গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেশকিছু ইতিবাচক অর্জন রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর অর্থাৎ সত্তর দশকে এ দেশের নারী-পুরুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৫২ বছর। পাঁচ দশক পর এই গড় আয়ু প্রায় ২০ বছর বেড়েছে। এই গড় আয়ু এখন (২০২০ সাল) ৭২ বছর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী গড় আয়ু বাড়ার পেছনে যে কারণগুলোকে চিহ্নিত করেছেন তা হলো শিশু ও মাতৃমৃত্যুহার হ্রাস, বাল্যবিবাহের প্রবণতা কমে যাওয়া, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকের অগ্রগতি।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর হার ও শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমে এসেছে। যেমন ১৯৯০ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রতি এক লাখ প্রসূতি নারীর বিপরীতে ৫৩৪ জন, যা ২০১৭ সালে ১৭৩ জনে নেমে এসেছে। অন্যদিকে শিশুমৃত্যুর হার ১৯৭১ সালে ছিল শতকরা ৯.৪ ভাগ, যা ২০১৯ সালে কমে এসে শতকরা ১.৯ ভাগে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচির (পেন্টা ভি) মাধ্যমে বিবিধ সংক্রামক রোগ যেমন ডিপথেরিয়া, পোলিও, হুপিং কফ, হেপাটাইটিস বি, রুবেলা ও সর্বোপরি শিশুর জন্মের ছয় সপ্তাহ পর দেয়া বিসিজি টিকার মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগ থেকে মুক্তির জন্য প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলা হয়েছে।

অন্যদিকে মাতৃমৃত্যুহার কমিয়ে আনার জন্য ধাত্রীবিদ্যায় পারদর্শী মাঠকর্মীরা বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কমিউনিটি সেন্টারের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। ১৫-৪৫ বছরের মহিলাদের পাঁচটি ডোজ সংবলিত টিটেনাস টিকা দেয়া হয়, যাতে তারা মাতৃকালীন সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে।

এ প্রসঙ্গে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ল্যাম্ব মিশনারি হাসপাতালের একটি দৃষ্টান্তমূলক কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করতে চাই। এ হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যার নার্স এবং কর্মীরা আশপাশের গ্রামগুলোতে নিয়মিত উঠানবৈঠকের আয়োজন করে। একটি নির্বাচিত বাড়ির উঠানে গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে মাতৃস্বাস্থ্য ও পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, প্রসবপূর্ব মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির কাজ করে যাচ্ছে, যা অন্যদের জন্য অনুকরণীয়। এছাড়া ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, গ্রামীণ কল্যাণ, মেরি স্টোপস ক্লিনিকসহ অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও এনজিও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিশেষত মেটারনিটি, পুষ্টিবিদ্যা, বিশুদ্ধ পানি পান ও স্যানিটেশন ইত্যাদি স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। এটি একটি শুভসংকেত। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই দেখা যায়, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অসংগতিগুলো বেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে, যা বিপর্যস্ত করে তুলেছে স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট।

এবার চোখ ফেরাই দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে। বিশেষত গত পাঁচ দশকের গ্রামভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবস্থান। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষের এক-তৃতীয়াংশ (৩৬.৬%) শহরে বাস করে, অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যার বেশির ভাগ জনগণ এখনো গ্রামকেন্দ্রিক জীবন যাপন করছে। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের অধিকাংশই শহরকেন্দ্রিক। ফলে চিকিৎসার জন্য মানুষ ছুটে আসছে মেট্রোপলিটন শহরে এবং রোগীর চাপ সামলাতে নাজেহাল অবস্থায় পড়ছে শহরের হাসপাতালগুলো।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করলেই স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যগুলো খুব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে (২০১৯-২০ সাল) বাংলাদেশে মোট সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬০০টি। এর মধ্যে ৪৮২টি প্রাথমিক সেবা হাসপাতাল রয়েছে উপজেলাকেন্দ্রিক। প্রায় ৬৫টি সেকেন্ডারি হাসপাতাল রয়েছে জেলাকেন্দ্রিক এবং ১৫টি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে যেখানে বিশেষ চিকিৎসা সেবা (যেমন হূদরোগ, বক্ষব্যাধি, সংক্রমক রোগ ইত্যাদি) দেয়া হয়। এছাড়া সরকারিভাবে প্রাইমারি এবং শিশু ও মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবার জন্য ১৫ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্যাটেলাইট ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এত সংখ্যক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্যাটেলাইট ক্লিনিক থাকা সত্ত্বেও গ্রামাঞ্চলের মানুষ ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য ছুটে আসছে কেন? ডিজি হেলথের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল বেডের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ এবং বেসরকারি হাসপাতলের সংখ্যা সরকারি হাসপাতালের প্রায় দ্বিগুণ। এ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি ১০০০ রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত বেডের সংখ্যা একটিরও কম (মাত্র ০.৮৭টি)। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপকাঠি অনুযায়ী প্রতি ১ হাজার রোগীর জন্য ন্যূনতম বেড বরাদ্দ হলো অন্তত তিনটি। অর্থাৎ বাংলাদেশে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ রোগীর জন্য কোনো হাসপাতাল বেড বরাদ্দ নেই। ফলে এই দুই-তৃতীয়াংশ রোগী বেড ও ডাক্তারের অভাবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী (২০১৮ সাল) বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার রোগীর জন্য ডাক্তার রয়েছেন একজনেরও কম (০.৬ জন)। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপকাঠি অনুযায়ী প্রতি ১ হাজার রোগীর জন্য একজন ডাক্তার প্রয়োজন। এছাড়া বাংলাদেশে ডাক্তার ও নার্সের আনুপাতিক সংখ্যা খুবই নাজুক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপকাঠি অনুযায়ী যেখানে একজন ডাক্তারের বিপরীতে অন্তত তিনজন নার্স থাকা প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে একজন ডাক্তারের বিপরীতে একজনেরও কম (.০৬) নার্স রয়েছেন। অর্থাৎ বর্তমানে নার্সের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম। গত পাঁচ দশকে নার্সিং পেশার প্রতি গুরুত্ব আরোপ না করার কারণে এ করুণ পরিণতির সৃষ্টি হয়েছে। অবশেষে গত ২০১৬ সালে সরকার নার্সিং পেশাকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করেছে এবং বেশকিছু নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কিন্তু অধিকাংশ নার্সিং কলেজের শিক্ষার মান এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।

দেশে বর্তমানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) বেডের সংখ্যাও অপ্রতুল। উন্নতমানের মাল্টিডিসিপ্লিনারি টারশিয়ারি কেয়ার হাসপাতালের সংখ্যা নগণ্য এবং এসব হাসপাতালের অধিকাংশই ঢাকা ও মেট্রোপলিটন শহরকেন্দ্রিক। দেশে মোট নিবিড় পরিচর্যা বেডের সংখ্যা অনধিক ১২০০, এর মধ্যে কমবেশি ৪৫০টি সরকারি এবং ৭৫০টি বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছে। প্রতি এক লাখ রোগীর বিপরীতে নিবিড় পরিচর্যা বেডের সংখ্যা একটিরও কম। এদিক থেকে বাংলাদেশ নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও পাকিস্তান থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।

ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেডের সংখ্যা (প্রতি এক লাখ)

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় রেফারেল প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতির কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপ বাড়ছে। একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। অথচ রেফারেল প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হলে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি পর্যায়ে অনেক রোগী পারিবারিক চিকিৎসক বা জেনারেল প্র্যাকটিশনারের কাছে চিকিৎসা লাভ করতে পারে এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ক্রিটিক্যাল রোগীদের চিকিৎসায় মনোযোগ দিতে পারবেন।

স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। জনস্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ মোট জিডিপির ২.৩ শতাংশ ব্যয় করে; যেখানে নেপাল ৫.৬ শতাংশ, শ্রীলংকা ৩.৮ শতাংশ, ভারত ৩.৬ শতাংশ ও যুক্তরাজ্যে ৯.৬ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান থেকে উন্নত দেশের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পার্থক্য খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়।

স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ব্যয়

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানের ওপর সর্বশেষ যে র্যাংকিং প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। সার্কভুক্ত দেশগুলোর ভেতরে বাংলাদেশের ওপরে কেবল রয়েছে শ্রীলংকা, তাদের অবস্থান ৭৬তম। এছাড়া ভারত ১১২তম, পাকিস্তান ১২২তম, ভুটান ১২৪তম, মালদ্বীপ ১৪৭তম, নেপাল ১৫০তম এবং সব থেকে পেছনে রয়েছে আফগানিস্তান ১৭৩তম অবস্থানে। এই র্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভারতের চেয়ে ভালো বলেই প্রতীয়মান হয়। অথচ ভারতে বাংলাদেশী রোগীরা চিকিৎসার জন্য বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। এ ব্যাপারে আমাদের অনুসন্ধানী হওয়া জরুরি।

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের (এসকাফ) ২০১৮ সালের জরিপে বলা হয়েছে, জিডিপি অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ৫২টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০১৪ সালে এক রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালগুলোতে চাহিদার তুলনায় শয্যার সংখ্যা অপ্রতুল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক টিকিট কাউন্টার এবং নারী রোগীর জন্য বহির্বিভাগে পৃথক বসার ব্যবস্থা নেই।

জেলা সদর হাসপাতালে সিসিইউ, আইসিইউ, সিটি স্ক্যান যন্ত্র ও লিফট নেই। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। উপজেলা পর্যায়ে এ সমস্যাটি আরো প্রকট। জেনারেটর থাকলেও তা চালানোর জন্য জ্বালানি তেলের বরাদ্দ পর্যাপ্ত নেই। হাসপাতালে মজুদ ওষুধের তালিকা কোনো কোনো ক্ষেত্রে  যেমন টানানো হয় না, তেমনি নিয়মিত তা হালনাগাদও করা হয় না। অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধের কাউন্টার থাকলেও অপর্যাপ্ত ওষুধ, অনিয়মিত সরবরাহ ইত্যাদি নানাবিদ কারণে সেগুলো অচল হয়ে পড়ছে।

অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে যন্ত্র সচল থাকে না। এছাড়া আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে ও ইসিজি যন্ত্রের অভাব রয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষ করে ডিজিটাল এক্স-রে, ইকো-কার্ডিয়াক, মাইক্রোস্কোপ প্রভৃতির অভাব রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্সও কম। অনুমোদিত অ্যাম্বুলেন্সের সবগুলো আবার সচল নয়।

২০২০ সালের অক্টোবর মাসে কয়েকটি জেলায় আরেকটি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। সেই সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ছয় বছর আগে টিআইবি যে রিপোর্ট দিয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে সেই অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি।

এমন বাস্তবতায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ২৭ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় যা ২ হাজার ১১৮ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন-অনুন্নয়ন মিলে ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ৬৫ শতাংশই ব্যয় হয় বেতন-ভাতায়, বাকিটা উন্নয়নে। সর্বোপরি দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা খুবই নাজুক এবং জবাবদিহিতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। যে অর্থই বরাদ্দ হোক না কেন, স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক সক্ষমতার অভাবে সেটুকুও পুরোপুরি ব্যবহূত হয় না।

বাংলাদেশে প্রধান কয়েকটি অসংক্রমক রোগের মৃত্যুর হার

বর্তমানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ। ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হূদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ দূষণ, মদ ও তামাক সেবনের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসের কারণে ঘটছে। মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৯ শতাংশ এই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটছে। যার ফলে বছরে প্রায় ৮-১০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে এবং অনেকেই অকালে ঝরে পড়ছে। একদিকে বলা হচ্ছে, গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে, অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে প্রায় তরুণ বয়স থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হূদরোগ এমনকি ক্যানসার নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে প্রতি বছর প্রায় লাখ লাখ মানুষ।

স্বাস্থ্যখাতে জনপ্রতি ব্যয় (ডলারে)

এছাড়া সংবাদপত্রগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের যেসব দুর্নীতির চিত্র দেখতে পাওয়া যায়, তা আমাদের যে উদ্বিগ্ন করে শুধু তাই নয়, সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসার মৌলিক অধিকারকেও ক্ষুণ্ন করে। তাই শুধু স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বৃদ্ধি করলেই চলবে না, প্রয়োজন সুশাসন এবং সঠিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্নীতি রোধ করা।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত জাতীয় উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাপকাঠিকে নির্ধারণ করে। বলা হয় শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড এবং স্বাস্থ্য হলো সব সুখের মূল। তাই শিক্ষার মান উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। তা না হলে অপরাপর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে এবং তা এক সময় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। বর্তমানে করোনাভাইরাসের মহামারী আমাদের সেই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতকে সঠিক ব্যবস্থাপনার অধীনে আনার জন্য কয়েকটি সুপারিশ প্রস্তাব করা যেতে পারে:

জেলা/উপজেলা পর্যায়ে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রণোদনা দিয়ে মানসম্পন্ন সেকেন্ডারি হাসপাতাল তৈরির মাধ্যমে শয্যা এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো

প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোতে ডিজিটাল সংযুক্তির মাধ্যমে রোগীর জন্য রেফারেল সিস্টেম চালু করা

স্বাস্থ্যসেবা বীমা ব্যবস্থা চালু করা

দুর্নীতির কারণে বাজেটের অপব্যবহার রোধ করা

রাজনৈতিক নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেয়া বাধ্যতামূলক করা

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত একটি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। এজন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনাকে পুনর্বিন্যাস করার জন্য সৎ, নিষ্ঠাবান, অভিজ্ঞ এবং দক্ষ ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হতে হবে। তাদের উপযুক্ত বেতন-ভাতা এবং আনুষঙ্গিক প্রণোদনা দিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। আমরা একুশ শতকে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অপেক্ষায় আছি।


তথ্যসূত্র:

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)

সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)

বিশ্বব্যাংক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক (এসকাফ)

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)


কিশওয়ার ইমদাদ: একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা