নারীরা পর্যাপ্ত খাবার বা তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগানটুকু পাচ্ছেন না। আমরা দেখি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফসলের দাম না পাওয়ার কারণে মাঠ থেকেই কৃষক তার উৎপাদিত ফসল ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। সার, বীজের নিয়ন্ত্রণ কৃষকদের কাছ থেকে চলে যাচ্ছে। কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের বস্তা কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে বিক্রির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। নারীরা তো যেতেই পারেন না।
আনু মুহাম্মদ
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমাদের অর্থনীতিবিদরা একমুখী কিংবা খণ্ডিত বিচার-বিশ্লেষণে অভ্যস্ত। সে বিচার-বিশ্লেষণ অনুযায়ী এগুলো উন্নয়নের প্রধান চিন্তা। কারণ এভাবেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। প্রাকৃতিক উেসর বদলে আমরা যত বোতলজাত পানি খাব, তাতে আমাদের জিডিপি বাড়বে। আজ আমরা করোনার মধ্যে মাস্ক পরছি। এ মাস্ক পরাটা পৃথিবীর কিছু দেশে উঠে যাবে, যেমন ইসরায়েলে উঠে গেছে। কিন্তু ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ যে পর্যায়ে তাতে মাস্ক পরাটা স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হবে। করোনার প্রকোপ চলে গেলেও দূষণের কারণে বেঁচে থাকার জন্য মাস্ক পরতে হবে। তার সঙ্গে বোতলজাত বা পোর্টেবল অক্সিজেনের বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়। আমাদের যদি নিয়মিত মাস্ক পরতে হয়, বোতলজাত পানি পান করতে হয় এবং অক্সিজেন বহন করতে হয় তাহলে এগুলোর সবই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে, অর্থাৎ আমরা যে ধরনের উন্নয়নের কথা বলছি। আর এর মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও হবে। সুন্দরবন যেভাবে পুরো বাংলাদেশকে রক্ষা করে, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে রক্ষা করে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, তা জিডিপি দিয়ে মাপা যায় না কখনো। কিন্তু সুন্দরবন নষ্ট করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিমেন্ট কারখানার মতো যেগুলো এখন হচ্ছে, তার সবগুলোই কিন্তু জিডিপি বাড়াচ্ছে। তার মানে বৈশ্বিকভাবে কিংবা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও উন্নয়ন চিন্তার মধ্যে এমন একটা ধরন তৈরি হয়েছে, সেখানে মানুষ আসলে উন্নয়ন হচ্ছে বলে যা ভাবছে, সেখানে সে মূলত উন্নয়নের নামে তার ধ্বংসের জন্য বৈধতা দিচ্ছে। ভবন তৈরি হচ্ছে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে কিন্তু বিপরীতে আমরা কী হারাচ্ছি, তার কোনো হিসাব নেই। আমাদের উন্নয়ন গল্পে সমীকরণের একটা দিক দেখানো হচ্ছে। উন্নয়ন যাত্রায় কে হারাচ্ছে আর কে ভোগ করছে? এ প্রশ্নের উত্তরও অনুপস্থিত। কতগুলো ভবন হলো? কিংবা কতটা রাস্তা হলো? এগুলো কিসের বিনিময়ে কী ধ্বংসের বিনিময়ে কিংবা কী হারানোর বিনিময়ে হলো? যা হারালাম তা কে হারাল? যেটা পাওয়া গেল তা কে পেল? কার টাকা কোথায় গেল? যে সম্পদটা তৈরি হচ্ছে, এসবের মালিকানা কার হাতে যাচ্ছে? এ প্রশ্নগুলো সবসময় অনুচ্চারিত ও উহ্য থাকে। তাই মানুষ দ্যাখে যে উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু সে শ্বাস নিতে পারে না। উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে না, মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, নারীদের ওপর নিপীড়ন বাড়ছে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কিংবা সংখ্যালঘু জাতি যারা আছে, তারা আরো বেশি প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন হচ্ছে অথচ সমাজের মধ্যে বিদ্বেষ, সহিংসতা, হিংসা বেড়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন সমীকরণের উভয় দিকটা যদি আমরা পর্যালোচনা করতাম যে কার বিনিময়ে কারা লাভবান হচ্ছে, তাহলে দেখতে পেতাম সমষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর ব্যক্তি লাভবান হচ্ছে। এই যে ব্যক্তির লাভের বিনিময়ে সমষ্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বা সমষ্টির বিনিময়ে ব্যক্তিকে লাভবান করার যে অর্থনীতি রাজনীতি, একে আনুষ্ঠানিকভাবে নিও-লিবারেল ক্যাপিটালিস্ট মডেল বলা হয়। ধরিত্রী কি আমাদের, না আমরা ধরিত্রীর—এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বর্তমান সময়ে এটা প্রধান মনোযোগের জায়গা হওয়া উচিত যে কে মালিক? নিও-লিবারেল ক্যাপিটালিজমের যে আগ্রাসন, সেখানে তার আকাশ এবং পাতালের মাঝখানে যা কিছু আছে—বাতাস, নদী, পানি, বন, মানুষ, মানুষের শরীর, নারীর শরীর এবং সমস্ত কিছু পুঁজির মালিকানায় যাবে এবং সমস্ত কিছু হতে হবে মুনাফার জন্য। যা দিয়ে মুনাফা হবে না, তা করা যাবে না। যে বন আমাদের দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করে, আমাদের সমর্থন দেয়, আমাদের শরীর-মনকে বাঁচায়, আমাদের সন্তানকে বাঁচায়, সে বন মুনাফালোভীদের দৃষ্টিতে পরিত্যাজ্য। তার কাছে গ্রহণযোগ্য এমন গাছ, যে গাছে বাণিজ্য হবে। সুতরাং আপনারা দেখতে পাবেন যে বাংলাদেশে ইউএসএইড, বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বন উন্নয়নের বহু রকম প্রকল্প আছে, সে প্রকল্প অনুযায়ী এমনসব গাছ লাগানো হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কিন্তু সে গাছগুলো বাজারের জন্য উপযোগী। সবকিছু ব্যক্তিমালিকানার, মুনাফার মালিকানায়, পুঁজির জন্য করার প্রবণতার এ চিত্র বর্তমানে বৈশ্বিক একটি চিত্র, যেটা আমরা নিও-লিবারেল ক্যাপিটালিজমে দেখি। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাণবৈচিত্র্যের বিনাশ, রামপাল থেকে শুরু করে অন্য যত উন্নয়ন প্রকল্প আছে, যেখানে সব জায়গায় আমরা জোরজবরদস্তির বিষয়টি দেখি। গোটা উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে ত্রাসের উন্নয়ন প্রকল্প। ঢাকা শহরে উন্নয়নের দুটো বিপরীত চিহ্ন আমরা দেখি। এক. খুব দামি প্রাইভেট কার। দুই. ভাঙাচোরা গণপরিবহন। গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার প্রান্তিক অবস্থা কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি, হাসপাতাল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত অবস্থা। সবকিছুকে ব্যক্তিমালিকানায় নিয়ে যাওয়া ও মুনাফার লক্ষ্যে পরিচালিত করার বিষয়টি শক্তিশালী একটা ধারায় পরিণত হয়েছে। সেখানে ভোগবাদিতা একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ও অবলম্বন। গাছ কেটে উষ্ণতা বৃদ্ধির বিপরীতে এসির ব্যবহার—এ প্রক্রিয়ার ওপরই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। ধরিত্রী দিবস উপলক্ষে বিশ্বনেতারা ভার্চুয়ালি উপস্থিত হয়েছেন। একদিকে ছিলেন ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা, যারা সারা পৃথিবীকে বিপর্যস্ত করার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি, যারা নিজেদের দেশে নিজেদের উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নিজ পায়ে কুড়াল মারছেন। আমরা দুটো বিপদের মধ্যে আছি—একটা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও করোনা; যা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সারা পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই কিন্তু এ ধরনের ভাইরাসগুলো আরো নতুন নতুনভাবে আগ্রাসন চালাতে পারে। এদিকে সর্বজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা পাবলিক হেলথ কেয়ার থেকে সরে যাওয়ার কারণে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিপর্যয়ের কারণে মানুষের বিপদ বেড়েছে। পূর্ণ রেশনিং ব্যবস্থা থেকে সরে আসার কারণে মানুষের বিপদ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ধরনের প্রভাব পড়বে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয়। আমরা বিভিন্ন সম্মেলনে গিয়ে শুধু টাকা চাই কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যাতে কম হয়, সেজন্য তো আমাদের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। যাতে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার সক্ষমতা থাকে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে তুলবে। বাঁশখালী, মাতারবাড়ী থেকে শুরু করে রামপাল, পায়রা পুরো কোস্টাল জোনে একের পর এক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হচ্ছে। এগুলো জিডিপি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করবে কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এগুলো ভয়ংকর রকমের সর্বনাশা প্রকল্প। অন্যদিকে নদীকে ঘিরে এমনসব প্রকল্প করা হচ্ছে, যার ফলে নদী দখল হচ্ছে, সেখানে বড় বড় ভবন উঠছে, জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে বা নদী নর্দমায় রূপ নিচ্ছে। যেমন বুড়িগঙ্গা। এগুলোর সবই কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের ফসল।
শ্রুতলিখন: রুহিনা ফেরদৌস






