আমার বাবা অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। অনেক আবেগ, অনেক গর্ব নিয়ে আমরা ভাইবোনেরা প্রতিটি সময় কথাটি উচ্চারণ করে থাকি। তিনি শুধু একজন সফল মানুষই নন, একজন অসাধারণ সৎ ও ভালো মানুষও বটে।

আমরা ভাইবোনেরা প্রতিটি সময় তাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করার চেষ্টা করি। কোন ধরনের পরিস্থিতিতে তিনি কেমন আচরণ করতেন, কী কথা বলতেন, কতখানি ধৈর্ষ ধরতেন আমরা ছোটবেলা থেকে এ বিষয়গুলো দেখে বড় হয়েছি। আর চেষ্টা করেছি এ বিষয়গুলোকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে।

আমার বাবা একজন সফল মানুষ শুধু নন, একজন সফল পিতাও—এটা আমি বলব। কারণ তার সব সন্তান নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও তারা কেউ বাবার ইচ্ছার বাইরে কোনো কাজ করেনি। তিনি তার সন্তানদের নিজের মনের মতো করে গড়ে তুলতে পেরেছেন।

আমি নিজে ছোটবেলা থেকে আব্বাকে দেখেছি সারা দিন পড়াশোনা করতে। আর আমাদের ছিল বাসাভর্তি বই। সেই থেকে আমি আজীবন চেয়েছি একজন শিক্ষক হতে এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক হতে। তখন ছোট ছিলাম, জানতাম না যে কোথায় শিক্ষক হব—স্কুল, কলেজ নাকি বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু জানতাম যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক হতে হবে। তাই সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছি।

আমার ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় ব্যতিক্রম সেটা হলো আমি আমার বাবার ছাত্রী। তিনি আমার ক্লাস নিয়েছেন, যদিও পরীক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত ছিলেন। এটা আমার জীবনের বিরল একটি অভিজ্ঞতা, বিরল সম্মান ও গর্বের বিষয়। ক’জন মেয়ে পারে তার বাবার ছাত্রী হতে!

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন অসাধারণ শিক্ষক। যে তার ক্লাস করেনি, সে বুঝবে না সে কী পায়নি। তার ক্লাসে কেউ ফাঁকি দিত না। কোনো সুযোগও ছিল না ফাঁকি দেয়ার। কারণ ক্লাসের পুরোটা সময় তিনি ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারতেন। কেউ তার কোনো কথা মিস করতে চাইত না। মনে হতো, একটি কথাও বাদ গেলে অনেক কিছু অজানা থেকে যাবে। পেশাগত জীবনে, ব্যক্তি জীবনে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন সৎ, নির্লোভ, নির্ভীক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষ। তার এ গুণগুলোর প্রকাশ পেয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। তিনি যা বিশ্বাস করেছেন নির্ভয়ে তা বলেছেন। নির্ভীকভাবে তা প্রকাশ করেছেন তার লেখনীর মাধ্যমে। তিনি কোনো লোভের কাছে নতি স্বীকার করেননি, কোনো ভীতির কাছে হার মানেননি।

আমার বাবা শুধু একজন সফল শিক্ষকই ছিলেন না। তিনি যখন যে কাজ করেছেন, সেখানেই সফল হয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টর ছিলেন, প্রভোস্ট ছিলেন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান ছিলেন, প্রো-উপাচার্য ছিলেন এবং উপাচার্য ছিলেন—আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল।

তিনি যখন উপাচার্য—তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন জট ছিল অনেক—এই সেশন জট কমিয়ে আনার জন্য তিনি প্রথম প্রচলন করেন একাডেমিক ক্যালেন্ডার। এই একাডেমিক ক্যালেন্ডার কার্যকর করার ফলে সেশন জট অনেক কমে গিয়েছিল। উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বহু বছর পর ১৯৯৩ সালে সমাবর্তন সভার আয়োজন করেন। সেখানে বিশেষ অতিথি ছিলেন খ্যাতিমান পরমাণু বিজ্ঞানী ড. আবদুস সালাম।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম পিএইচডি ডিগ্রি আমার আব্বার সুপারভিশনে হয়েছে। যদিও ১৯৩৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তার আগে কেউ বিষয়টি চিন্তা করেনি।

শুরু থেকেই আমার বাবা ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জেল খেটেছেন। এ ধরনের একটি বিশাল বিষয়ের সঙ্গে জড়িত থাকতে পেরে তিনি ছিলেন অত্যন্ত গর্বিত।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ এফএইচ হলের (শেরেবাংলা একে ফজলুল হক) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। তাদের সময় ছাত্ররাজনীতি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ছিল। যারা জয়লাভ করতেন আর যারা নির্বাচনে পরাজিত হতেন সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতেন। আমার বাবা কাজপাগল মানুষ ছিলেন। সারা দিন পড়াশোনা আর লেখালেখি—এই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। সেজন্য তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ৬০-এর কাছাকাছি এবং আর্টিকেল লিখেছেন শতাধিক। আমি এজন্য মাঝে মাঝেই মজা করে বলতাম, আব্বা, সবই তো আপনি লিখে ফেললেন, আমি আর কী লিখব?

কাজপাগল মানুষ ছিলেন বলেই যখন অবসরে গেলেন তখন আমরা সবাই একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম—আব্বা কাজ ছাড়া কীভাবে থাকবেন! এজন্য যখন তাকে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের দায়িত্ব নিতে ড. মুজিব খান—ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা—অনুরোধ করেন, আমরা তখন সবাই রাজি হয়ে যাই, আব্বা যদিও একটু দোটানায় ছিলেন। এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে আব্বা দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং অত্যন্ত সফলভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পরিচিত করিয়েছেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ছিলেন।

আব্বা কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। তখন অনেক সুযোগ ছিল বিদেশে থেকে যাওয়ার। প্রলোভনও ছিল। কিন্তু আমার দেশপ্রেমিক বাবা কখনো বিদেশে থাকতে চাননি। আমাদের অর্থাৎ তার ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রেও তিনি সব সময় চেয়েছেন দেশে প্রতিষ্ঠিত হোক তার ছেলেমেয়েরা। এক্ষেত্রে আমার আম্মা সেলিমা আহমদেরও একই চাওয়া ছিল।

সংসার জীবনে অত্যন্ত সুখী দম্পতি ছিলেন আমার বাবা-মা। কেউ কখনো একে অন্যকে ছেড়ে তারা লাঞ্চ বা ডিনার করেননি। বাবার যদি বাইরে কোথাও দাওয়াতও থাকত তিনি প্রায়ই না খেয়ে বাসায় ফিরে আসতেন এক সঙ্গে খাবেন বলে। আমার আম্মা ২০১৬ সালের মে মাসে ইন্তেকাল করেন। এর পরই আব্বা একদম একা হয়ে গিয়েছিরেন। যদিও আমরা ভাইবোনেরা প্রতিদিন ৩-৪ ঘণ্টা করে আব্বার সঙ্গে সময় কাটাতাম, তার পরও আব্বাকে অনেক একাকী লাগত।

আব্বা তার সারাটা জীবন দিয়ে গেছেন মানুষকে। মানুষের জন্য সব সময় তিনি কাজ করেছেন, চিন্তা করেছেন। একইভাবে মানুষের ভালোবাসাও পেয়েছেন অকৃপণভাবে। দেশে-বিদেশে যেখানেই গিয়েছেন, সাধারণ মানুষ তাকে ঘিরে ধরেছে—ভালোবাসায়, সম্মানে তাকে সিক্ত করেছে। এক জীবনে এত ভালোবাসা পাওয়া অনেক ভাগ্যের কথা। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত নিরপেক্ষ মানুষ ছিলেন। তিনি যখন  উপ-উপাচার্য এবং উপাচার্য তখন শিক্ষক সিলেকশনে সব সময় মেধা ও যোগ্যতাকে দেখতেন, দলীয় বিবেচনাকে নয়।

তিনি ছিলেন স্বল্পাহারী, নিয়ম মেনে জীবন যাপন করেছেন। হয়তো সুস্থ থাকতেন, হয়তো বেঁচে থাকতেন আরো কিছুদিন। কিন্তু করোনাকালীন দুঃসময় তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তিনি কোথাও যেতে পারছিলেন না, কেউ তার কাছে আসতে পারছিল না, এটা তার জন্য অনেক কষ্টের ছিল। আমরা পরিবারের মানুষ ছাড়া আর কেউ তখন আসত না, ভয় ছিল কেউ এলে যদি আব্বার কভিড হয়। এজন্য একটু রেস্ট্রিকশন রাখা হয়েছিল। কিন্তু এ সময় আব্বা একটু মনমরা থাকতেন। সারা জীবন লোকজন নিয়ে থাকা অভ্যাস। তাই লোকজন ছাড়া জীবন তাকে কষ্ট দিচ্ছিল।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী মানুষ। এমনও হয়েছে আব্বার বিপক্ষের কেউ আব্বার কাছে সাহায্য নিতে এসেছেন। সাধারণত লেখালেখির বিষয়ে অনেকেই আব্বার সাহায্য নিতেন, কাজ শেষ হলে গেট দিয়ে বের হয়েই আজেবাজে কথা বলতেন কেউ কেউ। আমরা, বিশেষ করে আমি তখন আব্বাকে বলতাম, আব্বা কেন এদের আসতে দেন আর সাহায্য করেন। এই যে বাজে কথা বলে গেল। আব্বা হাসতেন আর বলতেন, আসুক, তাও তো একটু কাজ করছে।

 

দিল রওশান জিন্নাত আরা নাজনীন: এমাজউদ্দীন আহমদের কন্যা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক