স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে বাংলাদেশ। এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ফসল এই স্বাধীনতা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে এ দেশের মানুষকে। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর মানুষের সীমাহীন কষ্টের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা। এ দীর্ঘ সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু তার যৌবনের প্রায় ১৩টি বছর কাটিয়েছেন কারাগারে। স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় আমরা হারিয়েছি জাতির পিতাকে। ঘাতকের নির্মম বুলেট তাকে কেড়ে নিয়েছে। তার দেহের অবসান ঘটেছে মাত্র, কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন বাঙালির হূদয়ে ও সমগ্র সত্তায়। তাই স্বাধীনতা অর্জনের আবেগ এ দেশের মানুষের মাঝে এক অন্যরকম শিহরণ জাগিয়ে তোলে। বঙ্গবন্ধুর অসময়ে চলে যাওয়ার গভীর ক্ষত বাঙালির হূদয়কে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ, আদর্শ ও চিন্তা-চেতনার বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত এ দেশের মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। আমরা সব সময়ে খুঁজে বেড়াই বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের মুক্তির যে কঠিন সিঁড়িটি তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তার কতটুকু বিনির্মাণ করতে পেরেছি।

বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন। তিনি সোনার বাংলা গড়ার জন্য সোনার মানুষ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সোনার মানুষ তৈরির মূল বিষয়টি হচ্ছে শিক্ষা। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৬২-এর শিক্ষানীতি আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা ও পরবর্তী সময়ে ছাত্রসমাজের ১১ দফা এবং পরিশেষে ’৭০-এর নির্বাচন সর্বক্ষেত্রে শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা লাভের শুরু থেকেই জ্ঞাননির্ভর জাতি গড়তে চেয়েছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধুর আমলে শিক্ষাকে বেশ গুরুত্ব সহকারে গণ্য করা হয়েছে এবং বেশকিছু দৃশ্যমান উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছিল। সোনার মানুষ তৈরির কাজটি প্রাথমিক থেকে শুরু হলেও এর পূর্ণতা পায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। আর সোনার মানুষ তৈরির মূল কাজটি করে থাকেন শিক্ষকরা। উচ্চশিক্ষার গুণগত মান এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সক্ষমতা তৈরিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সঠিক মানের কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষায় যাদের গড়ে তোলা হয়, তাদের হাতেই ছেড়ে দেয়া হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের সবদিক থেকে গড়ে তোলার গুরু দায়িত্বটি। যে পর্যন্ত কোনো দেশ মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারছে না, সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার মান ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অন্যসব পর্যায়ের শিক্ষকদের চেয়ে আলাদা ভূমিকা পালন করে থাকেন কারণ একজন পরিণত মানুষকে আলোকিত করার কাজে তারা ব্রত হন। শিক্ষার্থী যেই পরিবেশ থেকেই আসুক না কেন, ও তার মননশীলতা যে পর্যায়েই থাকুক না কেন, তার মাঝে জ্ঞান, দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, সৃজনশীলতাসহ মানবিক গুণাবলির উন্মেষ ঘটিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিতে হয়। তাই উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ সবদিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি।

আমি ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে ইতালিতে অনুষ্ঠিত ‘ল্যান্ডফিল ও ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সারদিনিয়া ২০১১’-এ কারিগরি পেপার উপস্থাপনের জন্য যাই। তা ইউরোপের একটি নাম করা সম্মেলন, যা ১৯৮৭ সাল থেকে দুই বছর অন্তর অন্তর একই স্থানে নিয়মিত হয়ে আসছে। সম্মেলনের মূল বিষয়বস্তুর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের গবেষক এবং শিক্ষকরা তাদের দেশের বিদ্যমান অবস্থা তুলে ধরেন। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ বিষয়ের ওপর আমাকে বলতে হয়েছিল। ওই অধিবেশনে যোগ দিয়ে আমি দেখতে পেলাম, আমাদের সঙ্গে বিশ্বের অন্য দেশের বিস্তর পার্থক্য। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও এশিয়ার উন্নত দেশগুলো, এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় নেই বরং সর্বোচ্চ মাত্রাই নির্ধারণ করে থাকে। প্রয়োজন ও পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষক নেয়া হয়ে থাকে এবং উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিই নিয়োগ পেয়ে থাকেন। যোগ্যতাই শেষ কথা, যা সময় সময় পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে। যোগ্যতা অনুযায়ী যেমন বেতন নির্ধারণ করা হয়, তেমনি যোগ্যতা হারালে বা নির্ধারিত টার্গেট অর্জন করতে ব্যর্থ  হলে যেকোনো সময় চাকরি হারানোর ঝুঁকি থাকে। আর কোনো বিভাগে যে বিষয়বস্তুর ওপর বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, সে বিষয়ের সবচেয়ে ভালো ব্যক্তিটিই নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হবেন। অধিকাংশ দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য ন্যূনতম পিএইচডি থাকা চাই। বিষয়টি এ রকম যে, আমি যদি বার্সেলোনার মতো ফুটবল টিম গঠন করতে চাই, তবে মেসির মতো স্ট্রাইকার প্রয়োজন, তেমনি দরকার জরদি অ্যালবার মতো ডিফেন্ডার ও মার্ক আঁন্দ্রের মতো গোলকিপার। টিমে যেমন সব পজিশনে ভালো খেলোয়াড় প্রয়োজন, তেমনি একটি বিভাগে সব বিষয়ের ওপর সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন যোগ্য শিক্ষক প্রয়োজন। তবে টিমে যে কারো সক্ষমতা হারিয়ে গেলে যেমন তাকে মূল মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়ে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয় বা বেতন কমিয়ে দেয়া হয় বা নিচের কোনো ক্লাবে বিক্রি করা হয়, তেমনি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগে শিক্ষকদের যোগ্যতা ও গবেষণার ধারাবাহিকতার বিষয়টি দেখতে হবে অর্থাৎ নিজেকে সবসময় আপডেট রাখতে হবে। এর মানে হলো মান অর্জনের ক্ষেত্রে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই বিধায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই, পরিষ্কারভাবে পেশাদারিত্ব মনোভাব থাকতে হবে।

বাংলাদেশে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫১টি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৮টি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত স্বতন্ত্র নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। প্রথম দিকে নির্ধারিত যোগ্যতা পর্যায়ক্রমে উন্নত না করে বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে তা অবনমিতও করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা সমন্বয় করে একটি অভিন্ন ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণী নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়, যার ওপর ভিত্তি করে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজ নিজ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে কমপক্ষে এটি অথবা এর চেয়ে আরো অধিক যোগ্যতা নিয়ে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করবে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন তার মর্যাদা রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেয়ার অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন ঘটানো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও বিশ্ব র্যাংকিংয়ে অবস্থান দেখে আমরা এ কথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি বরং অনেক ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মানের উত্তরণ ঘটিয়ে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে একটা সম্মানজনক পর্যায়ে স্থান করে নিতে হলে আমাদের সত্যিই অনেক দূর যেতে হবে। সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি, যোগ্যতা ও চাকরির শর্তগুলো বিশ্বের সঙ্গে তাল রেখে তৈরি করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের মান-মর্যাদা, গবেষণার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও বেতন কাঠামোতেও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারকে এ বিষয়টি অনুধাবন করে তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে ‘আউট অব অব দ্য বক্স’ কাজ করতে  হবে। কেমন হতে পারে এ পরিবর্তনগুলো তার একটা ধারণা এখানে উল্লেখ করব। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার প্রথম ধাপটিই হবে সহকারী অধ্যাপক। এ পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে অবশ্যই পিএইচডি থাকতে হবে। যে বিষয়ের ওপর নেয়া হচ্ছে সে বিষয়ের ওপর ভালো মানের গবেষণার অভিজ্ঞতা, গবেষণার ধারাবাহিকতা ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ থাকতে হবে। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে ভালো ফলাফল থাকতে হবে। হতে হবে পরিচ্ছন্ন এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সুনির্দিষ্ট একটি উন্নত পদ্ধতির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে নিয়োগ প্রদান করতে হবে। বেতন কাঠামো হবে ভিন্ন প্রকৃতির, যা বর্তমানে বিদ্যমান গতানুগতিক বেতন কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তবে বেতন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হবে চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ চাকরি হবে চুক্তিভিত্তিক, যা প্রাথমিকভাবে তিন বছরের মতো। সুনির্দিষ্ট অর্জনের অঙ্গীকার থাকবে চুক্তিনামায়। বছরে কয়টি ভালোমানের পাবলিকেশন করতে হবে, কতজন পিএইচডি গবেষককে সুপারভাইজ করতে হবে ও কতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গবেষণার ফান্ড আনা। কেবল তা অর্জিত হলেই শিক্ষক হিসেবে ওই ধাপে থাকার মেয়াদ বাড়ানো যাবে ও ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে। গবেষণায় উত্কর্ষসহ ভালো প্রকাশনা, পেটেন্ট অর্জন ও কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য তাকে পুরস্কৃত করার সুযোগ থাকবে। বেতন ও সুযোগ-সুবিধাও বেড়ে যাবে এবং পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সময়ও কমিয়ে নিয়ে আসা যাবে। আর কেউ যদি প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন ও অঙ্গীকার পালন করতে ব্যর্থ হন, তবে তাকে যেকোনো সময় চাকরি থেকে বিদায় করা যাবে। তবে যদি তিনি উন্নতি ঘটানোর অঙ্গীকার ও সময়প্রার্থনা  করেন, সেক্ষেত্রে উন্নতির জন্য নির্ধারিত সময় দিয়ে একবার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেয়া যেতে পারে। শিক্ষকতার পরবর্তী ধাপগুলোতেও এ রকম যুগোপযোগী শর্ত সংযুক্ত করে সম্পূর্ণ যোগ্যতা ও গবেষণায় সাম্প্রতিক অর্জনের ভিত্তিতে একটি সুস্পষ্ট এবং নির্ধারিত শর্তে নিয়োগ প্রদান করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের এ প্রথম ধাপটি হবে যেকোনো বিচারে স্বচ্ছ ও পক্ষপাতবিহীন। একটি বিভাগ বা ইনস্টিটিউটে কতজন শিক্ষক কোন কোন ধাপে থাকবে এবং কোন কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবেন তাও যুক্তিসংগতভাবে সবকিছু বিবেচনায় এনে নির্ধারণ করা থাকবে, যা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা গোষ্ঠীস্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হবে না। যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি যেকোনো সময় নিয়োগ লাভের জন্য আবেদন করতে পারবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করতে পারবে। এখানে বিচার্য বিষয় হবে প্রয়োজন ও যোগ্যতা। আবেদনগুলোর প্রাথমিক বাছাইয়ের পর শুধু শর্টলিস্টেড প্রার্থীকে সিলেকশন বোর্ডে ডাকা হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন কেউ বোর্ডে থাকতে পারবে না। প্রার্থীর পিএইচডির  সুপারভাইজারও বোর্ডে থাকতে পারবে না। শুধু তা-ই নয়, কোনো প্রার্থী যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বশেষ ডিগ্রি অর্জন করেছে, তারা অন্য প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে পাঁচ বছর চাকরি করার পর নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়ার আবেদন করতে পারবে, এর আগে নয়।

