যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল। তার সঙ্গে আমি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে কাজ করেছি। শুরুতেই একটা গল্প বলে রাখি, বুঝতে সহজ হবে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে বের হয়ে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলাম। ১৯৯০ সালের দিকে আমি একবার চট্টগ্রামে গিয়েছি বেড়াতে। সেখানে তিন বন্ধুর সঙ্গে একদিন রাতের খাবার খেতে খেতে এক বন্ধু বলল—দোস্ত, একটা কথা বলি, কিছু মনে করো না। তুমি তো আমাদের ক্লাসের ক্যাপ্টেন ছিলা, আর মেধাবীও ছিলা। আমরা ভেবেছিলাম তুমি চাকরি ক্ষেত্রে খুব ভালো করবা। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী তুমি ভালো করছ না। এসব শুনে আমি খুব আপসেট হয়ে গেলাম। সকালে আমার ফ্লাইট ছিল। রাতে আমি ঘুমাতেই পারলাম না। আমেরিকায় আমার কিছু বন্ধু আছে। তাদের সঙ্গে কথা বললাম, তারা আমাকে আমেরিকায় যাওয়ার পরামর্শ দিল। আমি আমেরিকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমার ভিসা-টিকিট সব ওকে হওয়ার পর আমার এক বন্ধু একদিন বলল, তোমার জন্য একটা ভালো খবর আছে। তোমার সঙ্গে যমুনার বাবুল সাহেব দেখা করতে চান, তিনি অনেক বড় মাপের মানুষ। তোমার ব্যাপারে শুনে তিনি খুব অভিভূত হয়েছেন। আমি বললাম, আমি দেখা করে কী করব? আমার তো টিকিটও রেডি, আমেরিকা যাচ্ছি। ওই বন্ধু এবার অনুরোধ করা শুরু করল, আমি তাকে কথা দিয়ে ফেলেছি। তোকে যেতেই হবে। বাসা কাছাকাছি হওয়ায় আমি গেলাম দেখা করতে। গিয়ে দেখি তিনি নেই, ঢাকার বাইরে গেছেন। আমিও ভাবলাম, যাক বাঁচা গেল। চলে এলাম। এরপর বন্ধু বাসায় এসে বলে যে যেহেতু একবার গিয়েছি, আর আমাদের যাওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। তোকে আরেকবার যেতেই হবে। কাছের বন্ধুর পীড়াপীড়িতে আবার গেলাম তার কাছে। পরের দিন, এবার সেনাকল্যাণে। এবার দেখা হলো, তিনি আমাকে বললেন, আমি সো সরি, আপনারা এসেছিলেন, আমি ছিলাম না। তিনি খুব ‘স্ট্রেইট কাট’ মানুষ। আর তার মতো ইন্টেলিজেন্ট মানুষ আমি জীবনে কম দেখেছি। তিনি আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, আপনার কথা অনেক শুনেছি। আমার একটা অনুরোধ। আমি খুব বড় একটা কোম্পানি করব। আপনি জয়েন করেন। আমি বিলম্ব না করেই বলে দিলাম, আমি তো আমেরিকা যাওয়ার জন্য রেডি। আমি আসলে জানি না, আমার ভাগ্যটা হয়তো ভালো ছিল বলে তিনি আমাকে কোনো প্রশ্নও করেননি। সাক্ষাতের প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অফার দিয়ে বসলেন। তিনি নানাভাবে আমেরিকা না যাওয়ার জন্য আমাকে বোঝাতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত আমাকে রাজি করাতে না পেরে একটু চালাকি করলেন। আসলে তিনি অনেক চালাক মানুষ। তিনি বললেন, আমি একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দিই। আপনি ভাবির কাছে রেখে যাইয়েন। আমি বলছি না আপনি যাইয়েন না। আপনি যান, যদি আপনার খারাপ লাগে, চলে আইসেন। আর আপনি আসলে আপনার জন্য দ্বার খোলা। যেকোনো সময় জয়েন করতে পারবেন। এমনকি এক বছর হয়ে গেলেও আপনার জন্য ওপেন অফার থাকল। তিনি কলবেল চেপে একজনকে ডেকে আমার বেতন বলে দিলেন, বললেন, উনি যা পায়। তার থেকে আড়াইশ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার বানিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে আমার তখনকার কোম্পানি গাড়ির চেয়ে দেড়শ ভাগ বেশি সুবিধাসম্পন্ন গাড়ি বরাদ্দ দিয়ে দিতে বললেন। আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার এনে বাসায় রেখে আমেরিকা চলে গেলাম। আমি এক বন্ধুর ওখানে উঠলাম। কোনো কাজকর্ম নেই। বন্ধুর বাসাতেই থাকি, তার কাজকর্মে টুকটাক সহায়তা করি। আর ওয়ার্ক পারমিটের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। তারাও চেষ্টা চালাল। এ সময়ে আমি তাদের দৈনন্দিন কাজ দেখলাম। তারা নিজের কাজ নিজেই করে। নিজেরাই কাপড় কাচে, রান্না করে। আর আমি এসবে অভ্যস্ত ছিলাম না। আমি ছাত্রাবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে থাকতাম। সেখানে থাকতেও নিজের কাপড় নিজে কাচিনি। একটা ছেলেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাপড় কেচে নিতাম। আর বাসায় আমার একটা ছোট মেয়েও ছিল। তার সঙ্গে ফোনে মাঝেমধ্যে কথা হতো, আমার মা ফোন করে কান্নাকাটি করতেন। তারা সবাই আমাকে ফিরে আসতে বলত। তিন মাসে আমি সব মিলিয়ে দেখলাম, এ বয়সে আসলে এত স্ট্রাগল করা আমার জন্য সম্ভব না।
সেখানে তিন মাস ছিলাম। এরপর ১৯৯১ সালের কোনো এক মাসের ৩১ তারিখে দেশে এলাম। অবশ্য আগে একবার ওখানে যোগাযোগ করে নিয়েছি। আমি এসে ১ তারিখে জয়েন করলাম। এসে দেখি তিনি আমার জন্য পুরো অফিস ডেকোরেট করে রেখেছেন। আমাকে সুন্দরভাবে রিসিভ করলেন, সবাইকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এই হলো তার সঙ্গে আমার যাত্রা শুরু। আমাকে তিনি আগেই বলেছিলেন, আপনি আমার ভাইয়ের মতো। আপনি চাইলে বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন—আমার কাছে পর্যাপ্ত ফান্ড আছে। আপনার কাজ হলো কোম্পানি খোলা। আমি আসলে আমেরিকার অবসর সময়টাতে স্টাডি করেছিলাম ওনার জন্য। ভেবেছিলাম, আমি যদি নাও যাই, ওনার জন্য কী কী প্রডাক্ট দেয়া যায়, এগুলো নিয়ে স্টাডি করেছিলাম। আমি চিন্তা করলাম, বাংলাদেশে অনেক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, কিন্তু লোকাল কোম্পানি নেই। আমি নিজেও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করেছি। আমি ওরকম করতে পারব না। আমি দেখব কোন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিটা শীর্ষে আছে। আমি তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী একটা কোম্পানি করতে চাই। বাংলাদেশের লোকাল এ রকম কোম্পানি নেই। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি বাটা, তখন এর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না; আমি দিলাম প্যাগাসাস, নামটা আমি দিয়েছি। ইউনিলিভার—আমি দিলাম অ্যারোমেটিক। অক্সিজেন, আমি দিলাম যমুনা। এ রকম করে করে আমি কিছু ডিসিশান আগেই নিয়ে নিয়েছিলাম।
আগেই বলেছি, তিনি আমাকে বলেছিলেন ফান্ড সমস্যা নয়। তিনি আমাকে বললেন, আপনি ভালো ভালো প্রজেক্ট দেন। যেটা আমার জন্য ভালো হয়। তিনি এটাও বলে দিলেন যে কোনো প্রজেক্ট যদি ফেইল করে সেটা আমার, আর যদি সফল হয় তাহলে তা আপনার। তিনি কত ভালো একটা অ্যাপ্রোচ দিলেন! একটা কথা বলি, বাইরে থেকে তার সম্পর্কে অনেকেই অনেক কথা বলেন। কিন্তু আমি তাকে যেভাবে পেয়েছি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও খুব ভালো মানুষ। তবে হ্যাঁ, তিনি একটু রাগী মানুষ ছিলেন। সাধারণ মানুষ কোনো অন্যায়ের কারণে রাগ করলে তা হয় দুই মাত্রায় আর তিনি করতেন পাঁচ মাত্রায়। তবে তিনি কখনো অন্যায় ছাড়া রাগ করতেন না। তবে আমি দেখেছি, তার যে রি-অ্যাকশন, সেই রি-অ্যাকশনটা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। সব সময়ের জন্য বলব নাম, তবে অনেক ক্ষেত্রেই এমন বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ‘ফিয়ার ফ্যাক্ট’টা কাজ করে। তা না হলে হয়তো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে যায়। তবে তার বুদ্ধিমত্তা ও তার সাহস সত্যিই বিরল। উদাহরণ হিসাবে বলি, আমি যখন সাবানের একটি বিজ্ঞাপনে ১০০ ভাগ হালাল শব্দটা ব্যবহার করতে চাইলাম। আমার পরিচিত যার কাছেই আমি এটা বললাম, সবাই এর বিরোধিতা করলেন। এমনকি আমার স্ত্রীও। তবে বাবুল সাহেব আমাকে একবাক্যে বললেন, আপনি এগিয়ে যান। আমি তাকে এ সিদ্ধান্তের ঝুঁকির কথাও জানালাম, এমনও বললাম যে কোম্পানি কিন্তু বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিনি আমাকে বললেন, হলে হবে। আমি মনে করব আমার একটা কোম্পানি আগুনে পুড়ে গেছে। এখন অনেকেই বলেন, সেই প্রকল্পটি বিরাট সাকসেসফুল হয়েছে। আমি ভাবি, ওইদিন সেই লোকটা ছাড়া আর কোনো উদ্যোক্তা কি এই সাহসটা নিতে পারতেন! তিনি এটাকে কোনো ঝুঁকিই মনে করেননি। এমনকি কোনো প্রকল্পেই তিনি আমাকে বাধা দেননি। আর ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে তিনি যে কী ভদ্রতা দেখাতেন! কোনোদিন আমাকে ডাইরেক্টর সাহেব ছাড়া নাম ধরেও ডাকেননি। আমি গ্রুপ মার্কেটিং ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দিয়ে প্রায় ছয় বছর সেই পদে ছিলাম। আমি থাকাকালে অন্তত চার-পাঁচটা বড় বড় কোম্পানি দাঁড়িয়েছে। এসব আমিই প্রস্তাব দিতাম। তারপর তার সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করে পুরো পরিকল্পনা সাজাতাম।
তার উদ্যম ও তার উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনাগুলোকে তুলে ধরা দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, দেশের প্রথম নিটিং-ডায়িং ফ্যাক্টরি কে করেছেন? নুরুল ইসলাম বাবুল। তখন কেউ চিন্তাও করেননি। তিনি বড় বড় চিন্তা করতেন। যাই করতেন, অনেক বড় করে করতেন। তিনি যখন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি করলেন, ১২তলা, ৮তলা এমন। আবার মানুষ স্পিন্ডল (সুতা কাটা মেশিন) করে ২৫ হাজার, ২০ হাজার দিয়ে। তিনি করেছিলেন আড়াই লাখ স্পিন্ডল দিয়ে। এত বড় ফ্যাক্টরি করেছেন, এমাথা থেকে অন্য মাথা দেখা যায় না। যেতে হয় গাড়ি দিয়ে। তিনি জানতেন যে বাংলাদেশের বস্ত্র খাত একদিন অনেক এগোবে। তিনি বলতেন, বিশ্বের যেসব দেশ বড় হয়েছে, শুধু বস্ত্র দিয়েই বড় হয়েছে। এসব বিষয়ে তার প্রচুর জ্ঞান ছিল। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যাই থাকুক, তার ভেতরে অনেক জ্ঞান ছিল। অসাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তার কাছে কেউ চালাকি করে, মিথ্যা বলে পার পাওয়ার সুযোগ ছিল না। তিনি সহজেই ধরে ফেলতেন।
আরেকটা বিষয় বলতে হয়, তিনি যা করেছেন সব দেশের জন্য। তিনি প্রায়ই একটা কথা বলতেন, আমি যেটাই করি, বাংলাদেশের জন্য করব। এমনকি কোম্পানি লাভ করলে সেটা টাকাও আমার চাই না। এমনকি আমার জানা মতে ঢাকার বাইরে জনতা ব্যাংকের একটা ছাড়া আর কোনো অ্যাকাউন্টও তার নেই। তিনি কোনো ব্যাংক লোনও নিতেন না। তিনি ব্যাংক লোন নিয়ে ঋণখেলাপি হবেন, বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করবেন—এমন ইচ্ছেও তার নেই। এখনকার খবর তেমন জানি না। তবে এটুকু জানি, শামীম (শামীম ইসলাম) তার যোগ্য ছেলে, খুবই সাউন্ড ও ঠান্ডা। লন্ডন থেকে পড়াশোনা করে এসেছে। আমি তাকে খুব ছোট পেয়েছিলাম। তারা কখনো বিদেশে কোনো অর্থ বিনিয়োগ করেছে, বাড়ি কিনেছে, জমি কিনেছে কিংবা কোনো কিছু করেছে বলে আমার জানা নেই। এটা বাবুল ইসলামও বিশ্বাস করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন দেশীয় বিনিয়োগে। তিনি খুব সাধারণ কাপড়-চোপড় পরতেন, সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তিনি পণ্য বিদেশে রফতানিতেও খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। তিনি বলতেন বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তিনি সত্যিকার অর্থেই অনেক ভালো একজন মানুষ ছিলেন। আমি প্রত্যাশা করি, তার পরের প্রজন্মের হাত ধরে গ্রুপটা আরো এগিয়ে যাক।
সৈয়দ আলমগীর: যমুনা গ্রুপের সাবেক গ্রুপ মার্কেটিং ডিরেক্টর





