একটি দেশের জনসংখ্যা ক্রমধারা ও গতিশীলতা দারিদ্র্য হ্রাসে ও টেকসই উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব রাখে। জনসংখ্যার গতিশীলতা দ্বারা দারিদ্র্য প্রভাবিত হয় বা দারিদ্র্য দ্বারা জনসংখ্যার গতিশীলতা প্রভাবিত হয়, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বয়স কাঠামো এবং গ্রামীণ-শহর কাঠামোর বণ্টন। জনমিতিক প্রক্রিয়া—জন্ম, মৃত্যু ও স্থানান্তর এক্ষেত্রে মুখ্য। যেকোনো দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা ও দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এ সবকিছুরই প্রভাব থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। বিগত পাঁচ দশকে দেশের জনসংখ্যায় পরিমাণগত ও গুণগত দুই ধরনের পরিবর্তনই লক্ষ করা যায়। বণিক বার্তার বর্ষপূর্তি সংখ্যায় এ লেখার পরিসর মূলত বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও দারিদ্র্য নিয়ে। এক্ষেত্রে অর্জন ও চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরা। সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) ও পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে জনসংখ্যার তুলনামূলক আলোচনা দিয়ে শুরু করা যায়। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের তথ্য সূত্রে দেখা যায় ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৪২ লাখ ৩২ হাজার। আর পাকিস্তানের ছিল ৫ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার। বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণে পৌঁছে ২০০০ সালে আর পক্ষান্তরে পাকিস্তান দ্বিগুণে পৌঁছে বাংলাদেশের আগেই ১৯৯০ সালে। ফলে এটি লক্ষণীয় যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও সমগ্র প্রজনন হার বাংলাদেশের তুলনায় পাকিস্তানে বেশি। বর্তমানে ২০২১ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৯১ লাখে (বিবিএস : ২০২১ সালে প্রকাশিত রিপোর্ট অন স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২০ রিপোর্ট অনুযায়ী) আর পাকিস্তানে ২২ কোটিরও বেশি (জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের তথ্যসূত্র অনুযায়ী)। বাংলাদেশের উন্নয়নে পরিবার-পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম। বলা যায়, আজকের বাংলাদেশের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম যা এক সময় ছিল বিশ্বস্বীকৃত। পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পরিবার-পরিকল্পনা কার্যক্রম অধিকতর ফলপ্রসূ ছিল, যা নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে—বিশেষ করে জীবনের গুণগত মান উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। মাঠ পর্যায়ে পরিবার-পরিকল্পনা কার্যক্রম ও গণসচেতনতা কার্যক্রম ছিল বেশ দৃঢ়। মোট প্রজনন হার হ্রাসে নারী শিক্ষার প্রসার ও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনওসহ অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নের প্রভাবকও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুকূলে কাজ করেছে। বিভিন্ন গবেষণা এটি স্পষ্টই লক্ষণীয় যে বাংলাদেশে দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও মোট প্রজনন হার লক্ষণীয় মাত্রায় কমে এসেছে (প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারের কাছাকাছি) যা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। বাংলাদেশে মোট প্রজনন হার (প্রজননকালে মহিলাপ্রতি গড় সন্তান সংখ্যা—টিএফআর) ১৯৭৪ সালে ছিল ৬ দশমিক ২৪, যা ১৯৯৩-৯৪ সালে নেমে আসে ৩ দশমিক ৪৪-এ। তবে তা গ্রামীণ এলাকায় ছিল শহর থেকে বেশি (৩ দশমিক ৫৪)। সময়ের পরিক্রমায় সমগ্র দেশে মোট প্রজনন হার হ্রাসে আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন এলেও ২০১১ পরবর্তী সময়ে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১১-পরবর্তী সময়ে সমগ্র প্রজননহার হ্রাসে সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভ ২০১৭-১৮ ও মাল্টিপল ক্লাস্টার ইন্ডিকেটর সার্ভে-২০১৯-এর তথ্যানুযায়ী তেমন আর কোনো অগ্রগতি হয়নি অর্থাৎ বর্তমানে দেশে মোট প্রজনন হার ২.৩-এ স্থিত হয়ে আছে। ক্ষেত্রবিশেষে এ মোট প্রজনন হার হ্রাসে রয়েছে ভিন্নতা : যেমন- সিলেট, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে এখনো প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারের চেয়ে অনেক বেশি। দরিদ্র গৃহস্থালি সম্পদ সম্পন্ন কিংবা শিক্ষা নেই বা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেনি এমন মায়েদের মধ্যে সমগ্র প্রজননহার বেশি (২ দশমিক ৬)। দারিদ্র্যের সঙ্গে এখানে মোট প্রজনন হারের এক ধরনের সম্পর্ক সহজেই লক্ষণীয়। দেশে বর্তমানে মোট কাঙ্ক্ষিত প্রজনন হার ১ দশমিক ৭ যেখানে গ্রাম এলাকায় ১ দশমিক ৮ হলেও বাস্তবে তা ২ দশমিক ৩। ফলে পরিবার-পরিকল্পনা কার্যক্রম গ্রামীণ এলাকায় জোরদার করা প্রয়োজন। ‘জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ২০১২’ ও অনুযায়ী আমরা এখনো জনসংখ্যা নীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। জনসংখ্যা নীতির লক্ষ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে সমগ্র প্রজনন হার (টিএফআর) ২ দশমিক ১-এ পৌঁছানোর কথা। ২০০৪ সালের জনসংখ্যা নীতিতেও একই লক্ষ্য ছিল। জন্ম-নিরোধের হার ২০১৫ সালের মধ্যে ৭২ শতাংশে পৌঁছানোর কথা। আর সরকারের বাংলাদেশ রূপকল্প (২০১০-২০২১) অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে টিএফআর ১.৭-এ আর জন্ম-নিরোধে ৮০ শতাংশে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে উভয় হারের লক্ষ্যমাত্রা হলো ২ দশমিক শূন্য এবং ৭৫ শতাংশ—যা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ফলে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও (২০২০-২৫) একই লক্ষ্যমাত্রা বিদ্যমান রয়েছে। ১৯৭৫ সালে জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৮ শতাংশ। দীর্ঘ সময়ের প্রক্ষাপটে এক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য থাকলেও ২০১১-১৮ সময়কালীন জন্মনিয়ন্ত্রনের পদ্ধতি ব্যবহারে নেই উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ সালের বিডিএইচএস জরিপ অনুযায়ী ১৫-৪৯ বয়স্ক বিবাহিত নারীদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ, যার মধ্যে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যবহার করে আধুনিক পদ্ধতি, যেখানে নেই স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি ব্যবহারে কোনো সাফল্য। গ্রাম ও শহরভেদে পদ্ধতি ব্যবহারে পার্থক্য যেখানে গ্রামে এ হার (৬০ দশমিক ৪ শতাংশ) শহর থেকে ৫ শতাংশ কম। তবে অর্থনৈতিকভাবে যারা সবচেয়ে কম সচ্ছল বা দরিদ্র তাদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম (৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ)। এছাড়া ১৫-৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের পরিবার-পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অপূর্ণ চাহিদার হার ১২ শতাংশ, যা ১৫-১৯ বছরের মধ্যে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০-২৪ বয়সীদের ক্ষেত্রে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১১ থেকে ২০১৮—এ সময়ে অপূর্ণ চাহিদার হার কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। গ্রামে এ হার (১৩ দশমিক ১ শতাংশ) শহর থেকে প্রায় ৪ শতাংশ বেশি হলেও অর্থনৈতিকভাবে যারা সবচেয়ে কম সচ্ছল বা দরিদ্রদের মধ্যে ধনীদের তুলনায় এ হার অপেক্ষাকৃত কম (৯ দশমিক ৯ শতাংশ বনাম ১২ দশমিক ১ শতাংশ)। ফলে এসব প্যারাডক্স নিয়ে গবেষণার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

প্রজনন হার হ্রাসে সাফল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশে এক বছরের নিচে ও পাঁচ বছরের নিচে বয়সীদের ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এক্ষেত্রে গ্রাম শহর থেকে এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে পাঁচ-বছরের নিচে বয়সীদের ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৩৩ (বিডিএইচএস ১৯৯৩-৯৪) থেকে নেমে এসেছে ৪৫-এ (বিডিএইচএস ২০১৪ ও ২০১৭-২০১৮)। বর্তমানে গ্রামে এ হার ৪৩ হলেও শহরে তা ৪৮। আর এক বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার গ্রামে ৩৬ আর শহরে ৪১। তবে লক্ষণীয় যে, যেসব শিশু দরিদ্র গৃহস্থালির অন্তর্ভুক্ত তাদের মধ্যে পাঁচ বছরের নিচে বয়সীদের ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে ধনীদের তুলনায় বেশ বেশি (৫৫ বনাম ৩৬ প্রতি হাজারে)। এক্ষেত্রে শিশুদের টিকা দেয়া বা ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামের রয়েছে সাফল্য। যথাযথ বয়স অনুযায়ী সব মৌলিক টিকা দেয়ার হার যথাক্রমে গ্রামে ৮৫ দশমিক ৮ শতাংশ আর শহরে ৮৫ শতাংশ (বিডিএইচএস ২০১৭-১৮)।

বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসে ২০০১ থেকে ২০১০ সময়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলেও ২০১০ সালের পর তা স্থিতাবস্থায় রয়েছে কিংবা আংশিক বেড়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপ ২০১৬ তাই প্রতিফলিত করে যেখানে আগের (২০১০) জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ১৯৪ থেকে ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে ১৯৬। ২০০১ সালে বাংলাদেশে এ হার ছিল ৩২২। গ্রাম ও শহর ভেদে রয়েছে ব্যবধান। ২০০১ সালে গ্রামে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ৩২৬, যা বেশ আশাব্যঞ্জকভাবে হ্রাস পেয়ে ২০১০ সালে পৌঁছে ১৯৯-তে আর ২০১৬ সালের সর্বশেষ বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপের তথ্যমতে, গ্রামে মাতৃমৃত্যু হার ২১৬ দশমিক ৬ যেখানে শহরে ১৩৭ দশমিক ৭। ফলে শহর ও গ্রাম ভেদে এ হারে বেশ পার্থক্য লক্ষণীয়। দরিদ্র গৃহস্থালি সম্পদসম্পন্ন মায়েদের মধ্যে ধনীদের তুলনায় মাতৃমৃত্যু হার বেশি (২৬৪ দশমিক ৫৪ বনাম ১৩০ দশমিক ৯৮)। ফলে দারিদ্র্যের সঙ্গে মৃত্যুহারেরও সম্পর্ক আমরা দেখতে পাই, যা জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিশ্লেষণে প্রাসঙ্গিক। আগামী নয় বছরে এ টেকসই বা বজায়যোগ্য উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বা আইসিপিডি+ ২৫-এর অন্যতম একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ অর্থাৎ এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এ হ্রাস করা বাংলাদেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্যকে লক্ষ্য রেখে এ হার কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সেদিকে প্রয়োজন বিশেষ দৃষ্টি। এছাড়া এখনো বাংলাদেশে ৫০ শতাংশের মতো প্রসব বাড়িতে হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, মাতৃ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবহার বাড়লেও এক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পাওয়া যেন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার দিকে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। রক্তক্ষরণ বন্ধ ও একলাম্পশিয়া চিকিৎসায় গুরুত্ব দিতে হবে, কারণ এ দুটো কারণেই ৫৫ শতাংশ মা মারা যান। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে বিদ্যমান সিজারিয়ান প্রসবের হার কীভাবে কমিয়ে আনা যায় ও মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস করাতে মনোযোগ দিতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কিশোরী অবস্থায় বা কম বয়সে গর্ভধারণ বা কিশোরী মাতৃত্বের হার কমিয়ে আনা যা অনেক বেশি ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ (২০১৭-১৮ বিডিএইচএস)। ১৯৯৩-৯৪ সালে কিশোরী (১৫-১৯ বছর) প্রজনন হার ছিল ৩৩ শতাংশ। বিগত ২৬ বছরে (১৯৯৩-২০১৮) এ হার হ্রাস পেয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৭-১৮ বিডিএইচএস একই তথ্যসূত্রে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র গৃহস্থালিতে এ হার ধনীদের তুলনায় বেশ বেশি (৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ বনাম ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ)। তাছাড়া গ্রাম এলাকায় এ হার ২৯.৩ শতাংশ, যা শহর থেকে ৬ শতাংশ বেশি। ফলে কম বয়সে গর্ভধারণ বা কিশোরী মাতৃত্বের হার কীভাবে কমিয়ে আনা যায় তার জন্য দরকার যুগোপযোগী কার্যক্রম ও পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ নির্মূল হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ। এখনো বাংলাদেশে ২০-২৪ বছর বয়সী কখনো বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু বা বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে (বিডিএইচএস ২০১৭-১৮) যার বেশির ভাগই হচ্ছে গ্রামে (৬০ দশমিক ৭ শতাংশ)। গ্রামে এ হার শহর থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেশী। বাল্যবিবাহের একটি অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। সবচেয়ে দরিদ্র গৃহস্থালিতে বিয়ের এ হার ধনীদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশ বেশি (৭৪ দশমিক ২ শতাংশ বনাম ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ)। বর্তমানে কভিড-১৯ মহামারীকালেও এ বিয়ের হার বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের গত ৫০ বছর সময়কালীন জনসংখ্যা ও উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভবনা দুই-ই লক্ষণীয়। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম ১৯৭৪ সালের জনশুমারিতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার আকার ছিল ৭ কোটি ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৭১ জনে আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ববর্তী জনশুমারি ১৯৬১ অনুযায়ী এ অঞ্চল তথা পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৮৪ লাখ, যা এ জনসংখ্যার ৯১ দশমিক ২২ শতাংশ (৬,৫২,০৫,৪৬৮)-ই তখন বাস করতেন গ্রামীণ এলাকায় আর ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ শহরে। তবে পরবর্তী সময়ে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে (বর্তমানে ৩৭ শতাংশ নগর জনসংখ্যা, বিশ্বব্যাংক ২০২০)। গ্রামীণ এলাকায় যোগাযোগ ও আবকাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি কাজের সন্ধানে, জীবনের টানে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, পরিবেশগত বা অন্যান্য কারণে মানুষ গ্রাম থেকে স্থানান্তরিত হয় শহরে। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার গ্রামীণ এলাকায় কমেছে. তেমনি বেড়েছে নগরে। এক্ষেত্রে গ্রাম থেকে শহরে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর প্রভাব রেখেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গৃহস্থালি আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ গ্রামীণ গৃহস্থালি থেকে পরিবারের সদস্য কেউ না কেউ এক বছর সময়কালীন স্থানান্তর করেছে, যেখানে শহরে এ হার ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। তবে লক্ষণীয় যে, দেশের অভ্যন্তরে কিংবা বিদেশে মূলত বেশি স্থানান্তর করে গ্রামীণ এলাকা থেকেই। বিদেশের শ্রমবাজারে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন লোক বিদেশে গিয়েছে ১৯৭৬-২০২০ সময়কালে যেখানে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স পেয়েছে ১৭ লাখ ৫ হাজার ৬২০ দশমিক ৮২ কোটি টাকা (বিএমইটি ২০২১)। বিদেশে গমন করা এসব মানুষের বেশির ভাগ গিয়েছে গ্রাম এলাকা থেকে, যার অধিংকাশই অদক্ষ কিংবা আংশিক দক্ষ কাজের সঙ্গে যুক্ত। উল্লেখ্য, তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রেরিত রেমিটান্সের ৭০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ ব্যয় করে মৌলিক চাহিদা পূরণে আর ২৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ করে বিনিয়োগে। গ্রামে শহরের তুলনায় বিনিয়োগে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ রেমিট্যান্স বেশি ব্যয় করে যেখানে শহরে মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় গ্রামের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি (বিবিএস ২০১৬)। বৈদেশিক এ রেমিট্যান্স বাংলাদেশ তথা গ্রামীণ সমাজ জীবনে ক্ষমতায়ন, সম্পত্তির মালিকানা, পারিবারিক ও অন্যান্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখছে তার অধিকতর গবেষণার প্রয়োজন। অধিকন্তু অতিমারী কভিড-১৯ অধিকতর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়। ফলে এ নিয়ে বিস্তর কাজ ও ভাবনার সুযোগ রয়েছে—যেমন নতুন দারিদ্র্য, নগর দারিদ্র্য, রিভার্স মাইগ্রেশনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে দরকার গবেষণা।

বয়স কাঠামোর বিচারে বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০ বছর ও ঊর্ধ্বে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে, যা ১৯৭৪ সালে ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ (২০১৯ সালে বিবিএস প্রকাশিত—রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০১৯-এর তথ্যে) যা জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩০ সালে পৌঁছে যাবে প্রায় ১২ শতাংশে। ২০১১ সালের গৃহ ও জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দুই- তৃতীয়াংশের অধিক এ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে অক্ষম অবস্থায় রয়েছেন। বর্তমান কভিড-১৯ সংকটকালে এ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত রয়েছেন। বিপুলসংখ্যক এ প্রবীণের খুব কম শতাংশই ভোগ করে থাকেন পেনশন বা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা। বেশির ভাগেরই নিজের সঞ্চয়, সম্পত্তি কিংবা সন্তানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয় তাদের। পরিবারের ধরনে যৌথ বা বর্ধিত পরিবার প্রথা থেকে পরিবর্তিত বর্তমানে মূলত অনু পরিবার ব্যবস্থায় বয়স্ক এ জনগোষ্ঠীর যত্ন ও সেবা প্রদান চ্যালেঞ্জ হিসাবে উদ্ভূত হচ্ছে।

লক্ষণীয় যে, গত ৫০ বছরে আমাদের রয়েছে লক্ষণীয় অর্থনৈতিক সাফল্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ (১৯৭৩) থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশে (২০১৯, বিশ্বব্যাংক) পৌঁছেছে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ১ দশমিক ৯০ ডলারের নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যা ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ১৯৮৩ সালে ছিল ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ (বিশ্বব্যাংক)। সরকারি হিসাবে জাতীয় মাথাপিছু দারিদ্র্যের হার ২০০০ সালের ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে (বিবিএস ২০১৬)। তবে গ্রামে এ দারিদ্র্যের হার শহর থেকে এখনো ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি (২৬ দশমিক ৪ শতাংশ)। আয় বৈষম্যে কোনো উন্নতি হয়নি বরং বেড়েছে যা ১৯৮৩ সালের ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ২০১৬-তে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে (বিশ্বব্যাংক)। সাম্প্রতিক সময়ে গিনি সহগের মানদণ্ডে ২০১০-এ ছিল  দশমিক ৪৫৮, যা ২০১৬-তে বেড়ে হয়েছে  দশমিক ৪৮২-এ (বিবিএস ২০১৬)। এক্ষেত্রে গ্রাম (দশমিক ৪৫৪) ও শহরে (দশমিক ৪৯৮) উভয় ক্ষেত্রেই বেড়েছে। বাংলাদেশে যুবগোষ্ঠী ও দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়লেও বেকারত্বের হারে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি (৪ দশমিক ৩ শতাংশ—২০১৬-১৭ ও ২০১৩; ৪ দশমিক ৬ শতাংশ-২০১০)। এক্ষেত্রে শহরের তুলনায় গ্রামে বেকারত্বের হার অপেক্ষাকৃত কম (৪ দশমিক শূন্য শতাংশ বনাম ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, বিবিএস ২০১৬-১৭)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রম জরিপ বলছে বাংলাদেশে ১৫-২৯ বছর বয়সী যুবগোষ্ঠীর বেকারত্ব ক্রমান্বয়ে বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, যার মধ্যে গ্রামে ১০ দশমিক ২ শতাংশ আর শহরে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। এ বয়সী কর্মক্ষম যুবগোষ্ঠীর ২৯ দশমিক ৮ শতাংশই শিক্ষা, চাকরি অথবা প্রশিক্ষণের (নিট) কোনোটিতেই নেই যাদের ৮৭ শতাংশই হচ্ছে নারী। গ্রাম ও শহরে নিটে হার যথাক্রমে ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ও ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই গ্রাম ও শহরে—কাজের সুযোগ বৃদ্ধিতে দরকার ব্যাপক বিনিয়োগ ও পদক্ষেপ। তবে আশাপ্রদ ব্যাপার হলো জনসংখ্যার কাঠামোগত মানদণ্ডে বাংলাদেশে এমন একটি সময় পার করছে, যেখানে নির্ভরশীলতার হার সবচেয়ে কম এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা (১৫-৫৯ বছর) এখন সবচেয়ে বেশি। জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগের পাশাপাশি সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে। ১৯৭৪ সালের ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বর্তমানে বেড়েছে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬৩.৩ শতাংশ-এ। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে ১৫-৬৪ বছরের বিবেচনায় গ্রাম এলাকায় রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ আর শহরে ৬৮ দশমিক ৪ শতাংশ (বিবিএস ২০১৯)। বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা (১৫-৫৯ বছর) এখন সবচেয়ে বেশি। ফলে নির্ভরশীলতার হার এখন সবচেয়ে কম। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সময় পার করছে, যা সদ্ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে ২০৩৫-৩৭ পর্যন্ত। বর্তমানে দেশে জাতীয়ভাবে নির্ভরশীলতার অনুপাত ৫১ শতাংশ হলেও গ্রাম এলাকায় ৫৫ শতাংশ। গ্রাম এলাকায় ২০১৫ সালে এ হার ছিল ৫৯ শতাংশ (বিবিএস ২০১৯)। ফলে নির্ভরশীলতার এ হারকে আরো কমিয়ে এ সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ত্বরায়ণ নির্ভর করছে বয়স-কাঠামোর পরিবর্তনে কর্মক্ষম এ জনগোষ্ঠীর সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক নীতি ও সুশাসন নিশ্চিতকরণের ওপর। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা দরকার সঠিক তথ্যভিত্তিক উপাত্তের বিশ্লেষণে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে বাংলাদেশ ও সমগ্র বিশ্ব বর্তমানে এক অনিশ্চিত সময় পার করছে। কভিড-১৯ সংক্রমণে প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কভিড-১৯ মহামারী আমাদের স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। জনসংখ্যায় নতুন করে দারিদ্র্য তৈরি করছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে এ দারিদ্র্য কীভাবে জনমিতিক প্রক্রিয়ায়—জন্ম, মৃত্যু ও স্থানান্তরে প্রভাব ফেলছে কিংবা জনমিতিক প্রক্রিয়া কীভাবে এ দারিদ্র্যকে প্রভাবিত করছে—তা সঠিক ও গুণগত উপাত্তের বিশ্লেষণ দরকার। সে উপাত্তের চাহিদা ও পদ্ধতিগত বিশ্লেষণে আমাদের অর্জন বা ঘাটতি এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের নীতি-কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে উন্নয়নের ভিত্তিমূলে থাকা দরকার অধিকার ও পছন্দ-সমতা নিশ্চিত করা ও জীবনের গুণগত দিকে মানোন্নয়নে গুরুত্ব প্রদান।

 

ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম : অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়