বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি এ দেশের জাতীয় অর্থনীতির জীবনী শক্তি। বর্তমানে দেশজ শ্রমশক্তির ৪২ দশমিক ৬২ শতাংশ কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত। কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্যও ঈর্ষণীয়, মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। যদিও দিন দিন কৃষিজমির পরিমাণ কমেই চলেছে, বাড়ছে জনসংখ্যা। কিন্তু উৎপাদনশীলতার ঊর্ধ্বগতিতে থেমে নেই বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী, চাল, সবজি ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় হলেও রফতানিতে বিশ্বে প্রথম, আলু উৎপাদনে সপ্তম, আম উৎপাদনে সপ্তম, ফল উৎপাদনে দশম এবং সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, বিশ্বে যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয় তার ৮৬ শতাংশই হয় এ দেশে।

বাংলাদেশের ইতিহাস একসময় খুবই মর্মাহত ছিল। সদ্য স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জমির পরিমাণ বর্তমান সময়ের চেয়ে অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য উৎপাদিত খাদ্য পর্যাপ্ত ছিল না। মানুষ না খেয়ে রাত যাপন করত। আর বর্তমানে আবাদি জমির পরিমাণ আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৭ কোটি হলেও দেশে উদ্বৃত্ত খাদ্যের মজুদ রয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে খাদ্য উৎপাদন কয়েক গুণ। এভাবে কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করে। আর এ অভাবনীয় সাফল্য রাতারাতি ঘটেনি। এর পেছনে রয়েছেন কৃষক, কৃষিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণবিদদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সরকার কর্তৃক যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত।

কৃষি গবেষণায় এ সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছতে অবদান রেখেছে এবং রাখছে দেশের বিভিন্ন কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন সংস্থা। আর এদের মধ্যেই অনন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বোচ্চ কৃষি বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়টি মানসম্পন্ন উচ্চতর কৃষিশিক্ষা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা বিধানের মাধ্যমে দেশে কৃষি উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব বহনে সক্ষম তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কৃষিবিদ, প্রাণী বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও কৃষি প্রকৌশলী তৈরি করে যাচ্ছে। কৃষি উন্নয়ন ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৃষি খাতে উদ্ভাবন ও নতুন জাত তৈরি করেছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা এবং তাদের অধিকাংশই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শস্যের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এগুলোর মধ্যে বাউকুল, উফশী সরিষা জাত, সয়াবিন জাত, আলুর জাত, মুখিকচুর জাত, কলা ও আনারস উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তি, রাইজোবিয়াম জৈব সার উৎপাদন প্রযুক্তি, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সয়েল টেস্টিং কিট, পেয়ারা গাছের মড়ক নিবারণ পদ্ধতি, বীজের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সহজ পদ্ধতি, শুকানো পদ্ধতিতে বোরো ধান চাষ, পশুখাদ্য হিসেবে ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধির কলাকৌশল, আফ্রিকান ধৈঞ্চার অঙ্গজ প্রজনন, এলামনডা ট্যাবলেট, আইপিএম ল্যাব বায়োপেস্টিসাইড, বিলুপ্তপ্রায় শাকসবজি ও ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও মলিকিউলার বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণ কলাকৌশল, হাঁস-মুরগির বিভিন্ন প্রতিষেধক টিকা উৎপাদন, রোগ সহজেই শনাক্তকরণে মলিকিউলার পদ্ধতির উদ্ভাবন, রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি, কমিউনিটিভিত্তিক উৎপাদনমুখী ভেটেরিনারি সেবা, গবাদিপশুর ভ্রূণ প্রতিস্থাপন, মাছ ও প্রাণীর কৃত্রিম প্রজনন, কৃত্রিম প্রজননে ব্যবহূত ষাঁড়ের আগাম ফার্টিলিটি নির্ণয়, হরমোন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাণীর গর্ভ নির্ণয়, সুষম পোলট্রি খাদ্য, গোখাদ্য হিসেবে খড়ের সঙ্গে ইউরিয়া-মোলাসেস ব্লক ব্যবহার, হাঁস-মুরগির উন্নত জাত উৎপাদন এবং কলাকৌশল, মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানী গবেষণা তত্পরতার মাধ্যমে টেকসই শস্যবীমা কার্যক্রম, ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রমের উন্নয়ন, পশুসম্পদ উপখাত ও ডেইরি উৎপাদনের উন্নয়ন, স্বল্প ব্যয়ে সেচনালা তৈরি, উন্নত ধরনের লাঙল ও স্প্রে মেশিন, বাকৃবি জিয়া সার-বীজ ছিটানো যন্ত্র, সোলার ড্রায়ার, উন্নত ধরনের হস্তচালিত টিউবয়েল পাম্প, জ্বালানি সাশ্রয়ী উন্নত মানের দেশী চুলা, ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি, খাঁচায় পাঙ্গাশ চাষ, পেরিফাইটন বেজড মত্স্য চাষ, ডাকউইড দিয়ে মিশ্র মত্স্য চাষ, মাছের জীবন্ত খাদ্য হিসেবে টিউবিফিসিড উৎপাদনের কলাকৌশল, পুকুরে মাগুর চাষের উপযোগী সহজলভ্য মত্স্য খাদ্য তৈরি, শুক্রাণু ক্রয়োপ্রিজারভেশন প্রযুক্তি, স্বল্প ব্যয় মিডিয়ামে ক্লোরেলার চাষ, মাছের পোনা পালনের জন্য রটিফারের চাষ, মাছের রোগ প্রতিরোধকল্পে ঔষধি গাছের ব্যবহার এবং মলিকিউলার পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছের বংশ পরিক্রম নির্ণয়, ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ, নিরাপদ মাছ উৎপাদন, বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজনন, সহজলভ্য মাছের খাদ্য তৈরি, অ্যাকোয়াপনিক্সের মাধ্যমে মাছ ও সবজি একসঙ্গে উৎপাদন, হিমায়িত ভ্রূণ থেকে ভেড়ার কৃত্রিম প্রজনন, ইলিশের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন, ডেঙ্গু ভাইরাসের সিরোটাইপ নির্ণয়ের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

বাকৃবিতে আছে সাড়ে ১১ হাজার ফল ও মসলার প্রজাতি নিয়ে তৈরি জার্মপ্লাজম সেন্টার, যা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগ্রহশালা। গবেষণার এ বিশাল সাফল্যে অর্জিত হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয় বা বাইরের সংস্থার অর্থায়নে কোনো সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রকল্প গবেষণা। গবেষণা প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বাকৃবিতে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম, যা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে এখানে রয়েছে গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (জিটিআই), এছাড়া দক্ষ কৃষিবিদ তৈরিতে ও কৃষিবাজার ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে ইনস্টিটিউট অব এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, খাদ্যনিরাপত্তায় চালু হয়েছে ইন্টারডিসিপ্লিনারি ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটি। এছাড়া দেশের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও হাওরাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে গবেষণা শুরু করেছে এখানকার হাওর ও চর উন্নয়ন ইনস্টিটিউট। খাদ্যে ক্ষতিকারক পদার্থ শনাক্তকরণ এবং পুষ্টিমান নির্ণয়ের জন্য রয়েছে গবেষণাগার। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরিতে রয়েছে, যেখানে সিকোয়েন্সার মেশিনসহ অনেক অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহূত হচ্ছে।

খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় কৃষিতে স্থানীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করতে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্য ও ফলের জাত উদ্ভাবন, নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নানামুখী জাত উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। অতিসম্প্রতি উদ্ভাবিত হয়েছে ব্লাস্ট প্রতিরোধী বাউ-ধান-৩। চলমান রয়েছে দেশী-বিদেশী অর্থায়নে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প। গতানুগতিক কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া করোনা শনাক্তকরণ ও জিনগত বৈশিষ্ট্য নিরূপণে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাথে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

কৃষিশিক্ষার এ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জায়গা করে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ র্যাংকিং হিসেবে স্বীকৃত টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে এবার ১০০০ থেকে ১২০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে এবং বিষয়ভিত্তিক (লাইফ সায়েন্স) র্যাংকিংয়ে (৬০১ থেকে ৮০০-এর মধ্যে) দেশসেরা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বিশ্ববিদ্যালয় বৈদেশিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর সাথেও যৌথ উদ্যোগে গবেষণা পরিচালনা করে নিরলসভাবে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কৃষির বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করার জন্য রয়েছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষক। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও পর্যাপ্ত গবেষণা বরাদ্দ পেলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়টি খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার স্থানীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পারবে।

 

ড. মো. সহিদুজ্জামান: অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়