স্বাধীনতার ৫০ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে এসে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনায় মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ের বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আলোচনা বেশি হয়। কিন্তু নয় মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধের অব্যবহিত পর যেভাবে দেশকে পুনর্গঠন করেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তাও বিরল। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর পরই বঙ্গবন্ধু তার কারাবন্দি অসুস্থ শরীর নিয়েও ছুটে বেড়িয়েছেন দেশ-বিদেশ। বহির্বিশ্বের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে সদ্য শত্রুমুক্ত দেশটির প্রতি বিশ্বনেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন এবং বন্ধুত্ব প্রসার ও দৃঢ় করার ক্ষেত্রে সক্ষমও হয়েছিলেন।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন খুব অল্প। তার ওপর বাংলাদেশ তখন সদ্য যুদ্ধ থেকে মুক্ত হয়ে নিজের ক্ষত নিয়ে পর্যুদস্ত। এ অবস্থায় ’৭২-এর বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল বৈদেশিক সাহায্য এবং মৈত্রী। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু তাই বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশটা ছোট আর আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়।’ সমগ্র বাংলাদেশের হয়ে তার কণ্ঠে বন্ধুত্ব ধ্বনিত হয়েছিল। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, আজও অনেকে তা নিয়ে সমালোচনা করতে চায় কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যুদয়-পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার থেকে শুরু করে দেশের ভিত্তি মজবুত করে তার গৃহীত বৈদেশিক মৈত্রীর নীতি সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল।

দেশকে গড়ে তোলার প্রাথমিক সময়ে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ কথা আজ আমাদের কারো অজানা নয় যে, পাকিস্তানি শাসকরা মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলামকে যুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। অভ্যন্তরীণ সেই নৈতিক অস্ত্র বহির্বিশ্বেও তারা ব্যবহার করেছিল নানাভাবে। মুসলিম দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে কিনা কিংবা কতটা বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার তারা করবে—এ নিয়ে সব পর্যায়েই সন্দেহের ছায়া ছিল। কিন্তু সন্দেহের দোলাচলের সেই সময়ে বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল ইরাক। ১৯৭২ সালের ৮ জুলাই ইরাক বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইরাকের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে ইরাকি প্রেসিডেন্ট আহমেদ হাসান আল বকরের আমন্ত্রণে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ইরাক সফর করেন।

ওই বছর বঙ্গবন্ধু মূলত ওয়াশিংটনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে সেখান থেকে তিনদিনের সরকারি সফরে ইরাকে গিয়েছিলেন। ৩ অক্টোবর তিনি বাগদাদে পৌঁছেন। বাগদাদ বিমানবন্দরে খোদ সাদ্দাম হোসেন বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান। বিশ্বের দুটি মুসলিম দেশের বলিষ্ঠ দুই নেতার মুখোমুখি দেখা হয়। লালগালিচা সম্মাননার পর সাদ্দাম হোসেনের তত্ত্বাবধানে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিত হন বঙ্গবন্ধু এবং তাকে সেখানেই একটি গার্ড অব অনার দেয়া হয়েছিল। সফরের প্রথম দিন সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়।

আজকের পৃথিবীতে সাদ্দাম হোসেন একটি পরিচিত নাম। কোথাও তিনি নেতা, কোথাও একনায়ক হিসেবে পরিচিত। তবে মুসলিম দেশগুলোর কাছে আজও সাদ্দাম হোসেন সম্মানিত। আলোচনায় যখন দুজন নেতার নাম আসে, তখন না চাইতেও তাদের তুলনা কিছুটা হলেও চলে আসে। সেখান থেকেই বলা যায়, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সফলতা, ব্যর্থতা অনেক পরের কথা। সেই ১৯৭৪ সালের হিসাবে সাদ্দাম হোসেনের চেয়ে বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন ইরাক সফর করছিলেন, সাদ্দাম হোসেন তখন ইরাকি রেভল্যুশনারি কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান। প্রেসিডেন্ট বকরের ডেপুটি। বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বয়সে ১৭ বছরের ছোট সাদ্দাম হোসেন অবশ্য ততদিনে তার দেশে অনেক সংগ্রাম করেছেন। যে সাদ্দাম হোসেনকে আমরা চিনি, তার উত্থান হয়েছিল আরো পরে। কিন্তু অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েই তিনি নিজ অবস্থানে এসেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর মতোই রাজনীতিতে সাদ্দাম এসেছিলেন বেশ অল্প বয়সে। ছোটবেলা থেকে চাচার আশ্রয়ে বড় হওয়া সাদ্দাম তার চাচা খাইরুল্লাহ তালফার প্রভাবেই ১৯৫৭ সালে বাথ পার্টিতে যোগ দেন। সিরিয়া থেকে বাথ পার্টির সূচনা হলেও ওই সময় নাগাদ ইরাকে সম আদর্শের কর্মী তৈরি হয়েছিল এবং সাদ্দাম এতে যোগ দেয়ার ফলেই তার সঙ্গে হাসান আল বকরসহ অন্যান্য নেতার যোগাযোগ হয়েছিল। আদর্শের দিক থেকে শেখ মুজিবুর রহমান যেমন একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছিলেন, সাদ্দাম হোসেনসহ আরো অনেক তরুণ গ্রহণ করেছিলেন মিসরের জামাল আবদেল নাসেরের আদর্শ। মিসর থেকে ফরাসি ও ইংরেজদের বিতাড়নের দুই বছরের মাথায় ইরাকে আবদ আল কাসিমের নেতৃত্বে ইরাকে হাশেমি সাম্রাজ্যের পতন হয়।

এই কাসিমের মন্ত্রিসভার ১২ জনই ছিলেন বাথ পার্টির সদস্য এবং জামাল আবদেল নাসেরের আদর্শের সমর্থক। কিন্তু কাসিম যখন জামাল আবদেল নাসেরের ‘ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক’-এ যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, বাথ পার্টি তার প্রতি বিমুখ হয়ে যায়। ১৯৫৯ সালের অক্টোবরে কাসিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং যে দলটি অ্যাম্বুশ করতে গিয়েছিল সেখানে সাদ্দাম একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

বাংলাদেশের তুলনায় ইরাকের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন। সে কারণেই দুই দেশের নেতাদের মতাদর্শেও ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখব, তার রাজনৈতিক জীবন ছিল অধিকার আদায়ের সংগ্রামের। সেই অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে তিনি আন্দোলন করেছেন, কৌশল সাজিয়েছেন, কারাবরণ করেছেন এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার লগ্নে তার জীবন বিপন্ন হয়েছিল। প্রহসনের বিচারে ইয়াহিয়া তাকে ফাঁসি দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। গণমানুষের অধিকার আদায় এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধু এগিয়েছিলেন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। বঙ্গবন্ধু তার দেশের মানুষের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা জাগিয়েছিলেন আর সাদ্দাম হোসেন ছিলেন নিজ হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া ব্যক্তি।

প্যান-আরব তত্ত্বে বিশ্বাসী বাথ পার্টি যখন দেখেছিল, ইরাকি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে কাসিম মৈত্রী তৈরি করতে যাচ্ছেন তখন কাসিমের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র তৈরি হয়, কেননা ইরাকি কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শ প্যান-আরব সমর্থন করে না। ক্রমাগত পরিকল্পনার পর ১৯৬৩ সালে রমজান বিপ্লবের মাধ্যমে কাসিমকে অপসারণ করা হয়। এ সময় এবং এর পরবর্তী কিছুকাল সাদ্দাম হোসেনকে নিষ্ক্রিয় থাকতে হয়েছিল, কেননা তত্কালীন প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম আরিফও বাথ পার্টির বিরোধী ছিলেন। আরিফের শাসনামলে ১৯৬৪ সালে সাদ্দামকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৬ সালে তিনি পালিয়ে যান এবং হাসান আল বকরের অধীনে বাথ পার্টির আদর্শে আঞ্চলিক কমান্ডের ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পান।

পরবর্তী সময়ে বাথ পার্টিতেও নানা ভাঙন এসেছিল। দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া পার্টির মধ্যে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সাদ্দাম একটি ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ তৈরি করেন, যা তিনি একা নিয়ন্ত্রণ করতেন। দুঃসময় কিংবা নিজেদের টিকিয়ে রাখার এ কৌশল সব নেতাকেই করতে হয়। কিন্তু সাদ্দাম এক ধাপ এগিয়ে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে হাসান আল বকরের নেতৃত্বে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানে আরিফের শাসনামল সমাপ্ত হয়। এখানে সাদ্দাম হোসেনের ভূমিকা খুব বেশি ছিল না কিন্তু মূলত তিনি কর্মী হিসেবে কাজ করেছিলেন। এমনকি তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীকে দেশের বাইরে রেখে আসার দায়িত্বটা তিনি পালন করেছিলেন বন্দুক হাতে।

বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল আর তাদের সামনে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর অস্ত্র ছিল তার তর্জনী। সেই অস্ত্রে তিনি মানুষকে উজ্জীবিত করেছিলেন আর শাসনের গদি উল্টে দিতে ব্যবহার করেছিলেন যুক্তি, নিয়ম এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্ন। যুদ্ধের পর তিনি শত্রুতা ভুলে সবাইকে মিত্র করে নিতে যখন চেয়েছিলেন, সেই মিত্রতার অংশ হিসেবে তিনি যখন বাগদাদে উপস্থিত তখন প্রথম দিনেই তার আলাপ হলো সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে, যাকে কিনা বঙ্গবন্ধুর ঠিক বিপরীত বললে ভুল হয় না।

কিন্তু দুজনই ছিলেন কোনো না কোনো আদর্শের অনুসারী আর দেশকে নতুন করে সাজাতে দুজনেরই আগ্রহ ছিল। টালমাটাল অবস্থা সামাল দেয়ার অভিজ্ঞতা দুজনেরই ভরপুর। তাই প্রথম অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তারা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বৈদেশিক চুক্তি, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং তা উন্নত করার উপায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করেন। সাদ্দাম হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে হাসান আল বকরের ডেপুটি হলেও মূলত তার প্রভূত প্রভাব ছিল দেশে এবং প্রশাসনে। কেননা ক্ষমতালাভের পর থেকে দেশের নানা কাজে সাদ্দাম হোসেনের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি।

সাদ্দাম হোসেন নিজেকে একজন প্রগতিশীল এবং উপযুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রথমেই তিনি দেশের ভেতরে সাম্যাবস্থা আনার চেষ্টা করেন। শিয়া-সুন্নি থেকে শুরু করে অন্যান্য বিরোধ নিষ্পত্তি করে বৈদেশিক সম্পর্ক সহজ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে রাশিয়ার সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক সব দিক দিয়েই তিনি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের এ আলোচনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখেছিল।

সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পরদিন প্রেসিডেন্ট হাসান আল বকরের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ায় বঙ্গবন্ধু তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদারদের বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের কথা তিনি সংক্ষেপে বর্ণনা করেন। বিজয়লাভের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করছিল সে সম্পর্কেও উভয়ের মধ্যে আলোচনা হয়। বাহাত্তর থেকে শুরু করে এ বৈঠক পর্যন্ত কূটনৈতিক মিশনে বঙ্গবন্ধুর সফলতা সম্পর্কে ইরাকি প্রেসিডেন্ট অবগত ছিলেন এবং তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে ইরাকের সম্পর্ক আরো গভীর এবং হূদ্যতাপূর্ণ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সফরের শেষ দিনে ইরাকের সঙ্গে বাংলাদেশের দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বৃদ্ধি এবং উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিময় সহজ করার নিমিত্তে এ চুক্তি হয়।

হাসান আল বকর এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাইপ্রাস নিয়ে আলোচনা করার সময় দুজনই আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর ভিত্তি করে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে একমত হন। অন্যদিকে তারা গায়ানা-বিসাউর স্বাধীনতায় তাদের অভিনন্দন জানান। আফ্রিকার মানুষদের স্বাধীনতার সংগ্রামে তাদের সমর্থন জ্ঞাপন করেন। এ আলোচনার মধ্যে ইরাকের পূর্ব সীমান্ত সম্পর্কে সাদ্দাম হোসেন কথা বলেন। তার মতে, ‘এ অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং শান্তির প্রতি হুমকি।’ শেখ মুজিবুর রহমান তখন আন্তর্জাতিক আইন, শান্তিচুক্তি এবং জাতিসংঘের নিয়মের মধ্যে থেকে সমস্যা সমাধানের প্রতি জোর দেন। সাদ্দাম হোসেনের মতো তুখোড় এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্ধর্ষ ব্যক্তির সামনেও বঙ্গবন্ধু এতটা সাবলীল ও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু যখনই কোনো দেশনায়কের সঙ্গে দেখা করেছেন, তারা বঙ্গবন্ধুর ভক্ত বনে গেছেন। বাহাত্তর থেকে তিনি যে কূটনৈতিক সফর করেছিলেন সেখানে ইউরোপ, আমেরিকা থেকে আরব, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের মধ্যে কেউ ছিলেন শান্তিপ্রিয়, কেউ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে আবার কেউ সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে অধিকার আদায়ে বিশ্বাসী। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তারা সবাই সম্মান করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মবিশ্বাসের প্রশংসা সবাই করেছেন। ফিদেল কাস্ত্রো তো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।’

সাদ্দাম হোসেনও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সফরের শেষ দিন বঙ্গবন্ধুর সম্মানে সাদ্দাম হোসেন একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন। কূটনৈতিক দায়িত্ব বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে থেকেও এ আয়োজনে উভয় নেতা বন্ধুত্ব তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ সময় তাদের মধ্যে দুই দেশের বর্তমান অবস্থা এবং অনাগত সময়ে উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা ও বন্ধুত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্র সম্পর্কে আলোচনা হয়েছিল।

আদর্শ কিংবা পদ্ধতিগত দিক থেকে সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মিল-অমিল যা-ই থাক না কেন, আজীবন সংগ্রাম করে যাওয়া এ দুই নেতার মধ্যে আরো কয়েকবার সাক্ষাৎ ও আলোচনা হলে রাজনীতি, ইতিহাস এবং উভয় দেশের জন্যই হয়তো শুভ হতো।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক