নাগরিক প্লাটফর্ম হিসেবে গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন (ডিবিএম) জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হওয়ার আগে বাজেট বিষয়ে জনসংসদ আয়োজন করে। জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সরাসরি জনঅংশগ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি, এজন্য পদ্ধতিগত পরিবর্তনের উপায় এবং আইনপ্রণেতা ও সরকারের কাছে তৃণমূল ও প্রান্তিক মানুষের অগ্রাধিকার তুলে ধরা মূলত এ উদ্যোগের লক্ষ্য। প্রতীকী সংসদ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠানটি ৫ জুন ২০২২ তারিখে আয়োজিত হয়। বরাবরের মতো এবারো ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে নানা শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিরা এখানে উপস্থিত হয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজক ছিল বণিক বার্তা, সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি, সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি। সহআয়োজনে ছিল ১৩টি নাগরিক সংগঠন ও নেটওয়ার্ক। অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করে দি এশিয়া ফাউন্ডেশন। প্রথম অধিবেশন সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ ও দ্বিতীয় অধিবেশন সঞ্চালনা করেন গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের সহসভাপ্রধান আসগর আলী সাবরি।

প্রথম অধিবেশন: জাতীয় আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও বাজেটে জনপ্রত্যাশা


সূচনা বক্তা

মনোয়ার মোস্তফা

সাধারণ সম্পাদক

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন

সারা পৃথিবীতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে কভিড-পরবর্তী অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার প্রচেষ্টা; এ প্রেক্ষাপাটে দাঁড়িয়ে আমাদের এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে ট্যাকল করা যায়, মূল্যস্ফীতির শিকার যে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষ, তাদের কীভাবে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সুরক্ষা দেয়া যায় এটাই হবে এবারের বাজেটের আসল চ্যালেঞ্জ। শুধু বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি, উন্নয়ন বরাদ্দ বৃদ্ধি, খাতভিত্তিক বরাদ্দ বৃদ্ধি—এটাই আমাদের দাবি না। জাতীয় বাজেটকে যদি সত্যিকার অর্থেই জনমুখী করতে হয়, তাহলে এখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি। সেক্ষেত্রে আমাদের স্পষ্ট প্রস্তাব হলো, স্থানীয় সরকার কাঠামোগুলোকে কীভাবে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় সরাসরি সংযুক্ত করা যায় তার উপায় বের করা।

বিশেষ অতিথি


ড. এম এম আকাশ

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান

অর্থনীতি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এবারের বাজেট সরকারের জন্য দুদিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। একটা হচ্ছে যে খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এমন কিছু করা যাবে না, যাতে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে। মুদ্রাস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে চান তাহলে খাদ্যদ্রব্যের দাম আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। খাদ্যদ্রব্যের দাম যদি আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে চান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আপনি তা পারবেন না। কৃষক জানেন, চালের দাম বাড়বে, আগের মতো তারা হয়তো ধান-চাল বিক্রি করবেন না। ধরে রাখবেন। কিন্তু অলরেডি ফুড মার্কেটে বড় বড় করপোরেট বডি ঢুকে গেছে এবং তাদের মজুদ করার ক্ষমতা অনেক বড়। এখন আপনি তাদের যদি আক্রমণ করেন তাহলে সে আপনাকে পাল্টা আক্রমণ করবে। সেটা আপনি যদি সামলাতে না পারেন তাহলে অন্য অনেক জায়গায় সমস্যা হয়ে যাবে।

বিশেষ অতিথি

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

সাবেক চেয়ারম্যান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

আমি চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলব। প্রথমত, সামাজিক নিরাপত্তবেষ্টনী যদি সত্যি সত্যিভাবে বণ্টন করতে হয় তাহলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়, ইউনিয়ন পরিষদে যে দলীয় নির্বাচন করার পদ্ধতি এ সংস্কারের দিকে নজর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষির কথা বলব। সরকারের কৃষির প্রতি নজর দেয়ার প্রবণতা কম। সেখানে নজর বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, আমরা বর্তমানকে ঠিক রেখে ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্প নেব। বর্তমান সম্পদ না রেখে ভবিষ্যৎ মেগা প্রকল্প নিয়ে কী হবে? ভবিষ্যতে যে ব্রিজ হবে সেটাতে আমি উঠতে পারব কিনা জানি না। চতুর্থত বলব, সংসদে বাজেট ব্যবস্থাপনায় এলাকাভিত্তিক প্রতিনিধিরা যেন যথাযথ ভূমিকা পালন করেন।


সভাপতি

অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমেদ

কোষাধ্যক্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চেয়ারম্যান, সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি

বাজেট শুধু ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যান নয়, এর সঙ্গে সরকারের গোল, সরকার কী চাচ্ছে, দেশটা কোথায় যাবে, সবকিছু জড়িত। আজ থেকে ১০ বছর আগেও বাংলাদেশের বাজেটের যে সাইজ ছিল, বর্তমানে তার চেয়ে আরো অনেক বড়। তবে মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই। আমরা যদি আজকের আলোচনা দেখি, খাতভিত্তিক যে কথাগুলো বলেছি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তারুণ্য, বিভিন্ন জেলার যে চাহিদা—সবাই মনে করে, সবার বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। কিন্তু আমরা যদি সবকিছু যোগ করি, তাহলে ১০০-এর ওপরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অগ্রাধিকার ঠিক করা সরকারের মূল কাজ।



প্রবন্ধ উপস্থাপক

এ আর আমান

সহসভাপ্রধান

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন

বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে কভিডজনিত অতিমারী, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং নতুন নতুন ঝুঁকি আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এ বছরের বাজেট আলোচনায় আমরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিশ্চয় আলোচনা করব। তবে সামগ্রিকভাবে জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা কী করে পেতে পারি সেটি নিয়ে কথা বলতে হবে। আমরা দেখেছি, কভিডের কারণে আমাদের জীবিকা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু শহরের মানুষ নয়, গ্রামের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেবল নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রচুর তরুণ উদ্যোক্তা পথে বসে গেছে। কভিডের কারণে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে অনেক মানুষ। কভিডের আগে আমাদের দারিদ্র্য যেখানে ছিল ২০.৫ শতাংশ, বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণার জরিপ মতে সেটা প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি চলে গেছে। এ পরিস্থিতি এ বছরেও চলমান থাকলে সাধারণ মানুষের জন্য জীবিকা নিশ্চিত করা ও জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে উঠবে এবং নতুন করে আরো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।   

বিশেষ অতিথি

কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ

কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ

দি এশিয়া ফাউন্ডেশন

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে ব্যাপক উন্নতি করেছে। রাস্তাঘাটে বেরোলেই এর দৃশ্যমান প্রমাণ আমাদের চোখে পড়ে। করোনাও আমরা ভালো মোকাবেলা করেছি। এখানে আমাদের একটু সচেতন হওয়া দরকার, আমরা কীভাবে সামনে এগিয়ে যাব এ বিষয়ে এবং টেকসই উন্নয়ন কীভাবে হবে এ বিষয়ে। সামনে যেহেতু ইলেকশনের বছর আসছে, আশা করছি আসন্ন বাজেট সেদিক বিবেচনা করে সামঞ্জস্য করা হবে। বাজেট সবসময় একটা ডেলিকেট প্রসেস। এখানে আপনাদের যেসব কথা শুনলাম যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, মন্ত্রী অবশ্যই এগুলো গুরুত্ব দেবেন বলে আশা রাখি।


প্রধান অতিথি

মো. তাজুল ইসলাম, এমপি

মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়

আমাদের গোল হলো ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়ব। পৃথিবীর কোনো দেশের উন্নতি এক বছর, ১০ বছর, ৫০ বছরে হয়নি। সবাই ধীরে ধীরে উন্নতি করেছে। বাংলাদেশ এখন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। তবে অনেক দিক থেকে এগিয়েছে। স্বাধীনতার পর মাথাপিছু আয় ছিল ১২৫ ডলার। এখন এটি বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে। আগে খাদ্যের চরম অভাব ছিল। এখন সেটি নেই। দেশে ভয়াবহ দরিদ্রতা ছিল। না খেয়ে থাকা মানুষের আহাজারি শুনেছি। কিন্তু এখন মানুষ না খেয়ে মরছে না। গ্রামে-গঞ্জে পর্যন্ত ফলের বৃহৎ বাজার গড়ে উঠছে। বর্তমান সরকার কৃষিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে কৃষিকে একক গুরুত্ব দিয়ে মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। সরকার কৃষির পাশাপাশি শিল্পায়নকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। গার্মেন্ট শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এটা আমাদের জন্য গর্বের। এর অবদান একা কারো নয়। একজন সাধারণ পোশাক শ্রমিকও এর কৃতিত্ব পাবেন।


আঞ্চলিক ও খাতভিত্তিক মুক্ত আলোচনা

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা

নুরুল আলম মাসুদ, খাদ্যনিরাপত্তা (খানি) বাংলাদেশ

কৃষকের চাষাবাদে খরচ বেড়েছে, এজন্য তাদের সরাসরি নগদ টাকায় প্রণোদনা দিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে তৈলবীজ চাষাবাদ, গম উৎপাদন ইত্যাদিতে বিশেষ প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং স্থানীয় পযায়ে কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগে ১০ বছরের করমুক্তি সুবিধা দেয়া উচিত। ভোজ্যতেল ভোক্তাদের আবারো বিপদে ফেলেছে। সরিষা ও রাইস ব্র্যান তেলকে জনপ্রিয় করতে হবে। পণ্যের আগাম মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কৃষক-ব্যবসায়ী-সরকারি প্রতিনিধি নিয়ে একটি জাতীয় মূল্য কমিশন গঠন করতে হবে।

 

শ্রম, মজুরি ও কর্মসংস্থান

নাজমা হোসেন, লেবার রাইটস ওয়ার্কিং গ্রুপ, ডিবিএম

শ্রমিকদের জন্য রেশন কার্ড প্রচলন করা দরকার। দরকার জেলা পর্যায়ে ও শ্রমঘন এলাকাগুলোয় শ্রমিক কলোনি ও বিশেষায়িত হাসপাতাল। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নবায়ন করতে হবে। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের কার্যকর ব্যবহার ও ব্যাপক সক্রিয় করতে হবে।

 

জনস্বাস্থ্য

আমিনুর রসুল, পিপলস হেলথ মুভমেন্ট

জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় চাহিদা মোতাবেক বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। মানসম্মত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এখানে ব্যক্তি, লিঙ্গ, সামাজিক পটভূমি প্রত্যেকের যেন সম অধিকার নিশ্চিত হয়। হাওর, উপকূল, পাহাড়—এ জায়গাগুলোয় চিকিৎসাসেবার খুবই খারাপ অবস্থা। স্বাস্থ্য খাতের অচলাবস্থা দূর করতে দ্রুত সব শূন্য পদ পূরণ করতে হবে।

শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ

লুত্ফুন নাহার, দি আর্থ ফাউন্ডেশন

দেশের গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল উপকরণের ব্যবস্থা করার পাশাপশি শিক্ষা উপবৃত্তির সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ বাড়াতে হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিনা সুদে শিক্ষাঋণ চালু করতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল পেতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন শিক্ষা প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুসজ্জিত করতে হবে।

 

তানভির আহমেদ তন্ময়, প্রতিবন্ধী অধিকার কর্মী

আমরা দেখতে পাই, প্রতি বছরই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কি যথেষ্ট? মোটেও যথেষ্ট নয়। প্রতিবন্ধীদের শুধু ভাতা নয় তাদের সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি জানাচ্ছি।

 

বিম্পালি ডেভিড রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ দলিত ও অধিকারবঞ্চিত আন্দোলন

জাতীয় বাজেটে দলিতদের উন্নয়নের জন্য অবশ্যই একটা বিশেষ বরাদ্দ রাখা উচিত। বর্তমান সরকার আমাদের জন্য কিছুটা করছে, কিন্তু এটা একটা দয়ার মতো। আমাদের দাবি পূরণ করার মতো বরাদ্দ বাজেটে অবশ্যই থাকতে হবে।

 

শহিদুল ইসলাম শহিদুল্লাহ, দিনাজপুর

দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় দিনাজপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। আমাদের এখানে পচনশীল খাদ্যের জন্য হিমাগার তৈরির প্রস্তাব করছি। যেমন আলু, টমেটো, লিচু, আম। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সর্বজনীন রেশন ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানাচ্ছি।

 

ওমর ফারুক, কক্সবাজার

কক্সবাজারের মত্স্য খাত ও লবণ শিল্পই সাধারণ জনগণের প্রধান পেশা। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, যে পরিমাণ লবণ কক্সবাজারে উৎপাদন হয়, সে পরিমাণ মজুরি একজন শ্রমিক পান না। একজন বর্গাচাষী যে পরিমাণ জমি চাষ করেন, এর চেয়ে প্রাপ্ত অর্থ তার জন্য আনন্দ বয়ে আনে না। আমার দাবি হলো, লবণচাষীরা যেন তাদের ন্যায্যমূল্য পান বাজেটে সে উদ্যোগ থাকা দরকার।

 

মহেন্দ্র নাথ সেন, খুলনা

সরকার বলছে কৃষিজমিতে কোনো আবাসন করা যাবে না। অথচ একের পর এক কৃষিজমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমরা উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা। আমাদের এলাকার বেড়িবাঁধ বারবার ভাঙছে। বেড়িবাঁধ আমাদের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর স্থায়ী সমাধান চাই।

 

রাশেদ রিপন, রাজশাহী

আমরা বিশেষভাবে কর্মসংস্থানের বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই। রাজশাহী অঞ্চলে বড় কোনো শিল্প-কারখানা না থাকায় কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে। সেখানে এমন কলকারখানা স্থাপন করা দরকার, যেটা কৃষি বা মত্স্য শিল্পকে ক্ষতি না করে। হাই-টেক পার্কের মতো অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বাস্তু বা কৃষিজমি থেকে কী পরিমাণ পরিবারকে উত্খাত হতে হচ্ছে তার সুষ্ঠু অ্যাসেসমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে।


দ্বিতীয় অধিবেশন: জীবন ও জীবিকা রক্ষায় সর্বজনীন কৌশল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা


বিশেষ অতিথি

ড. নাজনীন আহমেদ

কান্ট্রি ইকোনমিস্ট, ইউএনডিপি

আমরা যখন সর্বজনীন পেনশন স্কিমের কথা বলছি সেটা যেমন মানুষের একটা বয়সের পরে তাকে সুরক্ষা দেবে, তার আগে কর্মসংস্থান বা কর্মসৃজনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এসব মানুষের কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তারা যেন পেনশনে কন্ট্রিবিউট করতে পারে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে কন্ট্রিবিউশন একটা দিক। এটা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিকল্প নয়। লাইফ সার্কেল অ্যাপ্রোচের কথা বলা হয়েছে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে ঝুঁকিগুলো থাকে, দুর্বলতাগুলো থাকে সেটার মোকাবেলায় টার্গেটেড প্রোগ্রাম যেন থাকে। সরকার অন্যান্য পরিকল্পনায় লাইফ সার্কেল অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করছে। রফতানিমুখী শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের জন্য একটি সেন্ট্রাল ফান্ড রয়েছে। রফতানিকারকরা তাদের রফতানি আয়ের দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এখানে দেয়ার কথা। সেটি ঠিকমতো দেয়া হচ্ছে কিনা এটা জানা দরকার। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির অনেক কিছুতেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।

বিশেষ অতিথি

অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ

পরিচালক, সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি

স্বাস্থ্য খাতে আমরা খরচ করছি জিডিপির ১ শতাংশের মতো, যেটি বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশের মতো। স্বাস্থ্য খাতে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট অংকের বাজেট। অথচ আমাদের বাজেটের ১০ শতাংশ খরচ করা উচিত বা জিডিপির ন্যূনতম ২ শতাংশ। আমাদের সাড়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, আরো কীভাবে কার্যকর করা যায় সেটি ভাবতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার হচ্ছে ৭০ শতাংশের মতো। এটিকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ বা ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে। ২০৩০ সাল কিন্তু বেশি দূরে নয়।  আমাদের অর্থনীতির একটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বৈষম্য বাড়ছে। ৬১ শতাংশ আমাদের শিক্ষা খাতে ঝরে পড়েছে। করোনায় ঝরে পড়াদের কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় সেটি ভাবতে হবে। যেহেতু স্বাস্থ্য হচ্ছে আমাদের মৌলিক অধিকার তাই সবার জন্য হেলথ কার্ড চালু করা উচিত।


বিশেষ অতিথি

শামীম হায়দার পাটোয়ারী, এমপি

অতিরিক্ত মহাসচিব, জাতীয় পার্টি; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য

বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন পদ্ধতি ট্র্যাডিশনাল। এটা গণমুখী বলার কোনো সুযোগ নেই। মালিক পক্ষের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের মালিক তো জনগণ। ১৬ কোটি মানুষ তো আর পলিসিতে কাজ করতে পারে না। সব সিদ্ধান্ত ঢাকা থেকে যাচ্ছে। ওপেন বাজেট ইনডেক্সে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বাজেটের আগে বাজেট নিয়ে আলোচনাই হয় না। আমাদের উচিত ড্রাফট ইন্ডিকেটিভ বাজেট ছয় মাস আগে দিয়ে দেয়া। তারপর এটা সিভিল সোসাইটি, সংসদ সদস্য সবার মাঝে এটা নিয়ে আলোচনা হবে। তিন মাস আগে এটি সংশোধন হবে, তারপর এটি পাস হবে। সব বাদ দিয়ে আমাদের দক্ষতা বাড়ানোর মেগা প্রজেক্ট নেয়া উচিত। কিন্তু দক্ষতা বাড়ানোর কোনো মেগা প্রজেক্ট সরকারের নেই। যদি এক কোটি লোক বিদেশে থাকে, এখানে তিন-চার কোটি লোক উপকৃত হচ্ছে। মাইগ্রেশন খাতের জন্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল মাত্র ২ পয়সা। কিছু অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রজেক্টে অর্থায়ন করে আমরা অতিপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থায়ন করতে পারিনি। উন্নয়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ প্যাকেজ প্রয়োজন। জিরো মাইগ্রেশন খরচে এসব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর লোকদের প্রতি বছর বিদেশে পাঠান। দেশের হতদরিদ্রের হার মুহূর্তের মধ্যে কমে যাবে। অন্যদিকে সরকার দারিদ্র্যের যে ডাটা দিচ্ছে বাস্তবের সঙ্গে সেটি মিলছে না।

বিশেষ অতিথি

রুমিন ফারহানা

সংসদ সদস্য

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)

যাদের ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে বাজেট চলে তারা আসলে কেমন বাজেট দেখতে চায় সেটা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা দেখি না। সেজন্যই প্রতি বছর যে বাজেট দেয়া হয় সেটি আসলে একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা হয়। কেন্দ্রনির্ভর একটা বাজেটের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি। সংসদে বাজেট নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেখানে সংসদ সদস্যদের কোনো মতামত দেয়ার সুযোগ থাকে না। যে দু-চারজন কথা বলে যান, তাদের কথা সরকারের কানে পৌঁছায় না। স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকাই, আমরা দেখব ভীষণ অদক্ষতা আছে, অব্যবস্থাপনা আছে, দুর্নীতি আছে। স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ৮৮ ডলার। এ কারণে জনগণকে নিজের পকেট থেকে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে হয় ৭০-৭২ শতাংশ। এ ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর ৮৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। সরকার বলেছিল ২০৩২ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনবে। কমা দূরে থাক এ ব্যয় এখন বেড়ে ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একটা পরিবারকে পথে বসে যাওয়ার জন্য একজন অসুস্থ ব্যক্তিই যথেষ্ট। সামাজিক সুরক্ষা খাতে চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বাজেট বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। অথচ এখানে যুক্ত আছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর ভাতা, গ্র্যাচুইটি, উপবৃত্তি, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, প্রণোদনার সুদও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেখার বিষয় দরিদ্র মানুষকে উদ্দেশ করে কত টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে? এভাবে শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে জনগণকে ভালো রাখা যায় না।

প্রধান অতিথি

ড. শামসুল আলম

প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

সরকারের অবদান কী সেটা দেখতে হলে আমাদের খাদ্যোৎপাদন কত বেড়েছে, মাথাপিছু আয় কত বেড়েছে, শিক্ষার হার কত বেড়েছে, প্রত্যাশিত গড় আয়ু কত বেড়েছে, মাতৃমৃত্যু হার কত কমেছে; ওই সংখ্যাগুলো দিয়ে কিন্তু সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা বিবেচনা করতে হবে। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি যে একটা উন্নয়নশীল দেশের থাকে, সেগুলো দিয়ে বললে আসলে সরকারের সফলতা বা কর্মসম্পাদন কী তা বোঝা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মেগা প্রজেক্ট হিসেবে দেখা প্রয়োজন। একেকটা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে কয়েক হাজার কোটি টাকা দিতে হয়। দক্ষতা উন্নয়নে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। এখনো বিদেশ থেকে শ্রমিক এনে কাজ করতে হয়। ২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতায় আসে। তখন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল ৩ শতাংশ। এখন এটি ১৮ শতাংশ।

এবারের বাজেট প্রণয়নের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। চিনির দাম ৪২ শতাংশ বেড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে ১০০ শতাংশ। তাই আমাদের মূল্যস্ফীতি আমদানীকৃত, সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে নয়। আমাদের ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান বেসরকারি খাতে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর কথা আমাদের ভাবতে হবে। তাদের নিরাপত্তার জন্য ভাবতে হবে। আমরা প্রথম প্রস্তাব করি যে ভলান্টারি পেনশন স্কিমে আসতে হবে। সেটার ওপর কাজ চলছে। ২০২৫-এর আগে এটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেটি বাস্তবায়ন হবে। যেখানেই যে চাকরি করুক, সেখানে তার অ্যাকাউন্টে একটা অ্যামাউন্ট জমা হবে, রাষ্ট্র একটা অংশ দেবে।

বৈষম্য বেড়েছে বলে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এটি নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারবেন না। কারণ ২০১৬ সালের পর আমাদের কোনো ডাটা নেই। আমার ব্যক্তিগত ধারণা এটি কমেছে বা স্থির আছে, বাড়েনি। গ্রামে গেলে পিউর কৃষক এখন পাবেন না। কৃষকদের ছেলেরা অন্য কিছু করে। যারা অশিক্ষিত, প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়েছে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকার সমস্যা নেই। সমস্যা হলো শিক্ষিত, এমএ, বিএ পাস যারা তাদের। সরকারি চাকরি না হলেই নিজেকে বেকার মনে করে। যারা একদম বেকার তাদের কথা ভিন্ন। হেলথ কার্ড ইস্যু এবার এসেছে। এটি আগেও ছিল। এখন আবার এটি গ্রহণ করা যেতে পারে। এবার সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেট বাড়বে।

আমাদের স্থানীয় সরকারগুলোর স্তর বেশি বাংলাদেশে। এত স্তর নিয়ে সমস্যা হয়ে যায়। অনেক স্তর, এদের মাঝে কাজের বরাদ্দের কোনো শৃঙ্খলা নেই। স্থানীয়ভাবে রেভিনিউ বাড়ানোর প্রচেষ্টা কেউ নেন না। স্থানীয় সরকারকে সক্রিয় করতে চান, তাহলে তাদের আয় বাড়ানো উচিত। বাজেট জেলাভিত্তিক হয়ে লাভ নেই, যদি না জেলাভিত্তিক শাসন থাকে। জেলাভিত্তিক প্রণয়ন করতে হলে সেটি আবার জেনারেট করতে হবে। ঢাকা থেকে টাকা নিয়ে জেলা বাজেট সফল হবে না।

