শিক্ষার গুরুত্ব যদি জাতির মেরুদণ্ডকে সোজা করা বোঝায় তাহলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সে দায়িত্ব পালন করে সবচেয়ে বেশি। কারণ একটি জাতির ২০ শতাংশেরও কম মানুষের ভাগ্যে উচ্চশিক্ষা নেয়ার সুযোগ থাকে। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে সুশিক্ষিত হতে পারলে সে দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়া যায়। তাই বলা যেতে পারে, মাধ্যমিক শিক্ষাই হচ্ছে জাতির মেরুদণ্ড সোজা করার শিক্ষা। সেই মাধ্যমিক শিক্ষা ইংরেজদের সময় থেকে অবহেলিত। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর হলো। এ ৫০ বছরেও ঠিক করা গেল না মৌলিক অধিকারের দিক থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা কতটা গুরুত্বের দাবি রাখে। ঔপনিবেশিক শাসকরা ছিল ফ্যাসিস্ট, কর্তৃত্ববাদী। তাদের নীতি জাতি, রাষ্ট্র বা মানুষের কল্যাণের জন্য নয়, এ দেশ থেকে সম্পদ লুণ্ঠন করার জন্য। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও ঔপনেবিশিক আমলে এ চরম সত্য প্রতিফলিত হয়েছে বারবার এবং শিক্ষার বিষয়ে তাদের আলসেমি ধরা পড়েছে। ইংরেজ সরকার ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট আইনের মাধ্যমে জনগণকে শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে, তাতে ছিল না কোনো শিক্ষানীতি, ফলে বিশাল জনগোষ্ঠী শিক্ষাদানের আওতার বাইরে ছিল। শিক্ষার মাধ্যম কী হবে সেটিও ছিল ঘোলাটে। ১৮৩৫ সালের দিকে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা শুরু হলো শহরে। ১৮৫৫ সালের পর থেকে গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। উপাধি লাভের আশায় জমিদার ও ধনী ব্যক্তিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে থাকেন আর নামমাত্র বেতনে শিক্ষক নিয়োগ করেন। সরলমনা মানুষদের ‘শিক্ষকতা একটি মহান পেশা’ জাদুমন্ত্রের মাধ্যমে শিক্ষাদানের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়, যার পরিবর্তন আজও সেভাবে হয়নি। মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় ৯৭ শতাংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রিত হয় এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামোর দ্বারা, যা কয়েক বছর পরপর সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ ২৯ মার্চ ২০২১ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৩ ধরনের স্কুল ও কলেজ এমপিওভুক্তির নীতিমালা জারি করেছে, যেখানে বেশকিছু নতুন বিষয় সংযোজন করা হয়েছে। এতে বেশ কয়েকটি প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। দেশের প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও নামক রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সুবিধার আওতাভুক্ত। এতে পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে মূল স্কেলের সমান বেতন পান। এর আগে ২০১৯ সালের অক্টোবরে সরকার আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে। তখন ঘোষণা ছিল, নীতিমালা হালনাগাদ করে ফের এমপিওভুক্তির আবেদন নেয়া হবে। এ বছর এমপিওভুক্তির নাীতিমালা হালনাগাদ করা হলো। এতে কিছু কিছ বিষয় ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য তবে, কিছু সিদ্ধান্ত পুনরায় চিন্তা করার দাবি রাখে।

আগে ১০ বছর সহকারী শিক্ষক আর পাঁচ বছর সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও কেউ প্রধান শিক্ষক হতে পারতেন না শুধু ১২ বছরের সহকারী শিক্ষকের অভিজ্ঞতা নেই এমন বাধার কারণে। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ন্যূনতম তিন বছরের সহকারী প্রধানসহ ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করা যাবে। ডিগ্রি ও অনার্স কলেজে অধ্যক্ষ পদে প্রায় একই ধরনের শর্ত রয়েছে। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তিন বছর কর্মরত থাকতে হবে। সব মিলিয়ে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা লাগবে। তবে শিক্ষাজীবনে একটি করে তৃতীয় শ্রেণীকে গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। এমপিওভুক্ত সহজীকরণের জন্য চারটির পরিবর্তে শর্ত তিনটি আরোপ করা হয়েছে। যেমন শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী সংখ্যা ও পাসের হার। আগে প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির মেয়াদের ওপর ২৫ নম্বর ছিল। সেটি আর নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ছাত্র সংখ্যায় কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। আর উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের প্রভাষকরা এমপিওভুক্তির আট বছর পূর্তিতে মোট প্রভাষকের মোট পদের ৫০ শতাংশ মূল্যায়নের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদে পদোন্নতি পাবেন। এমপিও নীতিমালায় ১০ বছরের সহকারী শিক্ষকের যোগ্যতায় সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ দেয়া হলেও প্রধান শিক্ষক পদের জন্য তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ ১২ বছরের সহকারী শিক্ষক পদে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। তাই সহকারী প্রধান শিক্ষকরা তিন বছর কর্মরত থাকার পরও প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়ে এমপিওভুক্ত হতে পারছেন না। কারণ ১০ বছর সহকারী শিক্ষক হসেবে কর্মরত থাকার পর নীতিমালা অনুসারেই সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়েছিলেন তারা। তাই প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে সহকারী শিক্ষক পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে এবং শিক্ষার মনোন্নয়ন ব্যাহত হবে বলে শিক্ষক নেতারা মনে করেন।

শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন সময়ে নেয়া পদক্ষেপগুলো ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছে। তবে নীতিমালা তৈরির সময়ে শিক্ষক, পরিবেশ-পরিস্থিতি, শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাবলি এবং সেগুলো সমাধানের বাস্তব ও প্রকৃত শিক্ষাবান্ধব পদক্ষেপগুলো এবং সর্বোপরি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বহু বছর ধরে ছিল ৩১৭। এ নিয়ে কারো যেন কোনো চিন্তা ছিল না। অর্থাৎ মাধ্যমিক শিক্ষা বেসরকারি খাতেই চলতে থাকবে। তবে বেসরকারি শিক্ষক সংগঠনগুলো পুরো মাধ্যমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে বহুদিন। বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বেশ গুরুত্বের সাথেই নিয়েছে, যার জন্য দেশে ৬৫ হাজার ৬৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুরোপুরি সরকারি। তবে মাধ্যমিকে উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ করে যেসব উপজেলায় কোনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না সেসব উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারি করায় এখন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৮৩। অর্থাৎ এখনো পুরো মাধ্যমিক শিক্ষার ৩ শতাংশের কাছাকাছি সরকারি বিদ্যালয় বাকি ৯৭ শতাংশ বেসরকারিভাবেই চলছে। তবে মাধ্যমিকের একটি বিরাট অংশ এমপিও নামক রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। তার পরও শিক্ষকতা চাকরিতে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে পদসোপান একেবারেই আকর্ষণীয় নয়। ফলে অনেক মেধাবীরা এ পেশায় আসতে চান না, এলেও থাকতে চান না এবং থাকেন না। শিক্ষার এ দুটো স্তরেই বিশেষ দৃষ্টি প্রয়োজন। তা না হলে শিক্ষকতাকে একটি আকর্ষণীয় পেশায় পরিণত করা যাবে না। এ অবস্থার মধ্যে সরকারি মাধ্যমিকে একটি আনন্দের সংবাদ হচ্ছে যে ‘জ্যেষ্ঠ শিক্ষক’ বা সিনিয়র টিচার পদ সৃষ্টি করা । সরকারি মাধ্যমিকে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে মোট পদের অর্ধেক শিক্ষক এ পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। এটি প্রথম শ্রেণীর পদ। এ পদে কর্মরত শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের নবম গ্রেডে বেতন পাবেন। প্রথমবারের মতো এ পদ সৃষ্টি করে তাতে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। এ পদে সারা দেশের ৫ হাজার ৪০৬ জন শিক্ষক এবার পদোন্নতি পেয়েছেন। বর্তমানে যে বিষয়টি প্রচলিত আছে তা হচ্ছে জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এন্ট্রি পদে চাকরিতে ঢুকে শিক্ষকরা ক্রমান্বয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পান। এর মাঝখানে কোনো পদ ছিল না, পদোন্নতির সুযোগ খুবই সীমিত। মাত্র ৪-৫ শতাংশ শিক্ষক পদোন্নতির সুযোগ পেতেন, এখন সেটি দূর হলো।

সরকারি আর বেসরকারি মাধ্যমিকের সর্বস্তরেই শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পরীক্ষায় পাস করা আর মেধা ও প্রকৃত জ্ঞানচর্চার মধ্যে যে আসলেই বড় পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তার প্রমাণ আমরা দেশে ও পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই দেখতে পাই যে, যারা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত তাদের অনেকেরই একাডেমিক রেকর্ড খুব একটা উজ্জ্বল নয়। তারা জীবনে কিছু করতে চেয়েছিলেন, করতে চেয়েছেন এবং করতে পেরেছেন। বহু মানুষের জন্য এবং দেশের জন্য তারা কিছু একটা করেছেন। কিন্তু যারা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য ভালো ছাত্র হিসেবে, নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিলেন, তারা শুধু জীবনধারণের জন্য একটু চাকরির ব্যবস্থা করেছেন, চারদিকের মানুষের জন্য খুব বেশি কিছু করতে পারেননি। এটি থাকবে, আছে। সবাই সবকিছু করবেন না। এটিই নিয়ম। কিন্তু তাই বলে যারা প্রচলিত পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে তাদের মেধা নেই এটি কি বলা যাবে? শিক্ষার্থীদের ভেতরকার মেধার খবর জানা এবং সেটি কোনদিকে ধাবিত হতে চায় সেটি জানা হচ্ছে মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন। এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু সফল একজন শিক্ষকের সেটি পারা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের বিচার করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এটি তিন বছর বা পাঁচ বছর পর হঠাৎ একটি ২ বা ৩ ঘণ্টার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বিচার করা সবসময়ই যুক্তিযুক্ত হয় না। তার পরও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমাদের এটির ওপরই নির্ভর করতে হয়। তবে রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা যা-ই হোক, যেভাবেই হোক একজন প্রকৃত শিক্ষক কিন্তু তার শিক্ষার্থীদের গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের লুক্কায়িত প্রতিভা আবিষ্কার করতে পারেন যেটি হচ্ছে প্রকৃত মূল্যায়ন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে দেশের কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেখানকার শিক্ষকদের মধ্যেও আলাদা এক ধরনের ‘মোটিভেশন’ তৈরি হয়। তারা প্রতিষ্ঠানে আলাদা এক পজিটিভ কালচার তৈরি করেন। ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে দু-চারজন শিক্ষক যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি হয়ে যেতে পারেন, তারা সেখানে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে শিখে যাওয়া পজিটিভ কালচার অনেকটা চালু করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে একটি হতে পারে যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পারফর্মিং কমিটি যদি তাদের প্রতিষ্ঠান আসলেই ভালো করতে চান এবং ভালো পারফর্ম করা কমিটিও যদি চান যে দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের মতো হোক, তাহলে তারা মিউচুয়ালি সেটি করতে পারেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার কিংবা জেলা শিক্ষা অফিসারকে বিষয়টি অবহিত করে। অর্থাৎ শিক্ষার মান, প্রতিষ্ঠানের মান বাড়ানোর জন্য বেসরকারি শিক্ষকদের জন্যও বদলি পদ্ধতি চালু করা উচিত।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক তিন স্তরের মধ্যে মাধ্যমিকের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ স্তরের জন্য একাধিক প্রকল্পসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে মাধ্যমিকে। ২০১৯ সালের ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী মাধ্যমিক লেভেলে ২০১৮ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ, ২০১৭ সালে এটি ছিল ৩৭ দশমিক ৮১ শতাংশ, ২০১৬ সালে ছিল ৩৮ দশমিক ৩০ এবং ২০১৫ সালে ছিল ৪০ দশমিক ২৯ শতাংশ। ঝরে পড়ার হার কমছে, কিন্তু আশাব্যঞ্জক নয়। আর তিন স্তরেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ঝরে পড়ছে বেশি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষা বিস্তার ও উন্নয়নে সরকার বৃত্তি, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণসহ নানা সুবিধা বাড়িয়েছে। ২০১৯ সালে ২ হাজার ৭৩০টি মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষকদের চাকরির স্থায়িত্ব, অর্থিক সুবিধা ও পেশার প্রতি মর্যাদা বাড়ানো হয়েছে। তার পরও কেন এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে মাধ্যমিকে, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ই এমপিওভুক্ত। কিন্তু শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। এছাড়া দুর্বোধ্য করে রাখা হয়েছে পাঠ্য বইয়ের বিষয়বস্তু। দুর্বোধ্য সৃজনশীল নিয়ে রয়েছে ঝামেলা। এ আনন্দহীন শিক্ষায় স্কুলে শুধু পড়া দেয়া হয় আর পড়া নেয়া হয়, এছাড়া শিক্ষাদান বলতে যা বোঝায় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হচ্ছে না। তার প্রমাণ হচ্ছে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তসহ সব ধরনের শিক্ষার্থীদের কোচিং, প্রাইভেট, টিউশন, গাইড ও নোট বইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা। মাঝে মাঝে সরকার হাঁকডাক শুরু করে যে নোট-গাইড সব বন্ধ করা হবে। অর্থাৎ তাতেই যেন সব সমস্যার সমাধান। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বেতন আসে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের খরচ অনেকটা কম। তবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কিনে নিতে হয় টিউশন, কোচিং আর নোট-গাইড থেকে। তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অবদান কতটুকু? শুধু বোর্ডের সার্টিফিকেট নেয়ার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া তো আর তেমন কিছু নেই। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেছেন, ‘মেয়েদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে বাল্যবিবাহ ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। তবে সার্বিকভাবে বলতে গেলে শিক্ষা ব্যয় ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে শিক্ষার্থীরা ঝরে যাচ্ছে। স্কুলে হয়তো বিনামূল্যে সবাই বই পাচ্ছে, কিন্তু এর পরের খরচের কী হবে?’ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা শিক্ষায় একটা বড় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। কারিকুলামে বড় পরিবর্তন আসছে। আমরা শিক্ষাকে জীবনমুখী করতে চাই। এজন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া মাধ্যমিক স্তরেও কারিগরি শিক্ষা যুক্ত করা হচ্ছে। এতে পড়ালেখার পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজ শিখতে পারবে শিক্ষার্থীরা। তাদের মাধ্যমিক শিক্ষা শেষেও চাকরির নিশ্চয়তা থাকবে। ফলে ঝরে পড়া অনেকাংশেই কমে যাবে।’’ একজন শিক্ষার্থী কী পড়বে, কে পড়াবে, কোথায় পড়বে, কতদিন পড়বে, কীভাবে পড়বে, শিখনসামগ্রী কেমন হবে, কী ধরনের শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি নির্দেশনার সমষ্টিতে শিক্ষাক্রম প্রণীত হয়। একটি শিক্ষাস্তর সমাপ্ত করে একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণিক স্তর কী হবে তা আগেই নির্ধারিত করে নিতে হয়। এ সবকিছুই শিক্ষাক্রমের অন্তর্গত। জাতীয় চাহিদার ভিত্তিতেই একটি দেশে শিক্ষাক্রম গড়ে ওঠে আর জাতীয় চাহিদার মূলে থাকে জাতীয় জীবনদর্শন। অতএব বলা যায়, একটি জাতির জীবনদর্শনের মধ্যেই সে জাতির শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাক্রমের কাঠামো ও প্রকৃতি নিহিত থাকে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এগুলোর চেয়ে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে পরীক্ষা বা মূল্যায়ন এবং গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়। আর তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয়, অভিভাবক সবাই মিলে পরীক্ষায় কী আসবে, কীভাবে উত্তর লিখলে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে ইত্যাদি বিষয় নিয়েই বেশি ব্যস্ত। শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য শিক্ষার্থীর সামগ্রিক জীবনের বিকাশ সাধন, পক্ষান্তরে পাঠ্যসূচি শিক্ষার্থীর একটি বিশেষ দিকের বিকাশ সাধন করে। শিক্ষার্থীদের অর্জন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে শিখন-শেখানো কার্যক্রম ও মূল্যায়নে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। এ সবকিছুর মূলে রয়েছে মানসম্পন্ন শিক্ষক। আমেরিকার এক গবেষণায় দেখা যায়, মানসম্মত শিক্ষার ২০ শতাংশ নির্ভর করে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার ওপর। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষার শতকরা ৮০ ভাগ নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। একজন যোগ্য শিক্ষক গাছতলায় বসেও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন। তার মানে হচ্ছে, প্রকৃত শিক্ষকরা সমাজকে পরিবর্তন করতে পারেন। সেই পরিবর্তনের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি করা একান্তই প্রয়োজন। ইউনেস্কো কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের শিক্ষার মান ২ দশমিক ৮ শতাংশ, ভারত ও শ্রীলংকায় ২০ দশমিক ৮ ও পাকিস্তানে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের সাথে খাপ খাওয়াতে হলে আমাদের শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতেই হবে।

 

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক