মানুষের জীবনচক্রে পাঁচটি স্তর—শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রবীণ ও বৃদ্ধ বয়স। এ পাঁচটি স্তরের মধ্যে বৃদ্ধ বয়সে মানুষ শৈশবের মতোই অসহায় হয়ে পড়ে। ষাটোর্ধ্ব বয়সে মানুষ ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় যাত্রা করে। এ সময়ে বয়োবৃদ্ধিজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় মানুষ আক্রান্ত হয়। বয়স বৃদ্ধির সাথে ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় আক্রান্ত হতে পারে নানামুখী সংক্রামক রোগে। একই সাথে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, চলাফেরার অক্ষমতা, দাঁতের সমস্যার কারণে খাদ্যদ্রব্য চিবিয়ে খেতে না পারা, কানে কম শোনা, হাড়ক্ষয়সহ নানা বার্ধক্য রোগে আক্রান্ত হয়। উন্নত বিশ্বে প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সহায়তা ও কল্যাণমূলক নানা কর্মসূচি থাকায় সেখানে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নত দেশ জাপানে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক বয়োজ্যেষ্ঠ। আর্থসামাজিক উন্নয়নের ফলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। একই সাথে ছোট পরিবার গড়ে তোলার কারণে কমছে স্বল্পবয়সী যুবক-যুবতীর সংখ্যা। ফলে বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশেও একইভাবে ঘটছে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন। নীতিনির্ধারকদের গবেষণা রিপোর্টে এ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পিরামিড কাঠামোয় দেখা দেবে লক্ষণীয় পরিবর্তন। এ পরিবর্তনের ঢেউ বিশ্বব্যাপী, ফলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নবিষয়ক নীতিনির্ধারণে বিষয়টি বিশেষ তাত্পর্যপূণ ভূমিকা রাখে। বয়োবৃদ্ধির এ ধারায় দেশে প্রবীণবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। গড়ে তুলতে হবে প্রবীণদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র, নিশ্চিত করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যবস্থা। সর্বোপরি প্রবীণদের সেবায় গড়ে তুলতে হবে প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী ও বৃদ্ধ নিবাস।
বাংলাদেশে প্রবীণদের বর্তমান পরিস্থিতি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে দেশে মোট জনসংখ্যার ৮% বয়োজ্যেষ্ঠ, যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। বর্তমান গড় আয়ু ৭১ বছর। সাম্প্রতিক গবেষণা রিপোর্টে ২০৫০ সালে দেশে বয়োজ্যেষ্ঠর সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছবে, যা মোট জনসংখ্যার ২৫.৯০% হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে (Ref: Ageing population in Bangladesh; Health Age Asia, 2019)। এর অর্থ দাঁড়ায় ২০৫০ সাল নাগাদ প্রতি পাঁচজনের একজন প্রবীণ ব্যক্তি থাকবেন। এখানে বয়োজ্যেষ্ঠ বলতে ষাটোর্ধ্ব জনসংখ্যাকে ধরা হয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে প্রবীণদের কল্যাণে তেমন কোনো সুব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। প্রবীণদের কল্যাণে যেসব অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন যেমন—বৃদ্ধদের জন্য প্রথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, বৃদ্ধ নিবাস, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যবস্থা, আর্থিক সাহায্য, পুষ্টিকর খাদ্য ইত্যাদি সরবরাহের ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। অধিকন্তু এ দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী ষাটোর্ধ্ব বয়স থেকে কর্মহীনতা, আর্থিক প্রবঞ্চনা, পুষ্টিহীনতা, নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পারিবারিক অবহেলা, নিঃসঙ্গতাসহ নানা জটিল অবস্থার ভেতর দিয়ে দিনযাপন করে। শহরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মাঝে এ অবস্থা তেমন একটা পরিলক্ষিত না হলেও নিম্নবিত্ত ও গরিব জনগোষ্ঠীর মাঝে বঞ্চনার এ মাত্রা লক্ষণীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের জনগণ পারিবারিকভাবে প্রবীণদের প্রতি যত্নশীল ও শ্রদ্ধাশীল হলেও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের কারণে দিন দিন এ অবস্থার অবক্ষয় হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ছোট পরিবার, অভিবাসন ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব ইত্যাদির কারণে পারিবারিক এ ঐতিহ্য ক্রমশ বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠী অনেকটা অবহেলা ও নিঃসঙ্গতায় জীবন অতিবাহিত করছে।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় প্রবীণ বয়সে গ্রামীণ ও শহুরে চিত্র: বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে দেশের ৭৬.৭% জনগণ গ্রামে বাস করে। গ্রামের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী দরিদ্র অধিবাসী হওয়ায় প্রবীণ বয়সে সেবাযত্নের সুবিধা পাওয়ার বঞ্চনা আরো প্রকট। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ধীরগতি এবং এর সুফল জনগণের দোরগোড়ায় সঠিকভাবে না পৌঁছানো এ প্রবঞ্চনার আরো একটি কারণ। জীবনের মৌলিক চাহিদা যেমন—পুষ্টিকর খাদ্য, বস্ত্র, নিরাপদ পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আশ্রয়ের অভাব, সেই সাথে হাসপাতাল, বিনোদন কেন্দ্র, বিপণিবিতান ইত্যাদি নেই বললেই চলে। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকলেও সেখানে নেই কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব। গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থসেবা এমনিতেই নাজুক, তার ওপর প্রবীণদের জন্য আলাদা কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। দেশে বিরাজমান বেকারত্বের কারণে অনেক যুবক-যুবতীকে কর্মহীন হতে দেখা যায়। ফলে তাদের পক্ষে বৃদ্ধ মা-বাবার খরচ বহন করাও অনেকটা দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে গ্রামাঞ্চলে নিম্নবিত্ত ও গরিব জনগোষ্ঠীর অনেক প্রবীণ ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিয়ে থাকে। কর্মহীন জনগোষ্ঠীর এ চাপে সমাজে নানা ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়।
বাংলাদেশের সামাজিক ঐতিহ্যে সাধারণত বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতা পুত্রসন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়। প্রবীণ বয়সে পিতা-মাতা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। তার মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হাড়ক্ষয়, শ্বাসকস্ট, অ্যাজমা, কিডনির অকার্যকারিতা, ক্যান্সারসহ নানারূপ বার্ধক্যজনিত রোগ। পরিবারে যথার্থ উপার্জনক্ষম সন্তান না থাকলে পিতা-মাতার ভরণপোষণের পর এসব ব্যয়বহুল খরচের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা অনেকটা দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে প্রবীণ ব্যক্তি নিজের পরিবারে আপনজন কর্তৃক নানা অবহেলা ও নিপীড়নের শিকার হন। অনেক পরিবারে এমনও দেখা যায় পিতা-মাতাকেই বৃদ্ধ বয়সে সন্তানসন্ততির ব্যয়ভার বহন করতে হয়। সে কারণে আমরা অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকেও উপার্জনের জন্য রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা কিংবা অন্য কোনো কায়িক পরিশ্রমে জীবনযাপন করতে দেখি। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নীতিনির্ধারকদের আগে থেকে সতর্ক না হলে আগামী সময়ে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।
শহরের জীবন গ্রামের জীবন থেকে ভিন্নতর হলেও এখানে রয়েছে নগরজীবনের ব্যস্ততা। অধিকাংশ পরিবারে বৃদ্ধরা সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান সঠিকভাবে পান না। শহরে কর্মব্যস্ত জীবনে সন্তানসন্ততি বৃদ্ধ মা-বাবাকে সময় দিতে পারে খুবই কম। ফলে নিঃসঙ্গ অবস্থায় অযত্ন, অবহেলায় কায়ক্লেশে কাটে বৃদ্ধদের জীবন। নগরজীবনে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও প্রবীণদের জন্য এখনো গড়ে ওঠেনি আলাদা কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা। শহরের জীবন অনেকটাই ব্যয়বহুল। ফলে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারে বৃদ্ধ মা-বাবার আশ্রয় জুটলেও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে এবং দরিদ্র পরিবারে তাদের অবস্থান অনেকটাই কোণঠাসা অথবা আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রমে। পাশ্চাত্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বৃদ্ধাশ্রম থাকায় এটিকে বৃদ্ধ বয়সে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বেশকিছু বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। তদুপরি রয়েছে আধুনিক সুযোগ ও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব। তথাপি আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক অসহায় বৃদ্ধ ও প্রবীণ বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিচ্ছেন।
ভৌগোলিক ও জলবায়ুজনিত প্রভাব: ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় একটি সাংবাৎসরিক বিষয়। প্রতি বছর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঝড় ও নদীভাঙনে ভিটে-মাটি ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এসব দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রবীণ জনগেষ্ঠী। ক্ষুধা, আশ্রয়হীনতা, রোগশোকে আক্রান্ত এ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যে সাহায্য দেয়া হয় তা চাহিদার তুলনায় একবারে অপ্রতুল। ফলে জীবনধারণের জন্য এ জনগোষ্ঠী আশ্রয় নেয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। ক্ষুধা, আর্থিক সামর্থ্যহীনতা, আশ্রয়ের অভাবে প্রবীণ এ নিপীড়িত জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বাংলাদেশে আশ্রয়হীন এসব জনগোষ্ঠীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান অদ্যাবধি তৈরি করা হয়নি। উপকূলীয় জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের জনজীবনে তীব্র নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে।
বয়স্কদের প্রতি নিপীড়ন: হেল্প এজ গ্লোবাল নেটওয়ার্কের গবেষণায় উঠে এসেছে বিশ্বব্যাপী প্রতি ছয়জন প্রবীণ ব্যক্তির মধ্যে একজন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এ তথ্য সত্য হলেও বাস্তবে বৃদ্ধদের প্রতি নিপীড়ন অনেকটাই দৃশ্যের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন ঘটনায় বৃদ্ধদের প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও অবহেলা বৃদ্ধির চিত্র ক্রমাগত পরিলক্ষিত হচ্ছে। মিডিয়ার বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে চলাচলে অক্ষম বৃদ্ধ বাবা-মাকে সন্তানসন্ততিরা কোনোরূপ ভরণপোষণ করছে না এবং কখনো কখনো রাস্তাঘাট, রেলস্টেশন কিংবা বাসস্টেশনে ফেলে নিরুদ্দেশ হচ্ছে। এসব পিতা-মাতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্মৃতিভ্রষ্ট থাকে কিংবা রাস্তাঘাট অপরিচিত থাকায় নিজের আশ্রয়স্থলে ফিরে যেতে অক্ষম। বৃদ্ধদের প্রতি এ ধরনের আচরণ পরিবারের অতি নিকটজন যেমন থাকে তেমনি বৃদ্ধাশ্রম ও অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্রের পরিচর্যায় নিযুক্ত সেবাকর্মীর মাধ্যমেও হতে পারে।
বিশ্ব প্রবীণ দিবসে এ ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং নিপীড়ন বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে পিতা-মাতার প্রতি এ ধরনের নিপীড়ন বন্ধে বাংলাদেশ সরকার পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করে থাকলেও বাংলাদেশের নিপীড়িত পিত-মাতারা সন্তানের বিরুদ্ধে কোনোরূপ আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। পরিবার ও বৃদ্ধাশ্রমে সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তির মাধ্যমে প্রবীণ জনগোষ্ঠী নিম্নরূপভাবে নিপীড়নের শিকার হয়:
শারীরিক সহিংসতা: শারীরিক আঘাত, ক্ষতিকর ড্রাগের ব্যবহার, আশ্রয়স্থলে কিংবা অন্য কোনোভাবে আবদ্ধ করার মাধ্যমে।
আবেগপূর্ণ: ভীতি প্রদর্শন, অবমাননা করা, অকারণে প্রাত্যহিক দোষারোপ, অবহেলা, ভর্ত্সনা, পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব থেকে পৃথক করে রাখা।
যৌন নিপীড়ন: আশ্রয়কেন্দ্রে সেবাদানকারী ব্যক্তির মাধ্যমে কিংবা পরিবারে নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার।
অবহেলা: ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে সঠিকভাবে খাদ্য, নিরাপদ পানি, আশ্রয়, পোশাক-পরিচ্ছদ, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ না করা, প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কর্মে কিংবা অন্য সব জরুরি কর্মে সহায়তা না করার মাধ্যমে।
আর্থিক প্রবঞ্চনা: বৃদ্ধ কিংবা প্রবীণ ব্যক্তির অগোচরে তার অর্থকড়ি, সম্পদ ভোগ করা এবং অর্থের ব্যবহারে তাদের সম্মতি না নেয়ার মাধ্যমে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে গৃহীত সরকারি ব্যবস্থা: বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ধারায় জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মনের দৃঢ় উন্নতিসাধনে অন্ন, বস্ত্র্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা, কর্মের অধিকার, বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ১৫(ঘ) ধারায় প্রবীণদের মৌলিক অধিকারের নিশচয়তা দেয়া হয়েছে নিম্নরূপভাবে:
সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃ-পিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার থাকবে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার দেশের বয়োজ্যেষ্ঠ দুস্থ ও স্বল্প উপার্জনক্ষম অথবা উপার্জনে অক্ষম বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে এবং পরিবার ও সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি চালু করে। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ৪৯ লাখ বয়স্ক ব্যক্তিকে জনপ্রতি মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতাকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য ‘পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে, পিতা-মাতার একই সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে, পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের কোনো বৃদ্ধনিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করবে না। প্রত্যেক সন্তান তার পিতা-মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবে। পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তান হতে পৃথকভাবে বসবাস করলে সন্তানকে নিয়মিতভাবে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। পিতা-মাতা সন্তানের সাথে না থেকে পৃথকভাবে বসবাস করলে সন্তান তার মাসিক বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসংগত অর্থ পিতা-মাতাকে প্রদান করবে। পিতা-মাতার অবর্তমানে বৃদ্ধ দাদা-দাদি, নানা-নানির ভরণপোষণ করবে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের জন্য মাসিক পেনশনের ব্যবস্থা রয়েছে।
সরকার প্রবীণদের কল্যাণে নানা কর্মসূচি চালু করলেও জনসংখ্যা অনুপাতে তা নিতান্তই অপ্রতুল। প্রবীণরা সমাজের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। তাদের প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও মেধাকে নিয়োজিত করে সমাজের ইতিবাচক কল্যাণ ও সুফল বয়ে আনতে পারে। সমাজে প্রত্যেক প্রবীণের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে পরিপূর্ণ জীবন ভোগ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে হবে।
হোসনে আরা আক্তার: সভাপতি
পূর্ণায়ু সিনিয়র সিটিজেনস সমাজকল্যাণ সংস্থা





