‘আমাদের রাস্তায় আমাদের গাড়ি’ স্লোগানে ২০১৭ সালে দেশে মালয়েশিয়ার প্রোটন ব্র্যান্ডের গাড়ি সংযোজন শুরু করে পিএইচপি অটোমোবাইলস। একের পর এক নতুন গাড়ি যুক্ত হয়ে পিএইচপির কারখানায় এখন প্রোটন সাগা এমসি ও পারসোনা মডেলের গাড়ি সংযোজন হচ্ছে। নতুন করে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল বা এসইউভি ক্যাটাগরির গাড়ি সংযোজনের। দেশের অটোমোবাইল শিল্পের এগিয়ে চলা ও সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন পিএইচপি অটোমোবাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আকতার পারভেজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান রাশেদ এইচ চৌধুরী

দেশেই গাড়ি তৈরির ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ দৃশ্যমান। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের চিন্তা কিংবা পদক্ষেপ কতটা উপযোগী?

উন্নত বিশ্বের দেশ যেমন জাপান, জার্মান, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো যারা আছে তারা নিজেরা নিজেদের গাড়ি প্রস্তুত করছে এবং রফতানি করে বেশ বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করছে। এমনকি মালয়েশিয়ায়ও প্রোটন গাড়ি নিজেরা উৎপাদন করছে। অথচ ১৯৮৩ সালেও মালয়েশিয়ায় প্রোটন আমাদের মতোই অ্যাসেম্বল দিয়ে শুরু করেছিল। মিত্সুবিশির সঙ্গে তখন জয়েন্ট কলাবরেশনে কুয়ালালামপুরে ফ্যাক্টরি স্থাপন করে এবং জাপান থেকে স্পেয়ার পার্টস নিয়ে অ্যাসেম্বল করা হতো। ধাপে ধাপে নিজেদের দক্ষতা তৈরি করে আজ তারা নিজ দেশের তানজুমালেনে নতুন করে ২০০ একর জায়গায় ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছে। যেখানে স্টিল প্রবেশ করে আর গাড়ি বের হয়। বলা চলে আমরাও একসময় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিলাম। সে চিত্র বদলাচ্ছে। এখন আমদানির পাশাপাশি দেশেই গাড়ি অ্যাসেম্বল করছি। এখন লক্ষ্য স্থির করেছি শুধু সংযোজনে সীমাবদ্ধ থাকব না, বরং শতভাগ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে চলে যাব আমরা।

দেশে বছরে গাড়ির যে চাহিদা, তাতে অটোমোবাইল শিল্প ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে কতটা বড় হওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করছেন?

গড় হিসাব করলে বাংলাদেশে বছরে ২২-২৩ হাজার প্যাসেঞ্জার ভেহিকলসের বিক্রি আছে। এটার জন্য হয়তোবা উৎপাদন কার্যক্রম খুব বেশি বড় হবে না। কিন্তু খেয়াল করতে হবে নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপের মতো দেশগুলোয় রফতানির বড় সুযোগ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে সেভেন সিস্টার্স। এসব দেশের বাজারে ঢুকতে পারলে ফ্রেইটে আমাদের সঙ্গে কেউ প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারবে না। এর মধ্যে আমরা প্রথমে নেপালে রফতানির বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আমাদের প্রিন্সিপ্যাল প্রোটনের যে টেরিটরি ভাগ করা আছে, আশা করছি নেপালকে শিগগিরই বাংলাদেশ টেরিটরিতে পেয়ে যাব। এ নিয়ে কাজ চলছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এসব দেশে রফতানি করতে পারলে আমরা সাফটার বেনেফিট পাব। যেটা আবার মালয়েশিয়া পাবে না।

গাড়ি শিল্পে দেশের উদ্যোক্তারা কতটা ভালো করতে পারবে বলে মনে করছেন?

প্রযুক্তি যতই অগ্রসর হোক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের সেমি-অটোমেটেডে থাকতে হবে। দেশে যে শ্রম সুবিধা, সেটাকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। তাছাড়া ফুল অটোমেটেডে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে জাপান, জার্মান, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো।

ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে যেতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন দিকটি বিবেচনা করছেন?

সরকার অটোমোবাইল শিল্পের জন্য একটা সুন্দর পলিসি ঠিক করে দিয়েছেন। এখন দ্রুত এর বাস্তবায়নে যেতে হবে। যেটা এখনো হয়নি। সরকারের এ সাপোর্ট যদি আমরা পাই অদূর ভবিষ্যতে অটোমোবাইল খাত একটা ডিফারেন্ট লেভেলের ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে জানান দেবে। আরেকটি বিষয় হলো বাংলাদেশ সরকারের পারচেজ পলিসি অনুযায়ী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের গাড়ি ক্রয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি সুইজারল্যান্ডের মতো দেশ যারা গাড়ি তৈরিই করে না, গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সে দেশটির নামও উল্লেখ রয়েছে। যদিও দেশে অ্যাসেম্বল হওয়া গাড়ি বিক্রয়ে সে সুবিধাটুকু মিলছে না।

আসন্ন বাজেটে কী প্রত্যাশা করছেন?

আসন্ন বাজেটে আমাদের এক দফা এক দাবি, সরকারি মহলে নিজেদের তৈরি গাড়ি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা তাদের দেশের গাড়ি ব্যবহার করছেন। এ ধরনের কালচার আমাদের দেশেও যখন শুরু হবে আলাদা একটা ভাবমূর্তি তৈরি হবে। এছাড়া এখন ডলারের যে রেট তাতে গাড়ির দাম অনেক বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে সিকেডিতে গুরুত্ব দেয়া হলে ভালো ফল দেবে। 

গাড়ি সংযোজন খাতে বিনিয়োগের পর এখনকার উপলব্ধি কী? অর্থাৎ এ খাতে বিনিয়োগ কতটা দূরদর্শী ছিল বলে মনে করেন?

প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আমরা এ শিল্পে যুক্ত। শুধু যদি আর্থিক বিবেচনায় বলি তাহলে আমরা এমন একটি বিনিয়োগ করেছি, যেটা গার্মেন্টস কিংবা অন্য কোনো খাতে করলে দ্রুত ভালো রিটার্ন হয়তো পাওয়া যেত। কিন্তু অটোমোবাইল শিল্পে বিনিয়োগে আমরা মানসিকভাবে সন্তুষ্ট। আমরা আশা দিতে পারছি যে দেশেই গাড়ি তৈরি সম্ভব। আর যখন দেখি মানুষ এটাকে খুব ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছে, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের।

এখন কী ধরনের গাড়ি সংযোজন কিংবা বাজারজাত করছেন?

মালয়েশিয়ার প্রোটন ব্র্যান্ডের নতুন ‘টকিং কার’ বাজারে এনেছি। এ বছরই প্রোটন এক্স ৫০ মডেলের এ গাড়ি তৈরি। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল বা এসইউভি ক্যাটাগরির এ গাড়ি ১ হাজার ৪৯৮ সিলিন্ডার ক্যাপাসিটির। এর আগে এনেছিলাম প্রোটন এক্স ৭০ গাড়ি। শুরুতে আমদানি হলেও শিগগিরই এ দুটি গাড়ি সংযোজন শুরু হবে হালিশহরের কারখানায়। গ্রাহকদের বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করতে ‘পারফেক্ট ভেহিকল সলিউশন বা (পিভিএস)’ নামে একটি অনলাইন অ্যাপসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। প্রোটন ব্র্যান্ডের যেকোনো মডেলের গাড়ি ব্যবহারকারী অনায়াসে এ পিভিএস অ্যাপস ডাউনলোড করার মাধ্যমে ঘরে বসেই অনলাইনে নিজের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ক্রয়াদেশ দিতে পারবেন। এতে স্বল্প সময়ের মধ্যে সেবাও গ্রহণ করতে পারবেন তারা।