স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। মুজিব জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল নির্ধারিত ‘স্বল্পোন্নত দেশের’ ক্যাটাগরি থেকে ‘উন্নয়নশীল দেশের’ ক্যাটাগরিতে উত্তরণের ছয় বছরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং ওই প্রক্রিয়ার সফল পরিসমাপ্তির পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে (অবশ্য করোনাভাইরাস মহামারীর বিপর্যয়ের কারণে স্বল্পোন্নত দেশের প্রাপ্য সুবিধাগুলো ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে)। এর আগে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘নিম্ন আয়ের দেশ’ থেকে বাংলাদেশ ‘নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। দুই দশক ধরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। করোনা মহামারীর আঘাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে গেলেও বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২০১৯ অর্থবছরের ১৯০৯ ডলার থেকে বেড়ে ২০২০ সালের ৩০ জুন ২০৬৪ ডলারে এবং ২০২১ সালের ৩০ জুন ২২২৭ ডলারে পৌঁছে গেছে। ২০২০ সালেই মাথাপিছু জিডিপি হিসাবে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে গেছে। এটা শুধু করোনা মহামারীর অভিঘাত নয়। পাঁচ বছর আগেও ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি ছিল। এরপর পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে ভারতের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। মাথাপিছু জিডিপির বিচারে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে, এবার ভারতকে ছাড়িয়ে গেল। বাংলাদেশের অর্থনীতি অনুন্নয়ন ও পরনির্ভরতার ফাঁদ থেকে মুক্ত হয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে যাত্রা করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন—এ কম বড় পাওয়া নয়। 

কিন্তু এ ৫০ বছরেও বাংলাদেশ অনৈতিকতার বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেছিল। এর মানে জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূলনীতি হলো শ্রমজীবী জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির পাহারাদারের ভূমিকা পালন। সেজন্যই রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির দ্বিতীয়টিই ছিল সমাজতন্ত্র। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পাঁচ বছরে অতিধনীর সংখ্যাবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক অতিধনীর সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। দেশের আয় ও সম্পদের এমন পুঞ্জীভবন উদ্ভূত আয়বৈষম্য বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ নিকৃষ্ট নজির হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে। মাঝে সংবিধানে অনেক কাঁটাছেড়া হওয়ার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির মধ্যে ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে আবারো সমাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১১ সালে সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোট সে রায়কে সংবিধানে ফিরিয়ে আনলেও সরকার এখনো ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতির’ মধ্যে মেতে রয়েছে। ২০০১-০৫ পাঁচ বছরে পাঁচবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছিল, এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করল ধনকুবেরের সংখ্যাবৃদ্ধির দৌড়ে। এসব ‘রবার ব্যারন’ সৃষ্টির জন্য কি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন এনেছিলাম আমরা? একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আয়বৈষম্য এভাবে বাড়তে পারে না, যদি শাসকরা সমাজতন্ত্রকে ‘বাত কা বাত’ বানিয়ে না ফেলে! এমন ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমপ্রীতি’ অসাংবিধানিক ও অনৈতিক।

মাথাপিছু জিডিপি যেহেতু একটি গড় সূচক, তাই মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যদি দেশে আয়-বণ্টনে বৈষম্যও বাড়তে থাকে তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের উচ্চবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রবণতা ক্রমে শক্তিশালী হতে থাকে। ফলে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ প্রবৃদ্ধির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত জনগণ জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কোন দেশ বেশি পাচ্ছে, তা জানতে দুই দেশের বিদ্যমান আয় ও সম্পদবৈষম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এ ব্যাপারে দুই দেশের তুলনা বেশ কঠিন। শুধু এটুকু বলব, ২০১৬ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশের আয়বৈষম্য পরিমাপকারী জিনি সহগ বেড়ে দশমিক ৪৮৩-এ পৌঁছে গেছে (১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের জিনি সহগ ছিল মাত্র ০.৩৩)। এর মানে এখন বাংলাদেশ উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আরেকটি পরিমাপকের গতিপ্রকৃতির মাধ্যমে ২০১০ ও ২০১৬ সালের মধ্যে আয়বৈষম্য বিপজ্জনকভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে এবং ৫-১০ শতাংশ ধনাঢ্য গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি ফুটে উঠেছে: ২০১০ সালে দরিদ্রতম ৫ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপির দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে মাত্র দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে গেছে। ২০১০ সালে দরিদ্রতম ১০ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপির ২ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা মাত্র ১ দশমিক  শূন্য ১ শতাংশে নেমে গেছে। সমস্যার আরেক পিঠে দেখা যাচ্ছে, দেশের ধনাঢ্য ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দখলে ২০১০ সালে ছিল মোট জিডিপির ৩৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছে গেছে। আরো দুঃখজনক হলো, জনগণের সবচেয়ে ধনাঢ্য ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দখলে ২০১৬ সালে চলে গেছে মোট জিডিপির ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ওয়েলথ এক্সের প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮ অনুযায়ী ২০১২-১৭ পাঁচ বছরে অতিধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক দিয়ে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে বাংলাদেশ। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। ভারত এ ব্যাপারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন না হলেও ধনকুবেরের সংখ্যা সেখানেও ক্রমে বাড়ছে। আর এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে’ বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫-এর চেয়ে ভারতের অবস্থান ১৯ ধাপ পেছনে ৯৪ নম্বরে চলে যাওয়ার ব্যাপারটায়। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, সিকিম, সেভেন সিস্টার্সসহ (আসাম, অরুণাচল, মেঘালয়, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও মিজোরাম) অধিকাংশ রাজ্যের প্রায় ৮০ কোটি জনগণের মাথাপিছু নমিনাল জিডিপি ও পিপিপি ভিত্তিতে পরিমাপকৃত মাথাপিছু জিডিপি উভয়ই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। আঞ্চলিক আয়বৈষম্য বাংলাদেশেও রয়েছে, তবে ভারতের মতো ততটা প্রকট নয়।

জাতির ‘অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম’ সফল করার জন্য আমাদের সুকঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে আরো বহু বছর। এ সংগ্রামে জয়ী হতে হলে এখন প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে জাতির উন্নয়নের যাত্রাপথের সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন এবং বিদেশে পুঁজি পাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামকে। এখন আর আমাদের কোনো ঔপনিবেশিক প্রভু দেশ নেই। তবে লুটেরা শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপব্যবহার করে  অবৈধ ধন-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে ৫০ বছর ধরে। জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক এ তিনটি বিষয়। পলাতক পুঁজি (capital flight) সম্পর্কে গবেষণা পরিচালনাকারী সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) জানাচ্ছে যে এখন প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৭-৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পুঁজি বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ দেশের আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা, গার্মেন্ট মালিকরা, রাজনীতিক ও তাদের স্বজনরা, দুর্নীতিবাজ আমলা, সামরিক অফিসার ও প্রকৌশলীরা এবং ব্যাংকের রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিরা লুণ্ঠনের মাধ্যমে অবৈধ ধনসম্পদ আহরণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে পুঁজি পাচার করে চলেছে। এরাই কানাডার টরন্টোয় বেগমপাড়া বানাচ্ছে, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম কিনছে, ছেলেমেয়েদের বিদেশে অভিবাসী করার জন্য মরিয়া হয়ে গেছে। এভাবে যদি দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচার না হতো তাহলে এরই মধ্যে বাংলাদেশের জিএনআই প্রবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়লগ্নে এ নব্য স্বাধীন দেশটি অর্থনৈতিকভাবে আদৌ টিকে থাকতে পারবে কিনা তা নিয়ে বিশ্বের অনেক উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও ওয়াকিবহাল মহলের গভীর হতাশা ছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জনসন নামের যুক্তরাষ্ট্রের একজন কূটনীতিক যখন স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের তদানীন্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পরবর্তী সময়ে (১৯৭৩ সাল থেকে) যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত সেক্রেটারি অব স্টেট ড. হেনরি কিসিঞ্জার তাতে সায় দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ওপর ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ইউস্ট ফালান্ড ও জন পারকিনসনের বিশ্বখ্যাত গবেষণা পুস্তকটির নামই ছিল বাংলাদেশ—এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট। অথচ গত ৫০ বছরে এসব নৈরাশ্যবাদী ভবিষ্যদ্বাণীকে উড়িয়ে এখন উন্নয়নশীল বিশ্বের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। মহামারীর অভিঘাত সত্ত্বেও বিশ্বের যে কয়েকটি দেশ গত দেড় বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ধনাত্মক রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। আরো বিস্ময়কর হলো মহামারী সত্ত্বেও ২০২০ সালে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী রেমিট্যান্স ২৩ শতাংশ বেড়ে ২১.৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের জুনে ৪৬ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের উন্নয়নের যেসব মাত্রা বিশ্বের কাছে চমকপ্রদ বিবেচিত হচ্ছে সেগুলো হলো:

১) ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার ৮২ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছিল, যেখান থেকে ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারীর তাণ্ডব শুরু হওয়ার পর্যায়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার অনুপাত ২০.৫ শতাংশে নেমে গিয়েছিল (গত দেড় বছরে মহামারীর কারণে দারিদ্র্য ৫ শতাংশ বেড়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে)।

২) ১৯৭৬-৭৭ থেকে ১৯৮১-৮২ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপির অনুপাত হিসেবে বৈদেশিক ঋণ-অনুদান ১০ শতাংশের বেশি ছিল, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। বাংলাদেশ এখন আর সহায়তানির্ভর দেশ নয়, একটি বাণিজ্যনির্ভর দেশ।

৩) দেড় দশক ধরে প্রায় প্রতি বছর বাংলাদেশ তার লেনদেন ভারসাম্যের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত অর্জন করে চলেছে। এর মানে বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতি এখন আর সংকটজনক নয়। প্রবাসী বাংলাদেশীদের বৈধ পথে প্রেরিত রেমিট্যান্সের চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধির হার এবং বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধি দেশের লেনদেন ভারসাম্যের এ স্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

৪) জনসংখ্যার অত্যধিক ঘনত্ব, জমি-জন অনুপাতের অত্যল্পতা এবং চাষযোগ্য জমির ক্রমসংকোচন সত্ত্বেও বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করে এখন ধান উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন, ২০১৯ সালে তা সোয়া তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ৩ কোটি ৬২ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। ধান, গম ও ভুট্টা মিলে ২০২০ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ৪ কোটি ৫৩ লাখ টন। ৭০ লাখ টন আলুর অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিপরীতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ১ কোটি ২ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে (এখনো আমরা অবশ্য প্রায় ৫০-৫৫ লাখ টন গম আমদানি করি)। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। শাক-সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। বলতে গেলে বাংলাদেশে একটি কৃষি বিপ্লব চলমান।

৫) ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শিল্প খাতের অবদান জিডিপির ৩৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে, বিনিয়োগ-জিডিপির অনুপাত ৩১.৫৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিল্প খাতে শ্রমশক্তির নিয়োগ বেড়ে প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে।

৬) ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানি আয় ছিল ৪২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, অথচ ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে রফতানি আয় ছিল মাত্র ৭৫২ মিলিয়ন ডলার (করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রফতানি আয় ৩৩.৬৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল, কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে)। রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসছে বুনন ও বয়নকৃত তৈরি পোশাক খাত থেকে। চীনের পর বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছিল, যদিও অতিসম্প্রতি ভিয়েতনাম এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সাময়িকভাবে টপকে গেছে। বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো সমাদৃত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, সিরামিক পণ্য, জাহাজ নির্মাণ ও কৃষিভিত্তিক খাদ্যপণ্য রফতানি বাজারে ভালোই সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

৭) বাংলাদেশের ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ বিদেশে কাজ করছেন ও বসবাস করছেন। ২০২০ সালে প্রাতিষ্ঠানিক পথে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ২১.৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে।

৮) ক্ষুদ্র ঋণ আন্দোলনের সাফল্য গ্রামের ভূমিহীন নারীদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পৌঁছে দেয়ার একটা অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এক-চতুর্থাংশের বেশি ঋণগ্রহীতা তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সাফল্য অর্জন করেছেন। অবশ্য ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা সাফল্যের সঙ্গে দারিদ্র্য থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শুধু ক্ষুদ্র ঋণকে এ দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কর্তৃক লালিত দারিদ্র্য সৃষ্টি ও পুনঃসৃষ্টির প্রক্রিয়াগুলোকে কার্যকরভাবে মোকাবেলার যথার্থ প্রতিষেধক বিবেচনা করা সমীচীন নয়। কিন্তু দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পৌঁছে দেয়ার এ সফল উদ্ভাবনটিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক দিক উন্মোচনের কৃতিত্ব দিতেই হবে।

৯) বাংলাদেশের নারীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ বাড়ির আঙিনার বাইরে অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে ক্রিয়াশীল। দেশের দ্রুত বিকাশমান পোশাক শিল্পে ৩৩ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, আর এ শ্রমিকদের ৬০ শতাংশেরও বেশি নারী। সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক অবস্থানের এসব নারীর প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প খাতে কাজের ব্যবস্থা করাটা তাদের বঞ্চনা ও চরম দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে একটি তাত্পর্যপূর্ণ নিরোধক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ক্ষুদ্র ঋণের সহায়তায় নারীর স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বাংলাদেশ বিশ্বে সফল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।

১০) বাংলাদেশে এখন ১৬ কোটি মোবাইল টেলিফোন রয়েছে, ১১ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

এত সব খাতে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে এক্ষেত্রে উন্নয়ন অপরিহার্য।

প্রথমত, ‘দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স’ নীতিকে শুধুই রাজনীতির কথা সর্বস্বভা হিসেবে ব্যবহার করে দুর্নীতি দমনে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা দেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিকে গত এক যুগে সর্বনাশা ও সর্বব্যাপ্ত স্তরে নিয়ে গেছে। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ২০০১-০৫ সাল পর্যন্ত, ২০০১ সালে সরকারে ক্ষমতাসীন ছিল আওয়ামী লীগ, আর ২০০২-০৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। ২০০৭-৮ সালে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতিবাজদের ‘প্রবল ঝাঁকি’ দেয়ায় বাংলাদেশের ভাগ্যে দুর্নীতির বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ আর না জুটলেও আমাদের অবস্থান এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্নে এবং বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ১৫টি দেশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এ পর্যায়ে স্মরণ করছি, ২০০৭-৮ সালের সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন গতিশীলতা অর্জন করেছিল। দুদকের পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী শক্তিশালী জাতীয় কমিটিও কাজ করেছিল। ওই দুই বছরে এ দুই ধরনের দুর্নীতিবাজদের যে প্রবল ঝাঁকি দেয়া সম্ভব হয়েছিল সেটা দুদকের পরবর্তী চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন। দুঃখজনক হলো, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে দুদককে অকার্যকর করার যাবতীয় প্রয়াস জোরদার করা হয়েছে, যা সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত ‘দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স’ নীতির বিপরীত।

দ্বিতীয়ত, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব বাজেটে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা বহাল রাখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে কালো টাকার মালিকদের জন্যে অভূতপূর্ব আরো কয়েকটি নতুন সুবিধে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সৎ করদাতারা এ দেশে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কর দেন, অথচ অসৎ কালো টাকার মালিক মাত্র ১০ শতাংশ কর দেবে, এটা কি অনৈতিক নয়? কালো টাকাকে সাদা করে ‘মেইন স্ট্রিমে’ নিয়ে না এলে নাকি এ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। এ সুবিধা প্রতি বাজেটে ঘোষণার আসল উদ্দেশ্য হলো প্রধানত দুর্নীতিবাজদের জন্য সম্ভাব্য দুর্নীতি দমনের জাল থেকে পলায়নের একটি পথ খুলে দেয়া। আমাদের নীতিপ্রণেতারা কি জানেন না সামান্য কিছু অর্থ এসব দুর্নীতিবাজ ১০ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করে নিলে ওই বৈধকরণের নথিপত্রগুলো তাদের হাজার হাজার কোটি কালো টাকা নিরাপদে রেখে দেয়ার ভালো দালিলিক সুরক্ষা প্রদান করে, কারণ টাকার গায়ে তো কালো-সাদা লেখা থাকে না? দেশের সংবিধানের ২০(২) ধারা বলছে,‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না’। অতএব, দুনীতিবাজ ব্যক্তি, ব্যাংকঋণ লুটেরা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের আইনের আওতায় এনে তাদের অপরাধের শাস্তিবিধান না করা হলে সেটা কি গুরুতর অনৈতিক ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপ হবে না?

তৃতীয়ত, দেশে খেলাপি ব্যাংকঋণ নিয়ে একটা ‘পাতানো খেলা’ চলছে। সমস্যার প্রকৃত রূপটি সরকার, ব্যাংকার ও ঋণখেলাপি সবারই জানা আছে। সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কেও এ তিন পক্ষের সবার স্পষ্ট ধারণা আছে। কিন্তু জেনেশুনেই সমাধানের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে এখনো দেশের ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা রয়ে গেছে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের কাছে আটকে থাকা বিপুল খেলাপিঋণ। এ ঋণখেলাপিদের প্রায় সবাই ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’, মানে যারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে তারা তাদের ঋণ ফেরত দেবেন না। কারণ তাদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক প্রতাপ দিয়ে তারা শুধু ব্যাংক খাত নয় দেশের সংসদকেও দখল করে ফেলেছেন। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮-এর নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের ৬১.৭ শতাংশই ব্যবসায়ী। সংসদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য প্রকৃতপক্ষে ঋণখেলাপি। করোনাভাইরাস মহামারী আঘাত হানার পর গত দেড় বছর আর কোনো ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি ঘোষণা করা হচ্ছে না। তাই এ অনৈতিক প্রবণতা এখন মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেলেও সংকটের প্রকৃত মাত্রা জানা যাচ্ছে না।

 

ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়