সভাপতি

ডা. রশীদ-ই মাহবুব

আহ্বায়ক, স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন

একটা কথা মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্য বাজেট আর চিকিৎসা এক নয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি অনেক হয়েছে। কিন্তু যেখানে আমাদের সমস্যা আছে সেটি হলো চিকিৎসা ব্যয়। আমাদের সবার চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে, সেটা সর্বজনীন বীমা বা স্বাস্থ্যসেবা, যে নামেই করা হোক। আর একটা প্রশ্ন এসেছে, এটা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সম্ভব নাকি স্থানীয় সরকার দেখবে। কারণ বীমার ওপর একটা প্রিমিয়াম থাকে। এখন যেটা সরকার বলছে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত একটা পরিবারের চিকিৎসার দায়িত্ব তারা নেবে। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তিগত চিকিৎসায় এটা অনেক কম। এখন বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশেই নিম্নবিত্তদের জন্য এটা সর্বজনীন করার চেষ্টা করছে। আমি মনে করি বাংলাদেশ সরকারে যে বা যারাই আসুক, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

রহিমা সুলতানা কাজল, বরিশাল

আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে প্রচুর মানতা জনগোষ্ঠী আছে। তাদের জন্য কিছু করা হচ্ছে না। মানতাদের জন্য বাজেটে কিছু বরাদ্দ রাখা হোক। একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হোক।

জনগোষ্ঠী ও বিষয়ভিত্তিক মুক্ত আলোচনা

সেকেন্দার আলী মিনা

যুগ্ম সম্পাদক, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন

অনেক ভালো উদ্যোগ নষ্ট হয়ে যায় ব্যবস্থাপনার অভাবে। অনেক ভালো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু এ ভালো উদ্যোগ যাদের জন্য এগুলো যদি তাদের কাছে পৌঁছানো না যায়, তাহলে সেগুলো আর ভালো উদ্যোগ থাকে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি অন্যায়-দুর্নীতি করেন তাহলে তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। এটা করে আসলে কোনো উপকার হয় না।

 

নাজমা ইয়াসমিন

শ্রম বাজেট ওয়ার্কিং গ্রুপ, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন

দেশে শ্রমজীবী মানুষ ৬ কোটি ৮০ লাখ। এর ৮০ ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এসব শ্রমজীবী মানুষ কভিডের সময় কাজের অনেক ঝুঁকির মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের দাবি শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা স্কিম চালু করার। ২০১৫ সালে এ-বিষয়ক একটা জাতীয় কৌশলপত্র তৈরি করা হয়েছে। এখন আমরা এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চাই।

 

বিভূতোষ রায়

বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন

কাউকে পেছনে রেখে উন্নয়ন নয়। প্রায় এক কোটি দলিত বাংলাদেশে বাস করে। আমাদের কিছুই নেই। আমাদের জমি নেই, আবাসন নেই, খাদ্য নেই, স্বাস্থ্য নেই। আমাদের এ অবস্থাটিকে মানবিকভাবে দেখা হোক। দলিত কর্মীদের জন্য জেলায় জেলায় কলোনি দরকার। দলিত শ্রমিকদের পেশাগত সুরক্ষাসামগ্রী দিতে হবে। 

 

রেজাউল করিম সিদ্দিকী রানা, কৃষি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন করা। কথাটি থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। দিন শেষে ১৮ কোটি মানুষ সবাই ভোক্তা। তাদের অধিকারের জায়গাটি এবং তাদের সুরক্ষার জায়গাটি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সামাজিক নিরাপত্তাবলয় বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি সে বিষয় ভাবা দরকার।

 

নাইমুল, প্রতিবন্ধী অধিকার কর্মী

যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তি প্রতিবন্ধী হতে পারে। প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে সিস্টেমেটিক ডিস্ক্রিমিনেশন কমানো হোক। তাদের প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেয়া হোক। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নামমাত্র ভাতা দেয়া হয়। এটি বন্ধ করে সুনির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা দেয়া হোক।

 

ডা. ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার

স্বাস্থ্য কর্মসূচি, কেয়ার বাংলাদেশ

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতার কথা বলা হচ্ছে। এটার প্রয়োজনীয়তা এবং বেনিফিট বা কমিটমেন্ট নিয়ে কারো কোনো দ্বিধা নেই। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এটাকে নিশ্চিত করার জন্য ম্যানেজমেন্ট গ্যাপস আছে। সেগুলো নিশ্চিত করার জন্য আরো ভাবার বিষয় আছে। স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের যে পদগুলো শূন্য হয়ে আছে সেগুলো পূরণ করার কোনো বিকল্প নেই।

 

জনবাজেট সংসদের সামগ্রিক প্রস্তাব

aদ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চরম আকার ধারণ করছে। নতুন দরিদ্রসহ প্রায় দেড় কোটি পরিবারের মূল্যস্ফীতি, কভিড, দুর্যোগ, আর্থিক বৈষম্য মোকাবেলার জন্য প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল তৈরি করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে নামমাত্র অর্থ ও খাদ্যসহায়তার বদলে এর পরিমাণ বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করা দরকার।

aসর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার প্রচলন

প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দুর্বলতা ও ত্রুটি দূর করতে হলে টার্গেট গ্রুপভিত্তিক ছোট ছোট অসংখ্য কর্মসূচির বদলে মানবাধিকার ও জনকল্যাণের দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার’ প্রচলন করা দরকার অনতিবিলম্বে, যাতে অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতি মা ও শিশু, বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী, কর্মহীন বা প্রচ্ছন্ন বেকার তরুণ-তরুণী-মধ্যবয়সী ব্যক্তি, অবসরে যাওয়া প্রবীণসহ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঝুঁকিতে থাকা সব মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা পায়। প্রয়োজনে এজন্য আইন প্রণয়ন করা দরকার। কার্যকরী সুরক্ষা কাঠামোর জন্য স্থানীয় সরকারকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার ও সরাসরি ক্যাশ ট্রান্সফার পদ্ধতি চালু করা দরকার।

aসামাজিক স্বাস্থ্য বীমার প্রচলন

ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলা ও বিশাল অংকের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ‘সামাজিক বীমা/সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা’ চালু করা দরকার। এজন্য সংসদে, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে একটা জাতীয় আলোচনা শুরু করা দরকার যাতে ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও নিয়োগকর্তা পর্যায়ে সামর্থ্য ও কার কী দায়িত্ব তা পরিষ্কার করা সম্ভব হয়। সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা না গেলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য ২০৩০ থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।

aসর্বজনীন পেনশন স্কিমের কার্যকরী কাঠামো

বেসরকারি খাতে থাকা ব্যক্তিদের কল্যাণে সর্বজনীন পেনশন স্কিম সরকারের একটা চমত্কার উদ্যোগ। এর সুফল পেতে হলে বেসরকারি নিয়োগকর্তা ও ব্যক্তি চাকুরের পাশাপাশি রাষ্ট্রের কন্ট্রিবিউশন প্রয়োজন হবে। স্বকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য নমনীয় কিন্তু স্পষ্ট কাঠামো তৈরি করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা হতদরিদ্র শ্রমজীবী, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মূলত করের অর্থে কন্ট্রিবিউশন নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে ডিমান্ড সাইডে সচেতনতা ক্যাম্পেইন তৈরি করতে হবে।

aবৈষম্য হ্রাস ও করভার লাঘব

সমাজে আয়বৈষম্য এখন বড় একটি চ্যালেঞ্জ। করমুক্ত আয়সীমা ন্যূনতম ৪ লাখ টাকা করতে হবে এবং প্রতি স্ল্যাবে অন্তত আড়াই শতাংশ হারে করভার কমানো প্রয়োজন। তবে করপোরেট ট্যাক্সের ক্ষেত্রে বিদ্যমান হার কমানো যাবে না। অতিধনীদের ওপর সম্পদ করের সারচার্জ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টার্নওভার ট্যাক্স কমানো দরকার। অর্থ পাচার ও দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের কম প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হ্রাস এবং এ মুহূর্তে আবশ্যিক নয় এমন মেগা প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণ কমানো যেতে পারে।