সময়ের বিবর্তনে গ্রামবাংলায় আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিবরে হারিয়ে যাওয়া সনাতন সংস্কৃতির স্মৃতিজাগানিয়া আবহ গীতিকবির বাণীতে বিমূর্ত হয়ে উঠেছে। অতীতের দিনগুলোতে আনন্দ প্রকাশের যেসব উৎসব উপলক্ষ উপকরণ ছিল, তা ফিরে পাওয়ার আশা ও আকাঙ্ক্ষা যেমন মেলে ধরা হয়েছে, তেমনি বিদেশী বেসাতিরা বাংলার বন্দরে ভিড়ে সমৃদ্ধির অনেক কিছুই লোপাট করতে আবার আসতে পারে এমন ইঙ্গিতও রয়েছে এখানে। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পূর্তির প্রাক্কালে গ্রামীণ সংস্কৃতির আটপৌরে চেহারা চারিত্রে রূপান্তরের রেখচিত্রে নস্টালজিক হওয়ার পাশাপাশি প্রভূত পরিবর্তনের প্রভাবক ভূমিকা শনাক্তকরণের অবকাশ মেলে। 

প্রথমেই বলে বা জেনে রাখা যে, বাংলা সংস্কৃতি শব্দটি সংস্কার থেকে এসেছে, যার অর্থ কোনো জিনিসের দোষত্রুটি, ময়লা-আবর্জনা দূর করে তাকে ঠিকঠাক করে পরিশুদ্ধ করা। মানুষের চিন্তাচেতনা, আচার-আচরণ, জীবনযাত্রা, পোশাক, ভাষা, সাহিত্য, মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, খাদ্যাভ্যাস, ইতিহাস, রাজনীতি, অথনীতি সবই তার সংস্কৃতি। মানুষ যা ধারণ ও চর্চা করে তাই তার সংস্কৃতি। 

পানি রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৃষি-পাটের মাঠ, প্রাকৃতিক পরিবেশের শেষমেশ সুন্দরবনের সৌন্দর্য-শক্তি খর্ব হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতি আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। কালক্রমে রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রভাবে, জলবায়ুর পরিবর্তনে, প্রযুক্তির প্রসারে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ঘটছে রূপান্তর। 

কৃষি

আধুনিক যন্ত্রপাতির ভিড়ে সেই লাঙল জোয়াল আর দেখা যায় না। নানা কারণে তার ব্যত্যয় ঘটছে। উজানের পানি প্রত্যাহার, নদীর তলদেশ ভরাট, বিভিন্ন প্রকার অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থার ফলে কৃষি অর্থনীতি প্রধান বাংলাদেশের ঋতুসম্রাট বর্ষা তার চিরন্তন রূপ হারিয়ে ফেলেছে। এখন সময়মতো বর্ষা হয় না, হলেও তা রূপ নেয় সর্বগ্রাসী বন্যায়। অথচ নদীমাতৃক এ দেশে বর্ষার প্রভাব গ্রামীণ জীবনযাত্রায় তথা কৃষক সমাজকে ভিন্ন আবেগ-মাত্রা যোগ করত। ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে’ যে বৃষ্টি ঝরত তাতে কুমারী নদীর বুক কেঁপে উঠত প্রণয়ের জোয়ারে, যৌবনবতী আষাঢ়ের পানি প্রবেশ করত ফসলি জমিতে, আষাঢ়- শ্রাবণের খরস্রোতা নদী, তারপর শরতের নির্মেঘ আকাশ, নদীতীরে কাশবন, মহাজনী ধান-পাটের পাল তোলা নৌকা, নায়রির নৌকা, নৌকাবাইচ, কতসব উৎসব... প্রাণচঞ্চল ‘পল্লীজননী’র সেই ‘অপরূপ রূপ’ দেখতেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল। 

উচ্চফলনশীল জাত প্রবর্তনের ফলে স্থানীয় জাতের ধান বিলুপ্তি ঘটছে। আষাঢ় এবং আউশ ধান ছিল স্বভাব কবি গোবিন্দ দাসের মানসপটের মনোমুগ্ধকর ছবি। বর্ষায় সাড়া পড়ে যেত আউশ ধান কাটার। কৃষক বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাথাল মাথায় ধান কাটতেন আপন মনে। ‘জলজ পাখি পানকৌড়ি নিরন্তর ডেকে যেত টুব্ টুব্ করে’। কৃষাণের কণ্ঠে ভেসে উঠত ধুয়া, মুর্শিদি, ভাটিয়ালিসহ আরো কত গানের সুর। গ্রামীণ ‘বাংলার জীবন বহতা নদীর মতো বয়ে চলা এক নদী। এর বাঁকে বাঁকে সৃষ্টি হতো শত শত আখ্যান।’ শচীন কর্তাকে যেমন ‘পিছু ডাকে তাল সুুপারির বন’।

সকালের নাশতায় কৃষক কাঁচামরিচ মিশিয়ে পান্তা ভাত পেটে পুরে ছুটে যেত তার প্রিয় কর্মস্থল আবাদ ভূমিতে। এখন গ্রামীণ কৃষকের সকাল তেমনটি আর খুব দেখা যায় না। সে এখন কলের ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করে জমি। তাকে ছ্যামচ দিয়ে পানি সেচতে হয় না, সে এখন দমকলে পানি তোলে। গরু দিয়ে ধান মাড়াই করতে হয় না, মেশিনে ধান মাড়াই চলে। চাষী বউ উঠানে ধান শুকায় না, ধান ঝাড়ে না এমনকি ঢেঁকিতে ধান ভানে না, সবই মেশিন করে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব যেন গ্রামীণ অর্থনীতিতে আগে ভাগে হাজির। 

খাবার দাবার 

গ্রামীণ সমাজে শীতকালের পিঠে পায়েস থেকে আরম্ভ করে সব রকমের মিষ্টি জাতীয় খাদ্যের সমাহারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল খেজুরের রস বা খেজুরের পাটালি গুড়। আজকাল এ অকৃত্রিম খাদ্য সংস্কৃতির ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। অন্যতম কারণ নিপাহ ভাইরাসের ভয়, জ্বালানি ও গাছির অভাব। ফলে নতুন করে আর খেজুর গাছ রোপিত হচ্ছে না। যাও আছে, তার থেকে যতটুকু গুড় আসে, তাও ভেজাল। বেশির ভাগ জায়গায়ই এক ভাগ খেজুরের গুড়ের সঙ্গে তিন ভাগ চিনি মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে ভেজাল গুড়। খাল-বিল সংকুচিত হওয়ায়, নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক উপায়ে দেশী মাছ ক্রমে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। ব্যাপক চাহিদা মেটাতে কৃত্রিম উপায়ে মাছ চাষ, হঠাৎ বড় করার জন্য নানা ফিড খাইয়ে মাছ উৎপাদনে মাছের সরবরাহ বাড়ছে ঠিকই। কিন্তু একটা জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়, গ্রামীণ জীবনে টাটকা শাকসবজি, দুধ ও প্রোটিনসমৃদ্ধ মাছ এখন সহজে মেলে না, কেননা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এসব সামগ্রী বেশি দাম পাওয়ার সুযোগে শহরে চলে যাচ্ছে বা বিদেশে রফতানি হচ্ছে। ধানের জমিতে লোনা পানি তুলে মাছের চাষ চলছে, ফলে সবুজ প্রান্তর হারিয়ে যাচ্ছে, ধান ও সবুজ সবজি চাষ ব্যাহত হচ্ছে। অর্থকরী ফসল উৎপাদনে হাত বদল ঘটছে, প্রকৃতি পাল্টাচ্ছে। অতি অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে গ্রামীণ স্বাস্থ্য, মানবিক মূল্যবোধ, সুকুমার সাংস্কৃতিক চিন্তাচেতনার অবক্ষয় হচ্ছে। হরিণের মাংস খাওয়াকে আইন করে থামাতে হচ্ছে। বকের মাংস খাওয়াও বর্তমানে এক ধরনের বিলাসিতা। পাখি শিকার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। নিত্যকার খাদ্য হিসেবে দেশী মুরগির পরিবর্তে ব্রয়লারের মুরগির মাংস এখন সাধারণ ব্যাপার। ডাল এখন বাঙালির প্রতিদিনের খাবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, এসেছে হালিম, কাবাবসহ আরো অনেক কিছু। ক্রমবর্ধমান দানাজাতীয় খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটাতে গিয়ে কুসুম ফুল, গুজিতিল, তিসি, চীনা কাউন, বোনা আমন, বোনা আউশ এ-জাতীয় শস্যের আবাদ আশঙ্কাজনক হারে কমে গিয়েছে। আবার এদের মধ্যে কোনো কোনো ফসলের আবাদের বিলুপ্তি ঘটেছে। তার মধ্যে মটরশুঁটির আবাদ এখন আর উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু নেই। অথচ এসব ফসলে যখন মাঠ ভরে থাকত তখন প্রকৃতি সাজত অপরূপ সাজে। গ্রীষ্মের দামাল বাতাস যখন বয়ে যেত বিস্তীর্ণ শস্যের ওপর দিয়ে তখন মনে হতো ধান কাউনের শস্যের জমি যেন ঢেউ খেলানো পানিবিহীন অনবদ্য প্রসারিত নদী।

অতিথি আপ্যায়ন

অতিথি আপ্যায়নেও এসেছে পরিবর্তন। আগে বড় বড় অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হতো মাটিতে চাটাই পেতে কলাপাতায়। তারপর এল মাটির সানকি বা বাসন। এরপর এল চীনামাটি, কাচ, স্টিলের থালা-বাসন। অতিথিদের এখন চেয়ার-টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবারের পর আগের মতো সেই মিষ্টান্নের সমাহার চোখেই পড়ে না। বহুজাতিক কোম্পানির বিভিন্ন পানীয়, যেমন কোকা-কোলা, ফান্টা, মিরিন্ডা, সেভেনআপ, পেপসি ইত্যাদি খাবারের পর পরিবেশন করা হয়। তাছাড়া নগর সংস্কৃতির ঢেউ গ্রামীণ জীবনেও লাগতে শুরু করেছে। ফলে অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহূত হচ্ছে বিস্কুট, চানাচুর, নুডলস, চা ইত্যাদি। অথচ কী স্বকীয়তাই না ছিল আমাদের গ্রামীণ তথা কৃষক সমাজের খাদ্য সংস্কৃতিতে। 

পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জার সংস্কৃতি

গ্রামবাংলায় পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জার সংস্কৃতিতেও ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পোশাকের আদি রীতি ছিল সেলাইবিহীন এক বস্ত্র। পুরুষরা ধুতি বা লুঙ্গি-পাঞ্জাবি আর মেয়েরা শাড়ি পরত। আর্থিক অবস্থা ভালো হলে গায়ের ওপর এক খণ্ড কাপড়ের ব্যবহার ছিল। এটা পুরুষের ক্ষেত্রে ছিল উত্তরীয় এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ওড়না। এ ওড়না প্রয়োজনে ঘোমটার কাজ করত। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তে এক কাপড়ই যথেষ্ঠ ছিল এবং এরা প্রয়োজনে এর আঁচল দিয়েই ঘোমটার কাজ চালাত। পরে সেলাই কাপড়ে ফুল, লতাপাতা ইত্যাদির নকশার প্রচলন হয়। অতীতে নর্তকীরা কোমর থেকে পায়ের গোঁড়ালি পর্যন্ত আঁটসাঁট পায়জামা আর গলায় বড় একটা ওড়না ব্যবহার করত। সাধু-সন্ন্যাসী ও দরিদ্র শ্রমিকরা পরত নেংটি। সৈন্য ও মল্লবীররা পরত হাঁটু পর্যন্ত আঁট-পায়জামা। শিশুরা পরত হাঁটু পর্যন্ত আঁট-পায়জামা। মেয়েদের ছিল লম্বা চুল। ঘাড়ের ওপর খোঁপা করে বাঁধা। কেউ কেউ পেছনে এলিয়ে দিত। সাধু-সন্ন্যাসীদের লম্বা জটা দুই ধাপে মাথার ওপর জড়ানো থাকত। শিশুদের চুল তিনটি ‘কাকপক্ষ’ গুচ্ছে মাথার ওপর বাঁধা থাকত। সৈন্য ও প্রহরীরা ফিতাবিহীন পায়ের কণ্ঠা পর্যন্ত ঢাকা চামড়ার জুতা পরত। সাধারণ লোকেরা জুতা ব্যবহার করত না। ধনীরা কাঠের পাদুকা ব্যবহার করত। বিবাহিত নারীরা কপালে কাজলের টিপ, পায়ে লাক্ষারস, দেহ ও মুখে চন্দনের গুঁড়ো, চন্দন বাটা এবং জাফরান ব্যবহার করত। বিলাসিনীরা ঠোঁটে লাক্ষারস ও খোঁপায় ফুল গুঁজে দিত। অনেকে গলায় দিত ফুলের মালা। অনেক সময় বুকের কাপড় সরে গেলে ফুলের মালা দিয়ে বুক ঢেকে লজ্জা নিবারণ করত। গ্রামের মেয়েরা আবার নগরের মেয়েদের সাজসজ্জা পছন্দ করত না। নগরের মেয়েরা বাঁকাভাবে পা ফেলে কোমর দুলিয়ে হাঁটত আর সেটা গ্রামের মেয়েরা যদি নকল করার চেষ্টা করত, তাদের বলা হতো সোজা পা ফেলে চলতে। এরাও কপালে কাজলের টিপ পরত, কানে পরত কচি রীঠাফুলের দুল, চুলে দিত তেল। সূক্ষ্ম কার্পাস ও রেশম কাপড়ের জন্য বাংলাদেশ ছিল বিখ্যাত। তবে এসব ছিল উচ্চবিত্তের জন্য। সাধারণ দরিদ্রের কপালে জুটত মোটা ছিন্ন ও জীর্ণ কার্পাস কাপড়।

পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে লুঙ্গির পাশাপাশি প্যান্ট, অভিজাতরা পরে প্যান্ট-স্যুট-টাই। পশ্চিম ভারত থেকে আমদানি হয়ে এল নারীদের শাড়ির পরিবর্তে সালোয়ার কামিজ, দোপাট্টা, লেহাঙ্গা, কাঠের খড়মের বদলে চামড়া ও প্লাস্টিকের জুতা। ভারতীয় টিভিতে দেখা সিরিয়ালের প্রভাবে গ্রামবাংলায় মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে বিয়েশাদির আয়োজন আনুষ্ঠানিকতায়, পোশাক-আশাক অনেক কিছুতেই। মুসলিম নারীরা পরা শুরু করল বোরকা। ঠোঁটে লাক্ষারস ব্যবহারের বদলে এল লিপিস্টিক, নখের নেইল পলিশ। ফুলের মালা দিয়ে বুক ঢাকার পরিবর্তে চালু হলো ব্লাউজ, ব্রা ইত্যাদি। কানের কচি তালপাতা ও রীঠাফুলের দুলের বদলে এল সোনা-রুপাসহ ইমিটিশনের নানা গহনা। সূক্ষ্ম কার্পাস ও রেশম কাপড় উধাও হয়ে এখন প্রচলিত হয়েছে নানা ধরনের কাপড়। এখন মেহেদি গাছ থেকে মেহেদি পাতা সংগ্রহ করে কষ্ট করে বেটে হাতে লাগাতে হয় না। বিভিন্ন কোম্পানি ‘সাজ’, ‘শাহজাদী’ ইত্যাদি নাম দিয়ে বাজারে এনেছে নানা প্যাকেটজাত মেহেদি।

কৃষাণ বধূর গহনায়ও এসেছে পরিবর্তন। একসময় কৃষাণ বধূ/মেয়েদের পায়ে রুপার নূপুর বা খারু, কোমরে রুপার বিছা, হাতে রেশমি চুড়ি, হাতের একদম উপরে রুপার বাগ, গলায় পুতির মালা বা রুপার মালা বা হাঁসুলি, নাকে নথ ইত্যাদি। কপালে লাল টিপ আর বাহারি গহনায় কৃষাণ বধূরা যখন গাঁয়ের মেঠোপথ ধরে চলে যেত বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর গৃহে কিংবা স্বামীর গৃহ থেকে বাবার বাড়ি, তখন নূপুরের ছন্দে কবি খুঁজে পেত কাব্যিক ছন্দ। 

খেলাধুলা

খেলাধুলায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। গ্রামবাংলায় শরীরচর্চা ও বিনোদন আশ্রয়ী খেলার মধ্যে ছিল হাডুডু বা কাবাডি, দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, নৌকাবাইচ। এছাড়া ছিল এলাটিং বেলাটিং, ঘুড়ি ওড়ানো, বলিখেলা, মোরগ যুদ্ধ, কড়ি, মার্বেল, ষোলঘুঁটি, লাটিম, ডাংগুলি বা ডাংগুলি, এচিং বিচিং, ওপেন্টি বাইস্কোপ, কুতকুত, ফুল টোকা, পুতুল খেলা, নুনতা, পানি ঝুপ্পা, কানামাছি, গাইগোদানী, টোপাভাতি, লুডু ইত্যাদি। গ্রামগঞ্জের কোথাও কোথাও এখনো এসব খেলার প্রচলন যদিও আছে তবে এসবের বদলে ধীরে ধীরে প্রচলন ঘটেছে ক্রিকেট, ফুটবল প্রভৃতি খেলা। গ্রামেও এখন ঢুকে পড়েছে হকি, ভিডিও গেমস এবং কম্পিউটার বা ইন্টারনেটভিত্তিক নানা খেলা।

বিনোদন

গ্রামীণ জীবনে একসময় যাত্রাপালা, কবিয়ালের লড়াই, পুঁথিপাঠ, জারি-সারি গানের প্রচলন ছিল। এখন সেই স্থান দখল করেছে মঞ্চনাটক, থিয়েটার, সিনেমা, রেডিও, টেলিভিশন। এখন আগের মতো আর কবিগানেরও খুব একটা প্রচলন নেই। পুঁথিপাঠও তেমন শোনা যায় না। কীর্তন কিংবা ধর্মসংগীতগুলো এখন আর অনুষ্ঠান করে আয়োজনের উদ্যোগ দেখা যায় না। আগের জারি-সারি-ভাটিয়ালি গান, বাউলসংগীত (ইসলামী সুফি দর্শনের প্রভাবমণ্ডিত) এখন রেডিও-টেলিভিশনেই শোনে বা দেখে সবাই। এখন রবীন্দ্রসংগীত নজরুল গীতি কিংবা আঞ্চলিক গানের চর্চা ও প্রচার মাঠে-ময়দানে এমনকি মঞ্চে অনুষ্ঠান করে খুব একটা হয় না। এসবই এখন রবীন্দ্র-নজরুলের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে নগরে যা আয়োজন হয়, গ্রামের দর্শক-শ্রোতা তা-ই টেলিভিশনে দেখেন। মোবাইল ফোনে ইউটিউবে আসক্ত হয়েই এসব জনে জনে ক্ষণে ক্ষণে কর্ণকুহরে পৌঁছায়। বিনোদনের সামাজিক উপভোগ-উপলব্ধি এখন আর সমষ্টিতে নেই, সুকুমার বৃত্তি বিকাশের পথে নেই, কোনো প্রতিযোগিতা-চর্চায় নেই। অথচ এ গানগুলোর মাধ্যমে ধর্মশাস্ত্র, ন্যায়নীতিবাক্য বিনিময়ের অন্যতম বাহন ছিল। গ্রামেও এখন পাশ্চাত্য ধ্যানধারণা ও আধুনিক নগরজীবনকেন্দ্রিক বাংলা ব্যান্ড সংগীতের উদ্ভব ঘটছে। এখন এ ব্যান্ড সংগীতের প্রচুর শ্রোতা। এসব সংগীত বাণী বা মেলোডি নির্ভর নয়, উচ্চ গ্রামের বাদ্যসংগীত, যা দর্শক-শ্রোতাকে আলোড়িত করে কিন্তু বিমোহিত করে না। শোনার বা দেখার পর পরই তা মন থেকে দৌড় দেয়, চিন্তাচেতনার চৌহদ্দিতে তা দাঁড়ায় না। তাত্ক্ষণিক বিনোদন, শারীরিক আলোড়ন উদ্দীপক হিসেবে ব্যান্ড সংগীতের ব্যাপক প্রচারিত মূল্য রয়েছে। তবে জারি-সারি-ভাটিয়ালি বাদ দিয়ে ব্যান্ড সংগীতে আসক্ত হলে চিরায়ত ভাবুকতা উধাও হয়ে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। কেননা জারি-সারি-ভাটিয়ালি বা রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত চিত্তকে প্রশান্তি দেয়, অন্যপক্ষে পাশ্চাত্য প্রভাবিত ব্যান্ড সংগীত চিত্তকে অশান্ত করে।

উৎসব-আনন্দ

বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ বাংলাদেশ। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, মহরম, আশুরা প্রভৃতির পাশাপাশি দুর্গা পূজা, লক্ষ্মী পূজা, মনসা পূজা, স্বরস্বতী পূজাসহ নানা পূজা-উৎসবের প্রচলন এখনো আছে গ্রামবাংলায়। তবে যদিও আগের মতো এসব উৎসব এখনো প্রচলিত, তবে উৎসবের ধরন গেছে পাল্টে। সময়ের সঙ্গে ঈদ-সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে। অর্ধশত বছর আগের যে ঈদ-সংস্কৃতি, তার সঙ্গে বর্তমানের ঈদ-সংস্কৃতির ঢের তফাৎ। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এখন শহরে চাকরি ও কর্মসূত্রে বসবাসকারীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামে ঈদ করতে আসে। ঈদে মোলাকাত, মেলামেশা, সালামি, ঈদ কার্ড বিতরণ; পূজায় আলোকসজ্জা ও অন্যান্য বাহুল্য আয়োজনের মধ্যে আগের ঈদ কিংবা পূজা উৎসবের সাক্ষাৎ মেলে না। এর ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় দিক রয়েছে। উৎসব-আনন্দ, উৎসব পালনের ঐতিহ্যবাহী তাত্পর্য, সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধির ও সৃষ্টির সনাতন আদর্শ ও দর্শন অতিমাত্রায় অর্থ অপব্যয়ের ডামাডোলে, আটপৌরের পরিবর্তে অতি ফ্যাশননির্ভর চলনে-বলনে বহু কিছুর বিবর্তন লক্ষ করা যায়।

শিক্ষা ও সংস্কৃতি 

শিক্ষা সংস্কৃতির অংশ। সংস্কৃতি একটা সমগ্র ব্যাপার। শিক্ষা অংশ হলেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সংস্কৃতির বাইরের কিছু নয়। শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরস্পরকে প্রভাবিত করে। শিক্ষা ততক্ষণ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয় না, যতক্ষণ না তা সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়ে যায়। সুতরাং প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চা এবং শিক্ষা অর্জন একই। সংস্কৃতিচর্চা একটি সামাজিক ঘটনা; শুধু ব্যক্তিগত নয়। শিক্ষা প্রকৃত না হলে সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে এখানেই তার ক্ষতিকর সংঘর্ষ ঘটে। মানুষের জীবন ক্রমে বেশি করে অর্থনৈতিক উন্নতিকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্যক্তিক উন্নতি যে হারে চোখে পড়ছে, সামাজিক ভাঙনও সেই হারে দেখা যাচ্ছে। গ্রামীণ সমাজে যেসব প্রধান সংকট চোখে পড়ছে, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক রূপের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের বিপথগামী হওয়ার যে ভয় এখন তীব্র হয়ে উঠেছে, তার কারণ শিক্ষা হয়েছে সংস্কৃতি-বিচ্যুত। শিক্ষার্থীরা যাতে যেখানে সেখানে আড্ডা মেরে সময় না কাটায় বা যেকোনো চরমপন্থার শিকার হয়ে না পড়ে এবং নিয়মিত ক্লাসে আসে, সেজন্য পুলিশি তদারকি শুরু হয়েছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার মিল করে যথাযথ শিক্ষা অর্জনের বিকল্প নেই। কেননা Society makes a man, man makes a Society. আগে গ্রামে স্থানীয় উদ্যোগে পাঠাগার পরিচালিত হতো, সেখানে পাঠ্য বইয়ের বাইরেও বিবিধ বই পড়ার জন্য পাওয়া যেত। জ্ঞানচর্চার সুযোগ অবারিত থাকত। এখন সবাইকে সব বিষয়ে একই ভারিক্কিপাঠ্য বই দিয়ে পরীক্ষায় পাসনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকায় পাঠাগারের বই পড়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গ্রামে সংস্কৃতিচর্চায় তা শুধু যে শূন্যতার সৃষ্টি করছে তা নয়, মুক্তচিন্তা ও মননচক্রবালের বিকাশ অসম্ভব করে তুলছে। 

অর্থনীতি ও সংস্কৃতি

মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ নিবিড়। কেননা অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা মানুষে মানুষে যে সম্পর্ক তৈরি করে, সংস্কৃতি মূলত তাকে অবলম্বন করেই গড়ে ওঠে। স্বাধীনতা লাভের পর সবার সামনে অভাবিতপূর্ব সুযোগ-সুবিধার দরজা যেভাবে খুলে গেছে, যেভাবে এ সুযোগ-সুবিধা লুণ্ঠন ও দুর্নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে, তার থেকেই সৃষ্টি হয়েছে সমাজে নিম্ন, মধ্য ও ধনিক শ্রেণীর জীবনে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও রূপান্তরের সংকট। 

অবারিত সুযোগ-সুবিধার দ্বার হঠাৎ করে উন্মুক্ত হওয়ায় তা ব্যবহার করে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত লোকজন, তাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব রাতারাতি বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিক হয়েছে। মানুষ যেভাবে অর্থ উপার্জন করে তার সঙ্গে তার অর্থ ব্যয়ের ধরনের সম্পর্কও গভীর। অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারটি মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে বর্তমানে ধনী পরিবারের লোকজন, এমনকি কিছুটা অবস্থাপন্ন পরিবারের লোকজন, যেভাবে অর্থ ব্যয় করে, যেভাবে বিলাসিতা ও ফুর্তির জন্য অর্থ ব্যয় হয়, এর মধ্যে এক ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা সহজেই লক্ষণীয়। এ নব্য ধনিকদের মধ্যে শিক্ষিত-অশিক্ষিতের অর্থ ব্যয়ের ধরনের মধ্যে গুণগত কোনো পার্থক্য নেই। দুর্নীতির ক্ষেত্রে যেমন তাদের ঐক্য, তেমনি তাদের ঐক্য দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে।

লুণ্ঠন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন এবং যে অর্থ উচ্ছৃঙ্খলভাবে ব্যয় হওয়ার সঙ্গে যে বিষয়টি বিশেষভাবে সম্পর্কিত তা হলো সমাজের নিকৃষ্টতম অংশকে সমাজের উপরিভাগে নিয়ে আসা। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার-ব্যবহার, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, সাংবাদিকতা, নৃত্যগীতসহ সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রে এটা ঘটতে থাকা। এটা এক সংকটজনক পরিস্থিতি। এ সংকটের প্রধান দিক হলো, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও চরিত্রের নিম্নতা। সমাজের অগ্রগতির ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক লোকজনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এরা সমাজে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে থাকে। সাংস্কৃতিক অর্থে, সমাজের নিচ থেকে উপরে উঠে আসা এরাই নিকৃষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত থেকে ও তাদের উচ্ছিষ্ট ভোগ করে এরা নিজেদের লোভ চরিতার্থ করে। ফলে আবহমান সংস্কৃতির ভিত ক্ষয়িষ্ণু হয়ে ওঠে, অপসংস্কৃতি সেখানে ওয়াকওভার পেয়ে যায়। 

সংস্কৃতির পরিবর্তন

সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক থাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারতায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রাগ্রসরমানতায় এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে সংস্কৃতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। গত পাঁচ দশকে পরিবর্তনের ধারাটিও বেশ প্রবহমান। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোতে আনন্দ যেমন আছে, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা-বেদনাও কম নয়। গ্রামের মানুষ হাত দিয়ে ভাত খেত, এখনো খায়। তবে কোনো কোনো বাঙালি এখন কাঁটাচামচ ব্যবহার করে। আগে লুঙ্গি-শাড়ি পড়ত, এখন প্যান্ট ও সালোয়ার-কামিজ পরে, আগে ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানত, চালের গুঁড়ো করত, গরু দিয়ে ধান মাড়াত। কিন্তু এখন মেশিন এসেছে। মেশিনই সব করে দিচ্ছে। আগে গৃহকোণ থেকে নারীর বের হওয়াটা সংস্কৃতির মধ্যে ছিল না। এখন অফিস-আদালতে চাকরি করছে নারীরা। আগে জমিদারি, সামন্ত প্রথা ছিল এখন তা ভাবাই যায় না। এ রকম বহু পরিবর্তন ঘটেছে যা ইতিবাচক পরিবর্তন। এ পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ জীবনযাপন উন্নত হয়েছে, হচ্ছে। এসব পুরনো প্রথা হারিয়ে যাওয়াটা প্রগতিশীলতা। 

তবে সংস্কৃতির এমন কিছু উপাদান আছে যেগুলোর পরিবর্তন ঘটলে মূল্যবোধগত, শরীর-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সুরক্ষায় সংকট সৃষ্টি হয়। দেশী মাছ-মুরগি, গরু-খাসির মাংসের পরিবর্তে, কৃত্রিম উপায়-উপকরণ দিয়ে চাষ করা মাছ, ব্রয়লারের মুরগি, মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় বড় করা গরুর মাংস, জাঙ্ক ফুড, সোডামিশ্রিত পানীয়, বার্গাড় বা পিত্জা খাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় স্বাস্থ্যগত ও মানসিক ক্ষতির কারণ বাড়ছে। পিঠা চাল থেকে আসে, চাল ধান থেকে। ধান থেকে বাঙালি খই, মুড়ি, ভাত, চিঁড়া, চালভাজা এবং কত রকমের পিঠা বানাত। এগুলো বানাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তেল লাগত না। গৃহস্থের গরুর খাঁটি দুধ পেত শিশু। এগুলো গ্রামবাংলার নিজস্ব সম্পদ-সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিটা হারিয়ে যাবে যদি বিদেশী ভোজ্যতেল, বিদেশী গুঁড়ো দুধের ওপর নির্ভরশীল খাবারগুলো বাইরে থেকে আসে। তাতে আমদানিনির্ভরতায় অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে, দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নিরুৎসাহিত হয়ে একসময় হারিয়ে যাবে। যে স্বভাব-সংস্কৃতিগুলো অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোর বিষয়ে সচেতন হওয়ার অবকাশ আছে। শুকনো খাবারের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে তেল ব্যবহারের ফলে শরীরে নানা রোগবালাই বাসা বাঁধছে। নিজস্ব বিনোদন বাদ দিয়ে যখন বিদেশী চ্যানেল দেখা হয়, তখন বিদেশী পণ্যের ও ফ্যাশনের বিজ্ঞাপনটাও চোখে পড়ে, সেই বিজ্ঞাপন দেখে বিদেশী পণ্যের প্রতি, বিদেশী আচার-অনুষ্ঠান, আদব-কায়দা, ধ্যান-ধারণার প্রতি আসক্ত হয়। মোবাইল ফোনের ব্যবহার গ্রামীণ সমাজ-সংসার-পরিবার-অর্থনীতিতে ব্যাপক রূপান্তর ঘটিয়েছে সত্য, কিন্তু মোবাইলের এবং এর ভেতরকার ক্ষতিকর অ্যাপস যখন বিদেশী অপসংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়, তখন নিজস্ব সংস্কৃতির আমছালা দুটোই যায়, নীতি ও নৈতিকতার প্রেরণাগুলো পথ হারায় বা সাংস্কৃতিক ক্ষতি হয় এবং আলটিমেটলি অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়। সবুজ মাঠ শুধু ধান ও সবজি উৎপাদনের জন্য নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রাখার জন্য জরুরি। সেখানে সাময়িকভাবে বেশি লাভের জন্য মাছের ঘের বানিয়ে ধান উৎপাদন যেমন ব্যাহত করা হয়, তেমনি পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ফলশ্রুতিতে ঘন ঘন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের জলাবদ্ধতায় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয় অর্থনীতি। 

গ্রামে ছিল খোলা মাঠ, পরিষ্কার আকাশ, ঐতিহ্যগত কৃষি খামার, তার বিপরীতে নতুন সামাজিক এ ব্যবস্থাই অন্তর্জাল, কম্পিউটার, অনলাইনে নানা বিষয়, যা গ্রামীণ ফোকলোরের বিষয়গত বৈশিষ্ট্য এবং চারিত্র-লক্ষণ, তা এখন পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে গ্রামীণ মেলা হতো, এখনো হয়। কিন্তু আগের গ্রামের মেলার সঙ্গে এখনকার গ্রামীণ মেলার অনেক পার্থক্য ঘটে গেছে। পহেলা বৈশাখে আগে গ্রামে যে ধরনের মেলা হতো, এখন নগরের বৈশাখী মেলা তার চেয়ে আঙ্গিকে, বৈশিষ্ট্যে এবং বিষয়ে বিপুল পরিবর্তনকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। 


ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান