তিন প্রজন্মের প্রতিনিধি একসঙ্গে নাশতার টেবিলে বসলে একইজাতীয় খাবার কি তাদের সমভাবে তৃপ্ত করবে? না, সেটা করে না বলেই সাধারণত দাদাকে রুটি, বাবাকে ব্রেড ও নাতিকে নুডলস পরিবেশন করা হয়! আচ্ছা, আপনার শৈশবেও কি সকালে একইভাবে ভিন্ন আইটেম তৈরি করা হতো? তাহলে এখন হচ্ছে কেন? তার চেয়ে বড় কথা হলো—খাদ্যাভ্যাসে ভিন্নতা কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণে পার্থক্য সৃষ্টি করে? বেশিমাত্রায় গরুর মাংস ও পেঁয়াজ খেলে তার আচরণ কি যারা এগুলো খায় না, তাদের থেকে ব্যাপকভাবে ভিন্নতর হয়?
‘ডিম আগে না মুরগি আগে’র মতো আরেকটা ক্ল্যাসিক বিতর্ক হতে পারে। সেটা হলো আপনার লাইফস্টাইলের পরিবর্তনসংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর চাহিদা বাড়ায়; নাকি ভোগকৃত পণ্যগুলো মানুষের জীবনধারা বদলে দেয়? অর্থাৎ বিশেষ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্যই আপনার ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা দরকার; নাকি গাড়ি কেনার মাধ্যমে আপনি সমাজের বিশেষ স্তরের সদস্য বলে গণ্য হন?
সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এ ব্যাপারে উপসংহারে পৌঁছা প্রায় অসম্ভব। তবে এটা অনুমেয়, আমাদের ভোগ প্রবণতার সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও বিস্তৃত। শিশুদের কেন্দ্রে রেখে ভাবনা প্রসারিত করা যৌক্তিক মনে হয়েছে— কারণ তারাই তো আমাদের বহুল প্রত্যাশিত উত্তরাধিকার। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে আলোকপাত করাই আজকের নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
যোগাযোগ—আস্থা বনাম সন্দেহ!
আমাদের শৈশবে বাসায় একটা টেলিফোন সংযোগ—চাঁদ হাতে পাওয়ার চেয়ে কম আনন্দের ছিল না। তখন সেটা পাওয়ার জন্য প্রভাবশালীদের সুপারিশেও অনেক সময় কাজ হতো না। শুনেছি এখন নাকি সেটা ফ্রিতে দেয়া হয়। তার পরও ঠিক কয়জন বাসায় ল্যান্ডফোন সংযোগ পেতে আগ্রহী হয় বলে আপনার মনে হয়? সেটা কেন হবে? প্রত্যেক বাসায় এখন (কাজের ভৃত্য, বুয়া সমেত) মোট সদস্যের চেয়ে, টেলিফোনের সংখ্যা বেশি! জল-স্থল-আকাশ সর্বত্র আমরা এখন মোবাইল টেলিফোন নেটওয়ার্কে যুক্ত। আলু-পটোলের চেয়েও ফোনের সংযোগ কেনাটা সহজতর হয়েছে!
উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষের মাঝে সম্পর্কের গভীরতা বাড়াবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে কী সেটা হচ্ছে? বরং পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস বৃদ্ধির চরম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে এই প্রযুক্তিপণ্য! দুইবার চেষ্টা করে ফোন এনগেজ পেলেই অপরপক্ষ রাগ-ক্ষোভে ফুঁসতে শুরু করছে! নিদেনপক্ষে বিরক্ত হয়। আগের দিনে একটা চিঠি লিখে তার জবাব পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করা যেত। অথচ এখন মেসেঞ্জারে রিপ্লাই দিতে ৩০ সেকেন্ড দেরি হলেই অন্যপক্ষ সন্দেহ করে—সে আবার অন্য কাউকে ‘ম্যানেজ’ করতে ব্যস্ত নয়তো!
ফলে কানেক্টেড হওয়ার পর ‘কাজের কথা’র চেয়ে বাহুল্য কথা হয় অনেক বেশি। পরস্পর যুক্ত থাকার সক্ষমতায় যে স্বচ্ছতা ও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা ছিল—বাস্তবতা মোটেই তেমনটা হয়নি। বরং চোর-পুলিশ খেলার মাত্রা বেড়েছে। এখন আর অনেকের মুখের কথা বিশ্বাস হয় না। ভিডিও কল করে দেখাতে হয় যে, তিনি সত্য বলছেন! ফলে আশীর্বাদতুল্য ফোন এখন অনেকের কাছেই রীতিমতো ‘আপদ’ বলে গণ্য হচ্ছে!
বিনোদন—তৃপ্তি বনাম অস্থিরতা!
মাঝেমধ্যে বিটিভিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা হয়। কারণ ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশনে দিনে মাত্র ঘণ্টা দেড়েক সময়ে আমাদের যে পরিপূর্ণ তৃপ্তি দিত—আজ তা কল্পনাও করা যায় না। সত্যি কথা বলতে, এক বিটিভি আমাদের অসংখ্য মানবীয় গুণাবলির বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল। বিনোদনের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রেখে নিজের কাজে মনোযোগী হওয়া, পছন্দ না হলেও তা সহ্য করা, পরিবারের সবাই মিলে একটা কিছু উপভোগ করা, প্রতিক্রিয়া প্রকাশে সংযমী থাকা, অল্পে তুষ্ট থাকার মতো অসংখ্য গুণাবলির চর্চা হয়েছে এক টিভি দর্শনের মাধ্যমে।
দুনিয়াতে সবকিছু যে আমার পছন্দ বা ইচ্ছামাফিক হবে না—বিটিভি সেই বোধটা খুব স্পষ্ট করে দিয়েছিল। একটা ভালো অনুষ্ঠান দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা এবং শেষমেশ পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া...হাল আমলে সর্বশেষ কবে এমনটা হয়েছে—মনে করতে পারেন? ঠিক তেমনিভাবে, রেডিও শোনার জন্য দিনের বিশেষ বিশেষ সময় তা অন করা, কিংবা পছন্দের একটি গানের ক্যাসেট অসংখ্যবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে শোনা—আমাদের হূদয়কে ধীর ও শান্ত করত; অস্থিরতা কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখত।
সবচেয়ে বড় কথা প্রিয় বস্তু বা ব্যক্তির প্রতি গভীরভাবে অনুগত থাকতে শেখাত। ফলে তখনকার দিনে বিশ্বাস করা হতো, মানুষের জীবনে প্রেম-ভালোবাসা একবারই আসে। পছন্দের মানুষটিকে না পেলে সাধারণত ইহজীবনে আর ওসব নিয়ে ভাবতে চাইত না। কিন্তু এখনকার দিনে বিনোদনের বিপুল সরবরাহ তরুণদের কোনোকিছুর প্রতিই স্থির ও অনুগত করতে পারছে না। কম্পিউটারের অপ্রয়োজনীয় ফাইল ডিলিট করার মতো অনেকে এক ‘ব্রেকআপ’ শব্দ দিয়ে মাঝেমধ্যেই সবকিছু মুছে ফেলতে সচেষ্ট থাকছে! সারাদিন বিনোদনের মধ্যে থাকলেও অন্তরে নিখাদ তৃপ্তি হচ্ছে না। ঠিক যেন সেই বৃদ্ধ নাবিকের দশা। চারপাশে শুধু পানি আর পানি; কিন্তু পান করার মতো একফোঁটা পানিও নেই!
অধিকার—গৃহচর্চা বনাম বাস্তবতা!
আমাদের প্রজন্মে সাধারণত প্রত্যেক পরিবারে অনেক ভাই-বোন থাকত। বাড়ির মুরগির ডিম সংখ্যা কম থাকায় মাঝেমধ্যে এক ডিম ভেজে কয়েকজনকে ভাগ করে দেয়া হতো। খাওয়ার সময় মাছ বা মাংসের ভালো টুকরোটা পাওয়ার জন্য আমরা উদগ্রীব থাকতাম। ঘুমানোর সময় নরম বালিশের মালিকানা নিয়েও হরহামেশা দ্বন্দ্ব হতো। কখনো তা মাত্রা অতিক্রম করলে বড়রা এসে দুমদাম পিঠে দু’চার ঘা লাগিয়ে দিত। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও একপর্যায়ে ‘অধিকার’ ত্যাগ করে নিঃশব্দে ঘুমাতে হতো।
অথচ এখন আমরা নিজে রাজা-বাদশা না হলেও সন্তানদের ‘রাজপুত্র ও রাজকন্যা’র মর্যাদায় বড় করতে চাইছি। এক-দুইটা সন্তানের বাবা-মা হয়ে ১০টার আদর তাদের দিতে ব্যাকুল থাকছি! নিজেদের হাজারো সমস্যা চেপে রেখে তাদের সুখী দেখতে চাইছি। আমাদের এ চর্চাগুলো তাদের ঘাতসহ করে তুলছে না। এমনকি অন্যের অধিকারের ব্যাপারেও তাদের সচেতন করছে না। বাসায় রান্না হওয়া সেরা জিনিসটা তার। মাছ খায় না বলে সবসময় তার জন্য ভিন্ন আয়োজন। এভাবে সবকিছুতে তার মতামতকে অগ্রাধিকার দেয়ার কালচার গড়ে তুলছি। শপিংয়ের সময় খেলনা, লোভনীয় খাদ্যবস্তু সবকিছুতে তার কথাকেই শেষ কথা হিসেবে গ্রহণ করছি।
কিন্তু বাস্তব জীবন তো কুসুমাস্তীর্ণ নয়। খুব সংগত কারণেই একসময় তার হাত ছাড়তে হবে। নিজস্ব পরিমণ্ডলে যখন একাধিক রাজকুমার ও রাজকুমারী একত্রিত হবে—তখন সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে! প্রকৃতপক্ষে দুনিয়াবি সব ধরনের দুঃখ-কষ্ট থেকে আড়াল করার মাধ্যমে আমরা তাদের এক ‘ফেক মনোজগৎ’ দিয়ে বড় করছি। সত্যিকারের দুনিয়ায় র্যাগিং, ইভটিজিং, প্রতারণা, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্যের মতো হাজারো কু-চর্চা রয়েছে। আকস্মিক যেদিন সে এমন সব কঠিন বিষয়ের মুখোমুখি হবে—তা সহজে নিতে পারবে তো? প্রাকৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নিয়মেই আপনি তখন তার পাশে থাকতে পারবেন না। র্যাগিংয়ের নামে রাতভর নির্যাতনের সময় আমরা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারব না যে, প্রিয়তম সন্তানের ওপর কী বর্বর নির্যাতন চলছে!
ফলে এমন পরিস্থিতিতে অতি আদরে গড়ে তোলা সন্তানটি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো অসম্ভব নয়। ছোটবেলা থেকে কোনো ধরনের কষ্ট, সীমাবদ্ধতা, ছাড় দিতে না শেখায় প্রতিকূল পরিবেশে আকস্মিক তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। অনেকের পক্ষেই তা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাটা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে সন্তানদের বাস্তবতার আলোকে গড়ে তোলা খুব দরকার। নইলে আজকের লাগামহীন ভোগ প্রবণতা একদিন তার বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ক্রয়ক্ষমতা—ঐক্য বনাম বিভক্তি!
আগে পাড়ার সবাই মিলেও একটা ফুটবল কেনা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। সমান চাঁদা দিয়ে কেনা বলেও মাঝেমধ্যে খেলায় নিত না; তখন খুব কষ্ট হতো। কিন্তু এখন বুঝি তার মাধ্যমে জীবনের জন্য অতি দরকারী গুণাবলিও রপ্ত হয়েছিল। সমবয়সীদের মাঝে নেতৃত্ব দেয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ধৈর্যশীল হওয়া, দলগতভাবে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করা—এমন অসংখ্য গুণাবলি শেখা যেত পাড়া-গাঁয়ের ছোট্ট এক ফুটবল মাঠে!
এখন চাইলে আমরা সন্তানকে একাই ১০টা বল কিনে দিতে পারি। কিন্তু সেই চর্চাগুলো করানোর পরিবেশ কি দিতে পারছি? যারা বলেন মাঠ নেই, আমি তাদের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারি না। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান মাঠগুলোতেও কি কেউ খেলতে চায়? গত এক মাসে (বিকাল বেলা) বেশ বড় কয়েকটা মাঠের পাশ দিয়ে গেছি। সেগুলোতে খেলাধুলার কোনো আয়োজন চোখে পড়েনি! হয়তো সে কারণেই প্রযুক্তিবিদ আর ব্যবসায়ীরা মিলে ‘ভার্চুয়াল রিয়েলিটি’র নামে এমন সব খেলা বানাচ্ছেন, যা একাই খেলতে হয়! কিন্তু জীবনটা তো খেলা নয়। সেখানে নানা জাতের ভিন্ন মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়। সেই দক্ষতা অর্জন হবে কেমন করে?
আগে যেখানেই যাই না কেন, মন পড়ে থাকত বাড়িতে। ফলে সেখানে ফেরার তাড়া থাকত অতিশয় তীব্র। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও ঈদের সময় পৈতৃক বাড়িতে ফেরার এমন পাগলপারা টান আর কোনো দেশে আছে কিনা জানি না। এখন সেখানেও চিড় ধরার লক্ষণ স্পষ্ট। ঈদের আগে-পরে সপ্তাহখানেক সময় দেশের অধিকাংশ পর্যটন স্পট সংলগ্ন হোটেলগুলোতে রুম পাওয়া যায় না। একাংশ যায় বিভিন্ন দেশের দর্শনীয় স্থানে ঈদ উদযাপন করতে।
এ প্রবণতা যত বাড়বে, বাঙালির নাড়ির টান ততই নড়বড়ে হবে—তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। হয়তো সে কারণেই আগে রেস্টুরেন্টগুলো তাদের বিজ্ঞাপনে বলত—ঠিক যেন মায়ের হাতে রান্না। এখন তারা মায়ের রান্না করা খাবারকে বলতে শুরু করেছে—ঠিক যেন রেস্টুরেন্টের স্বাদ! বুঝতে পারছেন, দৃষ্টিভঙ্গি বদলের প্রাথমিক ধাক্কায় কীভাবে আমরা ধরাশায়ী হয়েছি?
সংস্কৃতি—শেকড় বনাম ভাসমানতা!
মানুষ কালচার নিয়ে জন্মায় না। বরং পারিপার্শ্বিক যে আবহ ও চর্চার মধ্যে বড় হয়, সেটাই তার সংস্কৃতি গড়ে দেয়। আর এটা এমন এক সফটওয়্যার, যা বিমানের অটো পাইলটের মতো সারাক্ষণ আমাদের পরিচালনা করে। সেটা আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেটও হয়। ফলে সার্বক্ষণিক যাদের সঙ্গে মিশতে হয়, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ রাখতে হয়, যাদের মতো হতে চাই...তাদের ভাবনা ও কর্ম আমাদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। অনেক সময় ভাবি, তাদের মতো হতে পারলেই বুঝি জীবন ধন্য হবে। তাই নিজেদের শিক্ষা, ঐতিহ্য, বিশ্বাস দুই পায়ে দলে তাদের মতো হওয়ার দৌড়ে শামিল হই।
কিন্তু একবার ভাবুন, আমরা যাদের মডেল (আদর্শ) ভাবছি...তারা কেন ‘আত্মহত্যা’য় সমাধান খুঁজছে? কেন তারা মাদক গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে কল্পরাজ্যে সঁপে দিচ্ছে? তাদের পরিবারে অশান্তি কেন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে? এগুলো ইঙ্গিত করে যে, মেকি আচরণ ও বাহ্যিক ভোগপ্রবণতা দেখে আমরা তাদের অত্যন্ত সফল ও সুখী বলে ভুল করি। আসলে মানুষের স্বভাব হলো নিজের কষ্টগুলো ভেতরে পুষে রেখে শুধু সুখের দিকগুলো প্রদর্শন করা। তাই তাদের অন্ধ অনুকরণ বন্ধের মাধ্যমে নিজেদের ভেতরে সুখের সন্ধান করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রত্যেকের জীবন অনন্য। তাই আমার কারো মতো হওয়ার দরকার নেই—এ বোধটা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
আমরা আগে শিখতাম বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক ও মুরব্বিদের কাছ থেকে। এখনকার শিশুরা শেখে টেলিভিশন আর ইউটিউবের কাছে! তা-ও আবার দেশীয় কিছু তাদের পছন্দ না, সব বিদেশী চ্যানেলের ভক্ত। ফলে তারা কীভাবে আপনার-আমার সমাজ-সংস্কৃতির ধারক-বাহক হবে? সেদিন এক কিশোর বলছিল, ‘কফিন ড্যান্স’ তার সবচেয়ে ভালো লাগে! বুঝতে পারছেন, মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে নাচতে দেখে—সে আনন্দ পায়! এমন ভোগ প্রবণতায় দেশপ্রেম, বিনোদন, সাহিত্য-সংস্কৃতি এমনকি ধর্মীয় বোধ ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হবে না কেন—নিম গাছে তো আর আম ধরার কথা না, তাই না?
অধিকাংশ পরিবারে মুরব্বিরা হয়ে পড়ছেন কোণঠাসা। জীবনসায়াহ্নে এসে তারা কিছু বোঝেন না, ব্যাকডেটেড! পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় তারাও আর কথা বাড়ান না। একসময় কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় নিজের সন্তানদের বড় করলেও এখন নাতি-নাতনিকে বখে যেতে দেখেও (দীর্ঘশ্বাস ছাড়া ব্যতীত) কিছু করার থাকছে না। কারণ বেশি কথা বললে হয়তো সবাই মিলে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেবে! দীর্ঘজীবনে পদে পদে ঠেকে যা শিখেছেন—আজ কেউ তা নিতে চায় না! বড় অভিমানে মুরব্বিরা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন—এর ফল কি ভালো হওয়া সম্ভব? আপাতদৃষ্টিতে আমরা নিজেদের শক্তিশালী ভাবছি। কিন্তু নিজের অজান্তেই ‘একতাই বল’ গল্পের বিপরীতে হাঁটছি!
সিদ্ধান্ত গ্রহণ—ঐক্য বনাম বিভাজন!
আগে প্রায় প্রতিটি পরিবারে ৮-১০ জন সদস্য থাকত। ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো নিতেন মুরব্বিরা। আরো বড় (সন্তানের বিয়ে, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, বাড়ি বানানোর মতো) সিদ্ধান্তে এলাকার শিক্ষিত-সচেতন মানুষদের সাহায্য নেয়া হতো। ফলে বড় ভুল হওয়ার আশঙ্কা কমে যেত। কিন্তু এখন পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের ক্ষমতায়ন সে ধারায় সরাসরি আঘাত হেনেছে। তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’ ভোগ করতে গিয়ে আমার সন্তান শরীরের জন্য ক্ষতিকর জুস, চিপস, কোল্ডড্রিংকস কিনছে—না করা যাচ্ছে না; করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুনছে না!
এভাবেই একদিন সে নিজের পছন্দে (কারো মতামত গ্রাহ্য না করে) বন্ধু নির্বাচন এমনকি বিয়েও করবে। দুই দিন পর যখন নিজের ভুল বুঝতে পারবে—তখন বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে উঠবে! ফলে এখন শরীরের জন্য ক্ষতিকর ললিপপ কেনা থেকে তাকে বিরত করা না গেলে একদিন তার জন্য খুবই ক্ষতিকর ব্যক্তি (বন্ধু, নেতা, জীবনসঙ্গী) পছন্দ করাও ঠেকানো সম্ভব হবে না। ফল হিসেবে ব্যক্তি-পরিবার-সমাজে অশান্তি বাড়বে বৈ কমবে না!
কোম্পানিগুলোর স্বার্থে পরিচালিত গবেষণাগুলো আমাদের ঠিক কোন পথে চালিত করছে—তা-ও বোঝা মুশকিল। একসময় তারা শেখালো, সয়াবিন খুব পাতলা তেল হওয়ায় শরীরের জন্য খুব উপকারী। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, অতি উচ্চতাপমাত্রায় সেটা পরিশোধিত হওয়ায় শরীরের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর। বরং ঘানি ভাঙানো সরিষার তেল ঢের ভালো! দীর্ঘদিন জানতাম, ভাতের চেয়ে রুটি খাওয়া ভালো। কিন্তু সেদিন এক প্রতিবেদনে দেখলাম, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলছেন—ভাত খাওয়াই শরীরের জন্য ভালো! কারণ গমের আটায় নাকি খুব ক্ষতিকর এক উপাদান রয়েছে। একইভাবে ফুটানো পানি নাকি বিশেষ ব্র্যান্ডের ফিল্টারে ‘শুদ্ধ হওয়া পানি’ ভালো—তা এক গোলকধাঁধা বটে!
ভাঙা রাস্তায় চলার কারণে একটা গাড়ি ঠিক কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়—তা যেমন কেউ হিসাব করে না। ঠিক তেমনিভাবে, প্রতিনিয়ত অসংখ্য ভেজাল পণ্য ইনটেক করায় আমাদের শরীরের কলকব্জা ভেতরে ভেতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে; কাউকে দোষারোপও করা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে পরিচিতজনদের অনিরাময়যোগ্য অসুখ বা আকস্মিক মৃত্যুকে ‘কপাল’ বলে মেনে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এমন অসুখে একটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়, অসংখ্য মানুষ তার প্রিয়জনকে হারায়—তার হিসাব কে-বা রাখে! ফলে দৃষ্টিনন্দন বিজ্ঞাপন দেখে জীবনকে সুখময় করার আশায় আমরা যেসব পণ্য ভোগ করছি, তার শেষ পরিণতি কেমন হবে—তা বলা সত্যিই মুশকিল।
শিক্ষা—বোধ বনাম বাণিজ্য!
আমরা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-ভবন-মাঠ এমনকি রাস্তার প্রতিও একধরনের মায়া তৈরি হতো। বহু বছর পর ওই পথে হাঁটতে এখনো শিহরণ অনুভব করি। দূরে থাকার কারণে হয়তো সেটা একটু বেশিই হয়। স্কুল মাঠে গেলে নিজের অজান্তেই শৈশবে ফিরে যাই, বন্ধুদের মুখ ভেসে ওঠে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো তেমনই হওয়ার কথা। এটা তো মুড়ি-মুড়কির দোকান নয় যে, গেলাম আর বিক্রয়কর্মী ঠোঙায় ভরে এক পোয়া জ্ঞান ধরিয়ে দিল। মনের আনন্দে বাড়ি ফিরে এলাম! স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ ধরিয়ে দেয়া নয়, জীবনের জন্য অতি দরকারি বোধগুলোও স্পষ্টভাবে জাগিয়ে দেয়ার কথা। প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল একেকটা স্মৃতির ভাণ্ডার।
অথচ এখন কেজি স্কুলের নামে বিল্ডিংসর্বস্ব অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ পদ্ধতির উদ্ভাবক ভেবেছিলেন, স্কুলগুলো হবে ফুল বাগানের মতো শিশুদের উদ্যান। তারা হেসে-খেলে মনের আনন্দে জীবনের প্রাথমিক পাঠ নেবে। সেখানে বিদ্যার্জন মুখ্য নয়, বরং বিচিত্র রকমের মানুষ-সিস্টেম-রীতির সঙ্গে পরিচিত হবে। নিজ থেকে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। তখন শিক্ষকমণ্ডলী তাকে সাহায্য করবে সেগুলো বুঝতে ও জানতে। কিন্তু আমরা সেটাকে পরিণত করেছি রীতিমতো অর্থ উপার্জনের হাতিয়ারে।
অধিকাংশ স্কুলের না আছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা; শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভবই করে না। বর্তমানে শিক্ষকতায় নিয়োজিতদের না আছে সারাজীবন এই পেশায় থাকার পরিকল্পনা। শিশুদের সাইকোলজি বোঝা বা হ্যান্ডেল করার দক্ষতার প্রশ্ন তোলা অবান্তর। তারা জাস্ট একটা চাকরি করে। তবুও আমরা সন্তানদের তাদের কাছে পাঠিয়েই ধন্য হচ্ছি। বাচ্চাদের ঘুম থেকে টেনে তুলে দৌড়ে গিয়ে খাঁচাসদৃশ ভবনগুলোতে রেখে আসছি। ছুটির পর আবার হ্যাঁচকা টানে বাসায় এনে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। অন্যদিকে সরকারি স্কুলভবন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকমণ্ডলী ও খেলার মাঠগুলো দেখে ভাবি—দুনিয়ার কোথাও শিক্ষাকেন্দ্রিক এমন বিপুল বিনিয়োগকে এভাবে অবমূল্যায়ন করা হয় না! শুধু শিক্ষা বাণিজ্যকে উৎসাহ দিতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন অপচয় সত্যিই বিরল!
অভিভাবকদের এক্সপেরিমেন্টের কারণে বছর বছর বাচ্চার স্কুল বদলে যায়। এমন ট্রায়াল অ্যান্ড এরর পদ্ধতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোমলমতি শিশুরা। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি টান অনুভব করে না। শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ হয় না। বন্ধুর সংখ্যাও খুব একটা বাড়ে না। ফলে কচুরিপানার মতো শেকড়হীন হয়ে তারা ভেসে বেড়ায় এক হাত (স্কুল-কোচিং-প্রাইভেট টিউটর) থেকে আরেক হাতে। একপর্যায়ে শিক্ষার প্রতি জন্মে বিতৃষ্ণা। পরিবারের চাপে শরীরটা নিয়মিত স্কুলে যায়, মনটা থাকে উড়ুক্কু। ফলে জীবনের জন্য অতি দরকারী কমিটমেন্ট ও আনুগত্যের ঘাটতি স্থায়ীরূপ লাভ করে। দীর্ঘমেয়াদে সমাজজীবনে এর প্রভাব ঠিক কতটা গভীর হতে পারে—তা মনে হয় আমরা ঠিক ধরতে পারছি না।
পণ্য ও সেবা—মান বনাম পরিমাণ!
একসময় কৃষক পরিবারগুলো লবণ ও কেরোসিন তেল ছাড়া হাট থেকে তেমন কিছু কিনত না। স্বনির্ভর কৃষকের হাতে ফল-ফসলের বীজ থাকত, নিজেরা চারা তৈরি করত। গোবর ও প্রাকৃতিক সারই ছিল মুখ্য। বাড়ির হাঁস-মুরগির ডিম-মাংস দিয়ে পরিবারের চাহিদা মিটত। পুকুর-ডোবার মাছ দিয়েই বছর চলে যেত। জিনিসগুলো আকারে ছোট বা পরিমাণে কম হলেও ছিল সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর। কিন্তু এখন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গিয়ে এমন সব সার-কীটনাশক-বালাইনাশক ব্যবহার হচ্ছে, দূরবর্তী বাজারে পাঠাতে এমন সব কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে, যা আপাতত ক্ষুধা মেটালেও মানবদেহ ও প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
আগে গ্রামাঞ্চলে পাঁচ-সাত মাইল হেঁটে বড় হাট-বাজার কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু অটোরিকশা ও মেশিনচালিত ভ্যানের বদৌলতে গ্রামীণ মানুষদের এখন দিনে হাফ কিলোমিটারও হাঁটতে হয় না। আপাতদৃষ্টিতে শারীরিক কষ্ট লাঘব হয়েছে। কিন্তু তাদের শরীরে রোগ-ব্যাধির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে অ্যালার্মিং হারে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না।
আমাদের সর্বাধিক ভোগকৃত এক পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে শেষ করব। কখনো ভেবেছেন, উত্তর কোরিয়া, চীন, ইরান কেন ইন্টারনেটের মতো সর্বব্যাপী একটি পণ্য ব্যবহারে এত রক্ষণশীল মনোভাব পোষণ করছে? তারা ঠিক না ভুল করছে—সেটা অন্য বিতর্ক। তবে আমার মনে হয় এ পণ্য ভোগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব তারা খুব ভালোভাবে ধরতে পেরেছে। আমাদের দেশে প্রায় ১০ কোটি গ্রাহক যে কোটি কোটি শ্রমঘণ্টা এর পেছনে ব্যয় করছে—তার ঠিক কতভাগ প্রডাকটিভ? এত শক্তিশালী একটা মাধ্যম নির্বিচারে ছড়িয়ে পড়লে তার অপব্যবহারের আশঙ্কা বাড়ে। অসংখ্য নিরক্ষর মানুষের হাতেও এখন রয়েছে সর্বোচ্চ গতির ইন্টারনেট। ফলে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এ-সংক্রান্ত অপরাধের মাত্রা বাড়ছে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার বড় এক অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলো।
পরিশেষে...
পাশের ফ্ল্যাটের সদস্যরা ছুটি কাটাতে বিদেশ গিয়েছে বলে আপনাকেও যেতে হবে। তারা লেটেস্ট মডেলের গাড়ি কিনেছে, তাই আপনাকেও কিনতে হবে। তারা সন্তানের জন্মদিন বা খতনার অনুষ্ঠান ধুমধাম করে উদযাপন করেছে বলে আপনাকেও করতে হবে—এই প্রবণতা আপনার সন্তান কিন্তু সিরিয়াসলি ফলো করছে। পকেটে পয়সা না থাকলেও আপনি কর্জ করে সেগুলো করছেন। তাহলে আপনার সন্তানদের মিতব্যয়ী বা সঞ্চয়ী হওয়ার উপদেশ দেবেন কীভাবে? আর দিলেও সেটা শুনবে কেন? কারণ তারা উপদেশ শোনে না, বড়দের জাস্ট অনুকরণ করে। তাই ভবিষ্যতে ঘুষখোর, সন্ত্রাসী কিংবা নিদেনপক্ষে কুখ্যাত ঋণখেলাপির বাবা-মা হতে না চাইলে প্রথমে নিজেদের ভোগ প্রবণতায় লাগাম টানা খুব দরকার।
মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘পোস্ট ক্রাইসিস বিজনেস’ বইয়ের লেখক





