আমার বাবা গতানুগতিক বাঙালি বাবাদের মতো ছিলেন না। ইউরোপে পড়ালেখার সুবাদে তার মনমানসিকতায় ছিল পাশ্চাত্যের প্রভাব। সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও সততা আমার মধ্যে যা আছে, সবটুকুই আমার বাবার অবদান। ছোটবেলা থেকেই আব্বুকে দেখে এসেছি ঘড়ির কাঁটা ধরে চলতে। সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, সময়মতো প্রাতরাশ সারা। কিংবা দুপুরের খাওয়া, রাতের খাওয়া সবই সময় ও নিয়মের মধ্যে।
জীবনের একটা দীর্ঘ সময় আব্বু চট্টগ্রামে ছিলেন। আমার মনে আছে, যখন স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষার পর ঢাকায় যেতাম, তখন আব্বু সঙ্গে থাকলে বাস বা ট্রেন স্টেশনে নির্ধারিত সময়ের ২ ঘণ্টা আগে গিয়ে বসে থাকতে হতো। এ নিয়ে আম্মা অনেক রাগারাগিও করতেন। কিন্তু আব্বুর এক কথা, ২ ঘণ্টা আগে গিয়ে বসে থাকতে হবে। বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা আমার হাতেগোনা। তাদের বাসায় বেড়াতে গেলে আব্বু বারবার বলে দিতেন, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাড়ি ফিরবে। ৬টা বাজার ১ মিনিট দেরি হলে আব্বু মনে মনে ক্ষুব্ধ হতেন। মুখে কিছু বলতেন না, তবে তার চাহনি দেখেই আমি যা বোঝার বুঝে নিতাম। আব্বু তার পরিবারকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। আব্বু ছিলেন আমাদের বন্ধুর মতো। আত্মকেন্দ্রিক, প্রচারবিমুখ আব্বু সবসময় তার পরিবারকে সময় দিয়েছেন শতভাগ।
আমরা হয়তো প্রচণ্ড বিলাসিতায় মানুষ হইনি, কিন্তু আমাদের পরিবারে সচ্ছলতা ছিল। ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিনে আব্বু আমাদের সবাইকে নিয়ে চাইনিজ খেতে যেতেন। তুংফং আর টাইওয়া রেস্টুরেন্ট ছিল আমাদের পছন্দের তালিকায় প্রথম সারিতে। আমাদের বাসায় পহেলা বৈশাখ পালন করা হতো খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে। আব্বু সকাল হতেই বেরিয়ে পড়তেন আমার ভাই যামীকে সঙ্গে নিয়ে মিষ্টি আর ফুল কেনার জন্য। নিজস্ব সংস্কৃতিকে আব্বু ভালোবাসতেন, ধারণ করতেন এবং আমাদেরও ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। আম্মা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন রান্না নিয়ে। কি না রান্না হতো সেদিন—বিভিন্ন রকমের ভর্তা, সবজি, ডাল, মাছ থেকে আরম্ভ করে পোলাও, কোর্মা—২৭-২৮ পদের রান্না করতেন আম্মা!
আমরা তিন ভাইবোন সবসময় আব্বুর পছন্দটাকে প্রাধান্য দিয়েছি। আমার খুব শখ ছিল ফাইন আর্টস পড়ব, ছবিও মোটামুটি ভালোই আঁকতাম। চুরি করে আব্বুর ক্যানভাসে অনেক ছবি এঁকেছি। কিন্তু আব্বু বললেন, বিবিএ পড়ো। বললেন, আর্টিস্টের জীবন অনেক কষ্টের, অনেক স্ট্রাগল করতে হয়। আমি পিতা হয়ে সন্তানের কষ্ট সহ্য করতে পারব না। ব্যস, আর্টিস্ট হওয়ার স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে গেল। আমি ব্যাংকার হয়ে গেলাম। এ নিয়ে একটা সময় মনে মনে খুব আফসোস থাকলেও এখন মনে হয়, আব্বুর সেই দিনের সিদ্ধান্তটা যদি মেনে না নিতাম, তাহলে আমার জীবনটা হয়তো এখনকার মতো স্বাছন্দ্যময় হতো না।
সন্তানদের ব্যাপারে আব্বুকে কখনো দেখিনি কারো ব্যাপারে একটু বেশি পক্ষপাতিত্ব করেছেন। তিন সন্তানকে সবসময় সমান চোখে দেখেছেন। যখনই কোনো ছবি বিক্রি হতো, আব্বু বিক্রির টাকার কিছু অংশ আমাদের তিন ভাইবোন এবং সেই সাথে আম্মাকে সমান ভাগ করে দিতেন। কোনো সিরিজ যখন আঁকতেন, সেখান থেকেও আমাদের তিন ভাইবোনকে আমাদের পছন্দ করে ছবি বেছে নিতে বলতেন। আমি চট্টগ্রামে থাকি। ঢাকায় গেলে বলতেন, ‘যুথী, তুই এখান থেকে তোর যেটা ভালো লাগে বেছে নে। যুই আর যামীকেও দিয়েছি।’ আব্বুর ট্রান্সপারেন্সি নিয়ে খুব ছোট একটা ঘটনা বলি: ‘আব্বুর দুইটা গাড়ি। দিদি তখন লিবিয়ায় চাকরি করছে। আব্বুকে গাড়িতে আনা-নেয়া করে। আব্বু একদিন আমাকে ফোন দিলেন, বললেন, আমার তো দুইটা গাড়ি, একটা যদি যুইয়ের নামে করে দিই, তোর কোনো আপত্তি আছে? তোর আম্মাও বলেছে করে দিতে। তুই কী বলিস? যামীরও আপত্তি নেই। আমি বললাম, আপনার গাড়ি আপনি দিবেন, আমাদের কাছে কেন জিজ্ঞেস করছেন আব্বু? তিনি বললেন, তোদের সবার মতামত তো নিতে হয়। এই তো করোনার সময়ে আব্বু ফোন দিয়ে বললেন, তোর জন্য একটা পিপিই কিনে পাঠাব? সুজাত, যুই আর কুট্টুকে কিনে দিয়েছি। তোদের জন্যও পাঠাই? আমি বললাম, না, না, আব্বু লাগবে না, করোনায় কুরিয়ার করার দরকার নেই।’ এই হলেন তিনি ‘শিল্পী মুর্তজা বশীর’—আমাদের পিতা। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। অপ্রিয় সত্যি কথাটা বলতেও কখনো ওনাকে ইতস্তত করতে দেখিনি। সেটা যে-ই হোক, পছন্দ হয়নি, বলে ফেলবেন। এ অভ্যাসটা একসময় আমার মধ্যেও প্রবলভাবে ছিল, ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলেছি। চিন্তা করে দেখেছি, উনি তো উনিই, ওনাকে যা সাজে, আমাকে তা সাজে না।
আব্বু আমাকে শিখিয়েছেন কাজের প্রতি একাগ্রতা, সততা, নিষ্ঠা। আব্বু প্রচণ্ড নীতিবান ছিলেন। অনৈতিক কোনো ব্যাপারে কখনো তিনি আপস করেননি। প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আব্বুর সামনে সবাইকে ম্লান লাগত। আমাদের আব্বু শিখিয়েছেন সত্ভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে, এক আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথানত না করতে। তিনি বলতেন, তোমার যা কিছু চাওয়ার আল্লাহর কাছে চাও, তিনিই পারেন তোমাকে সবকিছু দিতে। আব্বুর ঈমানের জোর দেখে মাঝে মাঝে আমরা অবাক হয়ে যেতাম। আব্বু আমাকে ছোট একটা নোট বুকে সকাল-সন্ধ্যা কী কী দোয়া পড়তে হবে, তা নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন এবং সবসময় আমাকে জিজ্ঞেস করতেন দোয়াগুলো পড়ি কিনা। আব্বুর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। বিখ্যাত বাবার মতো হয়তো আমি বিখ্যাত নই, কিন্তু আমার অন্তরে আমি ধারণ করে আছি আমার বাবার আদর্শ। কখনো কখনো মনে হয় দূর আকাশের তারা হয়ে আব্বু তাকিয়ে আছেন, দেখছেন আর মিটমিট করে হেসে বলছেন, ভালো থাকিস।
মুনিজা বশীর: মুর্তজা বশীরের কন্যা ও ব্যাংকার





