আকাশে সূর্য হাতছানি দিচ্ছে। ১৯৮৭ সাল। সেনাবাহিনীর জলপাই সবুজ ইউনিফর্ম পরছেন ডা. আবুল মোকারিম। গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সামরিক হাসপাতালের উদ্দেশে। সবাই যখন কষ্টকর ঝুঁকিপূর্ণ প্রশিক্ষণে ব্যস্ত তখন তার লক্ষ্য ছিল কীভাবে অসুস্থ যোদ্ধাদের সুস্থ করে তাদের নিজ অবস্থানে ফিরিয়ে দেয়া যায়। নিজে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে নিজের সহযোদ্ধাদের ঝরে যেতে দেখেছিলেন বলেই হয়তো বেছে নিয়েছিলেন আরেক যুদ্ধ, মানুষের প্রাণ বাঁচানোর যুদ্ধ।
দেশের অন্যতম খ্যাতনামা রেডিওলজিস্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মেজর (অব.) আবুল মোকারিম কিশোরগঞ্জের সন্তান। কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের চরটেকী গ্রামে তার বাড়ি। ডা. আবুল মোকারিম মানুষের সেবায় নিবেদিত ছিলেন। একপর্যায়ে আরো বড় পরিসরে মানুষকে সেবাদানের উদ্দেশ্যে তিনি সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছা অবসর নেন এবং জনমানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হন। চার ভাই-বোনের পরিবারে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান।
ব্যক্তি জীবনে ডা. আবুল মোকারিম একজন সফল মানুষ। ময়মনসিংহ মেডিকেলে এম-১১ নামে তাদের গ্রুপের বিশাল পরিচিত ছিল। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের এম ১১ ব্যাচের গর্বিত সদস্য ছিলেন তিনি। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৯২ সালে জাপানে যান এবং রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিংয়ের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। বিদেশে চাকরির সুযোগ ছিল তার সামনে। অনায়াসে থেকেও যেতে পারতেন। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই পরীক্ষার প্রথমদিকের চিকিৎসক ছিলেন তিনি। সুদীর্ঘ ২৩-২৪ বছর ইবনে সিনা ইমেজিং সেন্টারের চিফ কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। শুধু কনসালট্যান্ট হিসেবে নন, তিনি ছিলেন অফিসের সবার প্রিয়, সবার সমস্যার কথা তিনি যত্ন নিয়ে শুনতেন এবং কারো পরিবারের অসুবিধায় তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
আমরা তার দুই পুত্রও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। বাবার অনুপ্রেরণায় নাগাসাকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র ২৮ বছর বয়সে রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছি। বাবার প্রভাব আমাদের জীবনে এত বেশি ছিল যে, তার পেশাকেই বেছে নিয়েছি। আমার বিভাগে বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠতম ডক্টরেট হিসেবে পিতা গর্ববোধও করছেন। খুব কম মানুষের সৌভাগ্য হয়, আমি আমার পিতার স্থলেই যোগদান করেছি। আমার ছোট ভাই আমেরিকার জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। বর্তমানে কর্মরত আছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। বাবা সব সময়ই বলতেন, যত ড্রিগ্রি নেও সমস্যা নেই। তবে দেশে ফিরে এসে মানুষের সেবা করবে। কারণ এ দেশের মানুষের করের অর্থে তোমাদের পড়ালেখা হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে। পিতার মতো আমরাও বিদেশে আকর্ষণীয় চাকরির প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে দেশে ফিরে আসি—আর এ অনুপ্রেরণা আমরা পেয়েছি পিতার কাছ থেকে।
ডা. আবুল মোকারিম ছিলেন জনদরদি ও জনকল্যাণে নিবেদিত এক প্রাণ। নিজ গ্রামে অসংখ্য মানুষকে সাহায্য করেছেন। নিজের অর্থায়নে মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করাসহ মুক্তিযোদ্ধাদের থাকার জন্য ভবন তৈরি করে দিয়েছিলেন। ছিলেন একজন জনদরদি সাদা মনের মানুষ। প্রতি ঈদে তিনি গ্রামে এসে যাদের ঘরবাড়ি নেই, তাদের ঘর-বাড়ি করার জন্য অনুদান দিতেন। এভাবে ঈদ উপলক্ষে তার মাধ্যমে এলাকার নিম্নবিত্ত লোকজন ঘর নির্মাণ করার সুযোগ পেতেন। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সেবামূলক কাজেও নিবেদিত ছিলেন। আমৃত্যু নিজ জেলার মানুষের বিপদে-আপদে তিনি সর্বদা সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত রেখেছিলেন।
একবার কিশোরগঞ্জে তাকে মসজিদের এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা হয়। সেদিন সৌভাগ্যবশত সেখানে তার সঙ্গে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করা হচ্ছে। জরাজীর্ণ কাপড় পরিহিত একজন লোক, কোনো একটি দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছেন, ক্রাচে ভর দিয়ে এসে বললেন, ‘মসজিদটা তো সুন্দর হয়েছে, তবে আফসোস যে এখানে দাঁড়িয়ে আমার নামাজ পড়া হবে না।’ কথাগুলো তাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করে। নাড়া দেয়। ঢাকা এসে নিজ উদ্যোগে তিনি কৃত্রিম পা সংগ্রহ করেন এবং পরের সপ্তাহেই তার কাছে পাঠিয়ে দেন। তার এ রকম অনেক ঘটনাই উদাহরণ হিসেবে দেয়া যাবে।
কর্মজীবনে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। তিনি আমাদের সবাইকে একটা কথাই বলতেন যে ‘জ্ঞান কমবেশি হতে পারে কিন্তু একজন রোগীকে এমনভাবে চিকিৎসা দিতে হবে যেন নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলে সদুত্তর পাওয়া যায়। কারণ ওপারে সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাবদিহি করতে হবে’—এভাবেই তিনি সবাইকে ভালো কাজে উৎসাহিত করতেন ।
তিনি ছিলেন ভীষণ ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিন্তু তিনি কুসংস্কার মুক্ত ছিলেন সারা জীবন। ২০২০ সালের ১২ মে ৬৬ বছর বয়সে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে ঢাকা সিএমএইচে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার শেষ পোস্টটি ছিল, কভিড-১৯ থেকে মানুষ কীভাবে রক্ষা পাবে তার ওপর। তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথমে ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও পরে সিএমএইচের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন।
ডা. আবুল মোকারিম হয়তো একজন মানুষ, হয়তো একজন চিকিৎসক, হয়তো একজন বাবা, ভাই কিংবা স্বামী ছিলেন—তবে অসংখ্য মানুষের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার অন্য নাম।
রাফায়েল মুরসালীন: ডা. আবুল মোকারিমের পুত্র





