১৯৫০-এর দশক থেকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে শিল্পায়ন দেখা যায় তাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল মুখ্য। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (ইপিআইডিসি) মালিকানায় কিংবা তার অংশীদারিত্বে এ অঞ্চলে বৃহৎ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। স্বাধীনতার আগে ছোটবড় ৩ হাজার ৫১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যদিও সংখ্যার দিক থেকে ২ হাজার ২৫৩টির মালিক ছিলেন বাঙালি, এর আর্থিক মূল্য ছিল শতকরা মাত্র ১৮ ভাগ। অন্যদিকে বৃহৎ ব্যবসায়ী অবাঙালি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭২৫ হলেও তার আর্থিক মূল্য ছিল শতকরা ৪৭ ভাগ। আর শতকরা যে ৩৪ ভাগ ইপিআইডিসির মালিকানায় ছিল সেগুলোর বেশির ভাগও অবাঙালি বৃহৎ মালিকদের হাতেই যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ফলে ১৯৭২ সালে অবাঙালি বৃহৎ মালিক ও ইপিআইডিসি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মিলে শিল্প খাতের শতকরা ৮১ ভাগ গঠন করে। এর কয়েকটি বাদ দিয়ে মালিক না থাকায় বাকিগুলো পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়, এর সঙ্গে যোগ হয় কতিপয় বাঙালি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে শিল্প খাতের শতকরা ৯২ ভাগ সম্পদ নিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের মূলভিত্তি তৈরি হয়। বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা, বাংলাদেশ বস্ত্রকল সংস্থা, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থা, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থা, বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থা, বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন সংস্থা নামে ছয়টি সংস্থার অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিন্যস্ত করা হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাজতন্ত্রের চিহ্ন হিসেবে বরাবর দাবি করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এ প্রতিষ্ঠানগুলোই ছিল বাংলাদেশের নব্য ধনিক শ্রেণী গঠনের আদি প্রধান অবলম্বন। এসব শিল্প-কারখানায় দুর্নীতি ও লোকসানের প্রধান কারণ ছিল এখানেই। নব্য ধনিক শ্রেণীর গঠন ও বিকাশ সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি পরিবর্তনেও ক্রমান্বয়ে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ১৯৭৩-৭৪ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি পুনরায় বাংলাদেশে তাদের প্রভাব কর্তৃত্ব পুনঃস্থাপন করতে সক্ষম হয়। শুরু হয় ঋণ, অনুদান, প্রকল্প বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের সমর্থক গোষ্ঠী তৈরির প্রক্রিয়া, আর বিভিন্ন খাতে পাকিস্তান আমলের পুরনো অর্থনৈতিক নীতির পুনঃস্থাপন। বিনিয়োগসীমা বাড়তে থাকে, বিরাষ্ট্রীয়করণও শুরু হয় ১৯৭৪ থেকেই। বাঙালি নব্য ধনিক শ্রেণীর আয়তন, প্রভাব ও দাবিদাওয়া বাড়তে থাকে।

১৯৭৫-এর সামরিক শাসনের পর এ শ্রেণীর সামনে রাষ্ট্রীয় নানা অঙ্গীকারের বাধা অপসারিত হয়। মূলধনের সংবর্ধন বিনিয়োগসীমা বৃদ্ধিরও তাগিদ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে সিলিং তুলে নেয়া হয়। পাশাপাশি অর্থসংস্থানের জন্য বাঙালি ধনিক শ্রেণীর কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো খুলে দেয়া হয়। ১৯৮২-এর সামরিক শাসনের পর এ ধনিক শ্রেণী আরো শক্তিশালী হয়। দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন অভূতপূর্ব মাত্রালাভ করে। এগুলোর মধ্য দিয়ে বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সংহত রূপলাভ করে। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রসহ তারাই তখন রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান ভিত্তি। এ দশকেই ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’ (structural adjustment programme) নামে একটি সামগ্রিক নীতিকাঠামোতে রাষ্ট্র প্রবেশ করে।

এসব নীতিকাঠামোর অধীনে ১৯৮৮ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়, যার মধ্যে ৬০৯টি শিল্প খাতের। এরপর ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ৪৪৯টি এবং ২০০০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম স্টিল মিলসহ ৬২১টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত আদমজী পাটকলসহ আরো বড়-ছোট-মাঝারি অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হয় বন্ধ অথবা বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থসংস্থান সব বিবেচনাতেই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অনুপাত অনেক সংকুচিত হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে প্রধান ও বৃহৎ কারখানা ছিল স্টিল, পাট, কাগজ, সার ও চিনি শিল্প। হয় বন্ধ অথবা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর, সংকোচন অথবা নীতি বা দুর্নীতির মাধ্যমে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রক্রিয়া সরকার নির্বিশেষে অব্যাহত থাকে।

১৯৭০ দশকের শেষ থেকে এবং বিশেষভাবে আশির দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ঋণখেলাপি হয়ে দাঁড়ায় মূলধন গঠন ও সংবর্ধনের বড় অবলম্বন। বস্তুত এ ঋণখেলাপিরাই বাঙালি নব্য ধনিক শ্রেণীর ভিত্তি স্থাপন করে। তারাই ক্রমে মালিক হয় নতুন ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের। এরাই ব্যবসা ও শিল্পের নতুন বৃহৎ মালিক হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের স্বার্থে লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান বন্ধ করার চেষ্টা না করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা, শ্রমিকজনিত ব্যয় সংকোচন করার জন্য ছাঁটাই, তথাকথিত ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ ইত্যাদি ছিল একের পর এক বিভিন্ন সরকারের ‘অর্থনৈতিক সংস্কারের’ প্রধান দিক। এসব পুনর্গঠন নীতির ফলে আশির দশকে বিশিল্পায়ন প্রক্রিয়া জোরদার হয়। কেননা একদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সংকুচিত হতে থাকে, অন্যদিকে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরিত অনেক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাড়তে থাকে বেকারত্ব। এ প্রক্রিয়া চূড়ান্তরূপ লাভ করে ২০০২ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জুট মিল আদমজী বন্ধের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয় বিশ্বব্যাংকের পাট খাতের উন্নয়নের নামে ২৫ কোটি ডলারের ঋণযুক্ত ‘জুট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’-এর অধীনে। এ নীতি কাঠামোতে বাকি পাটকলগুলোও ক্রমে বন্ধ করা হয়েছে।

শুধু শিল্প-কলকারখানা নয়, সব সাধারণ সম্পত্তি মুনাফামুখী তত্পরতার অধীনস্ত করার জন্য বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণই রাষ্ট্রের প্রধান তত্পরতায় পরিণত হয়। বিভিন্ন সরকারের রাজনৈতিক পরিচয়ের পার্থক্য এ ধারার কোনো ছেদ ঘটায়নি। ১৯৯৫-এর পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নানা চুক্তি এ ধারাকে আন্তর্জাতিক বিধি দ্বারা পুষ্ট করে। এগুলো ‘নয়া উদারনৈতিক’ (কার্যত ‘নয়া রক্ষণশীল’) দর্শন নামেই বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এ দর্শন অনুযায়ীই রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত পরিচালিত হচ্ছে।

