উপজেলা ও তদনিম্ন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রাইমারি হেলথকেয়ারের অংশ। স্বাস্থ্যোন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা প্রদান মোটা দাগে এ ব্যবস্থার অংশ। স্বাধীনতা-পূর্বকালে আমাদের দেশে বিজ্ঞাননির্ভর চিকিৎসা মফস্বলে ছিল না বললেই চলে। সাধারণত থানা পর্যায়ে এলএমএফ ডাক্তার ও কম্পাউন্ডারনির্ভর ডিসপেনসারিই ছিল সেখানে বসবাসরত দেশের ৯০ ভাগ মানুষের অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার সুযোগ। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে থানা হেলথ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা এবং ক্রমান্বয়ে এমবিবিএস চিকিৎসক পদায়নের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রবর্তন। পাঁচ দশকের পরিক্রমায় ১০ শয্যার হেলথ কমপ্লেক্স কোথাও কোথাও ৩১ শয্যা হয়ে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে, সার্জারি, গাইনি, মেডিসিন, শিশু ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পদায়িত হয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল কলেবর বৃদ্ধি পেলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এর মূল কারণগুলো হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আর্থিক বরাদ্দের সংস্থান না করা, প্রয়োজনীয় লোকবল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রদানের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং অপ্রতুল ওষুধপত্র, সরকারি চিকিৎসকসহ সহায়ক সেবাদানকারীদের সরকারি চিকিৎসার পাশাপাশি প্রাইভেট চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হওয়া। তুলনামূলক বেশি লাভবান হওয়ায় সরকারি সেবাদানকারীরা প্রাইভেট সেবাকে শুধু অধিকতর গুরুত্ব দেয়া নয়, বরং সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার প্রাইভেট সেবালয়ে করানোর মাধ্যমে কমিশন গ্রহণ এবং সেবাদান বাবদ আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার ক্রমবর্ধমান প্রবণতায় পতিত হচ্ছে। কর্মস্থলে না আসা বা দেরিতে এসে অফিস সময় শেষ হওয়ার আগেই কর্মস্থল ত্যাগও সেবাদানে চরম অন্তরায় হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

উপজেলা হাসপাতালে সর্বজনীন ও মানসম্মত সেবাদানে আরেকটি বড় অন্তরায় হচ্ছে ব্যবস্থাপনা সমস্যা। উপজেলা স্বাস্থ্যপ্রধানের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, অর্থ ও জনবল, ক্ষমতা, সহায়তা, তত্ত্বাবধান, পদোন্নতিসহ সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে সীমিত থেকে সীমাহীন অবজ্ঞা ও অব্যবস্থাপনার ফসল হচ্ছে উপজেলা পর্যায়ে সার্বিক অব্যবস্থাপনা এবং অকার্যকর স্বাস্থ্যসেবার বহুমাত্রিক বহুদিনের পুঞ্জীভূত প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতার কারণ।

একজন মেডিকেল অফিসার, যিনি মননে, মেধায় ও চর্চায় একজন ক্লিনিশিয়ান, তাকে কোনো ধরনের মূল্যায়ন ছাড়াই আচমকা কোনো একদিন উপজেলার স্বাস্থ্যপ্রধানের কণ্টকাকীর্ণ কেদারায় শৃঙ্খলিত করা হয়। কোনোরূপ প্রশিক্ষণ ব্যতিরেকে তাকে লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য উন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রণ-নির্মূল ও হাসপাতালে বহির্বিভাগ, অন্তঃবিভাগ ও জরুরি বিভাগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা করার মতো দুরূহ কাজ শুরু করতে হয়। তার কার্য সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও অর্থ বরাদ্দে কোনো প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ ক্ষমতা নেই, তিনি এজন্য কী করণীয় তা প্রায়ই যথাযথ জ্ঞাত নন এবং এ বিষয়ে কোনো চাহিদা প্রদান করলেও তার উত্তরটুকুও তিনি প্রত্যাশা করতে পারেন না। সত্যিকার অর্থে তাকে কোনোভাবে সহায়তা বা যথাযথ তত্ত্বাবধানের কেউ নেই। তার ঠিক ওপরের ধাপের কর্মকর্তা হলেন জেলা স্বাস্থ্যপ্রধান, সিভিল সার্জন। তিনি প্রায় ঢালহীন, তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার; জেলা প্রশাসন প্রধান ডিসির সঙ্গে তুলনা করলে তিনি আর্থিক, ক্ষমতাগত সব দিক থেকে একজন নস্যি কর্মকর্তা। সুতরাং তার কাছ থেকে উপজেলার স্বাস্থ্যপ্রধানের প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া দুষ্কর; বরাদ্দ না থাকায় চাইলেই তিনি উপজেলার জন্য আর্থিক বরাদ্দ দিতে পারেন না, এমনকি সক্ষমতায় একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো প্রান্তিক পদেও নিয়োগ দিতে পারেন না। স্বাভাবিক কারণে সিভিল সার্জনের সহায়তায় উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধারাবাহিক তাত্পর্যপূর্ণ উন্নতি কদাচিৎ ঘটেছে বা ঘটে থাকে। এমনকি বিভাগীয় স্বাস্থ্যপ্রধান, পরিচালক স্বাস্থ্য ও সিভিল সার্জনের বা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অনুরূপ কিংবা তারও চেয়ে কম আর্থিক ক্ষমতা রাখেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য জাতীয় পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা নেই, যিনি সেখানকার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবেন। অনেক পরিচালক সেখানকার দায়িত্ব খণ্ডিতভাবে করেন, কিন্তু সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনে কেউ নেই। যেমন অন্যান্য পর্যায়ের মতো উপজেলার জনবল নিয়োগ পদোন্নতির খণ্ডিত দায়িত্ব পালন করেন পরিচালক প্রশাসন, তবে বেশির ভাগ কর্মকর্তার পদোন্নতি হয় মন্ত্রণালয় থেকে। হাসপাতালের কিছু খাতে অর্থ বরাদ্দ দেন পরিচালক অর্থ, আবার কিছু খাতে দেন লাইন ডিরেক্টর উপজেলা। এছাড়া পরিচালক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও লাইন ডিরেক্টর-সংক্রামক রোগ; লাইন ডিরেক্টর-অসংক্রামক রোগ; লাইন ডিরেক্টর যক্ষ্মা, কুষ্ঠ ও এইচআইভি; লাইন ডিরেক্টর-মা ও নবজাতক শিশু এবং বয়ঃসন্ধি স্বাস্থ্য, লাইন ডিরেক্টর-সিবিএইচসি, লাইন ডিরেক্টর-পুষ্টিসেবাসহ সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের নানা কর্মকর্তা ও কর্মসূচি কোনো ধরনের সমন্বয় ছাড়াই নিজ নিজ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্যপ্রধানের অজ্ঞাতে কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয়। সুতরাং একটি উপজেলার প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণীত না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বৈততা আবার কোনো কোনো প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কর্মসূচির শূন্যতা দেখা যায়। সমন্বয়হীনতা এবং জনগণের অর্থ অপচয়ের একটি বড় উদাহারণ হতে পারে উপজেলা হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধিতে সমন্বয়হীনতার চূড়ান্ত নিদর্শন; অবকাঠামো তৈরি হলো ৫০ শয্যার, কিন্তু আনুপাতিক জনবল ও পরিচালন ব্যয় বরাদ্দ যুগের পর যুগ বা কস্মিনকালেও হয়নি এমন উদাহরণ বিরল নয়। যন্ত্র আছে, কর্মকর্তা-কর্মী নেই এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি এবং এটা যে একটা বড় সমস্যা তা আমলে নেয়া হয় না দশকের পর দশক।

উপজেলা স্বাস্থ্যপ্রধানদের যেমন পদায়নের কোনো সুষুম নীতিমালা বা মানদণ্ড নেই, তেমনি পদোন্নতিরও কোনো সুষুম নীতিমালা নেই, মান যাচাইয়ের নেই কোনো প্রমাণমান পদ্ধতি। সঠিক নীতিমালা না থাকার ফলে একদিকে যেমন মানসম্পন্ন কর্মকর্তা পাওয়া কঠিন, অনুরূপ যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাসম্পন্ন কর্মকর্তারা যথাসময়ে পদোন্নতি না পাওয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দক্ষতা অর্জন, কর্মসম্পাদন ও ঈপ্সিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে। অনেক সময় দলীয়করণ ও দুর্নীতিও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মস্পৃহায় প্রতিবন্ধক হিসেবে প্রভাব রাখে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও দুর্নীতি স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা। প্রশাসনিক বিধিবিধান, ক্রয় নীতিমালা ও পদ্ধতি সম্পর্কে অপ্রতুল জ্ঞান, দীর্ঘদিন বা পুরো চাকরিকাল একই কর্মস্থলে পদায়িত থাকার সুবাদে প্রধান সহকারী, হিসাবরক্ষক, ভাণ্ডাররক্ষক ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারীদের দৌরাত্ম্য, স্থানীয় রাজনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিশেষত ঠিকাদারদের রোগী পথ্য, এমএসআর ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ে সীমাহীন দুর্নীতি প্রয়োজনীয় ও মানসম্পন্ন সেবা প্রদানে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। মানহীন ও উচ্চমূল্যে এমএসআর ও অন্যান্য সামগ্রী রোগী আরোগ্যই শুধু বাধাগ্রস্ত করে তা নয়, কখনো কখনো তা জীবন সংশয় করে তোলে। অপ্রতুল ও হীন পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য রোগ সুস্থতায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

হাসপাতালে থাকেন চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী, টেকনোলজিস্ট, ওয়ার্ডবয়, আয়া ইত্যাদি। এখানে ডিপ্লোমা, স্নাতক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সেবায় নিয়োজিত আছেন। উপজেলা পর্যায়ে স্নাতক চিকিৎসকের অপ্রতুলতা একটি চিরস্থায়ী সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে। জনসংখ্যা ও সেবা চাহিদা অনুযায়ী পদসংখ্যার ঘাটতি, নিয়মিতভাবে নিয়োগের অভাব, উচ্চতর শিক্ষার জন্য প্রেষণ, উচ্চতর হাসপতালে সেবা চাহিদা পূরণে অপরিকল্পিত বদলি, স্বজনপ্রীতি বদলি ইত্যাদি বহু কারণে আজ পর্যন্ত এ সমস্যার কোনো টেকসই সমাধান হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় স্নাতক চিকিৎসক সমস্যা অত্যন্ত প্রকট। চাকরির শুরুতেই উপজেলা বা তার নিচে পদায়িত এ স্নাতক চিকিৎসকরা নানা বঞ্চনায় জর্জরিত ও চরম অবহেলিত। তাদের চাকরি সোপান বক্র সড়কে ধাবমান, তারা জানে না তাদের চাকরিজীবনের শেষ কোথায়। বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্যাডারে শুধু স্নাতক ডিগ্রি থাকলে যেমন সর্বোচ্চ পদ যথা সচিব হওয়া যায়, চিকিৎসকদের বেশির ভাগ পদে সচিবের দুই ধাপ নিচে যুগ্ম সচিব হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির প্রয়োজন হয়। এ স্নাতক অর্জন হিমালয় চূড়ায় আরোহণের চেয়ে কম কঠিন নয়। এ ডিগ্রি অর্জনে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকায় স্নাতক চিকিৎসকরা নিজ উদ্যোগে ভর্তি হওয়ার প্রতিযোগিতায় তাদের কর্তব্যকালীন সময়কে প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করতে যাওয়ায় তাদের কাঙ্ক্ষিত কর্তব্য পালনে বিঘ্ন ঘটে। তাদের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রায় অর্ধ দশক হওয়ায় অনেকটা সময় তারা উপজেলা পর্যায়ে সেবা দেয়া থেকে দূরে থাকেন, ফলে সেবাবঞ্চিত হন রোগীরা।

উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত সেবা প্রদানের মানসে বিশেষজ্ঞদের পদ সৃজন এবং অনেক ক্ষেত্রে পদায়ন সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া যাচ্ছেনা। এজন্য একদিকে সহায়ক পরিবেশের অভাব, অন্যদিকে এ চিকিৎসকদের নিজ পদের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব ও তত্ত্বাবধান সমস্যার কারণে এটি অর্থ ও মেধার অপচয়ে পর্যবসিত হয়েছে। এমন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বহু উপজেলায় পাওয়া যাবে, যারা এক দশক পদায়িত থেকেও একটিও প্রসব করাননি বা তত্ত্বাবধান করেননি। এমন বহু সার্জন আছেন যারা দু-চার বছরেও একটি অপারেশন করেননি। এটা যে তাদের কারণে হয়েছে তা নয়; ওটি ও অজ্ঞানবিদের অভাব, সহায়ক জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাব, তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণের ঘাটতি, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য না থাকা ইত্যাদি বহু কারণে তা ঘটছে, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কেউ আছে তাও মনে হয় না।

চিকিৎসা যেহেতু একটি দলগত কর্ম, তাই সহায়ক কর্মীদের গুরুত্ব অপরিসীম। সেবিকা, ধাত্রী, টেকনোলজিস্ট, ওয়ার্ডবয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা চিকিৎসকদের পরিপূরক ও আনুপাতিক হারে তাদের বেশি সংখ্যা হওয়ার কথা। কিন্তু দেশে তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়; বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা চিকিৎসককেন্দ্রিক, চিকিৎসক সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেশি। তারপর বড় সমস্যা হচ্ছে, যে স্বল্পসংখ্যক সহায়ক সেবাদানকারী আছেন তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব প্রায়ই যথাযথ পালন করেন না। সব মিলিয়ে উপজেলা হাসপাতালের সেবার মান এতটাই অনাকাঙ্ক্ষিত যে, অনেক হাসপতালে শয্যা ফাঁকা থাকে বা অহেতুক মারামারির রোগী ভর্তি রেখে শয্যার পূর্ণতা বৃদ্ধি করা হয়। অথচ জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে শয্যার চেয়ে কয়েক গুন রোগী বেশি থাকে।

ইউনিয়নের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের জন্য আমাদের স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেই চলে; পরিবার পরিকল্পনা পরিচালিত স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে কোনো স্নাতক চিকিৎসক পদ নেই; ডিপ্লোমা চিকিৎসকরা নামকাওয়াস্তে সেবা দিয়ে থাকেন। যদিও পরিবারকল্যাণ পরিদর্শকরা পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভকালীন এবং প্রসবকালীন সেবা মোটামুটি দিয়ে থাকেন। স্বাস্থ্য বিভাগের গুটিকয়েক উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নামকাওয়াস্তে ডিপ্লোমা চিকিৎসকনির্ভর। মাঝে মধ্যে স্নাতক চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হলেও তারা কদাচিৎ সেবায় নিয়োজিত থাকেন। তাদের উপজেলা, জেলা বা ওপরের হাসপাতালে সংযুক্তি বা প্রেষণে নিয়োজিত রাখা হয়। এটা ভাবলে কষ্টকর মনে হবে, উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার একটি দেশের সাড়ে চার হাজারের ওপরে ইউনিয়নের গড়ে অর্ধলক্ষ বাসিন্দার জন্য একজন করে স্নাতক চিকিৎসক নেই।

ইউনিয়নের নিচে ওয়ার্ড পর্যায়ে ১০ হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ১৫ হাজার কেন্দ্র মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবায় নিয়ে যেতে সচেষ্ট। যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসক ব্যতিরেকে সেবা দেয়ার মতো একটি ভিত্তিভূমি সমস্যা বাদ দিলে এ কেন্দ্রগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণের ধারায় ও সুবিস্তৃত অবকাঠামো বিনির্মাণে মুকুটের মতো জাজ্বল্যমান। এ কেন্দ্রগুলোর দায়িত্বে নিয়োজিত সিএইচসিপিদের অনেকে সেবার প্যাকেজগুলোকে একটা বিশেষ পর্যায়ে নিতে সমর্থ হয়েছে। তবে এখানকার সেবাকে চিকিৎসা হিসেবে দেয়ার পরিবর্তে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণমুখী করা গেলে তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য উন্নয়নে শ্রেয়তর ভূমিকা রাখতে পারত। সিএইচসিপিদের চাকরি স্থায়ীকরণ না করাজনিত হতাশায় এ গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাটিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠকর্মী, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিদর্শকরা গত তিন দশক ইপিআই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে টিকা দিয়ে নির্মূলযোগ্য বেশ কয়েকটি মারাত্মক রোগ যেমন পোলিও, ধনুষ্টঙ্কার, হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া, হাম ইত্যাদি রোগ নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক মানের কাজ করে আসছে। তবে পদস্বল্পতা ও নিয়োগ অভাবে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এ সফল কর্মসূচিটি।

এ থেকে উত্তরণে আমাদের গৃহীত কার্যক্রম নীতিগত পরিবর্তন

উত্তর: এখনো বাংলাদেশে ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। একটি স্বাস্থ্য জাতি প্রার্থিত হলে এ গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় মাপের পরিবর্তন আনতে হবে। বিরাজিত সমস্যাগুলো সমাধানের মধ্যেই তা নিহিত আছে। স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও রোগ নির্মূল, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে বহুপক্ষীয় সংশ্লিষ্টতায় একটি সুসমন্বিত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এর জন্য দেশের স্বাস্থ্য বাজেট বাড়াতে হবে। এসেনশিয়াল হেলথ প্যাকেজ অনুসরণ করে, কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপজেলা হাসপাতাল মিলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্যাকেজ প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক্রমে পর্যাপ্ত বিভিন্ন ধাপের জনবলে সংস্থান করতে হবে। সেবাদানকারীদের পদোন্নতি ও নানা ধরনের প্রণোদনার পাশাপাশি তাদের সর্বোচ্চ সেবাদান নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্যপ্রধানদের পদকে এক ধাপ উন্নতি করে প্রশাসনিক চেইন ঠিক করতে হবে। যোগ্য কর্মকর্তা নির্বাচনের নীতিমালা প্রণয়ন ও তার চর্চা করতে হবে। তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের নির্বাচনের পর পদায়নের আগে দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ দিয়ে চৌকস কর্মকর্তায় রূপান্তর করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্যপ্রধানদের কাজ সহজ করতে তাদের একাধিক সহযোগীর পদ সৃষ্টি করতে হবে। প্রধান অফিস সহকারী, হিসাবরক্ষক, ভাণ্ডাররক্ষকদের নিয়মিত বদলির বিধান থাকতে হবে। শূন্য দুর্নীতি নিশ্চিতকরণে স্বাস্থ্যপ্রধানসহ স্থানীয় রাজনীতিক, প্রভাবশালী ও ঠিকাদারদের কঠোর জবাবদিহির মধ্য আনতে হবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের উচ্চতর শিক্ষা, যথাসময়ে পদোন্নতি, উন্নততর বাসস্থান, কর্মস্থল ও যানবাহন ব্যবস্থার পাশাপাশি শতভাগ দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্ব নিস্পৃহ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ যথোপযুক্ত ব্যবস্থা সংক্ষিপ্ত সময়ে নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা হাসপাতালে ওই পর্যায়ের জন্য প্রযোজ্য সব পরীক্ষা ও রোগীর জন্য প্রেসক্রিপশনকৃত সব ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে ইউনিয়ন পর্যায়ে। ১০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে স্নাতক চিকিৎসকদের মাধ্যমে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। মারাত্মক ধরনের রোগের চিকিৎসা উচ্চ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্তির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকে ডিপ্লোমা চিকিৎসক পদায়ন শুরু করতে হবে, সিএইচসিপিদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করতে হবে। স্বাস্থ্য সহকারীদের টিকা বিষয়ে ডিপ্লোমা প্রদানের মাধ্যমে মানসম্পন্ন টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা ও তার নিম্নে সব স্বাস্থ্যসেবা এবং সেখানে কর্মরত কর্মীদের একই পরিচালকের আওতাধীন দপ্তরের মাধ্যমে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য নিশ্চিতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে রূপান্তর করে গণমুখী জনবান্ধব গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যই উন্নয়ন, উন্নত দেশের পূর্বশর্ত স্বাস্থ্য জাতি।

 

ডা. বে-নজির আহমেদ: অধ্যাপক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর