বাঙালি জাতির জীবনে ১০ জানুয়ারি চিরস্মরণীয় অনন্য ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭২-এর এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করে। যদিও ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়। কিন্তু বাংলার মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। কারণ যার নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, তিনি তখনো কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি। যতক্ষণ মহান নেতা ফিরে না এসেছেন, ততক্ষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় ১০ জানুয়ারি, যেদিন জাতির জনক স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে তার স্বপ্নের স্বাধীন সোনার বাংলায় ফিরে এসেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রথমে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের প্রধান কারাগার লায়ালপুর জেলে রাখা হয়েছিল। আগস্টের মাঝামাঝি সামরিক আদালতে তার বিচার শুরু হয়। বিচারের রায় ছিল পূর্বনির্ধারিত। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের সময় ইয়াহিয়া খান বলেছিল, বিনা শাস্তিতে সে পার পাবে না। ফলে বিচারটা ছিল প্রহসনের। গোটা বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আদালতে চুপচাপ বসে থাকতেন। বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে তার পক্ষে নিয়োগ করা আইনজীবী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মুজিব নিজের পক্ষে কোনো অবস্থান নিতে চান কিনা।’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। আমাকে অথবা আমার জনগণকে বিচার করার কোনো অধিকার এদের নেই। আইনের দিক দিয়ে কোনো বৈধতা এই আদালতের নেই’ (পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিবের বন্দীজীবন, আহমেদ সালিম, পৃষ্ঠা-৪৮)। ১৯৭১-এর ৩ ডিসেম্বর, প্রহসনমূলক বিচরের রায়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির দণ্ড দেয়া হয়। পরে লায়ালপুর কারাগার থেকে স্থানান্তর করা হয় মিয়ানওয়ালি জেলে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তার কারাকক্ষের পাশে কবর খোঁড়া হয়।’ আহমেদ সালিম লিখেছেন, ‘জেলের ডেপুটি সুপার ফজলদাদ একদিন ব্যারাকে এসে আটজন বন্দিকে বাছাই করলেন। এদের দিয়ে আট ফুট লম্বা, চার ফুট প্রশস্ত ও চার ফুট গভীর গর্ত খোঁড়া হলো। উপস্থিত সবাই বুঝতে পারলেন সেই রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দেওয়া হবে। ৯টার মধ্যে কবর খোঁড়া সম্পন্ন হলো। কিন্তু সেই রাতে কিছু ঘটল না। ফাঁসি দেওয়ার নির্ধারিত দিন জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি না দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, যদি মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হয় তবে বাঙালির ক্রোধের লক্ষ্য হবে পূর্বাঞ্চলে মোতায়েনকৃত পাকবাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার থেকে সর্বনিম্ন সৈনিক পর্যন্ত সবাই। ভুট্টোর উপদেশ অনুসারে ইয়াহিয়া খান মুজিবের ফাঁসি স্থগিত রাখেন। কয়েক দিনের জন্য কবর ভরাট করা হয়। পনেরো দিন পর একইভাবে গর্ত খোঁড়ার হুকুম আসে। এবারও শেখ মুজিবুর রহমানের ফাঁসি দেওয়া হলো না। এমনি প্রক্রিয়া তিনবার ঘটেছিল এবং তিনবারই তার ফাঁসি পিছিয়ে দেওয়া হয়।’ ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয়ী হলে ইয়াহিয়া খান সেই আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পাকিস্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর ইয়াহিয়া খানকে অপসারণ করে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়। ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে আবেদন করেছিল, ‘আমার একটি স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে, সেটি হলো শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো, আমাকে সেই সুযোগ দেয়া হোক।’ যে কারণে ভুট্টো মিয়ানওয়ালি কারাগারের জেল সুপার হাবীব আলীর কাছে বার্তা পাঠায় এবং বঙ্গবন্ধুকে মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে চশমা ব্যারাজস্থ হাবীব আলীর বাসভবনে নিয়ে রাখা হয়। এরপর ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুনয়-বিনয় করে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সম্পর্ক রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করে। বঙ্গবন্ধু ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

ভারতের আকাশসীমা পাকিস্তানের জন্য নিষিদ্ধ থাকায় বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রায়ে তাকে মুক্তি দিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার তাকে লন্ডন পৌঁছে দেয়। দ্রুতগতিতে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুকে বরণ করতে ভোরে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর জেগে ওঠে। এর মধ্যে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় তারা বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেবে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে ব্রিটিশ সরকার। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ব্রিটেনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। হোটেলে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যে তত্কালীন বিরোধী দলের নেতা লেবার পার্টির হ্যারল্ড উইলসন (পরে প্রধানমন্ত্রী) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। হ্যারল্ড উইলসন প্রথম কোনো রাজনৈতিক নেতা, যিনি করমর্দনের জন্য বঙ্গবন্ধুর দিকে হাত বাড়িয়ে প্রথম উচ্চারণ করেন ‘গুডমর্নিং মিস্টার প্রেসিডেন্ট।’ বিরোধীদলীয় নেতা হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদানের ব্যাপারে সাধারণভাবে ব্রিটেনের অনুসৃত নীতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এক্ষেত্রে কনজারভেটিভরা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমরা পূর্ণ সমর্থন জানাব।’ উল্লেখ্য, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২-এর ৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম পশ্চিমা দেশ হিসেবে ব্রিটেন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বিকালে বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে যান। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। তাদের বৈঠক হয় আন্তরিক পরিবেশে। বৈঠকে এডওয়ার্ড হিথ বলেন, ‘আপনাকে কী সহযোগিতা করতে পারি বলুন।’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি দ্রুত দেশে ফিরতে চাইছি।’ এডওয়ার্ড হিথ ত্বরিতগতিতে ব্যবস্থা নেন। বৈঠক চলাকালেই নিশ্চিত হয় যে ব্রিটিশ রাজকীয় কমেট জেট বিমানে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন জাতির জনক। বৈঠক শেষে বিদায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন গাড়িতে উঠবেন, তখন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ সৌজন্য প্রদর্শন করে গাড়ির দরজা খুলে দেন। কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এমন সম্মান আগে দেখাননি। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী হিথের সমালোচনা হয়। তিনি সেসব সমালোচনার জবাবে বলেছিলেন, ‘আমি যাকে সম্মান প্রদর্শন করেছি, তিনি একটি জাতির মুক্তিদাতা মহান বীর। তাকে এই সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে বরং আমরাই সম্মানিত হয়েছি।’ জাতির জনক শুধু বাঙালির বন্ধু নন, তিনি ছিলেন বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু তথা বিশ্ববন্ধু। বিশ্বনেতারা তাকে এভাবেই সম্বোধন করতেন। 

৯ জানুয়ারি লন্ডনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু একটি বিবৃতি প্রদান করেন। ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলার মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এই মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে তখন আমি রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থন ও সহযোগিতাদানের জন্য ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। এ দেশকে বিশ্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ অবিলম্বে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য অনুরোধ জানাবে।’ পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।’ বিবৃতির শেষে সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যে আপনার বাংলাদেশে ফিরে যাবেন, সেই দেশ তো এখন ধ্বংসস্তূপ?’ তখন জাতির জনক উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমার বাংলার মানুষ যদি থাকে, বাংলার মাটি যদি থাকে, একদিন এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই আমি আমার বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্র্যমুক্ত শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করব।’

১৬ ডিসেম্বর প্রিয় দেশ শত্রুমুক্ত হলেও তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আমরা জানতাম না। যেদিন, ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তিসংবাদ জানলাম, সেদিন এক অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল সারা দেশে। মানুষের যে কী আনন্দ, তা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়। যেদিন তিনি ফিরে এলেন, সেদিনটি ছিল সোমবার। সকাল থেকেই লাখ লাখ মানুষ ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে দশ দিক মুখরিত করে মিছিল নিয়ে বিমানবন্দর অভিমুখে। ঢাকায় যখন সাজ সাজ রব, তখন সকাল থেকেই দিল্লির রাজপথ ধরে হাজার হাজার মানুষের মিছিল পালাম বিমানবন্দর ও প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দিল্লির জনসাধারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে এক অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট জেটটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অবতরণ করলে তার সম্মানে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়। ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর আগেই উপস্থিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তার সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বলেন, ‘আপনার জন্য আমি গর্বিত। ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ আপনার জন্য গর্ব অনুভব করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে আমাদের মাঝে পেয়ে ভারতের জনগণ আজ আনন্দে আত্মহারা। শেখ মুজিবুর রহমান তার জনগণকে নতুন জীবন দান করেছেন। তার স্বাধীনতার স্বপ্ন আজ সার্থক।’ দিল্লিতে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিকালে লাখো মানুষের সমাবেশে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ভারতবাসীর উদ্দেশে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেন, ‘আমার জন্য এটা পরম সন্তোষের মুহূর্ত। বাংলাদেশে যাবার পথে আমি আপনাদের মহতী দেশের ঐতিহাসিক রাজধানীতে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ কারণে যে, আমাদের জনগণের সবচেয়ে বড় বন্ধু ভারতের জনগণ এবং আপনাদের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী—যিনি কেবল মানুষের নন, মানবতারও নেতা। তার নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারের কাছে এর মাধ্যমে আমি আমার ন্যূনতম ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারব। এ অভিযাত্রা সমাপ্ত করতে আপনারা সবাই নিরলস পরিশ্রম করেছেন এবং বীরোচিত ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এ অভিযাত্রা অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশায়। অবশেষে আমি নয় মাস পর আমার স্বপ্নের দেশ সোনার বাংলায় ফিরে যাচ্ছি।’

এরপর অবসান ঘটে আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার। দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট বিমানটি ঢাকার আকাশসীমায় দেখা দিতেই জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। বেলা ১টা ৫১ মিনিটে ঢাকা বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ করে। বিমানে সিঁড়ি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য নেতা, আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ছুটে যাই নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে। আমার হাতে ছিল পুষ্পমাল্য। জাতির জনককে মাল্য ভূষিত করার সঙ্গে সঙ্গেই তার সংযমের সব বাঁধ ভেঙে যায়, তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সে এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ, অভূতপূর্ব মুহূর্ত। যা আমার মানসপটে এখনো জ্বলজ্বল করে। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তার চোখে তখন স্বজন হারানোর বেদনা-ভারাক্রান্ত অশ্রুর নদী আর জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়বজুড়ে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি। বিমানের সিঁড়ি বেয়ে জাতির জনক তার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সম্মান জানানো হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। চারদিক থেকে তার ওপর পুষ্পবৃষ্টি হতে থাকে। বাংলাদেশ সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু সালাম গ্রহণ করেন। এ সময় বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী, লে. কর্নেল সফিউল্লাহ্ এবং বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র লেফটেন্যান্ট শেখ কামাল জাতির জনকের পাশে ছিলেন। গার্ড অব অনার পরিদর্শনের পর বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতা, ঢাকাস্থ বিদেশী মিশনের সদস্য, মিত্র বাহিনীর পদস্থ সামরিক অফিসার, বাংলাদেশ সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে করমর্দন করেন।

রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যাওয়ার জন্য জাতীয় নেতারাসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপেক্ষমাণ ট্রাকে উঠে রওনা দিই। সুদৃশ্য তোরণ, বাংলাদেশের পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দিয়ে সজ্জিত রাজপথের দুই পাশে দাঁড়ানো জনসমুদ্র পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট পর ময়দানে পৌঁছলাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল সাড়ে ৪টা। চারদিকে  লাখ লাখ অপেক্ষমাণ জনতা, কোনো দিকে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আবালবৃদ্ধবনিতার মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত। ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ রণধ্বনিতে সবকিছু যেন ডুবে গেল। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠে চতুর্দিকে তাকালেন এবং রুমালে মুখ মুছলেন। বঙ্গবন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার কেবলই মনে হয়েছে, জাতির জনক জীবনভর এমন একটি দিনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। দীর্ঘ কারাবাসের ক্লান্তিতে মলিন মুখটি তবু সমুজ্জ্বল। উন্নত ললাট, প্রশান্ত বদন, দু’চোখ তখনো অশ্রুসিক্ত, কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ। সে অবস্থায়ই চিরাচরিত ভঙ্গিতে ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশে নিবেদন করলেন তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা। হূদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে আবেগঘন ভাষায় বললেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ দীর্ঘ নয় মাস ১৪ দিন নির্জন কারাগারে মৃত্যুর প্রহর গোনা একজন মানুষ কী করে এ রকম উদ্বেলিত পরিস্থিতিতেও স্থির-প্রতিজ্ঞ থেকে বলছেন, ‘ভাইয়েরা, তোমাদেরকে একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। আজকে আমি বলি, আজকে আমাদের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঘরে ঘরে কাজ করে যেতে হবে।’ আরো বললেন, ‘সকলে জেনে রাখুন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের স্থান চতুর্থ।’ বক্তৃতায় তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে বাংলাদেশ একটি আদর্শ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয় ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।’ ৩০ লাখ মানুষের আত্মদান স্মরণ করে বেদনা-ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাংলায় আজ বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লক্ষ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে, এটাই ছিল আমার সাধনা।’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বলেন, ‘গত পঁচিশে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসে বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ দেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। বিশ্বকে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম কুকীর্তির তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব কুকীর্তির বিচার করতে হবে।’ পরিশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে বঙ্গ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি। কবিগুরুর কথা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ।’ লাখ লাখ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে এবং পরম পরিতৃপ্ত হয়েছে এই ভেবে যে আজ থেকে আমরা প্রকৃতই স্বাধীন।

জাতির জনকের দুটি স্বপ্ন ছিল—বাংলাদেশ স্বাধীন করা এবং দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তর করা। আমাদের তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তার প্রথম স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। আরেকটি স্বপ্ন বাস্তবায়নে যখন দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়ে সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছিলেন, তখনই বুলেটের আঘাতে সপরিবারে জাতির জনককে হত্যা করা হয়। আমাদের সৌভাগ্য তার দুই কন্যা তখন বিদেশে অবস্থান করায় রক্ষা পান। ’৮১-এর ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে রক্তে ভেজা আওয়ামী লীগের যে পতাকা আমরা তুলে দিয়েছিলাম, সেই পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। প্রতিপক্ষের শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রতিটি সূচক অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে সামগ্রিকতায় আজ ইতিবাচক অগ্রগতির দিকে ধাবমান। এবার নতুন প্রেক্ষাপটে ১০ জানুয়ারি আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ ‘মুজিব বর্ষ’ দেশে এবং বিশ্বজুড়ে সগৌরবে পালিত হচ্ছে। এর মধ্যে করোনা মহামারীর থাবায় বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এই বিপর্যয়ের মধ্যেও দেশ এগিয়ে চলেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর এই বছরটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বিগত দিনে গৃহীত সব মেগা প্রকল্প আগামী দিনগুলোয় দৃশ্যমান হবে এবং দেশের মানুষ তার সুফল ভোগ করবে। পূর্বঘোষিত রূপকল্প অনুযায়ী, ২০২১-এ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। বিশ্বব্যাংকের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে বঙ্গবন্ধুকন্যা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের যে অনন্যসাধারণ সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে এবং পদ্মাবক্ষে সেই সেতুর অবয়ব এখন দৃশ্যমান। যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে জাতির জনক স্বাধীন ও সার্বভৌম ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আজ তা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান—এই পাঁচটি মৌলিক অধিকার আজ মানুষের দোরগোড়ায়। একসময়ের অন্ধকার গ্রামবাংলা আজ আলোকিত। পিচঢালা পথ, সেই পথে সশব্দে ছুটে চলেছে যাত্রীবাহী বা মালবাহী গাড়ি। ঘরে ঘরে টিভি, ফ্রিজ। পাকা দালানকোঠা। খালি পায়ে লোকজন চোখে পড়ে না। বাজারগুলো সরগরম। গ্রামীণ জনপদের মানুষের হাতে ধূমায়িত পেয়ালা। গ্রামগুলো শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। এসবই সম্ভবপর হয়েছে চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করেছে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে উন্নয়নের চরম শিখরে নিয়ে যাবেন এবং বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় রূপান্তর করবেন।

 তোফায়েল আহমেদ: আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য; সভাপতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