১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে যেসব শিল্পনীতি ঘোষিত হয় সেগুলো এ ধারাতেই একরৈখিকভাবে ব্যক্তিমালিকানা, রফতানিমুখী ও বিদেশী মালিকানার পক্ষে নানা নীতি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করে। প্রণোদনা গুচ্ছের মধ্যে ছিল বিভিন্ন রকম ভর্তুকি, অবকাঠামো সমর্থন, কর মওকুফ, অর্থসংস্থানে সমর্থন, শুল্কমুক্ত আমদানি ও দেশের বাইরে অর্থ প্রেরণের সুবিধা ইত্যাদি। ১৯৭৮ সাল থেকেই একই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় অনেক সুবিধা দিয়ে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। এর বর্তমান পর্যায়ে বহুবিধ সুবিধা ও ভর্তুকি দিয়ে, অবকাঠামো তৈরি করে, বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী ব্যবসায়িক সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নামে বিশাল এলাকা।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিল্প খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাধান্যের কারণে এ খাতেই ছিল শিল্প শ্রমিকদের প্রধান কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র, আর এসব প্রতিষ্ঠান ঘিরেই শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রধানত কাজ করত। ষাটের দশকে নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, চট্টগ্রাম ও খুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংগঠন ও আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা ছিল বাম সংগঠনগুলোর, গণঅভ্যুত্থান গঠনে তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীনতার পর বৃহৎ শিল্প ও সে কারণে একই সঙ্গে বিশালসংখ্যক শ্রমিকদের সমাবেশ সরকারের জন্য সবসময়ই উদ্বেগের বিষয় ছিল। সরকারি দলের শ্রমিক সংগঠন দিয়ে বৃহৎ কারখানাগুলোতে ট্রেড ইউনিয়ন দখল শুরু হয় স্বাধীনতার পর পরই। এরপর সরকার পরিবর্তন হয়েছে অনেক, কিন্তু যারাই ক্ষমতায় এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানায় তাদেরই তথাকথিত শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার নির্বিশেষে সরকারি দলের এ আধিপত্য নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়েছে নানা কূটচাল, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে। অধঃপতিত ‘বামপন্থী’ নেতাদের সাথে সাথে ট্রেড ইউনিয়নের অনেক পুরনো নেতা বিভিন্ন আমলে সরকার সমর্থক বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনে যোগ দিয়ে এর শক্তিবৃদ্ধি করেছেন। দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের কারণে এসব সংগঠনের প্রকৃত শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী ভূমিকা আর অবশিষ্ট থাকেনি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনপন্থী সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বৈরী নীতি ও সংস্কার প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক মাত্রাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। এসব কাজ শুধু যে পুরনো বৃহৎ শিল্প-কারখানাগুলোকে অপসারণ করে ব্যক্তি পুঁজির সম্প্রসারণের জন্যই করা হয়েছে তা নয়; বরং এটা এখন স্পষ্ট যে এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল একক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বৃহৎ সমাবেশ ও তাদের ঐক্যের সুযোগ ভেঙে দেয়া। অধিকন্তু শ্রমিক ঐক্য ও সংহতি ভাঙতে, তাদের অধিকার আদায়ের সক্ষমতা নষ্ট করে কম মজুরি গ্রহণে বাধ্য করতে নানা কৌশল অবলম্বন করা। সর্বোপরি ব্যক্তিপুঁজির মুনাফামুখী তত্পরতার ক্ষেত্র অবাধ সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা। সর্বশেষ গত ৩০ জুন অবশিষ্ট ২৫টি পাটকল একসঙ্গে বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর চিনিকলগুলোও একে একে বন্ধ করার প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ জমি ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের নীতি কাঠামো চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। গত দুই দশকে আমরা ব্যক্তিমালিকানায় পাটকল স্থাপন হতে দেখি, কিন্তু সেখানে শ্রমিক নিয়োগ হয় চুক্তিভিত্তিক। মজুরি আগের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ।

অর্থনীতি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার বর্তমান দর্শনের সঙ্গে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের আবির্ভাব ও বিকাশ সংগতিপূর্ণ। দেশের ভেতর বর্ধিত বেকারত্ব ও নতুন আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজনের সঙ্গে এ খাতের বিকাশের তাগিদ খুবই সংগতিপূর্ণ ছিল। এভাবেই নতুন এ বর্ধনশীল খাতটি সরকারি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন আনুকূল্য পেতে থাকে। উঠতি ধনী লোকেরা এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিপুলসংখ্যক দরিদ্র বেকার পরিবারের কিশোরী তরুণী নারীরা খুব স্বল্প বেতনে এবং দীর্ঘ সময় কাজ করে এ খাতে নতুন শ্রমশক্তি তৈরি করে।

নব্বইয়ে দশকের মধ্যে শিল্প খাতে ব্যক্তিমালিকানাধীন কারখানাই সবদিক থেকে প্রাধান্যে আসে। এ খাতে সবচেয়ে উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি দেখা যায় রফতানিমুখী গার্মেন্টসে। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি গার্মেন্টসেই। এছাড়া ব্যক্তিমালিকানায় আরো যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যায় সেগুলো হলো ওষুধ, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পানীয়, জুতা, সিরামিকস। সব মিলিয়ে জিডিপিতে শিল্প খাতের অনুপাত প্রধানত গত এক দশকে ধীরে হলেও বেড়েছে। এ বৃদ্ধির প্রধান নিয়ামক বিভিন্ন রফতানিমুখী কারখানা বিশেষত পোশাক শিল্প।

একদিকে যখন রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ও কিছু বৃহৎ ভারী শিল্প নানা অজুহাতে বন্ধ বা সংকুচিত করা হয় বা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা হয়, তখন পাশাপাশি অনুকূল নীতি ও প্রণোদনামূলক ব্যবস্থাবলির কারণে ব্যক্তিমালিকানাধীন রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার ঘটে। নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়। আশির দশকের শুরুর দিকে এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে শিল্প শ্রমিকদের সংখ্যা তখন ছিল প্রায় ১৮ লাখ। এদের মধ্যে পাঁচ লাখ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন বৃহৎ সংস্থায়, বাকিরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে। অশিল্প শ্রমিকদের সংখ্যা তুলনায় বেশি ছিল—নির্মাণ ৭ লাখ ২০ হাজার, পরিবহন ছয় লাখ, ব্যবসা দোকান ১১ লাখ, স্বকর্মসংস্থান ১৭ লাখ—সব মিলিয়ে ৭৩ লাখ ৪৫ হাজার। আশির দশকে শিল্প শ্রমিকদের সংখ্যায় হ্রাস দেখা গেলেও সরকারি হিসাবে নব্বইয়ে দশকের মাঝামাঝি শিল্প শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৯ লাখ।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী শিল্প শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭২ লাখ। তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এর চেয়েও বেশিসংখ্যক বাংলাদেশী প্রধানত তরুণ এখন শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মরত। এছাড়া সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁয় কর্মরত এখন ৮৫ লাখ, যার অধিকাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে যুক্ত। পরিবহনের সঙ্গে প্রায় ৪০ লাখ। কৃষির অনুপাত অনেক কমে এলেও দুই কোটিরও বেশি নারী-পুরুষ কৃষির সাথেই যুক্ত।

যা-ই হোক, শিল্প শ্রমিক সংখ্যার এ বৃদ্ধির মধ্যে কিছু ধারাবাহিকতা যেমন আছে তেমনি তার সাথে গুণগত কিছু পরিবর্তনও দেখা যায়। যেসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে আছে ১. বাঁচার মতো মজুরির তুলনায় প্রকৃত মজুরি অনেক কম; ২. ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক, শতকরা ৫ ভাগের কম; ৩. মোট উৎপাদন মূল্যে অনুপাত অনেক কম হলেও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিকদের অবস্থান; ৪. তালিকাবিহীন বহুসংখ্যক কারখানায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিকের অবস্থান।