পুরো পরিকল্পনায় সফলতা আনয়নের লক্ষ্যে স্নাতক ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে টার্মিনাল ডিগ্রি হিসেবে গণ্য করতে হবে। এটি সহজেই করা যায়। কারণ শিক্ষকতা আর গবেষণা ছাড়া অন্য চাকরির প্রথম ধাপে স্নাতক যথেষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ে  গবেষণা কার্যক্রম চলমান রাখা, ভবিষ্যতের শিক্ষক তৈরি ও স্নাতক সম্পন্ন করা মেধাবী শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার স্বার্থে মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি এবং পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় সম্মানজনক ফেলোশিপ চালু করতে হবে। তবে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের সংখ্যাটা হবে সীমিত ও প্রতিযোগিতামূলক। ফেলোশিপের পরিমাণ এমন পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে যাতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের গবেষকরা আর্থিকভাবে কোনো সংকটে না থেকে নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে গবেষণায় মনোনিবেশ করতে পারেন। এ ফেলোরাই অনেকে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে বিভাগে কাজ করবে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে থেকে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে সহায়তা করবেন। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে তাদের থাকার জন্য ভালো ব্যবস্থা করতে হবে, যেন ইচ্ছা করলে গবেষকরা থাকতে পারেন। গবেষণার জন্য যে গবেষণাগারের প্রয়োজন হবে তাতে সরকার বা বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী কর্তৃক অর্থায়ন ও সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিংও বটে। কারণ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রমের ক্রম-উন্নয়নই পারবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মতভাবে গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি করতে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে পৌঁছতে পারবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও গবেষণায় উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। সংকটকালীন সময়ে এ অক্ষমতা আরো বেশি নজরে আসে। করোনাকালীন সময়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উল্লেখ করার মতো মৌলিক কোনো গবেষণার আউটকাম নেই, অথচ এই দেশে প্রায় ৪৩ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা স্তরে রয়েছে। এ ব্যর্থতা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয় বরং এ থেকে উত্তরণের সঠিক পথ খোঁজা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টেকসই গবেষণা-সংস্কৃতি চালু করা প্রয়োজন, যা একমাত্র সম্ভব  স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ধারাবাহিক গবেষণা, যা নিশ্চিত করার জন্য দরকার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গবেষণা কার্যক্রম ও নিয়মিত গবেষকদের উপস্থিতি এবং আনন্দদায়ক অংশগ্রহণ। এর জন্য প্রধানত প্রয়োজন মানসম্মত দক্ষ শিক্ষক, যারা তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ও যোগ্যতা দিয়ে নবীন গবেষকদের আকৃষ্ট করতে পারবেন।

 

ড. মুহাম্মদ আলমগীর: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন