দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আমি পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারে ছিলাম। ১৯৭২ সালের মার্চে আমাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয় সরকার। তারপর এক বছর পাকিস্তানে আটক ছিলাম। ১৯৭২ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে মানুষ পাচারকারীদের টাকা দিয়ে আমি, আমার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে (যারা ছিল অল্পবয়সী) নিয়ে পালিয়ে সীমান্ত প্রদেশের ভেতর দিয়ে খাইবারপাস পার হয়ে আফগানিস্তানের জালালাবাদে ও পরে কাবুলে পৌঁছাই ৪ জানুয়ারি ১৯৭৩। ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় কাবুল ছেড়ে উড়োজাহাজে দিল্লি ও কলকাতা হয়ে ২২ জানুয়ারি ঢাকায় আসি। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে জানুয়ারির প্রথম দিকে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ডা. এআর মল্লিক তখন কাবুলে ছিলেন এবং তার হস্তক্ষেপে আমার উড়োজাহাজে দিল্লি আসা ত্বরান্বিত হয়। তিনি এ খবর ঢাকায় পাঠান। ২৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে চাকরিতে যোগদানের জন্য দরখাস্ত করি। পরের দিন আমাকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যান প্রধানমন্ত্রীর তত্কালীন একজন প্রাইভেট সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম অনু। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখেই বললেন, ‘এত দেরি করলে কেন?’ আমি তাকে সবকিছু বললাম। তখনই আমাকে তিনি বললেন, ‘যাও তোমার জন্য দায়িত্ব ঠিক করা আছে। তুমি পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডা. নূরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করো। তিনি সব বলে দেবেন। অনেক কাজ করতে হবে।’

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি ১৯৭৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে এবং একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব ও কমিশনের বৈদেশিক সম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে।

অতএব, ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন ও অবদান রেখেছিলেন, তাতে আমি জড়িত হওয়ার সুযোগ পাইনি। তবে পাকিস্তানে অবস্থানকালে রেডিওর মাধ্যমে ও অনেক বন্ধুর পত্র থেকে (যেগুলো লন্ডন হয়ে আসত) স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর পুনর্বাসন পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু কিছু খবর পেয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তার বিস্তৃত বর্ণনা পেয়েছিলাম ১৯৭২ সালের কর্মকাণ্ড/কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে।

প্রথমেই বলতে হয়, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এবং ১৯৭২ সাল মিলে পরপর তিনটি শস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং দেশে খাদ্যাভাব ছিল। ভারত ও অন্যান্য উন্নত দেশ থেকে বেশকিছু খাদ্য সাহায্য পাওয়া যায়। জাতিসংঘের মহাসচিবের ১০ লাখ টন সাহায্যের আহ্বানে, জাপান সরকারের অনুদান এবং কিছু বার্টার চুক্তির মাধ্যমে ও বিভিন্ন স্তরে রেশনিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও প্রত্যাগত নাগরিকদের খাদ্য বিলির ব্যবস্থা করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ব্যবস্থা ছিল বলতে গেলে কপর্দকহীন এবং বৈদেশিক মুদ্রার অস্তিত্ব ছিল না। অর্থনৈতিক অবস্থা পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার যেসব পদক্ষেপ ও নীতিমালা গ্রহণ করেছিল, সেগুলো ছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও জাতীয়করণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংগঠন ও বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল গঠন। এগুলোতে সহায়তা প্রদান করেছিল আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। ১৯৭২ সালের আগস্টে বাংলাদেশ এ দুই সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে এবং এ প্রসঙ্গে যে বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণের প্রয়োজন ছিল, তা অনুদান হিসেবে দিয়েছিল কানাডা ও সুইডেন। তার আগে ভারত সরকার কিছু বৈদেশিক মুদ্রা ঋণ হিসেবে পৃথক করে রাখে (বিনিময় হার ভারতের হারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয় মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে)।

অবকাঠামো পুনর্গঠন ছিল একটি জরুরি ও কঠিন কাজ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সরকার সড়ক, সেতুগুলো রেলসংযোগ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, টেলিফোন ব্যবস্থা ও বন্দরগুলো পুনর্গঠনের ব্যবস্থা হাতে নেন ও ১৯৭২ সালের শেষার্ধে এগুলো মোটামুটি সম্পন্ন হয়।

প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর সরকার সার্বিক প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করেন এবং নতুন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ গঠন করেন। নতুন প্রশাসনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু আগে উল্লিখিত পুনর্গঠনের কর্মসূচি হাতে নেন ও সন্তোষজনক পর্যায়ে সেগুলো পুনর্গঠিত হয়।

পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের কাজের বর্ণনা ছিল ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটে। এ পুনর্গঠনে অনেক বন্ধুরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাহায্য দিয়েছিলেন, যেগুলো পরিশোধ করার প্রয়োজন ছিল না। এসব সাহায্যকারী দেশের মধ্যে ছিল ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, পশ্চিম জার্মানি, সুইডেন, ডেনমার্ক, হল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

পুনর্গঠনের সঙ্গে অগ্রাধিকার দেয়া হয় কৃষি খাতকে। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন। এছাড়া ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল পুনর্বাসনের পরই শিক্ষা খাতে।

উৎপাদন ও অর্থনৈতিক খাতে স্থিতিশীলতা আনয়ন—যা ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য, ১৯৭২ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু সব দেশীয় ব্যাংক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণের আদেশ/আইন ঘোষণা করেন।

বাংলার দরিদ্র মানুষের জন্য দুঃখ বিমোচন এবং সবার জন্য যাতে অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়, উন্নয়নের সঙ্গে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে ওঠে—এই ছিল বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের প্রচেষ্টা ও অবদানের লক্ষ্য।

অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা, শান্তিতে সহাবস্থানের নীতিমালা ও মানুষের জন্য সংগ্রামের প্রমাণ দেখেই অন্যান্য রাষ্ট্র বাংলাদেশকে, বঙ্গবন্ধুকে, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই।

১৯৭৩ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর যেহেতু আমাকে সরকারি কর্মচারী হিসেবে প্রকৃতপক্ষে সব সময়ই অফিসে কর্মরত থাকতে হতো, মিডিয়া ও কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর সরকারের সমালোচনা করত, সে সম্পর্কে আমি কোনো মতামত প্রকাশ করিনি। তবে শুনেছি, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের পর অনেক উগ্রবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যার মধ্যে ছিল জাসদ, সর্বহারা পার্টি, চীনপন্থী কমিউনিস্টের কিছু তথাকথিত নেতা এবং পাকিস্তান থেকে সহায়তাপ্রাপ্ত কিছু গোষ্ঠী ছিল। সেগুলো স্পষ্ট হয়েছিল, যখন অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশকে মানুষের জীবনধারণের ব্যবস্থায় ও পুনর্গঠনে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। এর পরিণতিতেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল উত্থাপন করে দেশে ‘শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার’ ঘোষণা দেন ও বিস্তৃত ভাষণ দেন, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ ঘোষণা। এ বিষয় আমি পরে আলোচনা করব।

বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ও দর্শন

এখানেই আমি বলতে চাই যে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার কিছুদিন পরই যে উদ্যোগ নেন এবং কমিটি গঠন করে বিশেষজ্ঞদের নির্দেশ ও দায়িত্ব দেন, সেটি ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সেটি ছিল ডা. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি, দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ে সেই সংবিধান বঙ্গবন্ধু সংসদে পেশ করেন ৪ নভেম্বর, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর দেশ গড়ার, মানুষের জীবন উন্নয়নের ও সমৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেয়ার একটি অপূর্ব দলিল। এর পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, যার ভিত্তি ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০ বছরেরও অধিককাল ধরে দেশের গ্রামে-শহরে ভ্রমণ করে, জনসভা করে, মানুষের আর্থিক দুরবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিতি লাভ করে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ধারণা। বঙ্গবন্ধুর এ চিন্তাভাবনা ও অর্থনৈতিক দর্শন প্রকাশ পায় স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের মাধ্যমে। এটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল।

সংবিধানের শুরুতে প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমাদের মনে রাখতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে আওয়ামী লীগ কোনো সমাজতন্ত্রবাদী দল ছিল না। তবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা ছিল দেশের অর্থনীতিতে সমাজতান্ত্রিক উন্নয়ন ও পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য দূরীকরণ এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া। এ ভিত্তিতেই তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীনের ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেট প্রণীত হয়েছিল, যেটিতে সংবিধানের মূলনীতিগুলোর প্রতিফলন ছিল।

বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনের কিছু মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিল—

১. স্বনির্ভরতা অর্জন, দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারঅ

২. বৈদেশিক সহায়তা গ্রহণ/ব্যবহার, যা হতে হবে শর্তবিহীন এবং ক্রমে এ নির্ভরতার অংশ কমিয়ে আনতে হবে।

৩. বেসরকারি খাতকেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও শিল্পায়নে সম্পৃক্ত করা। ১৯৭২ সালে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের উচ্চসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৫ লাখ টাকা, যা ১৯৭৪ সালে ৩ কোটিতে বর্ধিত করা হয়।

সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর দেশের সার্বিক উন্নয়নের যে চিন্তা ও নির্দেশনা ছিল, সেগুলো বর্ণিত হয়েছে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের অনুচ্ছেদগুলোতে। সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলো উল্লেখ করা যায় নিম্নরূপভাবে:

১. স্থানীয় শাসনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন

২. জাতীয় জীবনে মহিলাদের অংশগ্রহণ

৩. গণতন্ত্র ও মানবাধিকার

৪. মালিকানার নীতি: রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায়ী মালিকানা ও ব্যক্তিগত মালিকানা

৫. কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি

৬. জনগণের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা: অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণে মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা

৭. কর্মের অধিকার, যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার

৮. গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব

৯. অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা, সমাজ ও অর্থনীতির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণ এবং নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ

১০. জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার

১১. সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিতকরণ।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বঙ্গবন্ধুর যেদিক আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে, সেটি ছিল তার বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ইংরেজিতে যাকে বলে প্র্যাগমেটিক। এর একটি উদাহরণ আমি দেব, যেটি ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান আমলে বৈদেশিক দাতারা প্রতি বছর ‘পাকিস্তান কনসোর্টিয়াম’ নামক অনুষ্ঠানে (যা প্যারিসে অনুষ্ঠিত হতো) সাহায্য (ঋণ ও অনুদান) নির্ধারণ করতেন। এর একটি অংশ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানেও ব্যবহূত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশকে ওই ঋণ পরিশোধের জন্য দাতাদের পাকিস্তান চাপ দিতে থাকে এবং দাতারা তা বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি করে। ১৯৭৩ সালের মার্চে বিষয়টি নিয়ে দাতা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক) সঙ্গে ঢাকায় একটি বৈঠক হয় পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডা. নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে। অনেক আলোচনার পর সরকারের সিদ্ধান্ত তাদের জানিয়ে দেয়া হয়, যেহেতু বাংলাদেশ উত্তরাধিকারভিত্তিক কোনো রাষ্ট্র ছিল না, পাকিস্তানকে দেয়া কোনো ঋণের জন্য বাংলাদেশের কোনো দায় আদৌ নেই।

বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ডা. পিটার কারগিল, তদানীন্তন এশিয়ান দেশগুলোর জন্য একজন উঁচু পর্যায়ের সহসভাপতি। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এবং আলোচনা সমাপ্তির পর আমরা তাকে ও তার দুজন সহকর্মীকে গণভবনে বঙ্গবন্ধুর অফিসে নিয়ে যাই। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছিলেন ডা. নূরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন, পররাষ্ট্র সচিব এনায়েত করিম ও আমি। ডা. কারগিল বঙ্গবন্ধুকে বললেন ও উল্লেখ করলেন, বাংলাদেশে যেসব প্রকল্প বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতার অর্থে বাস্তবায়িত হয়েছে তার একটি তালিকা। এছাড়া কমোডিটি এইড ছিল। আরো বললেন, বিষয়টির ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পেলে বিশ্বব্যাংকের ও অন্য দাতাদের পক্ষে বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো প্রকল্প সাহায্য ও অন্যান্য সাহায্য দেয়া সম্ভব হবে না। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গে ডা. কারগিলকে বলেছিলেন, তবে তা-ই হবে, বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে। দুঃখ প্রকাশ করে ডা. কারগিল বিদায় নিলেন।

এরপর বঙ্গবন্ধু হঠাৎ আমাকে বললেন, ‘এই সৈয়দুজ্জামান (যে নামে আমাকে তিনি সব সময়ই ডাকতেন), এই যে কথাগুলো পিটার কারগিল বলল, তার কতটুকু সত্য? যে প্রকল্পগুলোর কথা বলল, সেগুলো থেকে আমরা কি কোনো উপকার পাচ্ছি? প্রকল্পগুলো যেগুলো ওদের টাকায় হয়েছিল বলল, সেগুলোর কি অস্তিত্ব আছে?’

আমি বললাম, ‘স্যার, কিছু প্রকল্প আছে যেগুলো সম্পূর্ণভাবে টিকে আছে, যেগুলো থেকে মানুষ এখনো উপকার পাচ্ছে; কিছু প্রকল্প আছে যেগুলো যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সম্পূর্ণভাবে কিংবা আংশিকভাবে। সেগুলো পুনর্নির্মাণের জন্য যদি সাহায্য পাওয়া যায় আমাদের উপকার হবে। আর কতগুলো নতুন প্রকল্পও আমাদের প্রয়োজন—ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ট্রান্সপোর্টেশন, পোর্টস, ইরিগেশন প্রভৃতি ক্ষেত্রে।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘শোনো, এক কাজ করো।

যেসব প্রকল্প থেকে আমাদের জনগণ এখনো উপকার পাচ্ছে, সেগুলোর দায়িত্ব আমরা নেব এবং যেসব তুমি বললে যে পুনর্নির্মাণ করতে হবে, ওইসব প্রকল্প ও যেগুলো নতুন করে করতে হবে তার একটি তালিকা প্রস্তুত করে আমাকে দেখাও এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করো—আমাদের কত টাকার দায় গ্রহণ করতে হবে এবং আরো কত টাকা আমাদের দরকার?’

বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ ছিল, তাদের হিসাবে পাকিস্তান দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাহায্য থেকে যে অংশ পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় করেছিল, তার জন্য পাকিস্তান ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ডলার দাবি করল। বিষয়টি বিবেচনা ও শনাক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধু আমাকে চিফ নেগোসিয়েটর হিসেবে নিযুক্ত করলেন। এ দায়িত্ব পালনে আমাকে অনেক জায়গায় আলোচনা করতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালের জুলাই থেকে ঢাকা ছাড়াও ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিস, রোম ও চেকোস্লোভাকিয়া—এসব জায়গায় যেতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডা. নূরুল ইসলামের উপদেশ নিয়ে এবং দীর্ঘ চাকরিজীবনের নীতিমালার সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোকে (প্রধান সংযোগ ছিল বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমেই) এ দাবি ৪০০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনতে সক্ষম হই (এটা ছিল আমার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময়, যা নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়)।

আমরা এ দায়িত্ব নিতে রাজি হলাম—তখনকার দিনের বৈদেশিক সাহায্যের সবচেয়ে নম্র শর্তে—বিশ্বব্যাংকের আইডিএ ঋণের শর্তে। আমরা আরো তাদের সম্মত করালাম বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদানের জন্য একটি নতুন সংস্থা বা মঞ্চ তৈরি করতে—যেটি হলো বাংলাদেশ এইড গ্রুপ। (অনেক নিম্ন আয়ের দেশের জন্যই এ ব্যবস্থা আছে—বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বের মাধ্যমে)।

বাংলাদেশ এইড গ্রুপের প্রথম মিটিং হলো ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে প্যারিসে। সেখানে আমরা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেলাম ৮০০ মিলিয়ন ডলারের এবং একই অর্থবছরে দ্বিতীয় মিটিং হলো ১৯৭৫ সালের মে মাসে, যেখানে আমরা প্রতিশ্রুতি পেলাম আরো ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ডলারের। একই সঙ্গে ১৯৭৪-৭৫ সালে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় টাকার অবমূল্যায়নে সায় দিয়ে আমরা এ সংস্থা থেকেও সাহায্য পেতে শুরু করলাম।

এ সাহায্যপ্রাপ্তি ও পরবর্তী সময়ে এ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হলো, পাঁচসালা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তা ছিল বঙ্গবন্ধুর বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ও ফলেই। প্রশাসনিক নীতিতে বঙ্গবন্ধুর এ সিদ্ধান্ত ছিল একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। (সৌজন্যে উত্তরণ)

 

এম সাইদুজ্জামান:  প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সচিব ও কমিশনের বৈদেশিক সম্পদ বিভাগের সচিব