পাশাপাশি শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে যেসব ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন দেখা যায় সেগুলো হলো ১. শিল্প শ্রমিকদের লিঙ্গীয় গঠনে পরিবর্তন। আশির দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত শ্রমিকদের মধ্যে নারী শ্রমিকদের অনুপাত ছিল অনুল্লেখ্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ছাড়া নারী শ্রমিকদের দেখা যেত না। কিন্তু এখন মোট শিল্প শ্রমিকদের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ নারী, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ছাড়াও এখন গার্মেন্টসসহ রফতানিমুখী কারখানায় কর্মরত যেখানে নারী শ্রমিকদের অনুপাত শতকরা ৮০ ভাগ; ২. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শিল্প শ্রমিকদের স্থায়ী কাজ, ন্যূনতম মজুরিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে রক্ষিত হয়নি; ৩. আগে শিল্প খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকার কারণে শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এসব প্রতিষ্ঠান। আদমজী পাটকলসহ সেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা ব্যক্তিমালিকানাধীনে হস্তান্তরিত হওয়ার পর শ্রমিক সংগঠন ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বড় রকমের ছেদ পড়েছে; ৪. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে মালিকদের ভূমিকায় ছিল সরকার, এখন বৃহৎ ও মাঝারি সংস্থায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী মালিক। সরকার এখন তৃতীয় পক্ষ; ৫. ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থায়ী কাজের অনুপাত খুব কম। বহু প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে কোনো নিয়োগই দেয়া হয় না। বহু প্রতিষ্ঠানেই নিয়োগ দেয়া হয় চুক্তিভিত্তিক বা দৈনিকভিত্তিক। জাতীয়ভাবে ন্যূনতম মজুরি নির্দিষ্ট না থাকায় এসব কারখানায় মজুরি স্তর অনেক নিচে, স্থায়ী নিয়োগ না হওয়ার ফলে মজুরি নিয়ে দরকষাকষি বা আইনি লড়াইয়ের সুযোগ নেই; ৬. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন প্রধানত সরকার ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীই ব্যবহার করেছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ অধিকার আরো সংকুচিত হয়েছে।

শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে বর্তমানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হলো গার্মেন্টস। গত দুই দশকে শিল্প শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান বা প্রায় একমাত্র তত্পরতা এ খাতেই দেখা যায়। এ আন্দোলন বেশির ভাগ সময় কোনো নির্দিষ্ট কারখানা বা অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হলেও ২০০৬ ও ২০১০ সালে ঢাকা মহানগরীসহ কয়েকটি অঞ্চল অচল করে ফেলার মাত্রায় উঠেছিল। দাবিগুলো অবশ্য তখন এবং এখনো খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের, যার মধ্যে আছে নিয়োগপত্র, সাপ্তাহিক ছুটি, নিয়মিত মজুরি ও বকেয়া পরিশোধ, অতিরিক্ত সময়ের মজুরি প্রদান, কাজের নিশ্চয়তা ইত্যাদি। গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকাংশ নারী হওয়ার কারণে যৌন নিপীড়নসহ নারী সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ও ক্রমেই সামনে আসছে। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ড ও ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প বিপর্যয়ের ঘটনা দেখায় যে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির পাটাতন কতটা নাজুক এবং শ্রমিকদের বঞ্চনার হার কত মাত্রায় উঁচু।

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের নির্বিচার বিনাশ ব্যক্তিপুঁজিকে স্ফীত করেছে, বিপুল সম্পদ হস্তান্তরিত হয়েছে দেশের ধনিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে। কিন্তু তার টেকসই ও উৎপাদনশীল রূপান্তর ঘটেছে খুব কম। এ প্রক্রিয়ায় পাট শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল তা নষ্ট করা হয়েছে। গত কয় দশকে যে পরিমাণ ভর্তুকি ব্যক্তি খাতে দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে তার ১ শতাংশ ব্যয় করলে পাট শিল্প শক্তিশালী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারত।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চপ্রবৃদ্ধি একদিকে যেমন টেকসই শিল্প খাতের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারেনি, অন্যদিকে শ্রমিকদের অতি উচ্চ শ্রম শোষণ এবং নিরাপত্তাহীনতার ওপর তা দাঁড়িয়ে আছে। অবাধ পরিবেশ দূষণও তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের অর্থনীতির এ গতিপ্রকৃতির পেছনে যেমন দেশের ভেতরের নানা শক্তি উপাদানের প্রভাব আছে তেমনি বিশ্বের অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান যুক্ততা এখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, কাজের শর্ত, ভোগ চাহিদা, পেশাসহ অনেক কিছুতেই আন্তর্জাতিক মাত্রা এনেছে। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেও তাই অভিন্ন কিছু ধরন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক