শিক্ষা একটা জাতিকে সমুন্নত করে, মর্যাদাসিক্ত করে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়—কথাটি সত্য হলেও বাস্তবতা থেকে এর অনেক ফারাক। শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ গতানুগতিক জীবনধারা পাল্টে দিতে চায়, ভিন্ন চেতনার অধিকারী করতে চায় এমনকি অর্জিত গুণের অধিকারী করতে চায়। সে প্রক্রিয়ায় স্কুল-কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম নির্দিষ্ট মূলনীতি নিয়ে অগ্রসর হয়। যদিও শিক্ষার একটা মানবিক লক্ষ্য থাকে—মানুষের মতো মানুষ হওয়া; কিন্তু সে লক্ষ্য চাপা পড়ে যায় শিক্ষার বস্তুকরণের প্রক্রিয়ায়। পারিবারিক ও সামাজিক প্রণোদনায় শিক্ষাকে একটি মাত্র লক্ষ্যের মধ্যে সীমিত করা হয়। সেই সীমিতকরণের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দৌড় শুধু  চাকরি ও বেতনভুক্ত কর্মচারী হওয়ার মধ্যে আটকে গেছে। এ ধারায় শিক্ষাকে করা হয়েছে দারিদ্র দূরীকরণের একটা উপায়, উচ্চবিত্ত হওয়ার সিঁড়ি আর ক্ষমতা কাঠামোতে যায়গা করার একটা মিশন। উপায়গুলোকে লক্ষ্য বানানো হয়েছে বিধায় প্রকারান্তরে শিক্ষা হয়ে গেছে লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার অভিনব মাধ্যম।

অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থিক উন্নয়ন ও সচ্ছলতার সম্পর্ক থাকবে। আর সে কারণে শিক্ষাগত উন্নয়ন পেশাভিত্তিক দক্ষতা, কর্মক্ষমতার বিকাশ এমনকি কৃষি ও শিল্পের বিকাশে অবদান রাখতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভিযাত্রায় যে কর্মক্ষমতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয় তার স্বাভাবিক উদ্দেশ্য থাকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ- যাতে করে শিক্ষিত শ্রেণীকে বেকারত্ব থেকে মুক্তি দেয়া যায়, আর আর্থসামাজিক কর্মে তাদের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হয়। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে শিক্ষা কার্যক্রমের রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য থাকে—কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে জনশক্তি বৃদ্ধি করা। অশিক্ষিতদের শিক্ষিত করা আর শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান দিয়ে আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব জনগণ রাষ্ট্রের হাতে অর্পণ করে। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি বলে আমাদের দেশের বেকারত্বের হার গুণোত্তর গতিতে বাড়ছে।

আইএলওর ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে দেখানো হয় বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (প্রথম আলো, ১৮ নভেম্বর ২০১৮)। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্বের হার বেড়ে চলায় জাতীয় ও সামাজিক ভারসাম্যহীনতার সংকট বেড়ে গেছে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলছে ঠিকই, কিন্তু কর্মসংস্থান আশানুরূপ না হওয়ার পেছনে বিনিয়োগ সংকট, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নমনীয়তা ও বিদেশীদের আজ্ঞাবহতার কারণ থাকলেও এর মূল কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠমোয় আটকে আছে। আমাদের শিক্ষার হার বাড়ছে, শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে, সেই সাথে বেড়ে চলছে দুর্নীতি আর লুটপাট। আমলাতন্ত্রকে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দুর্নীতির উপকেন্দ্র বানানো হয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোকে ক্ষমতা আর বিলাসচর্চার অন্যতম উৎস বানানো হয়েছে। ব্যাংক খাতকে করা হয়েছে ঋণখেলাপি আর রাঘববোয়ালদের গোয়ালঘর, শিল্প খাতকে করা হয়েছে দাসতন্ত্র আর প্রভুত্ব চর্চার আবাসভূমি। আর এর সবই করা হচ্ছে উচ্চশিক্ষিতদের হাত দিয়ে। তাহলে এ উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে আমাদের না ভেবে উপায় কি?

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা মানে উচ্চশিক্ষা। এ উচ্চশিক্ষার মান নির্ভর করছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার মানের ওপর। স্কুল-কলেজের শিক্ষার যে প্রচলিত রীতি তাতে বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের শিক্ষিত করা হচ্ছে মুখস্থ বিদ্যার মাপকাঠি দিয়ে। স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের কাজ হলো আরোপিত পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করা, মুখস্থ করার ভিত্তিতেই রেজাল্টের মান নির্ধারিত হয়। এমনকি বিসিএস পরীক্ষাকেও মুখস্থ করার যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচার করা হয়। এর মানে ইমাইল ডুরখেইম আধুনিক শিক্ষাকে অর্জিত শিক্ষা বলে দাবি করলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়ে গেছে কাঠামোগত আরোপিত শিক্ষা। আরোপিত শিক্ষায় বইয়ে যা আছে তা আত্মস্থ করাটাই মেধার প্রকাশ মনে করা হয়। এর মানে আমাদের কাজ হলো বইয়ে যা আছে তা আমাদের মেমোরিতে জমা করা, পাওলো ফ্রেইরে এর নাম দিয়েছেন ‘ব্যাংকিং শিক্ষা’। সেই জমানোর পরে কাজ হলো পরীক্ষার খাতায় খরচ করা, খরচ করে নম্বর ক্রয় করা, সেই কেনা নম্বর বাজারে বিনিয়োগ করা, বিনিয়োগ করে চাকরি থেকে মুনাফা হাসিল করা, আবার অনেকের ক্ষেত্রে মুনাফার চক্রবৃদ্ধি (ঘুস লেনদেন) করে বিলাসের ক্ষেত্র বৃদ্ধি করা। জমা-বিনিয়োগ নীতিতেই যখন শিক্ষা চলছে তখন মানুষের শিক্ষার উদ্দেশ্যগত মৌলিক বোধশক্তি হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় সৃষ্টিশীল ক্ষমতা, হারিয়ে যায় আত্মশক্তি, নৈতিক ভিত্তি ও জীবনের লক্ষ্য। এ হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে জন্ম নেয় অনুকরণপ্রবণতা, খাপ খেয়ে চলার মানসিকতা, মাথা নত করার মনোভাব আর ক্ষমতা পেলে দমন করার উদগ্র বাসনা ও বিলাসে কাটানোর খায়েশ।

এভাবেই আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ও বিকাশের প্রক্রিয়াকে বস্তুর চার দেয়ালে বন্দি করা হয়। বস্তুর চার দেয়ালে বন্দি থেকে সে বুঝে উঠতে পারে না, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানে কী? কেন এ শিক্ষা? কীভাবে অর্জিত হবে এ উচ্চতর শিক্ষা? বিশ্ববিদ্যালয় হলো উচ্চশিক্ষার আধার, উচ্চমানের শিক্ষাচর্চার উচ্চরত ক্ষেত্র। এ শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সর্বজনীন সত্য অনুসন্ধান ও মানবীয় গুণাবলি অর্জন করা। এ চিন্তায় দার্শনিক কার্ল জেসপার (১৯৬০) বলেন, “The University is a community of scholars and students engaged in the task of seeking truth.” অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষক ও ছাত্রদের মিলনমেলা যেখানে প্রধান কাজই হলো সত্য অনুসন্ধান করা। এ সত্য অনুসন্ধানের কাজ হবে না যদি মানুষ প্রচলিত কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকে, মুখস্থ বিদ্যায় গণ্ডিবন্ধ থাকে অথবা শিক্ষাকে স্বার্থ উদ্ধারের কাজে ব্যবহার করে। উচ্চশিক্ষা মানে যদি এই হয় যে এতে বস্তুগত পুঁজি উদ্ধার হবে অথবা সার্টিফিকেট দিয়ে মর্যাদা নির্ধারিত হবে, তাহলে এটিকে আমরা বিশ্বমানের শিক্ষা বলতে পারি না।

বিশ্বমানের শিক্ষা মানে এই নয় যে ইউরোপ-আমেরিকার মানে উত্তরণ ঘটানো, আবার এই নয় যে প্রচলিত ধারায় আড়ষ্ট থাকব। উচ্চশিক্ষা মানে এমন নৈতিক, মানবীয় ও সামাজিক শিক্ষা অর্জন করা যার ভিত্তিতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সব শাখাকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায়। শুধু বিজ্ঞানের ভিত্তিতে যদি জ্ঞানের ও কর্মের জগৎ চলে তাহলে বস্তুগত উত্কর্ষ এলেও সামাজিক ভারসাম্য আসবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উচ্চশিক্ষার কাজ হলো এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণী তৈরি করা, যারা জ্ঞান গবেষণা করবে সামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক শুদ্ধতার জন্য। এজন্য দরকার মুখস্থ কালচার থেকে বেরিয়ে এসে চিন্তা বিচার বিশ্লেষণের জগতে প্রবেশ করা।

চিন্তার কাজ শুধু বিজ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ভাগ্য গড়ার দায়িত্ব আমাদের হাতে থাকে না। চিন্তা গবেষণার কাজ হবে গতিশীল, স্বাধীন ও বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত। কেননা একটা স্বাধীন জাতির অস্তিত্ব নির্ভর করে স্বাধীন চিন্তা-গবেষণার সুযোগের ওপর, স্বাধীনভাবে দেশ-জাতি পরিচালনার ক্ষমতার ওপর ও স্বাধীন কালচার নিয়ে বেঁচে থাকার সক্ষমতার ওপর। কাজটির দায়িত্ব নিতে হয় উচ্চমাপের জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ও গবেষকদের। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার কাজই হলো একটা জাতিকে এমনভাবে বিকশিত করা যাতে পরিবার থেকে রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রে স্বাধীন মতামত, স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন পরিকল্পনার সুযোগ প্রসারিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে একে অন্যকে দমন করা, অন্যের অধিকার হরণ করা ও অন্যের স্বাধীনতা কুক্ষিগত করার অপপ্রয়াস বিনষ্ট হয়।

মূলত উচ্চমাত্রার জ্ঞানী বিচক্ষণ ও চরিত্রবান বিদগ্ধ মানুষ কিছুতেই একটা দেশের একটা জাতির ভাগ্যকে পুঁজি আর পরাধীন নীতির হাতে ছেড়ে দিতে পারে না। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক শিক্ষা থেকে জন্ম হবে সুশীল রাজনীতিকের যে শিক্ষার আলোকে রাজনীতি পরিশীলিত হবে। কার্ল জেসপার সরাসরি উল্লেখ করেন “The university must be free because it acts as an intellectual conscience to the state; as such it is not a political tool but, because it speaks from a basis of knowledge, it can fundamentally affect action. It controls the state through the power of truth not of force” (Jaspers, 1960, p. 135). এর মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো মুক্ত চেতনায় বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান নির্মাণ করা, যা কিছুতেই রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হতে না পারে। বরং বিশ্ববিদ্যালয় যে সত্য হাজির করবে তা দিয়েই রাষ্ট্র চলবে, কোনো শক্তি বা ক্ষমতা দিয়ে নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে সৃষ্টি হবে নেতৃত্ব, শাসন পদ্ধতি, আমলাতান্ত্রিক গঠন প্রক্রিয়া, স্কুল-কলেজ শিক্ষার কারিকুলাম এমনকি আর্থসামাজিক সমস্যা নিয়ে গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদন ও সমাধান।

এ কারণে জেসপার বিশ্ববিদ্যালয়কে নাম দিয়েছেন “Community of thinking” , “Spiritual community”, “Locus of Ideal”; এর মানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তৈরি হবে চিন্তাশীল সম্প্রদায়, আধ্যাত্মিক সম্প্রদায় ও আদর্শের সম্প্রদায়। এ শ্রেণীর কাজ এই নয় যে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ ও নিম্নমানের ক্ষমতার জন্য অযোগ্যদের পেছনে ছোটাছুটি করা। এটা অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ হবে যখন বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সমাজের চলমান অব্যবস্থাপনাকে তোষামুদে কায়দায় প্রশংসা করবে। বরং যেকোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক এমনকি অর্থনৈতিক সংকটের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধানের দায়িত্ব নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিকামী শ্রেণীকে। সেই দায়িত্ব থেকে সরে এসে আমরা যদি উচ্চশিক্ষার বস্তুকরণ ও পণ্যকরণ করি, তাহলে সমাজের বিদ্যমান সমস্যা, অপরাধ, দুর্নীতি বাড়তেই থাকবে, কমবে না। সমাজের সমস্যা নিয়ে গবেষণা হবে উচ্চশিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। পাওলো ফ্রেইরে (১৯৯৩) এর নাম দিয়েছেন “Problem-posing education” বা সমস্যা শনাক্তকারী শিক্ষা। আমাদের উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা নয়, বরং সমাজকে প্রতিষ্ঠিত করা, জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করা। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তাই বিশ্বমানের শিক্ষার অনুশীলন হবে সমস্যা শনাক্তকরণ, সমস্যার মূলীভূত, কারণ ফলাফল উদ্ভাবন ও সমাধানের পথ দেখানো। প্রকৃত অর্থে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম, এরই নাম উচ্চশিক্ষা।

এ উচ্চশিক্ষাচর্চার স্বাধীনতা পেলেই রাষ্ট্র নিজেকে দুর্বল ভাবতে পারবে না, চাপিয়ে দেয়া বিদেশী নীতির প্রভাব কমে যাবে, প্রশাসনে দুর্নীতি আসবে নিয়ন্ত্রণে, জ্ঞানীরা থাকবেন শাসনক্ষমতায়। ফলে নিজেদের সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পররাষ্ট্র নীতি, শিক্ষানীতি, অর্থনীতির কায়দাকানুন চলবে গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে। দেশের ও জনগণের সম্পদ কাজে লাগানো হবে শিক্ষার উন্নয়নে, শিল্পায়নে, কৃষি উন্নয়নে, স্বাস্থ্য উন্নয়নে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগের গবেষণাকে কাজে লাগানো হবে প্রতিটি সেক্টরে আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত ক্ষমতায়ন হলে প্রাইমারি থেকে সর্বস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞান ও সম্পদের সুষম বিন্যাসে ক্ষমতায়ন পাবে। মূলত উচ্চশিক্ষাকে আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ও বিদেশী নীতির হাত থেকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এজন্য দরকার উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত সংস্কার। এক্ষেত্রে যেসব সংস্কার জরুরি, তার মধ্যে অন্যতম হলো ১. স্বাধীন স্বতন্ত্র উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন ২. স্বতন্ত্র উচ্চশিক্ষা কমিশনকে সহযোগিতা করবে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩. উচ্চশিক্ষা কমিশনে থাকবে ২০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চশিক্ষা কমিশনার, যারা হবেন অধ্যাপক, যাদের গবেষণার মান ও মাত্রা সবার ওপরে থাকবে, এক্ষেত্রে বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা ও ব্যবসায় অধ্যয়ন অনুষদের অধ্যাপকদের মধ্য থেকে বাছাই করা হবে ৪. উচ্চশিক্ষা কমিশনারদের নিয়োগ ও তাদের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করবে উচ্চশিক্ষা অভিভাবক পরিষদ; এ পরিষদের প্রধান থাকবেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী, যার গবেষণা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নিরপেক্ষতা থাকবে প্রশ্নাতীত। ১০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চশিক্ষা অভিভাবক পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন প্রত্যেক অনুষদের প্রথম শ্রেণীর অধ্যাপকদের মধ্যে যাদের গবেষণার মান ও মাত্রা সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্য থেকে ৫. উচ্চশিক্ষা অভিভাবক পরিষদ স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো, মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা ও উচ্চমানের গবেষণার পরিকল্পনা প্রণয়নে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নেবে ৬. উচ্চশিক্ষা কমিশনের কাজ হবে প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার প্রায়োগিক দিক যাচাই করা এবং শিক্ষণ ও গবেষণার ট্রেনিং কার্যক্রমকে মনিটরিং ও পরিচালনা করা ৭. শিক্ষা, গবেষণা ও প্রকল্পের নিমিত্তে আর্থিক বিষয়াদি দেখভালের দায়িত্বে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

উচ্চশিক্ষা অভিভাবক পরিষদ, উচ্চশিক্ষা কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন—তিন প্রতিষ্ঠান যদি মানসম্পন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, আমাদের উচ্চশিক্ষা আরো অনেক বেশি প্রগতিশীল হবে। এ নিয়ে সুস্পষ্ট গঠন প্রণালি বিনির্মাণ ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

 

ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা