১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ নামে যাত্রা, ১৯৬৪ সালে পরিবর্তিত নাম হয় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বয়স বিবেচনায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চেয়েও পুরনো প্রতিষ্ঠান দেশের প্রধান এ পুঁজিবাজার। প্রত্যাশা ছিল বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হবে। পুঁজি সংগ্রহে হয়ে উঠবে উদ্যোক্তাদের মূল ভরসা। কিন্তু দীর্ঘ ছয় দশকের পথচলায় সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেনি ডিএসই। নিজেকে বিকশিত করতে পারেনি পুরোপুরি কার্যকর ও গতিশীল একটি পুঁজিবাজার হিসেবে।

বিশ্বের অনেক দেশেই অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে পুঁজিবাজার। এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোয়ও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বাজার মূলধনের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। যদিও এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। যদিও ভারতের জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান ভারতে ৭৫, থাইল্যান্ডে ৯০ শতাংশ।

দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকা, যোগ্য নেতৃত্ব ও দক্ষ-পেশাদার কর্মীর অভাব, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব, নামমাত্র অটোমেশন, ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, ডিজাস্টার রিকভারি (ডিআর) সাইট না থাকাসহ নানা কারণে পুরোপুরি কার্যকর পুঁজিবাজারে পরিণত হতে পারেনি ডিএসই। এমনকি চীনা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তির দুই বছরেও সেখান থেকে কোনো সুবিধা আদায় করা যায়নি।

প্রতিষ্ঠার পর মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে কার্যক্রম বন্ধ ছিল ডিএসইর। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পুনরায় কার্যক্রমে ফিরে আসে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৮ সালে স্টক এক্সচেঞ্জটিতে অটোমেটেড প্লাটফর্মে লেনদেন শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে কাগুজের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক শেয়ারের প্রচলন শুরু হয়। এরপর নতুন অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস), নতুন ইনডেক্স ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা হলেও পূর্ণাঙ্গতা আসেনি স্টক এক্সচেঞ্জটির অটোমেশনে। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে একটি পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড এক্সচেঞ্জ বলতে যা বোঝায় সে ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে ডিএসই।

বিশ্বের প্রায় সব দেশে পুঁজিবাজারের লেনদেন হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ব্রোকারেজ হাউজের ওয়ার্ক স্টেশন পরিচালনার জন্য ব্যক্তির উপস্থিতি আবশ্যক। আবার ব্রোকারেজ হাউজের যে কার্যালয় বা শাখার জন্য ওয়ার্ক স্টেশন নির্ধারিত রয়েছে, সেটি যদি অন্য কোথাও স্থানান্তর কিংবা পরিচালনা করতে হয়, তাহলে সেক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। তাছাড়া শেয়ার কেনাবেচার পর সেটেলমেন্ট সম্পন্ন করতে ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে কিনা সেটি নিশ্চিত হতে হয় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে ব্রোকারেজ হাউজের তথ্য আদান-প্রদান এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই হচ্ছে। এছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে যে তথ্য পাঠাচ্ছে, সেটিও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই। এসব কারণে বিশ্বব্যাপী লকডাউনের মধ্যেও যেখানে প্রায় সব দেশের পুঁজিবাজার খোলা ছিল, সেখানে পুঁজিবাজার বন্ধ রাখতে হয়েছে বাংলাদেশকে। মূলত ম্যানুয়াল সিস্টেমনির্ভর হওয়ার কারণেই এ সময়ে পুঁজিবাজার চালু রাখা সম্ভব হয়নি।

মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথককরণের উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে ডিমিউচুয়ালাইজড করা হয়। এর ফলে এক্সচেঞ্জের পর্ষদে শেয়ারধারী পরিচালকদের প্রাধান্য লোপ পায়। এর পরিবর্তে স্বতন্ত্র পরিচালকরা এক্সচেঞ্জটির নেতৃত্বে আসেন। কিন্তু এ পরিবর্তনও অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতামাত্র। কারণ ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পরও কার্যক্রমে স্বাতন্ত্র্য ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারেননি এক্সচেঞ্জটির স্বতন্ত্র পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ফলে এক্সচেঞ্জের কার্যক্রম পরিচালনায় অনেক ক্ষেত্রেই শেয়ারধারী পরিচালকদের দ্বারস্থ হতে হয়।

বর্তমান কমিশনের এক কমিশনার বলছিলেন, আগে কী সমস্যা ছিল সেটি নিয়ে তারা সময় ব্যয় করতে চান না। তারা সামনের দিকে এগোতে চান। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তাতে তেমন সুফল মিলছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এখনো দৃশ্যমান। একেক নিয়ন্ত্রক সংস্থা একেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আর তাতে বিনিয়োগকারীরা শঙ্কায় পড়ছেন। অটোমেশনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। আশার কথা হলো, এরই মধ্যে আমরা পুঁজিবাজারের সার্বিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে একজন আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি কাজও শুরু করে দিয়েছেন।

বিশ্বের যেসব দেশের স্টক এক্সচেঞ্জ পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে সেগুলোর প্রতিটিই একদল দক্ষ ও পেশাদার কর্মীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে দক্ষ ও পেশাদার কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। খোদ স্টক এক্সচেঞ্জটির পর্ষদের গঠন করা এক কমিটির প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ডিএসইতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ১৪২ জন স্টাফ রয়েছে, যাদের তেমন কোনো দায়িত্ব নেই। অথচ তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে স্টক এক্সচেঞ্জকে।

২০১৬ সালে লেনদেনের জন্য মোবাইল অ্যাপ চালু করে ডিএসই। কিন্তু গ্রাহকবান্ধব না হওয়ার কারণে এটি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। বিশ্বের অন্যান্য দেশে মোবাইল অ্যাপ ব্রোকারেজ হাউজের কাছে থাকে, স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে নয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। ফলে এই চার বছরে অ্যাপটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০ হাজারের কিছু বেশি। এদের বেশির ভাগই আবার নিষ্ক্রিয় গ্রাহক। সম্প্রতি ডিএসইর পক্ষ থেকে নিষ্ক্রিয় গ্রাহকদের রেজিস্ট্রেশন বাতিলের জন্য সব ব্রোকারেজ হাউজের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়।

যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা দুর্যোগ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সচল রাখার জন্য ব্যাকআপ হিসেবে মূল কার্যালয়ের বাইরে পৃথক স্থানে সব ধরনের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়, যা ডিজাস্টার রিকভারি (ডিআর) সাইট হিসেবে পরিচিত। স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট নিষ্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ডিআর সাইট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অটোমেটেড প্লাটফর্মে লেনদেন চালুর পর ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও ডিআর সাইট ছাড়াই চলছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইর কার্যক্রম। এতে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ডিএসইর কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গেল বছরের আগস্টে ডিএসইর ওয়েবসাইটের উন্নত সংস্করণ চালু করার পরই এতে সমস্যা দেখা দেয়। তাছাড়া সে সময় পুঁজিবাজারের বাড়তি লেনদেনের চাপ নিতে পারছিল না ডিএসইর ওএমএস। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে ২৪ আগস্ট ডিএসইর ওয়েবসাইট ও ট্রেডিং সিস্টেমের ত্রুটি অনুসন্ধানের জন্য ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডিএসইর কোনো ডিআর সাইট নেই। এর ফলে যেকোনো দুর্ঘটনার কারণে ডিএসইর ডাটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুঁজিবাজারের কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। এমনকি পুঁজিবাজারের লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। ফলে ডিএসইকে দ্রুত ডিআর সাইট স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছিল কমিটি।

২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের সমন্বয়ে গঠিত চীনা কনসোর্টিয়ামের কাছে ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তর করা হয়। ক্রয় চুক্তি অনুসারে শেয়ারের ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে ১০ বছরের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা ছিল চীনা কনসোর্টিয়ামের। কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে কৌশলগত অংশীদারের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সুযোগ-সুবিধা আদায়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ, মেয়াদ নবায়ন ও পদত্যাগ ইস্যু নিয়ে বরাবরই সরগরম থাকে ডিএসই। কখনো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, কখনো পর্ষদের সঙ্গে মনোমালিন্য, আবার কখনো এমডির নিজের সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়টি এক্সচেঞ্জটিতে বহুল আলোচিত। ফলে ডিএসইর এমডির পদ হয়ে উঠেছে একটি হটসিট। এ কারণে এখানে যিনি এমডি হিসেবে দায়িত্ব পান তাকে এক্সচেঞ্জের উন্নয়নের চেয়ে নিজের পদ টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত থাকতে হয়। নিয়োগের এক বছর না যেতেই পদত্যাগ করতে হয়েছে ডিএসইর এমডি কাজী ছানাউল হককে।

দেশের পুঁজিবাজার এখনো ইকুইটিনির্ভর। এর বাইরে বিনিয়োগযোগ্য পণ্য নেই বললেই চলে। এতে পুঁজিবাজারও প্রত্যাশিত পর্যায়ে বিকশিত হতে পারেনি। নতুন নতুন পণ্য এনে বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রেও সফলতা নেই ডিএসইর। এছাড়া স্থানীয় ও বহুজাতিক ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে পারেনি এক্সচেঞ্জটি।

দেশের অর্থনীতি যেভাবে এগিয়েছে পুঁজিবাজার সেভাবে এগোতে পারেনি। এ ব্যর্থতার দায় এক্সচেঞ্জটির সদস্য, পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষসহ সবার। সামনের দিনগুলোতে একটি কার্যকর ও গতিশীল এক্সচেঞ্জ হিসেবে ডিএসইকে দেখতে চাইলে একজন দক্ষ ও যোগ্য এমডি নিয়োগ, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও আস্থা অর্জন, ডিজিটালাইজেশন, ওএমএস ও এপিআই ব্রোকারেজ পর্যায়ে ছেড়ে দেয়ার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে।

 

মেহেদী হাসান রাহাত: সাংবাদিক