বলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মই হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। আর তাই এযাবত্কালের ইতিহাসই হচ্ছে বেশি রাজনীতি ঘেঁষা বিদ্যা শিক্ষার চেয়ে। কথাটা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। যদিও এ নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক করা যেতে পারে। সে বিতর্কে না গিয়ে মেনে নেয়াই শ্রেয়। যদিও শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এর অর্জন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ঈর্ষার বিষয় হবে। বস্তুত আজকের বাংলাদেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমরা যে বাংলাদেশকে ছিনিয়ে এনেছি, তার সূত্রপাতও হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এটি আজ অজানা নয়, যে পাকিস্তান দিয়ে আমাদের ইংরেজদের ২০০ বছরের দুঃশাসনের সমাপ্তি ঘটে, সে পাকিস্তান আমাদের জন্য ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যে তা আমরা বুঝতে পারি আর এ বোঝার মধ্য দিয়েই শুরু হয় আমাদের সংগ্রাম প্রথমে কলম দিয়ে পরে অস্ত্র দিয়ে। ভাষা আন্দোলন দিয়ে শুরু করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন সবার পেছনেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ। এর জন্য তাদের যেমন মেধার পরিচয় দিতে হয়েছিল, তেমনি পরবর্তী সময়ে দিতে হয়েছিল জীবন।

আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন ও নিপীড়ন এবং পূর্ববাংলার জনগণের শোষিত জীবনের কিছুটা হলেও হ্রাসপ্রাপ্তি ঘটেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ৬০-এর দশকের উত্তাল আন্দোলনে ও অসহযোগিতায়। আইয়ুব খানের পতন হলেও পূর্ববাংলার ভাগ্যের কোনো তাত্ক্ষণিক পরিবর্তন ঘটল না। এক স্বৈরশাসকের পরিবর্তে আগমন ঘটল আরেক স্বৈরশাসকের। যাহোক, নতুন শাসক কথা দিলেন পাকিস্তানে অচিরেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পাকিস্তানের সর্বপ্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

ইয়াহিয়া খানের শর্তসাপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন শুরু হলো কিন্তু পাকিস্তানের স্বৈরশাসকের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হলো না, যার পরিচয় পাওয়া গেল ১৯৭০ সালের ভয়াবহ সাইক্লোনে, যা পূর্ববাংলার সমুদ্র উপকূলের অধিকাংশ এলাকা ধ্বংস করে দিল নিয়ে গেল লাখ লাখ মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণ। কিন্তু এর পরও ইয়াহিয়া খানের সরকার এগিয়ে এলো না পূর্ববাংলার সাহায্যের জন্য। এগিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধু বনে গেলেন বাংলার মানুষের সত্যিকারের বন্ধু। তিনি ও তার দলের সবাই ছুটে গেলেন আর্তমানবতার সেবার জন্য জীবন বাজি রেখে। হাজার হাজার আর্তমানবের সেবা করে হয়ে উঠলেন বাংলার সবচেয়ে মানব দরদী রাজনীতিবিদ। এর ফল হলো ১৯৭০-এর নির্বাচনে জিতে নিলেন পাকিস্তানের পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন। তাকে বলা হলো পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী সেনাবাহিনী ও আরো কিছু পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ তাকে তা হতে দেবেন না। শুরু হলো ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে, বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিরুদ্ধে। বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী ইয়াহিয়া খান সর্বশক্তিশালী কামান দাগালেন পাকিস্তানি সংসদের সভা বাতিল করে। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল বাংলার মানুষ। পাগল ও সাহসী হয়ে উঠল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দামাল ছেলেরা। তারা বঙ্গবন্ধুকে জানালো আর নয় আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা নয়। এবার আমরা স্বাধীন হবো জয় বাংলা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখনও হাল ছাড়েননি, ভাবছিলেন পাকিস্তানকে কোনোভাবে রক্ষা করা যায় কিনা? তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আর সময় দিতে চায় না। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ ভবনে তদানীন্তন ডাকসুর প্রতিনিধিরা উঠিয়ে দিলেন প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজ পতাকা। বাংলাদেশ কার্যকরভাবে বনে গেল স্বাধীন রাষ্ট্র। কিন্তু অনেক কিছুই তখনো বাকি ছিল। একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকল। বঙ্গবন্ধু দিলেন তার অমর ৭ মার্চের ভাষণ, সেদিন থেকেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। আসে ২৫ মার্চের কালরাত্রি। পাকিস্তানি বাহিনী নেমে পড়ে অপারেশন সার্চলাইট বাস্তবায়ন করতে, যা ছিল আসলে জেনোসাইড—গণহত্যা। সেনাবাহিনী আক্রমণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের বাসাবাড়ি, নিহত হয় শত শত ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারী। এ ধাক্কা সহ্য করে সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দেয় দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্ররা। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়ে নির্দেশ দেয় প্রয়োজনে দেশের বাইরে গিয়েও যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অংশ নিতে। শুরু হয় বীরত্বে গাথা মুক্তিযুদ্ধ। অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে এক যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করা হলো, পুরো দেশকে ভাগ করা হলো ১১টি সেক্টরে। প্রতিটি সেক্টরে একজন করে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়, যার অধীনে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। এসব সেক্টরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যুক্ত হয়। প্রশিক্ষণ নেয়, আর চালিয়ে যেতে থাকে তাদের চোরাগোপ্তা অভিযান—গেরিলা যুদ্ধ। আশ্চর্য রকমের মেধা ও সাহসিকতার পরিচয় দেয় ছাত্ররা। আর বয়োজ্যেষ্ঠ ছাত্ররা যোগ দেয় মুজিবনগর সরকারে, যা গঠিত হয়েছিল ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে। মন্ত্রিসভার অনেকেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। স্বয়ং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এরা খুব ধীর মস্তিষ্কে একজাইল বা বনবাসের সরকারকে বিশ্বব্যাপী পরিচয় করিয়ে দেয়, বিশেষ করে ভারত সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে থাকে। এর ফলে মুজিবনগর সরকার বা বাংলাদেশ সরকার শক্তিশালী ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একইভাবে হাজার হাজার যে উদ্বাস্তু বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত যায়, তাদের দেখাশোনা করার দায়িত্বও বহন করে।

শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক নতুন ইতিহাস। প্রথমেই এর উপাচার্য যিনি ছিলেন এর ছাত্র। বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী এ সময় ইউরোপে জাতিসংঘের মানবিক কমিশনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করছিলেন। ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তার প্রতিবাদে তিনি তার জীবন ও পরিবারের কথা ভুলে গিয়ে তার পদত্যাগপত্র ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। তিনি জানান, ‘আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই; তাই আমি পদত্যাগ করলাম’। এমনিভাবেই মুক্তিযুদ্ধকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘ত্যাগ ও সাহসিকতার’ পরিচয় পাওয়া যায়। বৃহত্তর পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে ভূমিকা রাখে, তা নাহলে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়তো আরো সময়সাপেক্ষ হতো। মুজিবনগর সরকারের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা করেন, তাদের অনেকেই আজ প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।

মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগরের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব, উপরাষ্ট্রপতি নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যেমন খন্দকার মোশতাক আহমেদ, প্রফেসর ইউসুফ আলী খান, আব্দুল মান্নান, নুরুল কাদের খান, তৌফিক এলাহী চৌধুরী, মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, ডক্টর মোফাজ্জাল আহমেদ চৌধুরী, ডক্টর মোশারফ হোসেইন, ডক্টর আনিসুজ্জামান, ডক্টর খান সারওয়ার মুর্শেদ, ডক্টর স্বদেশ রঞ্জন বসু, আবুল ফাতেহ, আর আই চৌধুরী, আনোয়ারুল কবির চৌধুরী, কাজী নজরুল ইসলাম, ও এম হোসেন আলী।

‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পরিষদের’ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ডক্টর আজিজুর রহমান মল্লিক। এ ছাড়াও দেশ-বিদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র বিদেশের বহু জায়গায় মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করার জন্য অর্থ সংগ্রহ, ওষুধ সরবরাহ, জামা-কাপড় সংগ্রহ ইত্যাদি কাজে সম্পৃক্ত হয়ে অসাধারণ ভূমিকা রাখে।

এ সময় যে ব্যক্তিত্ব সারা বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছিল এবং যে ঘটনার সঙ্গে বর্তমান লেখকও জড়িত তিনি হলেন মহিউদ্দিন আহমেদ, তিনি তখন পাকিস্তান দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি ছিলেন। এ তরুণ কূটনীতিকের সাহসী সিদ্ধান্ত ও মাতৃভূমির জন্য আত্মত্যাগ এবং লন্ডনের ট্রাফালগার মিলনস্থানে নাটকীয়ভাবে উপস্থিত হয়ে তার পদত্যাগ ঘোষণা বিশ্বে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছিল। আমিও সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলাম, আমি তখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছিলাম।

যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যেসব বাহিনী তৈরি হয়েছিল, তার অনেকগুলোর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। যেমন- তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল ইসলাম খান, আবদুর রাজ্জাক ও ফজলুল হক মনি।

মুক্তিযুদ্ধের আরেটি দিক ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার। চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা এ বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ অনুপ্রেরণার সব শক্তি। এ বেতার কেন্দ্র জুগিয়েছে সব বাঙালিকে সাহস ও বেঁচে থাকার শক্তি। এ বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র, যেমন এম আর আখতার মুকুল—তার জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র’ এক পৃথিবী কাঁপানো অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। সেই বিখ্যাত সংগীত, যা সব মানুষের মনে কম্পন সৃষ্টি করত ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ তাও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আপেল মাহমুদের।

ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নানাবিধ কর্ম করে ছাত্র-শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধের বহুবিধ কর্ম পরিচালনা করে স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এজন্য তাদের বহু মূল্য দিতে হয়েছে, এমনকি জীবন দিতে হয়েছে—বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে বহু শিক্ষককে প্রাণ দিতে হয়েছে। যেমন ইতিহাস বিভাগের সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ ও ডক্টর আবুল খয়ের।

এভাবেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্ররা জীবন, সময়, দৈহিক প্রচেষ্টা, মেধা ও সাহস দিয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে অর্জন করেছি।

 

শরীফ উদ্দিন আহমেদ

অধ্যাপক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি