গুণগত শিক্ষা বা মানসম্মত শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এটি উন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের শিক্ষাবিদদের মনোযোগ আকর্ষণ করে চলেছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো টেকসই উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে গুণগত শিক্ষার ধারণা ও গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছর সময়কে ‘জাতিসংঘ শিক্ষা দশক’ হিসেবে গণ্য করে ইউনেস্কো গুণগত শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, উপাদান ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে। এ সংস্থাটি গুণগত শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নে শিক্ষার পূর্বশর্ত হিসেবে গণ্য করেছে। ‘সবার জন্য শিক্ষা’ এবং ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমালা’ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অভীষ্টফলে গুণগত শিক্ষার বিকাশ ঘটতে পারে বলে অনেকে মত প্রকাশ করেন। এক্ষেত্রে ইউনেস্কো দ্বিমত পোষণ করে বলেছে, শিক্ষার পরিমাণগত ও গুণগত বিকাশ একই সঙ্গে ঘটতে পারে।

শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। শিক্ষাব্যবস্থার নানা দিকে সংস্কার, পরিবর্তন, পরিমার্জন, নবায়ন, পুনর্বিন্যাস ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিটি দেশে শিক্ষার মান উন্নয়ন অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। শিক্ষার উন্নয়নে বাংলাদেশে প্রতিটি মেয়াদি পরিকল্পনায় লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কৌশল, কর্মসূচি ইত্যাদি গ্রহণ করা হয়। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পঞ্চবার্ষিকী (১৯৭৩-১৯৭৭) পরিকল্পনা প্রণয়নকালে শিক্ষার তাত্পর্য ও গুরুত্ব প্রদান করেন এবং ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশগুলো ওই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্দেশনা দেন, যার ফলে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হয় এবং শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

পরিকল্পনা বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন মত লক্ষ করা যায়। খ্যাতনামা পরিকল্পনাবিদ ইউরাইচের মতে, পরিকল্পনা হচ্ছে মূলত কোনো কাজ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পাদনের আগে চিন্তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া ও মানসিক প্রস্তুতি এবং অনুমানের পরিবর্তে বাস্তবতার আলোকে কাজ করা। ট্রাকারের মতে, পরিকল্পনা হলো লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও কৌশল ও দায়িত্ব সম্পন্ন করার আগে তাদের সংগঠন, ব্যবস্থাপনা প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির অনুধাবন, ব্যাখ্যাকরণ ও প্রস্তুতি। পাশ্চাত্যের পরিকল্পনাবিদ ওয়াল্টার পরিকল্পনাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন, পরিকল্পনা হচ্ছে পূর্ব চিন্তা, চিন্তার বিকাশ, চিন্তার প্রকাশ ও চিন্তাধারা, যার মধ্যে রয়েছে কী করতে ও কেন করতে হবে তার আগে চিন্তা এবং কাজের গতি ও পদ্ধতির চিন্তাধারা।

বিশিষ্ট পরিকল্পনাবিদদের সংজ্ঞার আলোকে সাধারণভাবে বলা চলে, কোনো কর্মসূচি শুরুর আগে কতকগুলো কর্মসূচি সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যে ধাপ, জনবল, সময়, অর্থ ইত্যাদি সম্পর্কে একটি সামগ্রিক আগাম ধারণা গ্রহণ করতে হয় তাই পরিকল্পনা। অন্যভাবে বলা যায়, সুনির্দিষ্ট বা পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পাদনের জন্য গৃহীতব্য কার্যাবলির ছক বা তালিকা, কর্মপন্থার রূপরেখাই হলো পরিকল্পনা। প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান তার সার্বিক উন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট চাহিদার ভিত্তিতে যে পরিকল্পনা তৈরি করে তাকেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা বলা হয়।

পরিকল্পনা হচ্ছে অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সম্পাদিত কার্যাবলির একটি সামগ্রিক এবং সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল ও সুচিন্তিত রূপরেখা। আর শিক্ষা পরিকল্পনা হচ্ছে কোনো দেশের শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সম্পাদিত সামগ্রিক কার্যক্রমের একটি সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল ও সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা বা ছক। অর্থাৎ শিক্ষা সম্বন্ধীয় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার প্রক্রিয়ার সামগ্রিক রূপরেখাই হলো শিক্ষা পরিকল্পনা। ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ফিলিপ কম্বশিক্ষা পরিকল্পনাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন, শিক্ষা পরিকল্পনা হলো কোনো শিক্ষাব্যবস্থাপনার নীতি, অগ্রাধিকার ও ব্যয় নির্ধারণে দূরদর্শিতার অনুশীলন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাটির বিকাশের সম্ভাবনা এবং দেশে শিক্ষার্থীদের চাহিদার নিরিখে তা গ্রহণ করা হয়।

শিক্ষাবিষয়ক সুষ্ঠু পরিকল্পনা ব্যতিরেকে শিক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভবপর নয়। দেশের আর্থসামজিক পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য হলো সীমিত সম্পদকে ব্যবহার করে যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে জনগণের অভাব দূরীকরণের জন্য সমাজের চতুর্মুখী উন্নয়ন সাধন, সংরক্ষণ এবং তা নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে বৃদ্ধি করা। শিক্ষা সমাজের সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে রূপান্তর করে। কোনো দেশের সামাজিক ও আর্থিক অগ্রযাত্রা সূচিত করার জন্য শিক্ষা পরিকল্পনা একান্ত দরকার। কারণ শিক্ষা পরিকল্পনায় মানব সম্পদ উন্নয়ন, সংগঠন ও সব সূচক সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত থাকে। পরিশেষে বলা যায় একটি দেশের প্রধান সম্পদ হচ্ছে সে দেশের জনগণ। এ জনগণকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে কর্মে নিয়োজিত করার মধ্যে শিক্ষা পরিকল্পনার গুরুত্ব নিহিত। বিগত এক দশকে এসব সূচক বিবেচনায় নিয়ে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে মানব সম্পদ মানব মূলধনে পরিণত হয়েছে।

শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশেও শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। শিক্ষা উন্নয়ন বাংলাদেশে জাতীয় উন্নয়নের প্রধানতম দিক হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের জাতীয় নীতি ও পদ্ধতির অধীনেই শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে শিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলো (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়) নিজ নিজ ক্ষেত্রে শিক্ষা পরিকল্পনা/প্রকল্প প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাঠানো হয়। এ কমিটির অনুমোদনের পর তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (নেক) উপস্থাপিত হয়। এ পরিষদে অনুমোদিত হলে সরকার সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করে। সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনায় শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হয়। ১৯৭৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট আটটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।

দেশে উচ্চ পর্যায়ের মানবসম্পদের চাহিদা মেটাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্ষেত্রে পাঠদানকৃত বিষয়গুলোর মধ্যে যথাযথ সমন্বয়ের ব্যাপক ঘাটতি ছিল। বিগত দশকে তুলনামূলকভাবে বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা খাতে। তথাপি শিক্ষার মান বা গবেষণার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখনো অর্জিত বা সাধিত হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমকালীন বিষয়ে স্বাধীন চিন্তাভাবনা বা মতামত প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করা হতো। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বাধীন চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যানুপাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগে পর্যাপ্ত আসন না থাকাতে বিশেষ চাপের সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদেয় সুযোগ-সুবিধার যথাযথ ব্যবহার করতে পারছেন না। আবার দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা অনেক সময় নিজেদের পছন্দমতো বিষয়ে পড়ার সুযোগ না পেয়ে এমন বিষয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছে, যাতে তার সৃজনশীলতা ও আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই উচ্চশিক্ষার মান রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য যা অর্থ বরাদ্দ করা হতো তা ইট, বালি, গাঁথনি ইত্যাদিতে ব্যয় করার ফলে অনুষদগুলোতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ সুবিধা, গবেষণা, নবতর জ্ঞান সৃজন ইত্যাদি অবহেলিত হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন শুধু এর বিল্ডিং বা ক্যাম্পাস সম্পর্কিত হওয়া উচিত নয় বরং আমাদের উচিত উচ্চশিক্ষার দ্বার যেসব শিক্ষার্থী তাদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটিয়ে গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া। উচ্চশিক্ষার মান সুদৃঢ় করা, গবেষণার ক্ষেত্র অবারিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে বিশেষ ক্ষেত্রে গবেষণা, নবতর জ্ঞান সৃষ্টি ও শিক্ষকদের বুনিয়াদি, পেশাগত ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা একাডেমি বা উচ্চতর কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উত্কর্ষ সাধনের উদ্যোগ নেয়া হবে। এজন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ করতে হবে এবং এসব উন্নয়নমূলক কাজের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে দিতে হবে। কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার উন্নয়ন, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও বিশ্বমানের গবেষণা ও পেটেন্ট নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ইউনিভার্সিটি টিচার্স ট্রেনিং একাডেমি, ন্যাশনাল রিসার্স কাউন্সিল এবং সেন্ট্রাল রিসার্স ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় উন্নতমানের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, গুণগত তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা প্রবর্তন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রেণীকক্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি, শ্রেণীকক্ষ সজ্জিতকরণ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় সংস্কার সাধন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, একাডেমিক তত্ত্বাবধান ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জিত না হলেও শিক্ষার সব স্তরে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ধারা সূচিত হয়েছে বলা যায়। তবে সার্বিক উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত ও গতিশীল রাখা গেলে তা প্রাধান্য লাভ করবে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকাল উদযাপন করছে। এর আগে গৃহীত সাতটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং দুটি দ্বিবার্ষিক অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত উন্নয়নের যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তা সার্বিক বিচারে তাত্পর্যময়। তবে বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন ফল আশানুরূপ নয় তা অনায়াসে বলা চলে। এক্ষেত্রে বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা আশু প্রয়োজন। তা না হলে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার পথ চলা দুরূহ হবে। এতে গোটা জাতি অপরিসীম ক্ষতির সম্মুখীন হবে। পরিবর্তনশীল বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ও পাশাপাশি মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য সব মহলের সহযোগিতা ও প্রচেষ্টা আবশ্যক। অব্যাহত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল গুণগত শিক্ষাকে নিশ্চিত ও সুসংহত করা যাবে। এ লক্ষ্যে এর আগে প্রণীত বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত, গ্রহণযোগ্য ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতের দিকটি বিবেচনায় রেখে উন্নত বিশ্বের আদলে শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং এর সুষ্ঠু ও সঠিক বাস্তবায়নে সরকার, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনা এখন উচ্চশিক্ষার স্তরেই সীমিত রয়েছে। এ প্রবণতা হয়তো আরো কিছুদিন চলমান থাকবে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই এসব আলোচনা আর উচ্চশিক্ষার স্তরে সীমিত থাকবে না। এ বিষয়ক অনেক তথ্যকে সাধারণ জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আমরা যদি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল বেশিমাত্রায় পেতে চাই, তাহলে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই সে সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রাসঙ্গিক আলোচনা শুরু করতে হবে। এ সম্পর্কিত জ্ঞানের আলোচনার অন্যতম প্রধান বার্তাটি হলো, জ্ঞানচর্চায় কোনো বিভাজন থাকা সমীচীন নয়। জ্ঞানের সমন্বিত চর্চা ছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল পাওয়ার কথা চিন্তা করা যায় না।

দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে নিত্যনতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ফলে উন্নয়ন কৌশল ও পদ্ধতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের অবশ্যই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক পেশার মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকল্পে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যুক্তিসংগত অনুপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের সম্মুখে শতাধিক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে যে কী গভীর সমস্যার সৃষ্টি করে, তা সহজেই অনুমেয়। এজন্য পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে ঘটে অনিবার্য বিপর্যয়। তাই শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত একটি যুক্তিযুক্ত সীমার মধ্যে রাখতে হবে, যা প্রাথমিক স্তরের জন্য ১:৩০, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের জন্য ১:৪০ এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ১:২৫-এর বেশি না হয়। প্রতি বছর বিদেশী ঋণের কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তা কতটুকু মানসম্পন্ন এবং লব্ধ প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় বা মহাবিদ্যালয় পর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে মনিটর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও দক্ষতা প্রয়োগে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে উত্তরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক বাস্তবায়িত উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পটির (২০০৮-২০১৮) একাডেমিক ইনোভেশন, রিসার্চ গ্রান্টস, ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরি আধুনিকায়ন, ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ স্থাপন ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণের ফলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে একটি শক্ত ভিত সৃষ্টি হয়েছে, যা একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক প্রণীত উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্র: ২০১৮-২০৩০-এ বিধৃত ৪১টি কর্মকৌশলের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হলে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিশ্ব পরিমণ্ডলে ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হবে এবং একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকবে।

দেশে শিক্ষা খাতে প্রকৃত অর্থায়ন পর্যাপ্ত নয় এবং প্রকৃত বরাদ্দ মোট জিডিপির ২.৫ শতাংশ। এ বছর গতানুগতিক বাজেট দিয়ে কভিড-১৯ অতিমারীর ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। করোনার কারণে সারা দেশে চার কোটির বেশি শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক শিক্ষা গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে। এর ক্ষতি ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে করোনার কারণে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়ের আয় কমে গেছে, এ শিশুরা পুষ্টি ঘাটতিতে পড়েছে। করোনার কারণে বাল্যবিবাহ ও ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। শিশুশ্রমও বাড়ছে। শিক্ষায় চলমান এ বিপর্যয় রোধকল্পে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা আবশ্যক। উপরন্তু ইউনেস্কো গঠিত দেলরস কমিশন প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাপ্ত মোট বৈদেশিক সহায়তার ২৫ শতাংশ অর্থ শিক্ষা খাতে ব্যয় করার জন্য যে সুপারিশ করেছে, বাংলাদেশকে তা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে। এ-সংক্রান্ত সুপারিশ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার সব পর্যায়ে গুণগত ও পরিমাণগত দিক সুষম ও সুসংহত হবে।

সেই সঙ্গে, শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, বিষয়ে বৈচিত্র্য আনয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নবতর জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন এবং উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিশ্বমানের গবেষণা কার্যক্রম নিশ্চিতকরণে শিক্ষা খাতে যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের কোনোই বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সুসংহতকরণে ও চতুর্থ শিল্পবিল্পবের বাস্তবায়ন কার্যক্রমকে গতিশীল রাখার জন্য জাতীয় বাজেটে উচ্চশিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করে শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিকীকরণে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও সরকার যৌথভাবে বহুমাত্রিক কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তবেই বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে সক্ষম হবে ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে শামিল হতে পারবে। শিক্ষা, গবেষণা, নবতর জ্ঞান সৃজন ও আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে এটাই হোক বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী কাল ও মুজিব বর্ষের প্রত্যাশা।

 

ড. মো. ফখরুল ইসলাম: লেখক ও গবেষক