রড উৎপাদনের মধ্যবর্তী কাঁচামাল হলো বিলেট। এই বিলেট উত্তপ্ত করে ছাঁচে ফেলে রড তৈরি করা হয়। পাঁচ বছর আগেও আমদানিনির্ভর ছিল ইস্পাত তৈরির এ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে সেই পরিস্থিতি এখন পুরোপুরিই পাল্টেছে। অবশ্য বিদ্যুৎ সংকট থেকে বেরিয়ে আসাসহ আমদানিতে শুল্ক-কর বাড়ানোর নীতি এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিলেটের চাহিদা পাঁচ বছর আগেও ছিল বছরে ৪০ লাখ টনের কাছাকাছি। তখন আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ টন। এর বাইরে আরো প্রায় ২১-২২ লাখ টনের চাহিদা মেটানো হতো দেশে তৈরি বিলেট ও জাহাজ ভাঙা শিল্পের লোহার প্লেট থেকে সংগ্রহ করে। কিন্তু পাঁচ বছরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এখন বার্ষিক চাহিদা বাড়লেও এর প্রায় পুরোটাই তৈরি হচ্ছে দেশে। পাশাপাশি বিলেট এখন রফতানি হতে শুরু করেছে। মধ্যবর্তী কাঁচামাল বিলেটের পরিবর্তে বরং এখন বিলেট তৈরির কাঁচামাল পুরনো লোহার টুকরোই বেশি আমদানি হচ্ছে। বাংলাদেশে একসময় বিলেট তৈরি হতো একমাত্র চিটাগং স্টিল মিলসে। সরকারি এ কারখানায় বিলেট ছাড়াও ইনগট ও ঢেউটিন তৈরির পাত উৎপাদন হতো।  কিন্তু সরকারি এ কারখানা বন্ধ হওয়ার আগেই ১৯৯৬ সালে দেশে বিলেট তৈরির কারখানা গড়ে তোলার প্রথম উদ্যোগটি নেয় বিএসআরএম গ্রুপ। বর্তমানে দেশে বিলেটের যে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে তার ৯০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন করছে বিএসআরএম, আবুল খায়ের গ্রুপ, জিপিএইচ ইস্পাত ও কেএসআরএম। ইস্পাত উৎপাদনে বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে চীন। বাংলাদেশেও বিলেট আমদানির সিংহভাগ আসত চীন থেকে। আর সে দেশেই বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো বিলেট রফতানির কৃতিত্ব দেখিয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত। বিলেট রফতানি বিবেচনায় বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী জিপিএইচ গ্রুপ এরই মধ্যে চারটি জাহাজে করে চীনে রফতানি করেছে এক লাখ টন। এখন দুবাইতে বিলেট রফতানির ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছে। চাহিদামতো মূল্য নিশ্চিত করতে পারলেই সে দেশে যাবে জিপিএইচের বিলেট। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম বিলেট রফতানির সূচনা হয় ২০০৯ সালে শ্রীলংকায়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কুমিরা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ইস্পাত কারখানাটিতে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের সর্বশেষ প্রযুক্তি ‘কোয়ান্টাম ইএএফ’ ব্যবহারে বিলেট উৎপাদন করছে জিপিএইচ ইস্পাত। রড বা বিলেট উৎপাদনে এটি যেকোনো বিবেচনায় অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সাশ্রয়ী। নতুন ও পুরনো কারখানা মিলিয়ে বার্ষিক বিলেট উৎপাদন সক্ষমতা ১০ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে এগিয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত।

জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমাস শিমুল এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বছর কয়েক আগেও চাহিদা অনুযায়ী বিলেট তৈরির সক্ষমতা ছিল না রড তৈরির কারখানাগুলোয়। তবে এখনকার চিত্র ভিন্ন। আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর সরকারি নীতির ইতিবাচক পদক্ষেপে নতুন বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন করে আমরা নিজেরাই পুরনো লোহা গলিয়ে বিলেট উৎপাদন করছি। সেই বিলেট রফতানিও করছি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোয়ালিটি নিশ্চিত করা। গুণগত মান ধরে রেখে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিংসহ সরকারি নীতিসহায়তা থাকলে শিগগিরই রফতানি বড় পরিসরে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। কোয়ালিটি নিশ্চিত করে শুধু চীন নয়, বিশ্বের যেকোনো দেশেই রফতানি সাফল্য আনা সম্ভব। আমাদের কর্মপরিকল্পনায় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ২০৪১-এর মিশন ভালোভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’

 

গোলাম মর্তুজা আলী: সাংবাদিক