বাংলাদেশে দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের আলীহোসাইন আকবরআলী জন্মগ্রহণ করেন ভারতের গুজরাটের আম্রেলি জেলায়। গুজরাটে জন্মগ্রহণ করলেও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা চট্টগ্রামে। এরপর পাকিস্তানের করাচি থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেসি (সিএ) শেষ করে উচ্চবেতনের চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে পৈতৃক ইস্পাত ব্যবসায় যুক্ত হন। তারও আগে অর্থাৎ ১৯৫২ সালেই চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে আলীহোসাইন আকবরআলীর পিতা একসময়ের চট্টগ্রামের জুবিলি রোডের ব্যবসায়ী আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালা গড়ে তুলেছিলেন দেশের প্রথম ইস্পাত কারখানা। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামে ফিরে এসে চাকরি না ব্যবসা, এ বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন পিতার। আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালার উত্তর ছিল, বিশ্বের যেকোনো স্থানের তুলনায় চট্টগ্রাম অনেক বেশি শান্তির জায়গা। এখানে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধন রয়েছে, স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্ন ভাষা-ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষকে আপন করে নেয়ার মানসিকতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, চট্টগ্রাম বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে ভালো অঞ্চল।
পারিবারিক ইস্পাত কারখানায় যোগ দিয়ে তরুণ আলীহোসাইন আকবরআলী দেখলেন, ইস্পাত খাতে বিনিয়োগের জন্য বন্দর সুবিধা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি—সবই আছে চট্টগ্রামে। দক্ষতা অর্জনের প্রায় এক দশক পর ১৯৮৫ সালে পূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পের আধুনিক ও প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকে নজর দিলেন আলীহোসাইন আকবরআলী। গড়ে তুললেন বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস বা বিএসআরএম।
দেশের ইস্পাত শিল্পের অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের মতোই এ অঞ্চলের উদ্যোক্তারাও চট্টগ্রামের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়েছেন ইস্পাত খাতের বিনিয়োগে। বিএসআরএমের পথ ধরে এ খাতে আসেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। এসব ব্যবসায়ী এ অঞ্চলে একসময় সওদাগরি ব্যবসা ও পরে ভোগ্যপণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সহযোগী খাত হিসেবে ইস্পাতের ভবিষ্যৎ বুঝে নিলেন। কেউ যুক্ত হলেন পুরনো জাহাজ ভাঙা শিল্পে, যা ইস্পাত খাতের মূল কাঁচামাল কিংবা সহযোগী খাত হিসেবে ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে। এসব ব্যবসায়ীর অনেকেই তখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ে ম্যানুয়াল রি-রোলিং মিল স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকে বিএসআরএমসহ মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রযুক্তির ইস্পাতপণ্য উৎপাদনের কারখানা স্থাপন করলে চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের অনেকেই এ খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নেন।
একপর্যায়ে আবুল খায়ের স্টিল (একেএস), জিপিএইচ ইস্পাত, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিল (আরএসআরএম), কবির স্টিল রি-রোলিং মিল (কেএসআরএম), শীতলপুল অটো স্টিল মিল (এসএআরএম), এইচএম স্টিল, বায়েজিদ স্টিল, পিএইচপি ইন্টিগ্রেটেড স্টিল মিল বড়সড় ইস্পাত কারখানা স্থাপন করে। এসব কারখানাই দেশের ইস্পাত খাতের রড উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চাহিদা পূরণ করে।
ভৌগোলিক সুবিধা যেমন দেশের প্রধানতম বন্দর (চট্টগ্রাম বন্দর), শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডসহ নানাবিধ কারণে এখানেই ইস্পাতপণ্য উৎপাদন সুবিধাজনক। যার কারণে কাঁচামাল আমদানি, বন্দর দিয়ে সারা দেশে উৎপাদিত পণ্য পরিবহন, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড থেকে কাঁচামাল সংগ্রহসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সর্বাপেক্ষা সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি করা সহজ চট্টগ্রাম থেকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রি-রোলিং মিল স্থাপনের চেষ্টা করলেও চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের ভৌগোলিক সুবিধাকে এড়িয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে কলেবর বাড়াতে সক্ষম হয়নি। যার পুরো সুবিধাটাই নিয়েছেন চট্টগ্রামের উদ্যোক্তারা। যদিও বর্তমানে দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষ শিল্প গ্রুপ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় আকারে ইস্পাত কারখানা করছে।
অনানুষ্ঠানিক চট্টগ্রামের উদ্যোক্তারা শিপ ব্রেকিং, শিপ বিল্ডিং ও ইস্পাতপণ্য নির্মাণে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। গত এক দশকে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় করে ইস্পাতপণ্যের চাহিদাও বেড়েছে কয়েক গুণ। দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম চলমান থাকায় আগামীতে রডসহ বিভিন্ন ইস্পাতপণ্যের চাহিদাও বেড়ে দ্বিগুণ হবে। সুদূরপ্রসারী জায়গা থেকে চিন্তা করে চট্টগ্রামের শীর্ষ ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা এরই মধ্যে তাদের উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রথম সারির নেতৃস্থানীয় ইস্পাত কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন খাতে ব্যবসায় থাকা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ইস্পাত খাতে বড় বিনিয়োগ নিয়ে আসছেন। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের বনেদি বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ী পরিবার এ খাতে বিনিয়োগ করেছে। কেউ কেউ বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা মেটানো ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশেও ইস্পাতপণ্য রফতানির সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের অধিকাংশ ইস্পাতপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড রয়েছে। নিজেদের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের স্ক্র্যাপ ব্যবহার করে রড প্রস্তুত করা ছাড়াও চাহিদা মেটাতে বিশ্ববাজার থেকেও স্ক্র্যাপ আমদানি করতে হচ্ছে। স্ক্র্যাপের মাধ্যমে বিলেট উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্ববাজার থেকে ফিনিশড পণ্য আমদানিনির্ভরতাও কমিয়ে এনেছেন চট্টগ্রামের উদ্যোক্তারা। কাঁচামাল থেকে বিলেট উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা পূরণ ছাড়াও বিশ্ববাজারে বিলেট রফতানির বড় সম্ভাবনা জাগিয়েছেন চট্টগ্রামের উদ্যোক্তারা।
জোবায়ের চৌধুরী: সাংবাদিক





